৬ মাসে মৃত্যু ১০ : ছোট্ট কক্ষে ৪০/৪২ জনকে রাখা হয়েছে: ব্যবহার করতে হচ্ছে উম্মুক্ত টয়লেট

যুক্তরাষ্ট্রের ডিটেনশন সেন্টারে অমানবিক পরিস্থিতির চাঞ্চল্যকর তথ্য

বিশেষ সংবাদদাতা   প্রিন্ট
রবিবার, ২৯ জুন ২০২৫   সর্বশেষ আপডেট : ৮:৪৭ পূর্বাহ্ণ

যুক্তরাষ্ট্রের ডিটেনশন সেন্টারে অমানবিক পরিস্থিতির চাঞ্চল্যকর তথ্য

ফাইল ছবি

সারাবিশ্বের মানবতা নিয়ে সবক প্রদানকারি যুক্তরাষ্ট্রের ডিটেনশন সেন্টারসমূহে অভিবাসীগণের মানবেতর পরিস্থিতির অবিশ্বাস্য একটি বিবরণী প্রকাশ পেয়েছে ২৮ জুন নিউইয়র্ক টাইমসে। অনুসন্ধানী এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৬ মাসে ডিটেনশন সেন্টারে মারা গেছে ১০ অভিবাসী। এর আগে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলের ৪ বছরে মারা গেছে ২৮ অভিবাসী। ১৫ জুন সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৪১ হাজারের ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়েছে ৫৬ হাজার অভিবাসীকে। এরফলে অনেকেই ঘুমানোর বিছানা দূরের কথা একটি বালিশও পাচ্ছেন না। ৭ জনের একটি কক্ষে ৪২ জনকে রাখা হয়েছে কংক্রিটের মেঝের ওপর এবং সেই ছোট্ট কক্ষেই প্রস্রাব-পায়খানা করতে হচ্ছে খোলা টয়লেটে।

সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, কোন ধরনের গুরুতর অপরাধে এরা আটক হননি। শুধুমাত্র অভিবাসনের আইন লংঘনের অপরাধে আটক অনেক অভিবাসী ৭ দিনেও একবার স্নানের সুযোগ পাচ্ছেন না। উচ্চট রক্তচাপ অথবা ডায়াবেটিসে আক্রান্তরা ওষুধ পাচ্ছেন না। লসএঞ্জেলেস এবং নিউইয়র্কস্থ ইমিগ্রেশন এটর্নীরা জানিয়েছেন যে, তাদের অসংখ্য মক্কেলের হদিস পাচ্ছেন না। ফেডারেল সিস্টেমেও পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ আটকের পর অনেক অভিবাসীকে নানাস্থানে স্থানান্তর করা হচ্ছে নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেয়ার অভিপ্রায়ে। আরিজোনা ও ক্যালিফোর্নিয়ার ডিটেনশন সেন্টারের অভিবাসীগণের কাছে মাঝেমধ্যেই কারারক্ষী এবং আইসের এজেন্টরা প্রস্তাব দিচ্ছেন যে, স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে যেতে চাইলে নগদ এক হাজার ডলার পকেট খরচ বাবদ এবং ফ্রি টিকিট দেয়া হবে। বিশ্বখ্যাত নিউইয়র্ক টাইমস উল্লেখ করেছে যে, ডিটেনশন সেন্টারে অসহনীয় অব্শ্বিাস্য দু:খকষ্টে থাকা অভিবাসীর কেউই এমন প্রস্তাবে সাঁয় দেননি।

ফ্লোরিডাস্থ ‘আমেরিকান্স ফর ইমিগ্র্যান্ট জাস্টিস’র পরিচালক এটর্নী পোল শ্যাভেজ বলেছেন, গত ২০ বছরের কর্মজীবনে এমন নিদারুণ অবস্থা কখনো দেখিনি। সভ্য সমাজে এমন আচরণকে মেনে নেয়া যায় না। নিউইয়র্ক অঞ্চলে অভিবাসন বিষয়ক খ্যাতনামা আইনজীবী এবং ডেমক্র্যাটিক পার্টির ডিস্ট্রিক্ট লিডার মঈন চৌধুরী জানান, দিন যত যাচ্ছে ততই বাড়ছে ডিটেনশন সেন্টারে অমানবিক আচরণের পরিধি। এমনকি, আমরা চেষ্টা করেও আটক অনেকের হদিস পাচ্ছি না। উল্লেখ্য, গত মে মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কর্তৃক দৈনিক অন্তত: ৩ হাজার অবৈধ অভিবাসীকে গ্রেফতারের টার্গেট নির্দ্ধারণ করে দেয়ার পরই এহেন অবস্থা তৈরী হয়েছে। আমেরিকাস্থ ‘ইন্টারন্যাশনাল বার এসোসিয়েশন’র পরিচালক এটর্নী মঈন চৌধুরী আরো জানান, ভাবতেও অবাক লাগে, অনেকে পূর্বনির্দ্ধারিত তারিখে কোর্টে হাজিরা দিতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছেন। অর্থাৎ অভিবাসীরা আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যূনতম সুযোগও পাচ্ছেন না। আটক অনেকে তার স্ত্রী/স্বামী-সন্তানের সাথে সাক্ষাতের সুযোগও পাচ্ছেন না।

ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নির্বাচিত কংগ্রেসওম্যান জুডি চু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ লিখেছেন, এডেলান্ট নামক স্থানের একটি ডিটেনশন সেন্টার ভিজিটের সময় তিনি দেখেছেন দুর্গন্ধ বিরাজ করছে এমন একটি বদ্ধ কক্ষে কিছু অভিবাসীকে রাখা হয়েছে, তারা এটর্নীর সাথে যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছেন না। আত্মীয়-স্বজনকেও সাক্ষাতের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। তারা গত ১০ দিন যাবত তাদের আন্ডারওয়েরও পরিবর্তনের সুযোগ পাননি।

লসএঞ্জেলেস সিটিতে অবস্থিত ফেডারেল ভবনের একটি বেসমেন্টে বেশ কজন অভিবাসীকে রাখা হয়েছে, সেখানে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে না। এভাবে কঠিন একটি পরিস্থিতি সইতে হচ্ছে তাদেরকে। এ প্রসঙ্গে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘পাবলিকস কাউন্সেল’র এটর্নী মার্ক রোজেন বাম বলেছেন, ওদেরকে এমনভাবে রাখা হয়েছে যেন সকলেই ভয়ংকর অপরাধে দোষী। অথচ কেউই ক্রিমিনাল মামলায় অভিযুক্ত নন। আরিজোনাস্থ এটর্নী নিরা শেফার নিউইয়র্ক টাইমসে বলেছেন, তার মক্কলের কাছে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে কোর্টে লড়াইয়ের পরিবর্তে স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে চাইলেই নগদ এক হাজার ডলার দেয়া হবে ফ্রি টিটেকট-সহ। কিন্তু রাজী হননি, কারণ নিজ দেশে ফিরলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কর্তৃক নাজেহালের আশংকা প্রবল।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশী ইমিগ্রেশন এটর্নী জান্নাতুল রুমা এ সংবাদদাতাকে গভীর উদ্বেগের সাথে জানান, নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার নাকি বাংলাদেশে রাজনৈতিক নীপিড়ন একেবারেই দমনে সক্ষম হয়েছে। তাই এখোন আর কাউকে এসাইলাম প্রদানের প্রয়োজন নেই। এমন মনোভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে ইমিগ্রেশন কোর্টে। এটর্নী রুমা আরো জানান, আমাদেরকে বলা হচ্ছে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে ভালো নয় তার সমর্থনে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের জন্যে। এটা করতে পারলে হয়তো আমাদের বাংলাদেশী ক্লায়েন্টরা কিছুটা ফায়দা পাবেন। জানা গেছে, গত এক দশকের মধ্যে যারা বিভিন্ন পথে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকেই রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন তার প্রায় সকলেই নিজেদেরকে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল কিংবা এলডিপির সমর্থক হিসেবে দাবি করেছেন এবং উল্লেখ করেছেন যে, আওয়ামী লীগের দুর্বৃত্ত কর্তৃক আক্রান্তের ভয়ে কিংবা মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে নিপতিত করার আতংকে তারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এমন দাবিকারি বাংলাদেশীদের এসাইলামের আবেদন পেন্ডিং থাকায়-তারা সকলেই অনিশ্চিত অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। কারণ, ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগের পতন ঘটার সংবাদকে মার্কিন প্রশাসনে, বিশেষ করে ইমিগ্রেশন কোর্টে বাংলাদেশে সুশাসনের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব তৈরী হয়েছে। ‘তারা বিশ্বাস করতে চান না যে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার কর্তৃক কেউ নিগৃহিত হতে পারেন’-এমন অভিমত আরেকজন ইমিগ্রেশন এটর্নীর।

এদিকে, বিভিন্ন মহলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিউইয়র্কস্থ ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’র পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর সরেজমিন পর্যবেক্ষন চালানো হচ্ছে বলে সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা গত সপ্তাহে এ সংবাদদাতাকে জানিয়েছেন। ‘তারা তা নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করলে এসাইলাম প্রার্থীরা হয়তো বর্তমানের অজানা আতংক থেকে রেহাই পাবেন’-মন্তব্য অনেক প্রবাসীর।

Facebook Comments Box

Posted ৮:৪৬ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ২৯ জুন ২০২৫

nyvoice24 |

Address
New York
Phone: 929-799-2884
Email: nyvoice24@gmail.com
Follow Us