নিউইয়র্কে সুধী সমাবেশে

ইউনুসের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদ, সন্ত্রাস ও বিদেশি আঁতাতের অভিযোগ

এ জেড এম সাজ্জাদ হোসেন   প্রিন্ট
সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫   সর্বশেষ আপডেট : ৯:৪২ পূর্বাহ্ণ

ইউনুসের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদ, সন্ত্রাস ও বিদেশি আঁতাতের অভিযোগ

ভার্চুয়ালে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ড. এ কে এ মোমেন। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।

নিউইয়র্ক সিটির ম্যানহাটানে একটি রেস্টুরেন্টের পার্টি হলে ২৭ সেপ্টেম্বর ‘বাংলাদেশ এ্যাট দ্য ক্রসরোড : গ্লোবাল রিফ্লেকশন্স’ (“বাংলাদেশ সন্ধিক্ষণে-বৈশ্বিক প্রতিফলন”)শীর্ষক এক মুক্ত আলোচনায় ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকারকে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন প্রবাসের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার বিদগ্ধজনেরা। এ সময় অভিযোগ করা হয়, ইউনুস সরকার গণহত্যা, ধর্ষণ, অর্থনৈতিক পতন, সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং বিদেশি শক্তির আঁতাতে দেশকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে।

‘দ্য ভয়েস নিউজ’ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালে মূল বক্তব্য উপস্থাপনকালে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন বলেন, “মিটিকুলাস ডিজাইনে বিভিন্ন রকম প্রচারণার দ্বারা মানুষকে ক্ষেপিয়ে, তাদের মধ্যে এক ধরনের আশা জাগিয়ে বিশেষ করে তরুণদের বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন ড. ইউনুস। মানুষের সেই আশা খুব দ্রুত বিভিষিকায় রুপ নিয়েছে।”

ড. আব্দুল মোমেন বলেন, ইউনুস গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে বেআইনিভাবে ক্ষমতা দখল করেছেন এবং ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির মতো কৌশল অনুসরণ করছেন।

“মুসোলিনি ব্ল্যাকশার্ট বাহিনী ব্যবহার করেছিল, আর ইউনুস ব্যবহার করছেন উগ্র জঙ্গি বাহিনী”- বলেন মোমেন। “ভয়, প্রচারযন্ত্র, বিরোধীদের দমন-এটাই দুই শাসকের মিল।”

অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত ড. মোমেন বলেন, প্রবৃদ্ধি কমে ৬.৮ শতাংশ থেকে ৩.৩ শতাংশে নেমেছে, দারিদ্র্য দ্বিগুণ হয়েছে, ৩০ লাখ চাকরি হারিয়েছে মানুষ-এর মধ্যে ৮৫ শতাংশ নারী। প্রায় ৩৯ মিলিয়ন মানুষ দিনে দুই বেলা খাবার জোগাড় করতে পারছে না।

“২৬৮টি কারখানা ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়েছে, বছরের শেষ নাগাদ অর্ধেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে,” সতর্ক করেন তিনি।

বিচার বিভাগ নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন মোমেন। বলেন, প্রধান বিচারপতি পর্যন্ত মিথ্যা মামলায় কারারুদ্ধ হয়েছেন। “৩ লাখের বেশি বিরোধী নেতা, বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ২৮ হাজার ভুয়া হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিচার বিভাগ প্রতিশোধের হাতিয়ার হয়ে গেছে,” তিনি বলেন।

মোমেন প্রশ্ন তোলেন, “যে ইউনুস চীনা অস্ত্র কিনছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি তাকে বিশ্বাস করতে পারে?”

“বাংলাদেশ প্রতিদিন ধ্বংস হচ্ছে, চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে,”-বলেন যুক্তরাজ্য থেকে আসা ব্যারিস্টার নিঝুম মজুমদার। “এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে। ইউনুসের সরকার অবৈধ এবং অসাংবিধানিক”-যুক্তির আলোকে উল্লেখ করেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং আইনজীবী নিঝুম মজুমদার। নিঝুম মজুমদার আরও বলেন, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই প্রতি মাসে বাংলাদেশে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। “বাংলাদেশকে চীন-ভারত বিরোধের প্রক্সি যুদ্ধক্ষেত্র বানানোর ষড়যন্ত্র চলছে,” মন্তব্য করেন তিনি।

সংবিধান ব্যাখ্যা করে ব্যারিস্টার নিঝুম মজুমদার বলেন, “এই সরকার বেআইনি, অসাংবিধানিক এবং ধ্বংসাত্মক- যারা বাংলাদেশের সমাজকে ভেঙে ফেলছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি নীরব থাকে, বাংলাদেশ কেবল ভেঙে পড়বে না, বরং সন্ত্রাস ও স্বৈরাচারের প্রক্সি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হবে।”

