স্মরণ : সুলতান আহমদ

একজন অর্থনীতিবিদ এবং প্রচারবিহীন এক বীর মুক্তিযোদ্ধা

ড. আশরাফ আহমেদ   প্রিন্ট
শুক্রবার, ১৫ আগস্ট ২০২৫   সর্বশেষ আপডেট : ১২:০৮ অপরাহ্ণ

একজন অর্থনীতিবিদ এবং প্রচারবিহীন এক বীর মুক্তিযোদ্ধা

(শ্রদ্ধেয় ড. সুলতান আহমদ ভাই ১৪ অগাস্ট সন্ধ্যা ৮টায় আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। অনেকের মতো তাঁর সাথে আমাদের দীর্ঘদিনের পারিবারিক বন্ধুত্ব ছিল। বহুদিন থেকে তিনি কিডনির জটিলতায় ভুগছিলেন। সামাজিক অনুষ্ঠানে বিশেষ দেখা যেতো না বলে মাঝে মাঝে তাঁর বাসায় গিয়ে দেখে এসেছি। শেষবার গত বছরের ঈদ উপলক্ষে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁকে হুইল চেয়ারে বসা অবস্থায় দেখেছি। সম্প্রতি আবার দেখতে যাবো যাবো করেও তাঁর বাড়িতে আর যাওয়া হয়নি। এই দুঃখ থেকেই যাবে। কয়েকটি ছবি সহ আট বছর আগে তাঁকে নিয়ে আমার একটি লেখা এখানে শেয়ার করছি। সেটি ছাপা হয়েছিল ২৪শে নভেম্বর, ২০১৭
সালে নিউইয়র্কের একটি পত্রিকায়।)

শ্রদ্ধেয় ডক্টর সুলতান আহমদের নাম শুনি ১৯৮৩-৮৪ সনের দিকে, যখন আমি এদেশে প্রথম আসি। এই এলাকায় (ওয়াশিংটন মেট্রো) বাংলাদেশ এসোসিয়েশন নামে একটি সংগঠনের সাথে জড়িত এক ব্যক্তি হিসেবে। বিভিন্ন কারণে তখন এই সংগঠনের হর্তাকর্তারা আমার খাতায় ভালো মানুষের তালিকায় ছিলেন না। ফলে চাক্ষুষ দেখা বা পরিচয় না থাকা সত্ত্বেও ডক্টর সুলতান আহমদও আমার কাছে একই কাতারের ছিলেন। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন বছর নর্থ ক্যারোলাইনায় কাটিয়ে এই এলাকায় ফিরে এলে এসোসিয়েশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাতায়াত আমার বেড়ে গেল। ফলে ডক্টর সুলতান আহমদকে দেখার সুযোগও বাড়তে লাগল। লক্ষ করলাম জনপ্রিয়তার দিক থেকে এসোসিয়েশনের একটি গোষ্ঠীর ওপর অনেকের ক্ষোভ থাকলেও ডক্টর সুলতান আহমদের নামটি প্রায় সবাই শ্রদ্ধাভরেই উচ্চারণ করতেন, যা এখনো করেন। ১৯৯৪ সাল থেকে ‘প্রতিধ্বনি’ নামে ত্রৈমাসিক একটি মুখপত্র/নিউজলেটার সম্পাদনা করতে গিয়ে আমি নিজেও এসোসিয়েশনের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়লাম। আর সেই সূত্রেই তার সাথে আমার প্রথম সরাসরি যোগাযোগ হলো। বলা বাহুল্য তাঁর বন্ধুস্থানীয় অন্য সবার চেয়ে তাঁকেই আমি দেখেছিলাম একমাত্র স্বছ ও নিঃস্বার্থ চিন্তার মানুষ হিসেবে। যে কোনো সমস্যা নিয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করে সৎ পরামর্শ পাওয়া যেতো কোনো রকম ত্যাড়া কথা না শুনে। দলগত বিরোধ কখনোই তাঁকে ন্যায় আচরণ থেকে বিচ্যুত করে নাই। এভাবে তাঁর প্রতি আমার যে শ্রদ্ধা গড়ে উঠেছিল তার ভিত্তি ছিল খুবই সুদৃঢ় যা আজ তক বহাল আছে! আমিও তাঁর এক স্নেহভাজনে পরিণত হয়েছিলাম তখন থেকেই।

‘প্রতিধ্বনি’ পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যাটি হাতে পেয়ে তিনি এর সার্বিক উপস্থাপন নিয়ে এবং প্রতিটি সংবাদ, নিবন্ধ, ফটো, চিত্র, এবং সম্পাদকীয় পড়ে যে যে মন্তব্য করেছিলেন তার সব আজও আমার মনে আছে। সেই সব মন্তব্য শুধু নিঃস্বার্থই ছিল না, ছিল স্বতঃস্ফূর্ত এবং হৃদয়বান এক ব্যক্তির। সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছিলাম অনেক ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও তিনি সেই সংখ্যায় এবং এর পরবর্তী কোনো সংখ্যায়ই আমাদের কী কী ভুল আছে তা জানতে চাইলে বলতেন, কিছু না, এসবকে ভুল ধরলে চলবে কেন? অথচ তাঁরই সমসাময়িক কেউ কেউ শুধু ভুল খোঁজার জন্যই পত্রিকাটি পড়ে পড়ে মন্তব্য করতেন! কাজেই তাঁর কাছেই আমি পত্রিকাটির জন্য সবচেয়ে প্রথমে একটি লেখা চেয়েছিলাম এবং পেয়েও ছিলাম।
কথায় কথায় আজই জানলাম যে সুলতান ভাই একজন প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা! মুক্তিযুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন এলাকার পুরনো লোকদের অনেকেই মিটিং-মিছিল-আন্দোলন-সমাবেশ করেছেন তা জানতাম। তাঁদের মাঝে সুলতান ভাই ছিলেন না। আমি তাঁর আমেরিকা আগমন এবং বিশ্বব্যাংকে চাকরির ইতিবৃত্ত জানতে চেয়েছিলাম। তখনই আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের কথা শুনেছিলাম। সে সব কথা পরে বলছি। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে কিছু লেখার বাসনা জাগলো ঠিক তখনই। একই সাথে আমাদের অনেকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিপরীতে সুলতান আহমাদের আত্মপ্রচার বিমুখতার পরিচয়ও পেলাম আজ। তাঁর সম্পর্কে কিছু লেখার তাগিদও তাই অনুভব করলাম।

৯ ভাইবোনের মাঝে পঞ্চম সুলতান আহমদ ১৯৩৭ সালে রাজশাহী শহর থেকে দেড় মাইল দূরে মীরেরচক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পৈত্রিক বাড়িতে ‘বাঁশ বাগানে মাথার ওপর চাঁদ’ দেখে দেখে এবং ভাইবোনদের সাথে নিজেদের বাগানে ‘ঝড়ের দিনে আম কুড়াতে সুখ’ পেয়ে পেয়ে তিনি বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর শিক্ষাজীবনটিও বেশ চমকপ্রদ। পরিবেশটি পুরোপুরি লেখাপড়ার না হওয়া সত্ত্বেও সুলতান আহমদ মেধা তালিকায় ম্যাট্রিকে দ্বিতীয় স্থান, এবং আইএ, বিএ, এবং এমএ-র সবকটি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন। তবে এর জন্য পেয়েছিলেন তাঁর স্নেহময় পিতার পূর্ণ সমর্থন ও নৈতিক শিক্ষা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৯ সালে অর্থনীতিতে এমএ পাশ করে সেই বছরেই তিনি বাণিজ্য বিভাগে লেকচারার হিসাবে শিক্ষতায় যোগ দেন। সহপাঠিনী সুফিয়া দিলরোয়াকে বিয়েও করেন সেই বছরেই।

১৯৬১ সালে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চশিক্ষার্থে বিলাতে যান লন্ডনের স্কুল অব ইকনমিক্সে। সেখানে এক ত্যাঁদড় অধ্যাপকের কার্পণ্যের ফলে পিএইচডির বদলে অর্থনীতিতে মাস্টার্স ডিগ্রি পকেটে নিয়ে ফিরে আসতে হয় ১৯৬৪ সালে। আগের শিক্ষকতায় যোগ দিয়ে লক্ষ্য করলেন পিএইচডি নামের উচ্চতর ডিগ্রিটি না থাকায় অন্য সহকর্মীরা তাঁকে অবজ্ঞার চোখে দ্যাখেন। এই সময়ে ফোর্ড ফাউন্ডেশন থেকে স্কলারশিপের দরখাস্ত আহ্বান করলে উপাচার্যের অসহযোগিতা সত্ত্বেও তিনি তাতে সাড়া দেন। কিন্তু ব্যক্তিগত কাজে চট্টগ্রামে গিয়ে ফিরে এলে পরের দিন ঢাকায় স্কলারশিপের ইন্টারভিউতে যোগ দেয়ার টেলিগ্রামটি হাতে পান। সে সব দিনে সেলফোন তো নয়ই, ল্যান্ড ফোনেরও প্রচলন বিশেষ ছিল না! যাই হোক সন্ধ্যার আগে আগে ঢাকা পৌঁছে শুনতে পেলেন দুপুরে ইন্টারভিউ পর্ব শেষ হয়ে গেছে। চাইলে তিনি ইন্টারভিউ গ্রহণকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের সাথে দেখা করতে পারেন। ছুটলেন নীলক্ষেতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। অর্থনীতির অধ্যাপক নুরুল ইসলাম জানালেন তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর দরখাস্ত এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তাঁকেই স্কলারশিপের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। অধ্যাপক নুরুল ইসলাম পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর পছন্দে এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিও অর্জন করেছিলেন। বর্তমানে এই ওয়াশিংটন ডিসি এলাকাতেই অবসর জীবন কাটাচ্ছেন ড. সুলতান আহমেদ।

ইতোমধ্যে ডক্টর সুলতান আহমদের দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়েছে। ১৯৬৫ সালে স্ত্রী ও পুত্রকে নিয়ে ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এলেন আমেরিকার পেনসলভেনিয়া রাজ্যে। ভর্তি হলেন ফিলাডেলফিয়া শহরের প্রায় কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত আমেরিকার আইভি লিগ-খ্যাত ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়ায় বা ইউপেন-এ। অধ্যাপক আরভিং ক্রেভিসের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি গবেষণা শুরু করলেন। সেই অধ্যাপক বহু বছর থেকেই চেষ্টা করছিলেন পৃথিবীর দেশগুলোকে সম্পদের অধিকারীর তালিকাভুক্ত করার। তখন পর্যন্ত মাথাপিছু আয় অথবা দেশপিছু সম্পদ (জিডিপি) ধরে যেভাবে তালিকা করা হতো তাতে অনেক ত্রুটি ছিল। যেমন আমেরিকায় গাড়ির মালিক হওয়াটা বড়লোকি কিছু নয়। অথচ ভারত উপমহাদেশের দেশগুলোয় তখন গাড়ির মালিক হওয়া মানে অত্যন্ত বড়লোক হওয়া। আবার ভারত উপমহাদেশের দেশগুলোয় বাড়িতে একাধিক কাজের লোক থাকা বড়লোকি ব্যাপার নয়। কিন্তু আমেরিকা বা ইউরোপে বাড়িতে চাকর রাখা রীতিমত একটি বড়লোকি কারবার! অধ্যাপক ক্রেভিস চাইছিলেন অর্থনীতির মাননির্ণায়ক এধরনের অসংখ্য অসম বিশেষত্বকে সেই দেশের উপযোগী সংখ্যা আরোপ করে সবগুলোর সমন্বয়ে একটি সূত্র আবিষ্কার করা। প্রকল্পটির নাম ‘আন্তর্জাতিক তুলনা কার্যক্রম’, ইংরেজিতে ‘ইন্টারন্যাশনাল কম্পারিযন প্রোগ্রাম’, সংক্ষেপে আইসিপি। সূত্রটিকে বলা হবে ক্রয় ক্ষমতার সমতা বা পারচেসিং পাওয়ার প্যারিটি। সেই সূত্রটি একটি দেশের জনগণের ক্রয়ক্ষমতার সঠিক প্রতিফলন ঘটাবে। সেই সূত্র প্রয়োগ করে যে তালিকা পাওয়া যাবে তা হবে পূর্বে ব্যবহৃত তালিকার ত্রুটিমুক্ত।

সুলতান ভাইয়ের গবেষণার কাজ হলো অসংখ্য সেসব অসম বিশেষত্বকে বাগে আনা, এবং প্রতিটিকে সেই দেশের উপযোগী একটি সংখ্যা আরোপ করা। আরোপের পর একটি সূত্র তৈরি করে বিশ্বের প্রতিটি দেশের তালিকা প্রস্তুত করা। কিন্তু কাজটি বললাম আর হয়ে গেল, তাতো নয়! শতাধিক দেশের শতাধিক উদাহরণ এর পারমুটেশন কম্বিনেশন হাতে করা কি মানুষের পক্ষে সম্ভব? এসব কাজে কম্পিউটর লাগে। কিন্তু তখন তো আর ল্যাপটপের এতো ছড়াছড়ি ছিল না! তা এতো শক্তিশালী কম্পিউটার পাবেন কোথায়?

লেখক ড. আশরাফ দম্পতির সাথে ড. সুলতান আহমেদ দম্পতি।

এক পদার্থবিদ বিজ্ঞানীর ল্যাবের নিজস্ব একটি মেমোরি বক্সের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইনফ্রেম কম্পিউটারের মেমোরি যোগ করে মোট ৫১২ কিলোবাইট পাওয়া গেল। শিখলেন কম্পিউটারের ভাষা ও ব্যবহার। কিন্তু কম্পিউটারে তিনি কাজ করতে পারবেন মধ্যরাতের পর, অন্যান্য গবেষকরা যখন গভীর ঘুমে অচেতন! তাই সই। সৃষ্টি করলেন শতশত ছিদ্রযুক্ত পাতলা কার্ডবোর্ড। ঘুমে চোখও বন্ধ হয়ে আসে। ভাবনা হয় সংসারের কাজ গুছিয়ে, নিজের পড়াশোনা শেষ করে স্ত্রী দুটি সন্তানকে সামাল দিতে পারবে তো?

এইবার, এইবার কাজ প্রায় শেষ। এবার সফলতার পালা। একটির পর একটি ছিদ্রযুক্ত কার্ডবোর্ড কম্পিউটারে ঢুকিয়ে বসে থাকেন পৃথিবীর দেশগুলোর তালিকাটি হাতে পেতে। কিন্তু এ কী? কোনো তালিকা তো বেরলোই না, হিসাব করতে করতে কম্পিউটারটিই মাঝপথে থেমে যেতে লাগল। গলদটি কোথায়? প্রতিটি ধাপ অনেকবার পরীক্ষা করার পর আবিষ্কার করলেন কম্পিউটারের কাছে ১ মানে ১ নয়! ১ হচ্ছে দশমিকের পর কতগুলো ৯ এর সমাহার। কিন্তু স্বাভাবিক জ্ঞানে দশমিকের পর তিন না চারটি ৯ লিখলে তাকে অনায়াসে ১ বলে চালানো যায়! কিন্তু সেই কম্পিউটারটিতে দশমিকের পর নয়টি ৯ না লিখলে সে কিছুতেই সংখ্যাটিকে ১ বিবেচনা করবে না।
একবার যখন কম্পিউটারের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই দুর্বলতাটি ধরতে পারলেন, তখন বাকি সব পানির মতো সহজ হয়ে গেল! ‘ক্রয় ক্ষমতার সমতা’ সূত্র ব্যবহার করে এবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যে তালিকা পাওয়া গেল তা দেখে সব অর্থনীতিবিদই চমৎকৃত হলেন। আজ ‘ক্রয় ক্ষমতার সমতা’ বা ‘পারচেসিং পাওয়ার প্যারিটি’ একটি অতি সাধারণ প্রবাদ বাক্য। বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও উন্নয়নের কথা উঠলেই জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশিয়া ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এই প্রবাদ বাক্যের সাহায্যই নিয়ে থাকে। অথচ পঞ্চাশ বছর আগে খুব কম লোকেরই এ সম্পর্কে ধারণা ছিল। সুলতান আহমদ এই মতবাদের ওপর ভিত্তি করে যে সূত্র লেখেন তার ফলেই ‘ক্রয় ক্ষমতার সমতা’ সবার গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। এই কাজ করেই তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

কিন্তু না, এই ডিগ্রি পাওয়ার আগে সব বাঙালির মতো তাঁর জীবনেও আরো একটি ঐতিহাসিক ঘটনার শুরু ও শেষ হয়েছিল। একজন বাঙালি হিসেবে তিনি তখন চুপ থাকতে পারলেন না। স্ত্রী ও পুত্রকে নিয়ে বিভিন্ন পেশার মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাঙালিকে সাথে নিয়ে প্রতিবাদ করলেন পাকিস্তানি অত্যাচারের। প্রথমে ফিলাডেলফিয়ায়, পরে বল্টিমোর নৌ-বন্দরে সমরাস্ত্র বোঝাই পাকিস্তানি জাহাজের গতিরোধ করতে, এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে বিভিন্ন সমাবেশে।
ইউপেন-এ পিএইচডি গবেষণা করা অবস্থায় ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশ থেকে পুত্র ও কন্যা সহ তাঁর স্ত্রী এসে যোগ দেন। দুই বছর পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ফিলাডেলফিয়া এলাকায় তাঁদের সহ আর মোটে ৫টি বাঙালি ছাত্র-পরিবার ছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন লেখক জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, মযহারুল হক (বহুদিন থেকে ওয়াশিংটন ডিসি এলাকার অধিবাসী), এবং মোনায়েম চৌধুরি। স্থানীয় ‘কোয়েকার’ সম্প্রদায়ের সৃষ্ট ‘ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ’ এর সহায়তায় এই পরিবারগুলো ফিলাডেলফিয়া শহরে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা, তহবিল সংগ্রহ, এবং প্রয়োজনে ভদ্রভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বেড়াতেন।

একবার ফিলাডেলফিয়া বন্দরে একটি পাকিস্তানি জাহাজ ভিড়লে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা কালে বন্দরের সবাই কাজ বন্ধ করে একাত্মতা প্রকাশ করল। তারা চারজন বাঙালি নাবিক ও খালাসিকে পাকিস্তানি জাহাজ থেকে বাংলাদেশের পক্ষে নেমে আসতেও সাহায্য করেন। আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করতে গিয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুলতান ভাই নিউইয়র্ক, বল্টিমোর, এবং ওয়াশিংটন ডিসিতেও গমন করেন। বন্দরে ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বিশালাকার পাকিস্তানি জাহাজ ঘেরাওয়ের অনেকটা ছেলেখেলার মতো কিন্তু অসম সাহসী ও দৃঢ়চিত্তের কিছু প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধার ছবি তখন বিভিন্ন টিভিতে দেখানো হতো। সম্প্রতি রিচার্ড টেইলার নামে আমাদের এক বিদেশি মুক্তিযোদ্ধা ‘ব্লকেড’ নামে একটি বই লিখেছেন যাতে সেই সময়কার অন্যান্য বাঙালি যোদ্ধাদের সাথে ড. সুলতান আহমদ, তাঁর স্ত্রী, এবং পুত্র-কন্যার ছবিও যংযুক্ত করা আছে। বইটিকে ভিত্তি করে ব্লকেড নামে একটি সিনেমাও বানানো হয়েছে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। ১৯৭২ সালে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে মিস্টার সুলতান আহমদ ডক্টর হলেন। চাকরি খোঁজা শুরু করলেন। তাঁর ‘ক্রয় ক্ষমতার সমতা’ গবেষণাটি জাতিসংঘের এবং বিশ্বব্যাংকের যৌথ প্রকল্প ছিল। ফলে জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের সাথে ছিল যোগাযোগ। জাতিসংঘ তখনো সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় নাই। তদুপরি সেখানে পাকিস্তানের প্রভাব যথেষ্ট। তাই জাতিসংঘে তাঁর সুহৃদরাই পরামর্শ দিলেন বিশ্বব্যাংকে চাকরির চেষ্টা করতে। ফলে সেখানে অর্থনীতিবিদ হিসেবে ১৯৭৩ সালে চাকরি শুরু করেন। বিশ্বব্যাংকে তিনিই ছিলেন প্রথম ‘বাংলাদেশ’ পাসপোর্টধারী ব্যক্তি। পিএইচডি গবেষণায় যে কাজ তিনি শুরু করেছিলেন সেই আইসিপি প্রোগ্রামেই কাজ। তাঁর ‘ক্রয় ক্ষমতার সমতা’ কাজের সফল প্রয়োগ হয়েছে বিশ্বের ১০৪টি দেশে। বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে তিনি বিশ্বব্যাংকের আইসিপি শীর্ষক প্রোগ্রামটির সর্বোচ্চ কর্মকর্তা হিসেবে ১৯৯৯ সালে চাকরি থেকে অবসরে গেলে। কিন্তু ২০১১ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের কনসালট্যান্ট হিসাবে কুয়েত এবং বার্মা সহ বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সুলতান আহমদ বিখ্যাত রাজশাহী মাদ্রাসায় দীর্ঘ আট বছর পড়াশোনা করে ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন। তখনই তাঁর ভেতর ধর্মীয় এবং নৈতিক মূল্যবোধ স্থায়ী আসন করে নিয়েছিল। সেই বয়সেই কখনো কখনো নিজ পরিবারে এবং ঈদের জামাতে ইমামতি করতেন। আমি যখন তাঁকে কাছ থেকে দেখি তখন তিনি ওয়াশিংটন ডিসি এলাকার বাঙালিদের ঈদের জামাতে ইমামতি করেন। এই এলাকার প্রায় সবার খোতবা আরবি বা উর্দুতে হওয়ায় আমার মতো অনেকেই ইংরেজিতে দেয়া তাঁর যৌক্তিক খোতবাকে পছন্দ করা শুরু করেছিলাম। তাছাড়া বিজ্ঞানকে তিনি কখনো ধর্মের পরিপন্থী মনে করেন না। বাঙালিদের বিবাহ বা অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও তিনি পৌরহিত্য করে থাকেন।

সুলতান আহমদের আরো দুটি গুণের কথা অনেকেই জানেন না। ফিলাডেলফিয়ায় থাকার সময় জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের সাথে তিনি একটি নিউজলেটার সম্পাদনা ও প্রকাশ করতেন। তিনি উত্তর আমেরিকা নজরুল সম্মেলনের একজন উদ্যোক্তা সেই ২০০৩ সাল থেকেই। সেই সম্মেলন কমিটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করে আসছেন। এর বাইরে নিকট বন্ধু মহলে পেটফাটা হাসির গল্প করে করে আসর জমিয়ে রাখতে তাঁর জুড়ি নেই।

তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। সবাই সংসারী ও চাকরিজীবী। এঁদের নিয়ে এবং তাঁর প্রাপ্ত জীবন নিয়ে তিনি একজন পুরোপুরি সুখী ব্যাক্তি। সৃষ্টিকর্তার কাছে তাই তাঁর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই!

বাংলাদেশের বয়স্ক অনেকের মতো কাগজ-কলমে তাঁর জন্মও জানুয়ারিতে হলেও আসলে সুলতান ভাইয়ের জন্ম হয়েছিল মার্চের দশ তারিখ। জন্মদিন উপলক্ষে ড. সুলতান আহমদ ভাইয়ের সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন কামনা করে অশেষ শুভেচ্ছা জানাই।

Facebook Comments Box

Posted ১২:০৮ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ১৫ আগস্ট ২০২৫

nyvoice24 |

Address
New York
Phone: 929-799-2884
Email: nyvoice24@gmail.com
Follow Us