কানাডাকে ৫১তম স্টেট, পানামা খাল ও গ্রীণল্যান্ডের দখল এবং ‘গালফ অব মেক্সিকো’ নয় ‘গালফ অব আমেরিকা’: আসলে কী করতে চান ডোনাল্ড ট্রাম্প

লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র   প্রিন্ট
বুধবার, ০৮ জানুয়ারি ২০২৫   সর্বশেষ আপডেট : ৮:০২ পূর্বাহ্ণ

কানাডাকে ৫১তম স্টেট, পানামা খাল ও গ্রীণল্যান্ডের দখল এবং ‘গালফ অব মেক্সিকো’ নয় ‘গালফ অব আমেরিকা’: আসলে কী করতে চান ডোনাল্ড ট্রাম্প

জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে পানামা খালের পুনর্দখল এবং গ্রীণল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনতে চান নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এজন্যে তিনি সামরিক শক্তি প্রয়োগেও দ্বিধা করবেন না। মার্কিন কংগ্রেস কর্তৃক গত নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয়কে সার্টিফাই করার পরদিন ৭ জানুয়ারি ফ্লোরিডায় নিজ বাসভবনে আহূত সংবাদ সম্মেলনে ডনাল্ড ট্রাম্প একইসাথে ‘গাল্্ফ অব মেক্সিকো’র নাম পাল্টে ‘গাল্্ফ অব আমেরিকা’ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। শুধু তাই নয়, আগে থেকেই বলে আসা কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম স্টেটে পরিণত করার কথাও জোর দিয়ে বলেছেন। অর্থাৎ ২০ জানুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিলেন। এরফলে নিকট প্রতিবেশীই শুধু নয়, ইউরোপের সাথেও বিদ্যমান সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটলের আশংকা করছেন ঝানু কুটনীতিকরা। সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছিলেন যে, পানামা খালের পুনর্দখলে এবং গ্রীণল্যান্ডকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করবেন কিনা। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এক্ষুণি সে ব্যাপারে কোন অঙ্গিকার ব্যক্ত করতে চাচ্ছি না। তবে কিছু করতে হলে হয়তো সে ধরনের প্রক্রিয়ায় যেতে হবে। কারণ, পানামা খালটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে খুবই প্রয়োজন। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেই গ্রীণল্যান্ডকে আমাদের খুবই প্রয়োজন।

ট্রাম্প যখোন সংবাদ সম্মেলনে গ্রীণল্যান্ডকে দখলে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা উপস্থাপন করেন ঠিক সে সময়েই তার জ্যেষ্ঠ পুত্র ডনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র গ্রীণল্যান্ড সফর করছিলেন। উল্লেখ্য, আর্কটিক এবং আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম অ-মহাদেশীয় একটিম দ্বীপ হচ্ছে গ্রীণল্যান্ড। বরফ আচ্ছাদিত এই দ্বীপের জনসংখ্যা মাত্র ৪৫ হাজার। ৬০০ বছরেরও অধিক সময় যাবত একটি ডেনমার্কের অংশ এবং বিশাল খনিজ সম্পদে ভরপুর। এই দ্বীপের মধ্যদিয়ে রাশিয়া ও চীনের সামরিক জাহাজ চলাচল করে বলেই যুক্তরাষ্ট্র তা সহ্য করতে পারছে না। মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অবলম্বন হতে পারবে দখলে নিতে পারলে। আরো উল্লেখ্য, এই দ্বীপের বাসিন্দারা ইতিমধ্যেই স্বাধীন হবার আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছেন। অপরদিকে, ট্রাম্প বলেছেন, ‘দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ডেনমার্ক। তবে আইনগত অধিকার ডেনমার্কের আদৌ আছে কিনা সেটিও জানেন না দ্বীপের বাসিন্দারা। যদিও তা থাকে, তবুও সেটি ছেড়ে দেয়া উচিত। কারণ, আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই সেটির নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে।’ উল্লেখ্য যে, ট্রাম্প প্রথম টার্মেই অর্থাৎ ২০১৯ সাল থেকেই গ্রীণল্যান্ডের দখল নেয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করে আসছেন। এর আগে প্রেসিডেন্ট আইজেনাওয়ার যেভাবে আলাস্কা-কে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্টেট হিসেবে দখলে নিয়েছেন, একইপন্থা অবলম্বনে আগ্রহী ট্রাম্প। তবে কানাডাকে ৫১তম স্টেটে পরিণত করতে সামরিক শক্তি প্রয়োগে আগ্রহী নন ট্রাম্প-এটা উল্লেখ করেছেন। কানাডাকে অর্থনৈতিকভাবে চাপ প্রয়োগের মনোভাব ব্যক্ত করেছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। কানাডার পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রফতানী করলে ২৫% হারে ট্যাক্স গুণতে হবে-এটি আগেই উল্লেখ করেছেন। করোনা পরবর্তী সংকট থেকে কানাডাকে ঘুরে দাঁড়াতে যথাযথ নেতৃত্ব প্রদানে ব্যর্থতার দায় নিয়ে ৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীত্ব এবং দলীয় প্রধান থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন জাস্টিন ট্রুডো। এরপর ট্রাম্প আরো জোরালোভাবে কানাডা নিয়ে তুচ্ছ্বতাচ্ছ্বিল্য মন্তব্য করলেন-যা সুধীজনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলেও ট্রাম্প হয়তো তার প্রতিহিংসাপরায়নতাকেই প্রাধান্য দিয়ে যাবেন। কারণ, প্রথম মেয়াদে জাস্টিন ট্রুডো ট্রাম্পের অনেক কাজকর্মেরই সমালোচনা করেছেন।

এদিকে, পানামা খাল হচ্ছে মধ্য আমেরিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃত্রিম জলপথ যা আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্ত করেছে। এটি বৈশ্বিক শিপিংয়ের জন্য সামুদ্রিক ভ্রমণের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে। এই খালটিকে ১৯১৪ সালে যোগাযোগের অবলম্বনে পরিণত করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তা পানামার ইস্তমাসের মধ্যদিয়ে ৫০ মাইল বিস্তৃত। যুক্তরাষ্ট্র এই খালের নিয়ন্ত্রণ ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পানামাকে হস্তান্তর করে। হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়াটি ১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে সম্পন্ন হয়। সময়ের ব্যবধানে এই খালটিকে চীন ব্যবহার করছে এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে ডনাল্ড ট্রাম্প যুক্তি দেখাচ্ছেন। ট্রাম্প বলেছেন, পানামা খাল আমাদের দেশের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। অথচ এটি চীন দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। যদিও আমরা সেটি নির্মাণ করে পানামাকে দিয়েছি, চীনকে দেইনি। পানামা সেই উপকারের অপব্যবহার করছে বলে ট্রাম্প বলেছেন।
ট্রাম্প দাবি করেন, এখোন যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণযুগ। সেজন্যেই ‘মেক্সিকো উপসাগর’কে ‘আমেরিকা উপসাগর’ হিসেবে নামকরণ করতে হবে। কারণ, এই সাগরের সুন্দর একটি বলয় রয়েছে। নামকরণটিও হবে অত্যন্ত সুন্দর।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’এ প্রদত্ত মন্তব্যে প্রগতিশীল রাজনীতিকরা উল্লেখ করেছেন, ডেনমার্কের দ্বীপ গ্রীণল্যান্ড এবং পানামা খালের দখল নেয়ার অভিপ্রায় প্রকাশের মধ্যদিয়ে ট্রাম্প অত্যন্ত বোকামি করেছেন এবং বিষয়টি আন্তর্জাতিক ক’টনীতিতে ভয়ংকর ও বিপজ্জনক অবস্থা তৈরী করবে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মিটে ফ্রেডারিক্সন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র। আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে, সেই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা পালন করবে। বিশেষ করে রাশিয়ার বিপরীতে। গ্রীণল্যান্ডের প্রিমিয়ার মুতে বি এগেডে লিখেছেন, গ্রীণল্যান্ডের মালিক হচ্ছেন সেখানকার অধিবাসীরা। আমাদের ভবিষ্যত এবং স্বাধীনতার লড়াইয়ের ব্যাপারটিও আমাদেরই। তাই গ্রীণল্যান্ডের মালিকানা অথবা নেতৃত্বের ব্যাপারটি নির্দ্ধারিত হবে আমাদের মত নাগরিকের দ্বারাই।

প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর পদত্যাগের ঘোষণার মধ্যেই প্রতিবেশী দেশ কানাডাকে আবারো পুরনো প্রস্তাবের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন,‘কানাডার জনগণ চান তাদের দেশ যেন আমেরিকার ৫১তম অঙ্গরাজ্য হয়ে ওঠে। কানাডাকে টিকিয়ে রাখার জন্য যে বিরাট বাণিজ্য ঘাটতি এবং ভর্তুকি দেয়া দরকার তা আমেরিকা আর সহ্য করতে পারে না। জাস্টিন ট্রুডো এটি জানেন এবং সেই জন্যই তিনি পদত্যাগ করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি কানাডা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত হয় তাহলে সেখানে কোনো শুল্ক থাকবে না, কর অনেকটাই কমে যাবে এবং তারা রাশিয়ান ও চীনা জাহাজের হুমকি থেকে সম্পূর্ণরুপে নিরাপদ থাকবে। একসঙ্গে এটা একটি মহান জাতি হবে॥’ উল্লেখ্য, গত নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর কানাডাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম স্টেটের গভনর হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছিলেন তিনি। যদিও ট্রুডো সে প্রস্তাব নাকচ করেছিলেন।
ট্রাম্পের পক্ষ থেকে কানাডাকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছিল, কানাডা সীমান্ত থেকে অবৈধ মাদক ও অভিবাসীদের পাঠানো বন্ধ না করলে কানাডার পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অংশ করে নেয়ার ‘ধারণাটি দারুণ’ এবং কানাডার অনেক নাগরিক সেটি চান বলেও দাবি করেছেন নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এর আগে, ১৮ ডিসেম্বর নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘কেউ উত্তর দিতে পারে না যে, কেন আমরা কানাডাকে বছরে ১০ কোটি ডলারেরও বেশি ভর্তুকি দেই? অনেক কানাডিয়ান চান কানাডা (যুক্তরাষ্ট্রের) ৫১তম অঙ্গরাজ্য হয়ে যাক। এটি কর ও সামরিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে অনেক খরচ বাঁচাবে। আমি মনে করি, এটি একটি দারুণ ধারণা। ৫১তম অঙ্গরাজ্য?

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অভিজ্ঞজনেরা মনে করছেন, গ্রীণল্যান্ডের দখল নেয়ার হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরী হয়েছে। গ্রীণল্যান্ডের পর ট্রাম্প অন্য কোন মানচিত্রে দৃষ্টি প্রসারিত করতে পারেন বলেও কানাঘুষা শুরু হয়েছে। কারণ, প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প ন্যাটোর অস্তিত্বকে গুরুত্ব দিতে চাননি। এমনকি সম্পর্কচ্ছেদের হুমকিতে কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করেছিলেন।
স্মরণ করা যেতে পারে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধের অঙ্গিকার করেছেন ট্রাম্প। কিন্তু মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের মেজাজে যুদ্ধ বন্ধের মনোভাব প্রকাশ পাওয়া দূরের কথা, নতুন যুদ্ধ শুরুর আভাসই পাওয়া গেছে। যদিও তিনি এখোন দাবি করছেন যে, প্রথম মেয়াদে আইসিসকে পরাজিত করেছিলেন। প্রথম মেয়াদে অনেক কিছুই করতে সক্ষম হননি পরিবর্তিত ভ’-রাজনৈতিক ল্যান্ডস্ক্যাপের কারণে। তবে নতুন করে কোন যুদ্ধ শুরু করেননি। গত চার বছরে প্রেসিডেন্ট বাইডেন দেশে দেশে যুদ্ধ লাগিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন ট্রাম্প এবং বলেন, জ্বলন্ত একটি বিশ্ব পরিস্থিতির মধ্যে তিনি ক্ষমতায় ফিরছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন প্রশাসন সাজাবেন বলেও মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প।

 

Facebook Comments Box

Posted ৮:০২ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ০৮ জানুয়ারি ২০২৫

nyvoice24 |

Address
New York
Phone: 929-799-2884
Email: nyvoice24@gmail.com
Follow Us