ভারতে বাংলাদেশের সাবেক প্রেস মিনিস্টার ও বিশিষ্ট সাংবাদিক নেতা শাবান মাহমুদ বলেন, “অবস্থা পরিবর্তন করতেই হবে। সাংবাদিকদের মুক্তভাবে লেখার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি অবাধ নির্বাচন জরুরি।”

‘জেনোসাইড একাত্তর ফাউন্ডেশন’র প্রতিষ্ঠাতা ও মানবাধিকার সংগঠক ড. প্রদীপ রঞ্জন কর বলেন, “বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে যা করার করতে হবে-এই হত্যাকারী স্বৈরাচারী সরকারকে সরাতেই হবে।”

আয়োজক দ্য ভয়েস নিউজের সম্পাদক দস্তগীর জাহাঙ্গীর উল্লেখ করেন, “এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এই সরকার ক্ষমতা দখল করতে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে অন্তত ৩,২৪০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে।”

ডেমক্র্যাটিক পার্টির ডিস্ট্রিক্ট লিডার ও মানবাধিকারকর্মী ড. দিলীপ নাথ বলেন, “৭০ বছর ধরে পাকিস্তানপন্থীরা বাংলাদেশকে হাঁটু গেড়াতে চেয়েছে। তারা মুজিববাদ মুছে খিলাফত কায়েম করতে চায়। ইউনুস তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করছেন।”

মূলধারার রাজনীতিক ড. রবি আলম সতর্ক করেন, “আইএসআইএস, আল-কায়েদা আর তালেবানের অনুপ্রেরণায় কাজ করছে বাংলাদেশি দুষ্কৃতকারীরা। তারা ইউনূস সরকারের সহায়তায় সারাদেশে মব সন্ত্রাস চালাচ্ছে। মানবাধিকার ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।”

বস্টনের সংগঠক টিপু চৌধুরী আন্তর্জাতিক সংহতির প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন।

সঞ্চালক দস্তগীর জাহাঙ্গির এবং প্যানেলিস্ট ব্যারিস্টার নিঝুম মজুমদার, টিপু চৌধুরী এবং মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।

সভায় অন্যদের মধ্যে আরো কথা বলেন আওয়ামী লীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আলী সিদ্দিক, ও বরকত আলম, বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সভাপতি আব্দুল কাদের মিয়া, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক প্রেস মিনিস্টার সাজ্জাদ হোসেন সবুজ, সিনিয়র সাংবাদিক শিহাবউদ্দিন কিসলু, পিনাকি তালুকদার, ৭১’এর প্রহরী ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক স্বীকৃতি বড়ুয়া, নারী অধিকার কর্মী ও সাংবাদিক রওশন আরা নিপা।

সব বক্তার কণ্ঠে এক সুর-বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতন্ত্র হত্যার বিরুদ্ধে বিশ্ব সম্প্রদায়কে পদক্ষেপ নিতে হবে এবং এজন্যে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সরব থাকতে হবে।

আলোচনায় উত্থাপিত মূল বিষয়সমূহ ছিল : রাজনৈতিক সংকট: কর্তৃত্ববাদী শাসন, বিরোধী দল দমন, নাগরিক স্বাধীনতার সংকোচন, অর্থনৈতিক বিপর্যয়: জিডিপি ৩.৩%-এ নেমে এসেছে, চরম দারিদ্র্য ৯.৩%, ৩০ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘন: ৩.৬ লাখ+ গ্রেপ্তার, ৬৫৭ নিশ্চিত মৃত্যু, মিডিয়া দমন, গণপিটুনি: এক বছরে ৬৩৭ জন নিহত, আইন ব্যবস্থার প্রতি আস্থার পতন, ধর্মীয় উগ্রবাদ: সংখ্যালঘুদের উপর ২০০০+ হামলা, উগ্র মাদ্রাসা, চরমপন্থী সমাবেশ।

এই বিষয়গুলো নিয়ে একটি বিশেষ প্রকাশনা প্রকাশ ও বিতরণ করেন বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সভাপতি আব্দুল কাদের মিয়া। তিনি এই সচেতনতামূলক অভিযাত্রা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের আয়োজন শুধু আমেরিকায় নয়, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। রুখে দিতে হবে অগণতান্ত্রিক সব প্রচেষ্টা ও আগ্রাসন।

Facebook Comments Box

Posted ৯:৪০ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫

nyvoice24 |

Address
New York
Phone: 929-799-2884
Email: nyvoice24@gmail.com
Follow Us