অনলাইন ডেস্ক
প্রিন্ট
রবিবার, ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ
আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে দল না পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে ভারতের মাটিতে খেলা সম্ভব নয় জানিয়ে আজ রোববার (৪ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে আনুষ্ঠানিক মেইল পাঠিয়েছে বিসিবি। চিঠিতে বাংলাদেশের নির্ধারিত ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করার জোরালো আবেদন জানানো হয়েছে।
বিসিবি পরিচালকদের জরুরি সভার পর নেওয়া এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, “বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না বাংলাদেশ। আজ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড।”
মুস্তাফিজকে দলে নেওয়া এবং বিতর্কের শুরু
ঘটনার শুরু আইপিএল ২০২৬-এর নিলাম থেকে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) বাংলাদেশের সেরা পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে দলে ভেড়ায়। নিলামে মুস্তাফিজের দাম ওঠে আকাশচুম্বী ৯ কোটি ২০ লাখ রুপি। একমাত্র বাংলাদেশি খেলোয়াড় হিসেবে তিনি মিনি অকশনে বিক্রি হন এবং তাকে দলে পেয়ে কেকেআর তাদের বোলিং লাইনআপ শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করেছিল।
কিন্তু মুস্তাফিজকে দলে নেওয়ার পরপরই ভারতীয় সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ভারতীয় ক্রিকেট ভক্ত এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো প্রশ্ন তোলে, যেখানে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে এবং পাকিস্তান নিষিদ্ধ, সেখানে বাংলাদেশিদের কেন আইপিএলে সুযোগ দেওয়া হবে?
চাপের মুখে বিসিসিআই এবং কেকেআর
শুরুতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) নমনীয় অবস্থান দেখিয়েছিল। বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, “সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো বাংলাদেশি খেলোয়াড়কে ব্যান করা যাবে না।” ইনসাইড স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিসিসিআইয়ের এক পরিচালক জানিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশ শত্রু দেশ নয় এবং মুস্তাফিজের খেলার পথে কোনো বাধা নেই। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায় যখন ভারতের একাধিক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা কেকেআর এবং এর মালিক শাহরুখ খানের বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু করেন।
আধ্যাত্মিক গুরু দেবকীনন্দন ঠাকুর এবং অল ইন্ডিয়া ইমাম অর্গানাইজেশনের প্রধান ইমাম উমর আহমেদ ইলিয়াসি প্রকাশ্যে শাহরুখ খানের সমালোচনা করেন। তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর কথিত নির্যাতনের পরেও বাংলাদেশি খেলোয়াড়কে দলে নেওয়াটা ভারতীয়দের আবেগে আঘাত হানার শামিল। এমনকি উত্তর প্রদেশের সাবেক বিধায়ক সংগীত সোম শাহরুখ খানকে ‘গাদ্দার’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেন। শিবসেনা নেতা সঞ্জয় নিরুপম সতর্ক করে দেন, জনরোষ এড়াতে যেন দ্রুত মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়া হয়।
বিসিসিআইয়ের নির্দেশ এবং মুস্তাফিজকে বিদায়
রাজনৈতিক এবং সামাজিক চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করে বিসিসিআই। ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে বিসিসিআই আনুষ্ঠানিকভাবে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দেয় মুস্তাফিজুর রহমানকে স্কোয়াড থেকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া সংবাদ সংস্থা এএনআই-কে জানান, “চারপাশে চলমান সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে বিসিসিআই ফ্র্যাঞ্চাইজি কেকেআরকে নির্দেশ দিয়েছে তাদের স্কোয়াড থেকে বাংলাদেশের খেলোয়াড় মুস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দিতে।”
বোর্ডের নির্দেশের পর কেকেআর এক বিবৃতিতে মুস্তাফিজকে ছেড়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। বিবৃতিতে বলা হয়, বিসিসিআইয়ের নির্দেশ এবং পরামর্শ মেনেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে মুস্তাফিজকে কোনো ম্যাচ না খেলেই দল থেকে বিদায় নিতে হয়। কেকেআর তাদের ফেসবুক পেজ থেকে মুস্তাফিজের ছবি সরিয়ে ফেলে এবং স্কোয়াড আপডেট করে। নিয়ম অনুযায়ী, কেকেআরকে মুস্তাফিজের পরিবর্তে অন্য খেলোয়াড় নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় এবং পুরো ৯ কোটি ২০ লাখ টাকাই তাদের পার্সে ফেরত দেওয়া হয়।
ভারতের অভ্যন্তরেই সমালোচনার ঝড়
বিসিসিআইয়ের এই সিদ্ধান্ত ভারতের ভেতরেও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কংগ্রেস নেতা শশী থারুর এবং বিশ্বকাপজয়ী ক্রিকেটার মদন লাল এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেন। শশী থারুর বলেন, “বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বোঝা ক্রিকেটের ওপর চাপানো উচিত নয়। মুস্তাফিজ একজন ক্রিকেটার এবং এই হামলার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। ক্রীড়া-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের কারণে ভারত তার প্রতিবেশীদের বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারে না।”
অন্যদিকে, মদন লাল হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “আমি বুঝতে পারছি না খেলাধুলার মধ্যে কেন এত রাজনীতি ঢুকে পড়ছে।” কংগ্রেস নেত্রী সুপ্রিয়া শ্রীনাতে প্রশ্ন তোলেন বিসিসিআই সচিব জয় শাহর ভূমিকা নিয়ে। তিনি বলেন, যদি সমস্যা থাকেই তবে প্রথমেই কেন বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের নিলামের তালিকায় রাখা হয়েছিল?
বাংলাদেশের তীব্র প্রতিক্রিয়া:
মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ৩ জানুয়ারি রাতে ফেসবুকে এক কড়া বার্তায় বলেন, “আমরা কোনো অবস্থাতেই অবমাননা মেনে নেব না। গোলামির দিন শেষ!” তিনি অভিযোগ করেন, ভারতের উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকার করে বিসিসিআই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য চরম অবমাননাকর।
আসিফ নজরুল বিসিবিকে নির্দেশ দেন আইসিসির কাছে এই ঘটনার আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাইতে। একই সঙ্গে তিনি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানান বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধের ব্যবস্থা নিতে।
এ বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, সরকার এই ইস্যুতে শক্ত অবস্থান নেবে। তিনি বলেন, “খেলার যুক্তিতে যদি মানা করা হতো, তাহলে কোনো প্রশ্ন থাকত না। কিন্তু যে যুক্তিতে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেই যুক্তি আমরা গ্রহণ করতে পারি না।” তবে সম্প্রচার বন্ধের বিষয়ে আইনি দিক পর্যালোচনার পরেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নিরাপত্তা শঙ্কা এবং বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত
মুস্তাফিজ ইস্যুতে সৃষ্ট উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রভাব ফেলে। ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক ভারত ও শ্রীলঙ্কা। সূচি অনুযায়ী, আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো ভারতের কলকাতা ও মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু মুস্তাফিজকে কেন্দ্র করে ভারতে সৃষ্ট পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণের কারণে বিসিবি মনে করে, ভারতের মাটিতে বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে। ৪ জানুয়ারি বিসিবির ১৭ জন পরিচালক জরুরি সভায় বসেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতে দল পাঠানো সম্ভব নয়।
ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ফেসবুকে নিশ্চিত করেন, “বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না বাংলাদেশ। আজ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের উগ্র সাম্প্রদায়িক নীতির প্রেক্ষিতে গৃহীত এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই।”
বিসিসিআইয়ের অনড় অবস্থান ও লজিস্টিক সংকট
বাংলাদেশের ভেন্যু পরিবর্তনের দাবির প্রেক্ষিতে বিসিসিআই তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, শেষ মুহূর্তে ভেন্যু পরিবর্তন করা “লজিস্টিক্যালি অসম্ভব”। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের এক সূত্র এনডিটিভিকে জানায়, বিশ্বকাপের মতো বিশাল টুর্নামেন্টে হঠাৎ করে সূচি পরিবর্তন করা একটি “লজিস্টিক দুঃস্বপ্ন”। বিমান টিকিট, হোটেল বুকিং এবং সম্প্রচার স্বত্বের মতো বিষয়গুলো এর সঙ্গে জড়িত। বিসিসিআই যুক্তি দেখায়, পাকিস্তানের ভেন্যু পরিবর্তনের বিষয়টি পূর্বনির্ধারিত ছিল, কিন্তু বাংলাদেশের দাবিটি এসেছে টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে, যা মেনে নেওয়া কঠিন।
মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাটি এখন আর কেবল একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের দলবদল বা খেলোয়াড় exclusion-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনকে খেলার মাঠে টেনে এনেছে। একদিকে বিসিসিআইয়ের রাজনৈতিক চাপে নতি স্বীকার, অন্যদিকে বিসিবি এবং বাংলাদেশ সরকারের আত্মমর্যাদা রক্ষার কঠোর অবস্থান—এই দুইয়ের মাঝে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসর। আইসিসি এখন এই সংকট নিরসনে কী ভূমিকা পালন করে এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপে অংশ নেয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এটা নিশ্চিত যে, খেলার মাঠের এই রাজনীতি দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
Posted ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ০৪ জানুয়ারি ২০২৬
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর