বিশেষ সংবাদদাতা
প্রিন্ট
বুধবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৫ সর্বশেষ আপডেট : ৮:১৬ পূর্বাহ্ণ
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিয়ো গুতেরেজ। ছবি-ইউএন নিউজ।
গাজায় যুদ্ধ-বিধ্বস্ত এলাকায় অবশিষ্ট মানুষগুলোকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষায় খাদ্য-সহায়তা চালুর উদাত্ত আহবান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিয়ো গুতেরেজ। ৮ এপ্রিল মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে গণমাধ্যমের সামনে প্রদত্ত বক্তব্যে মহাসচিব বলেন, গাজা উপত্যকায় মার্চের ২ তারিখে খাদ্য-ওষুধবাহী যানবাহনের প্রবেশাধিকার হরণ করেছে ইসরায়েল। এরপর থেকেই কোন ধরনের খাদ্য-সহায়তা পাচ্ছে না গাজাবাসী। মহাসচিব উল্লেখ করেছেন, জিম্মি হিসেবে আটক সকলের মুক্তির বিকল্প নেই। আশা করছি অবিলম্বে ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যেকার যুদ্ধ-বিরতি আবারো বহাল হবে। উল্লেখ্য, ইসরায়েলিরা জাতিসংঘের খাদ্য-ওষুধবাহি যানবাহন প্রবেশের পথ বন্ধ করায় গাজাবাসী নিদারুণ কষ্টে নিপতিত হয়েছেন। সে সব খাদ্য বহনকারি ট্রাক ইসরায়েলের ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের প্রতি মহাসচিবের আকুতি উচ্চারিত হয়েছে মূল নীতিসমূহের সাথে সম্পৃক্ত থাকার। সদস্য হিসেবে বাধ্যবাধকতাগুলো মেনে চলার আহবান জানিয়ে মহাসচিব উল্লেখ করেছেন মানবিকতার স্বার্থে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা অব্যাহত রাখতে হবে। গাজার পরিস্থিতি বর্ণনার ভাষা হয়তো বিশ্ব হারিয়ে ফেলেছে। তবে আমরা সত্য ও ন্যায়-নিষ্ঠতা থেকে কখনোই পালাতে পারবো না। মহাসচিব গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সকলকে সতর্ক হবার আহবান জানিয়ে আরো উল্লেখ করেছেন, বর্তমানের পরিস্থিতি মৃত্যু উপত্যকায় এসেছে। আন্তর্জাতিক আইন এবং ইতিহাসের দৃষ্টিতে তা একেবারেই অসহনীয় হয়ে পড়েছে। যখোন দখলীকৃত পশ্চিম তীর আরেকটি গাজায় রূপান্তরিত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে নিপতিত, তখোন সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তোলেছে। মহাসচিব বলেন, এখোন সময় হচ্ছে অমানবিকতা নিষ্পত্তির, বেসামরিক-নিরস্ত্র লোকদের রক্ষা করা এবং জিম্মিদের মুক্তি দেয়ার। একইসাথে জীবন রক্ষাকারি সহায়তা নিশ্চিত এবং যুদ্ধ বিরতির নবায়ন করার।
মহাসচিব বলেছেন, ত্রাণ-সহায়তা ট্রাকে শুকিয়ে যাওয়ায় গাজায় আবারো ভয়ংকর একটি ধ্বংসযজ্ঞ গ্রাস করছে। গাজা বর্তমানে একটি মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। সেখানকার নিরস্ত্র মানুষেরা মৃত্যুর সাথে কোলাকুলি করছেন। মহাসচিব মনে করছেন, ৭ অক্টোবর হামাস বাহিনী কর্তৃক ইসরায়েলি তরুণ-তরুণীদের ওপর বন্দুক হামলার নৃশংসতার মধ্যদিয়ে কিছু সত্য উদঘাটিত হলেও তার সমাপ্তির আভা ফুটে উঠেছিল যুদ্ধ বিরতির পর। সেই যুদ্ধ বিরতির মধ্যদিয়ে জিম্মিদের মুক্তি, জীবন রক্ষাকারি ওষুধ ও খাদ্য সরবরাহের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। এবং প্রমাণিত হয়েছিল যে মানবিকতায় সকলেই উজ্জীবিত। কয়েক সপ্তাহ বন্দুকের গুলির আওয়াজ থেমে ছিল, সবধরনের প্রকিবন্ধকতা অপসারিত হয়েছিল, লুটতরাজের ঘটনাও ছিল না, এ অবস্থায় আমরা জীবন রক্ষাকারি ওষুধ ও খাদ্য-সামগ্রি গাজা উপত্যকার সর্বত্র সরবরাহে সক্ষম হয়েছিলাম-বলেন মহাসচিব। এমনি একটি মানবিক পরিস্থিতির হঠাৎ অবসান ঘটেছে আবারো ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসী তৎপরতা শুরু হওয়ায়। যুদ্ধ-বিরতির চুক্তিকে দলিত-মথিত করা হয়েছে। মানবিকতা ডুকরে কাঁদছে। ইসরায়েলে জিম্মিদের মত গাজায় ফিলিস্তিনিদের পুনরায় বেঁচে থাকার স্বপ্ন ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। গতকাল (৭ এপ্রিল) আমি যখোন জিম্মিগণের পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করেছি তখোন এমোন উদ্বেগ-উৎকন্ঠা দেখেছি, উপলব্ধি করেছি। এমন নাজুক পরিস্থিতির কারণেই মহাসচিব বারংবার জিম্মিদের নি:শর্ত মুক্তির উদাত্ত আহবান রাখছেন। স্থায়ী যুদ্ধ-বিরতি এবং ঐ অঞ্চলে মানবিক সহায়তার পরিবেশ পরিপূর্ণভাবে তৈরীর আহবানও মহাসচিব জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি। মহাসচিব উল্লেখ করেছেণ, এমন একটি নিদারুন পরিস্থিতিতে আমাদেরকে সঠিক পন্থা অবলম্বন করতে হবে গাজায় ওষুধ ও খাদ্যবাহী যানবাহনের প্রবেশের বাধা অপসারণে। আটকে পড়া ফিলিস্তিনিরা যাতে অবাধে খাদ্য ওষুধ পেতে পারেন-তেমন একটি পরিবেশের বিকল্প নেই। এর আগেরদিন অর্থাৎ সোমবার জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক প্রধানের সাথে এক যুক্ত বিবৃতি প্রদানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মহাসচিব বলেন, গাজায় প্রত্যেকের খাবারের জন্যে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার যে দাবি ইসায়েলিরা করেছেন তা আদৌ সত্য নয়। আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী ইসরায়েলকেও অমানবিক পরিস্থিতির মোকাবেলায় সদয় হতে হবে-মন্তব্য মহাসচিবের। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী জাতিসংঘের প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব রয়েছে-যা ইসরায়েলও এড়াতে পারে না। চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী খাদ্য ওষুধ সামগ্রি দুর্গতদের মাঝে অবাধে সরবরাহের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসা-সেবা অব্যাহত রাখার অঙ্গিকারও করেছে সকল সদস্য রাষ্ট্র। মহাসচিব বলেছেন, চিকিৎসক-নার্সগণকেও অবাধে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গিকার করেছেন সকলে। আর্টিকেল-৫৯, প্যারাগ্রাফ-ওয়ানে চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন আরো উল্লেখ করেছে যে, যুদ্ধ-বিরাজিত অঞ্চলে কিংবা কিছু অংশে দুর্গতদের মধ্যে ওষুধ ও খাদ্য-সামগ্রি সরবরাহের দায়িত্ব অধিগ্রহণকারিদের ওপর বর্তায়। সে অনুযায়ী ইসরায়েলের দায়িত্ব হচ্ছে গাজা উপত্যকায় সবকিছুর সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। আন্তরিক মানবিক আইন আরো উল্লেখ করেছে যে, ত্রাণ কাজে লিপ্ত মানুষদের নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। গাজায় সামরিক অভিযানের সময় চিকিৎসক, নার্স এবং ত্রাণ-কর্মীগণের নিরাপত্তা সুরক্ষায় মনোযোগী হওয়ার দায়িত্ব ইসরায়েলিদের-এমন প্রসঙ্গটিও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মহাসচিব।
জাতিসংঘ মহাসচিবের উপরোক্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওরেন মারমোস্টাইন। মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রদত্ত বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অযথা কথা বলতে বরাবরই মহাসচিব বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেন না। কারণ, গাজা উপত্যকায় মানাবিক সহায়তার কোন কমতি নেই। যুদ্ধ-বিরতির ৪২ দিনে ২৫ হাজারের অধিক ট্রাক (ত্রাণবাহী) গাজায় ঢুকেছে। এসব ট্রাককে হামাস তার যুদ্ধ-সরঞ্জাম আমদানীর অবলম্বনে পরিণত করেছে। এজন্যে তোমার (জাতিসংঘ মহাসচিব) বক্তব্যে গাজা থেকে হামাস বাহিনী চলে যাবার আহবান সংবলিত একটি শব্দও উচ্চারিত হয়নি।
Posted ৮:১৬ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৫
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর