নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট
বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫ সর্বশেষ আপডেট : ৬:৪০ পূর্বাহ্ণ
নয়া শুল্ক হার প্রবর্তনের তালিকা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে। ছবি-হোয়াইট হাউজ।
চীন, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, ভারত, ইউরোপিয় ইউনিয়নসহ কমপক্ষে ১৭০ দেশের পণ্য আমদানিতে নয়া শুল্ক আরোপের কথা বললেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার অপরাহ্নে হোয়াইট হাউজের রোজগার্ডেন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য রফতানীতে বিপুল অংকের শুল্ক প্রদান করতে হচ্ছে বহুবছর যাবত। সে তুলনায় আমদানীতে শুল্কের হার নিতান্তই কম, কোন কোন ক্ষেত্রে একেবারেই নেই বলে মন্তব্য করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এ ধরনের বৈষম্য চলতে পারে না। এহেন অবস্থার অবসানের অভিপ্রায়ে ঘোষিত নতুন শুল্কনীতির দিনটিকে ‘লিবারেশন ডে’ হিসেবে অভিহিত করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। নয়া এই বিধি কার্যকর হলে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক, চামড়া, ফার্নিচার, কৃষিপণ্য এবং প্রযুক্তিখাতকে ৩৭% হারে শুল্ক দিতে হবে। আগে ছিল ১৫.৬% এর মত। অর্থাৎ এসব পণ্যের মূল্য বাড়াতে হবে প্রস্তুতকারকদের। একইভাবে আমদানিকারকদেরকেও যুক্তরাষ্ট্রে তা বাজারজাত করতে মূল্য বাড়াতে হবে। অর্থাৎ এতোদিন বাংলাদেশের যে পোশাক ২০ ডলারে ক্রয় করা যেত, নয়া নীতি কার্যকর হলে তার মূল্য ধার্য করা হবে ৩৫ ডলারের মত। মূল্যবৃদ্ধির খেসারতের পাশাপাশি ৮.৫% হারে ট্যাক্স প্রদান করতে হবে ক্রেতা-সাধারণকে। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নয়া এই শুল্ক নীতির ধকল পোহাতে হবে সরাসরি খেটে খাওয়া মাঝারি আয়ের ১৩ কোটি আমেরিকানকে।
এহেন অবস্থায় প্রবাসী বাংলাদেশীরাও বিচলিত হয়ে পড়েছেন। আমেরিকা-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট গিয়াস আহমেদ এবং ইউএসবিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট ও সিইও লিটন আহমেদ বুধবার সন্ধ্যায় পৃথক ভাবে এ সংবাদদাতার কাছে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। একইভাবে নতুন এ শুল্কনীতি বাংলাদেশের রপ্তানি শিল্পের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক (আরএমজি), চামড়া, ফার্নিচার, চা, কফি, মসল্লা, মাছ, শাক-সব্জিসহ কৃষিপণ্য, ওষুধ, পাথর, প্লাস্টার, সিমেন্ট, প্রযুক্তি খাত ইত্যাদি।
ইউএসবিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট ও সিইও লিটন আহমেদ বলেনম “যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, যদি এই নতুন ট্যারিফ নীতি কার্যকর হয়। বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আমরা চাই মার্কিন প্রশাসন আমাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি ন্যায্য ও টেকসই বাণিজ্য নীতি নির্ধারণ করুক।”
আমেরিকা-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট গিয়াস আহমেদ বলেন, রিপাবলিকানদের অধিকাংশই ধনাঢ্য আমেরিকান এবং বিলিয়োনেয়ার। সেজন্যেই ধনীক শ্রেণীর ব্যবসায়িক স্বার্থ সুরক্ষায় কঠোর পরিশ্রমী ও মাঝারি আয়ের মানুষের ভাল-মন্দ তাদের বিবেচনায় নেই। এই যে শুল্ক নীতি আরোপ করা হলো এর পুরো দায় বর্তাবে ক্রেতা-সাধারণের ওপর। মধ্যবিত্তশ্রেণীকে ত্রাহি অবস্থায় নিপতিত করা হলো। এটা মেনে নেয়া উচিত হবে না।
গিয়াস আহমেদ এবং লিটন আহমেদ আরো জানান, বর্তমানের বিধি অনুযায়ী সাধারণ আমেরিকানকে বার্ষিক গড়ে ৫ হাজার ডলারের মত পণ্য ক্রয়ের ওপর শুল্ক দিতে হচ্ছে। নয়া বিধি কার্যকর হলে আরো ৫ হাজার ডলার যোগ হয়ে বার্ষিক গড়ে ১০ হাজার ডলারের সেল্্স ট্যাক্স গুণতে হবে। অথচ মাঝারি আয়ের আমেরিকানদের আয়ের উৎস বৃদ্ধির ন্যূনতম কোন পরিকল্পনা এখোন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেননি।
ট্রাম্প দাবি করেছেন এই বিধি কার্যকর হলে বার্ষিক অতিরিক্ত ৬০০ বিলিয়ন ডলার হারে আগামী ১০ বছরে ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের মত অতিরিক্ত আয় হবে শুল্ক খাতে। আর এভাবে ফেডারেল বাজেট ঘাটতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।
ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের অর্থনীতির অধ্যাপক জাস্টিন উলফারস বলেছেন, এর ধকল সইতে হবে ১৩৪ মিলিয়ন আমেরিকানকে। পণ্য ক্রয়ের ওপর প্রদত্ত শুল্ক তারাই দিয়ে আসছেন। মাঝখান থেকে লাভবান হবেন ব্যবসায়ীরা। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জনকারি ‘মুডি’জ-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জিন্ডি বলেন, এধরনের কর্মকান্ডের পরিণতি হিসেবে যে মন্দার আশংকা করা হচ্ছিল তা ত্বরান্বিত হবে। অর্থাৎ ট্রাম্পের এহেন পদক্ষেপের বলি হতে হবে মাঝারি এবং সীমিত আয়ের আমেরিকানরদেরকেই। উল্লেখ্য, বাড়তি এই শুল্কনীতির মধ্যে নেই কানাডা, মেক্সিকো এবং রাশিয়া। এ প্রসঙ্গে হোয়াইট হাউজের যুক্তি হচ্ছে, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ। আর মেক্সিকো এবং কানাডার পণ্য আমদানীর ওপর ইতিপূর্বেই উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
নয়া শুল্ক হার প্রবর্তনের তালিকা। ছবি-হোয়াইট হাউজ।
ট্রাম্পের এই শুল্কনীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন ইউএস সিনেটে বিরোধী দলীয় নেতা (ডেমক্র্যাট) নিউইয়র্কের সিনেটর চাক শ্যুমার। তিনি বলেছেন, ধনীক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষায় প্রেসিডেন্ট এমন আচরণ করছেন। এমন অবস্থাকে মেনে নেয়া যায় না। সাধারণ মানুষের কথা যিনি ভাবেন না তিনি কীভাবে রাষ্ট্রনায়ক হোন?
এদিকে এই নয়া নীতি ঘোষণার ঘন্টাখানেক পর ইউএস সিনেটে রিপাবলিকান পাটির ৪ সিনেটরের সমর্থনে (৫১-৪৮) পাশ হওয়ান রেজ্যুলেশন অনুযায়ী কানাডান পণ্যের ওপর যে শুল্ক আরোপ ইতিপূর্বে করা হয়েছে তা রহিত করতে হবে। অর্থাৎ ট্রাম্পের এমন পদক্ষেপে কেউই সন্তুষ্ট নন। নয়া এই গণহারের শুল্কনীতিও থামিয়ে দেয়ার বিল পাশ হতে পারে সিনেট ও হাউজে। কারণ, সামনের বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের বৈতরণী পাড়ি দিতে সকল প্রার্থীকেই ভোটারের মুখোমুখী হতে হবে।
এদিকে, নয়া এই শুল্কনীতি ঘোষণার পরই শেয়ার মার্কেটে তার করুণ প্রভাব পড়েছে। স্টক মার্কেটে ধস নেমেছে।
ট্রাম্প ঘোষিত নীতি অনুযায়ী চীনের পণ্যের ওপর ৩৪%, ইউরোপিয় ইউনিয়ন-২০%, ভিয়েতনাম-৪৬%, তাইওয়ান-৩২%, জাপান-২৪%, ভারত-২৬%, সাউথ কোরিয়া-২৫%, থাইল্যান্ড-৩৬%, সুইজারল্যান্ড-৩১%, ইন্দোনেশিয়া-৩২%, মালয়েশিয়া-২৪%, ক্যাম্বোডিয়া-৪৯%, যুক্তরাজ্য-১০%, সাউথ আফ্রিকা-৩০%, ব্রাজিল-১০%, বাংলাদেশ-৩৭%, সিঙ্গাপুর-১০%, ইসরায়েল-১৭%, ফিলিপাইন-১৭%, চিলি-১০%, অষ্ট্রেলিয়া-১০%, পাকিস্তান-২৯%, তুরস্ক-১০%, শ্রীলংকা-৪৪%, কলম্বিয়া-১০% ইত্যাদি হারে শুল্ক ধার্য করা হয়েছে।
এহেন অবস্থায় ইউএসবিসিআইয়ের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে : বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ৩৭% শুল্ক আরোপ করা হলে এটি বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে দুর্বল করবে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। উচ্চ শুল্কের ফলে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য খাতে রপ্তানি হ্রাসের আশংকা রয়েছে। উচ্চ শুল্কের কারণে উৎপাদন কমে গেলে শিল্পখাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করবে।
ইউএসবিসিআই বলেছে, বাংলাদেশ সরকারকে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে যাতে নতুন শুল্ক নীতি থেকে বাংলাদেশি পণ্যকে ছাড় দেওয়া যায়। এছাড়া ইউরোপ, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার নতুন বাজারগুলোর দিকে নজর দিতে হবে যাতে ব্যবসায়ীরা নতুন সুযোগ খুঁজে পেতে পারেন। উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে ব্যয় কমাতে হবে, যাতে বাংলাদেশি পণ্য প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকে। স্থানীয় শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়িয়ে নিজেদের উৎপাদন ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
ইতিমধ্যে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে ইউএসবিসিসিআই এবং শিগগিরই মার্কিন প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করবে। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সরাসরি লবিং কার্যক্রম চালিয়ে যাবার সংকল্পও ব্যক্ত করা হয়েছে ইউএসবিসিসিআইয়ের বিবৃতিতে।
ছবির ক্যাপশন-ট্রাম্প-ট্যারিফ-১
নয়া শুল্ক হার প্রবর্তনের তালিকা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে। ছবি-হোয়াইট হাউজ।
ছবির ক্যাপশন-ট্রাম্প-ট্যারিফ-২
নয়া শুল্ক হার প্রবর্তনের তালিকা। ছবি-হোয়াইট হাউজ।
Posted ৬:৪০ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর