লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র
প্রিন্ট
সোমবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৫ সর্বশেষ আপডেট : ৯:০৯ পূর্বাহ্ণ
নিউ ইয়র্কে কলোম্বিয়ান কনসুলেটের পাশ দিয়ে একজন হেঁটে যাচ্ছেন। ফটোঃ ২৬ জানুয়ারি, ২০২৫।
কলরাডো স্টেটের ডেনভারে একটি নাইট ক্লাবে রোববার ভোরে অভিযান চালিয়ে আইসিস (ইসলামিক জঙ্গি নেটওয়ার্ক)’র ৫০ সন্ত্রাসীকে আটক করেছে ইমিগ্রেশন পুলিশ। এরা ভেনেজুয়েলার কারাগার থেকে পালিয়ে মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাস্ট্রে এসেছিল বলে গ্রেফতার অভিযানের পর আইসের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে। এদিন বিভিন্ন স্থানে হানা দিয়ে আইসের এজেন্টরা এক হাজারের মত অবৈধ অভিবাসীকে গ্রেফতার করেছে বলে ফেডারেল কর্মকর্তারা রোববার সন্ধ্যায় জানান। এভাবেই বৃহস্প্রতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত সারাদেশ থেকে ১৪ শতাধিক অবৈধ অভিবাসীকে গ্রেফতারের তথ্য নিশ্চিত করেছে আইস। উল্লেখ্য, দৈনিক ৪/৫ শত জন নয়, কমপক্ষে ১২০০ থেকে ১৫০০ জন অবৈধ অভিবাসীকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছে হোয়াইট হাউজ। অভিবাসী ধর-পাকড়ের দায়িত্ব পালনকারি আইসের (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) ২৫টি ফিল্ড অফিসের প্রত্যেকটিকে দৈনিক কমপক্ষে ৭৫ জন অবৈধ অভিবাসী গ্রেফতার করতে হবে হোয়াইট হাউজের ন্যূনতম প্রত্যাশা পূরণের জন্যে। যদিও ট্রাম্পের সীমান্ত সুরক্ষা সম্পর্কিত মুখ্য কর্মকর্তা টম হোম্যান এবিসি টিভিতে রোববার প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, আমরা শুধুমাত্র অবৈধদের মধ্যে গুরুতর অপরাধী এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের সদস্যদেরকে গ্রেফতারে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। এমনি অবস্থায় হোয়াইট হাউজের কোটা পালন করতে হলে গুরুতর অপরাধী ছাড়াও গ্রেফতার হবে অনেক অবৈধ অভিবাসী। টম হোম্যান বলেছেন, জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশংকা রয়েছে এমন অবৈধ অভিবাসীকে গ্রেফতারের জন্যে আমরা স্টেট এবং স্থানীয় প্রশাসনেরও সহযোগিতা চেয়েছি। ফেডারেল পুলিশ তো আছেই এ অভিযানে।
উল্লেখ্য, শনিবার পর্যন্ত ৫দিনে মাত্র ১৪০০ জন অবৈধ অভিবাসীকে গ্রেফতারের সংবাদে উষ্মা প্রকাশ করেছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। আরো উল্লেখ্য, বর্তমানে এক কোটি ১৭ লাখের অধিক অবৈধ অভিবাসী রয়েছে আমেরিকায়। এর মধ্যে গুরুতর অপরাধীর সংখ্যা কোনভাবেই ৫ লাখের বেশী হবে না। তবে গত সপ্তাহেই ডেমক্র্যাটদের সমর্থনে কংগ্রেসে পাশ হওয়া একটি বিল অনুযায়ী অবৈধ অভিবাসীর মধ্যে যারা ট্রাফিক ভায়োলেশনের জন্যে জরিমানা দিয়েছেন কিংবা সাবওয়েতে টিকিট ছাড়া প্রবেশকালে পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হয়েছিলেন অথবা স্টোরে ছোট-খাটো চুরির জন্যে ধরা পড়েছিলেন-এমন মামুলি অপরাধে লিপ্তদেরকেও গ্রেফতার ও বহিষ্কারের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। আর এটাই হচ্ছে সমগ্র কম্যুনিটিতে আতংকের মূল কারণ। ট্রাম্পের এমন মনোভাবের পরিপ্রেক্ষিতে জানুয়ারির ২ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে নিউইয়র্ক টাইমস/ইপসোস জরিপে অংশগ্রহণকারি ভোটারের ৫৫% অবৈধদের অবিলম্বে বহিষ্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। ৮৮% বলেছেন যে, অবৈধদের মধ্যে যারা অপরাধের জন্যে দন্ডিত/চিহ্নিত তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সুযোগ দেয়া উচিত হবে না। জরিপে অংশগ্রহণকারি ডেমক্র্যাট এবং রিপাবলিকানের সিংহভাগই মনে করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন ভেঙ্গে পড়েছে। এটি ঢেলে সাজানোর বহু পুরনো দাবিটি পূরণের সময় এখোন।
গ্রেফতার এবং বহিষ্কারের প্রক্রিয়ায় বিপুল অর্থ-সম্পদের প্রয়োজন হচ্ছে এবং এটাই ট্রাম্পের আন্তরিক আগ্রহেও ভাটা ফেলতে পারে বলে অভিজ্ঞজনেরা মন্তব্য করেছেন। টম হোম্যান উল্লেখ করেছিলেন যে, গ্রেফতার ও বহিষ্কারের জন্যে প্রাথমিকভাবে ৮৬ বিলিয়ন ডলার লাগতে পারে। এবং এ অর্থের অনুমোদন চেয়েছেন কংগ্রেসের কাছে। অভিযান শুরুর পর টম হোম্যানের সম্বিত ফিরেছে। কারণ, আমেরিকান ইমিগ্রেশন কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী ধর-পাকড়ের ব্যাপক অভিযান চালাতে অর্থাৎ ১০ লাখ অবৈধকে বহিষ্কার বাবদ বার্ষিক অন্তত: ৮৮ বিলিয়ন ডলার করে লাগবে। এজন্যে ১০ বছরের খরচ লাগবে ৯৬৭.৯ বিলিয়ন ডলারের মত। আর এ অর্থ লাগবে ডিটেনশন সেন্টারের সম্প্রসারণ এবং কোর্ট সিস্টেমকে আরো গতিশীল করার জন্যে। বর্তমানে সারা আমেরিকায় ডিটেনশন সেন্টারে বেডের সংখ্যা মাত্র ৪১ হাজার। একটিও খালি নেই। এদিকে খেয়াল রেখেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেনাবাহিনী তলব করেছেন, গ্রেফতারের পরই সামরিক বিমানে নিজ নিজ দেশে অবৈধ অভিবাসীকে পাঠিয়ে দিতে। এ প্রক্রিয়ায় মেক্সিকো কর্তৃক আপত্তির পর কলম্বিয়াতেও বিমান নামাতে পারেনি মার্কিন সামরিক বাহিনী। কলম্বিয়ার এ আচরণে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে স্যাঙ্কশন আরোপ করেছেন। কলম্বিয়ার বগোটায় অবস্থিত মার্কিন কন্স্যুলেট থেকে ভিসা ইস্যুর কার্যক্রম বন্ধ করা করা হয়েছে। অবৈধ অভিবাসী বহনকারি বিমানটিকে যারা নামতে দেয়নি, সেই সব অফিসার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের বিরুদ্ধ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে রোববার থেকেই। এবং নিজেদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে না চাওয়া পর্যন্ত কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর মনোভাব অব্যাহত থাকবে। এ প্রসঙ্গে রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোবিয়ো এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নে আমরা বদ্ধপরিকর। নিজেদের নাগরিককে গ্রহণে সম্মতি দিয়েও কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট পেট্রো বিমানটিকে নামতে না দিয়ে অমার্জনীয় অপরাধ করেছেন।’ ‘আমেরিকা কখনোই তার জাতীয় নিরাপত্তার সাথে আপস করেনা’-মন্তব্য রোবিয়োর। এর ফলে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কলম্বিয়ার সাথে সম্পর্কে এমন উত্তেজনায় অনেকেই হতবাক। এর জের কোথায় ঠেকবে তা নিয়েও চলছে নানা গুঞ্জন।
ট্রাম্পের এই অভিযানের ভিকটিম হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি। মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে ধস নামার আশংকা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এর জের পড়বে বাজারে। মাংসের দাম দুই-তিনগুণ বাড়তে পারে। কারণ, এসব কারখানায় কর্মরতদের সিংহভাগই অবৈধ অভিবাসী। কৃষি শ্রমিকের মধ্যেও অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা বেশী। এই অভিযান অব্যাহত থাকলে কৃষি সেক্টরে উৎপাদন হ্রাস পাবে ৬০ বিলিয়ন ডলারের মত। আমেরিকান বিজনেস ইমিগ্রেশন কোয়ালিশনের নির্বাহী পরিচালক রেবেকা শী বলেছেন, যদি ঢালাও গ্রেফতার ও বহিষ্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে তাহলে অর্থনীতিতে এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। আমরা ট্রাম্প এবং কংগ্রেসের প্রতি উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি বিদ্যমান সমস্যার স্থায়ী সমাধানে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে, যার মাধ্যমে সীমান্ত সুরক্ষিত হবে এবং ইমিগ্রেশনের ভঙ্গুর অবস্থাকেও ঢেলে সাজানো সম্ভব হবে। বলতে দ্বিধা নেই যে, এখনো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি হচ্ছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয়, তাই এই অহংকারকে দলিত-মথিত করতে চাই না।
কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞার পরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন অভিবাসী বহনকারি বিমান অবতরণ করতে না দেয়ার খেসারত হিসেবে এখোন থেকে কলম্বিয়া থেকে যত পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে আসবে তার ওপর ২৫%ম হারে ট্যাক্স ধার্য করা হলো। এটি হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে পরিচিত কোন দেশের বিরুদ্ধে করারোপ করার প্রথম ঘটনা-যা অন্য বন্ধু রাষ্ট্রকেও ভাবিয়ে তোলেছে।
Posted ৯:০৯ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৫
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর