ভীত-সন্ত্রস্ত্র কমুনিটির জন্যে নিউইয়র্কেপরামর্শ সভা

গ্রেফতার-অভিযানে স্টুডেন্ট ও ট্যুরিস্ট ভিসাধারীরা জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক   প্রিন্ট
মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫   সর্বশেষ আপডেট : ৬:৫১ পূর্বাহ্ণ

গ্রেফতার-অভিযানে স্টুডেন্ট ও ট্যুরিস্ট ভিসাধারীরা জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হচ্ছে

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন-বিরোধী পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে অন্য কম্যুনিটির মত প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যেও ভীতির সঞ্চার ঘটেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে করণীয় সম্পর্কে আলোকপাতের জন্যে ১০ ফেব্রুয়ারি সোমবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে ‘বাংলাদেশ সোসাইটি’র উদ্যোগে এক পরামর্শ সভার আয়োজন করা হয়। সময়ের প্রয়োজনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ সভায় বক্তব্যকালে ইমিগ্রেশন এটর্নী খায়রোল বাশার একজন ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টের পরিস্থিতির আলোকপাতকালে বলেন, সেমিস্টার পরবর্তী ছুটি শেষে বাংলাদেশ থেকে ফেরার সময় জেএফকে এয়ারপোর্টে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জানতে চাওয়া হয় যে, নয়া সেশনের সেমিস্টার শুরু হবে আরো ৪৫দিন পর। তাহলে এতো আগে কেন এসেছো? এ ধরনের আরো কিছু প্রশ্ন করা হয়। সেটি ঘটেছে ২০ জানুয়ারির কদিন আগে অর্থাৎ ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের প্রাক্কালে ১৭ জানুয়ারি। জিজ্ঞাসাবাদকালেই তার ফোন নিয়ে পরীক্ষা করেন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস কর্মকর্তারা। টেলিফোনে অনেক তথ্য তারা উদঘাটনে সক্ষম হন যে সে ভিসার বিধি লংঘন করে কাজ করেছেন। এরপরই তাকে আটক করা হয়। দু’ঘন্টার মধ্যেই আটক শিক্ষার্থী আমার সাথে যোগাযোগ করেন এবং আমাকে তার এটর্নী হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। তবে সে সময়েই তাকে মুক্তি দেয়া হয়নি। সপ্তাহখানেক কাটাতে হয়েছে প্যারলে মুক্তির আদেশ পাওয়া পর্যন্ত। আমিও বিষয়টি জানতে পারি।

এটর্নী বাশার বলেন, ২০ জানুয়ারি ট্রাম্পের বিশেষ আদেশ জারির পর জেএফকে এয়ারপোর্টে অবতরণ করেও অনেক বাংলাদেশী ও ভারতীয় স্টুডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে পারেনি।এয়ারপোর্ট থেকেই তাদেরকে নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। এজন্যে আমি স্টুডেন্ট ভিসাধারিদের সতর্ক করতে চাই যে, স্টুডেন্ট ভিসাধারীর অনেকে সঙ্গতকারণে টুকটাক কাজ করেন। ব্যাংকে অনেকের ডলারও জমা হয়। যারা বাংলাদেশ থেকে আসছেন তারা নানাবিধ প্রশ্নবাণে জর্জরিত হচ্ছেন। কেন এত ডলার জমা হয়েছে? কোত্থেকে এসেছে এই অর্থ? এমন বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়ানোর অভিপ্রায়ে সাথে সেলফোন না রাখাই শ্রেয়। এটর্নী বাশার উল্লেখ করেন, এমনকি যারা ট্যুরিস্ট ভিসায় আসবেন বা এসেছেন-তারাও ফোন সাথে না রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কারণ বাংলাদেশ থেকে আসার সময় ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস কর্মকর্তারা সার্চ করে দেখতে পারেন আপনি যুক্তরাষ্ট্রে কোন ঠিকানায় থাকবেন। সেই ঠিকানা সার্চ দিলে উদঘাটিত হতে পারে যে, ঐ ঠিকানায় কয়েকজন অবৈধ অভিবাসীও আছেন। এছাড়া, একজন বাংলাদেশ থেকে ট্যুরিস্ট ভিসায় আসার সময় এমন একজনের কিছু কাগজপত্র সাথে এনেছিলেন যাবে আগেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

সতর্কতা হিসেবে এটর্নী বাশার আরো বলেন, ট্যুরিস্ট ভিসায় আগত একজনকে জেএফকে এয়ার পোর্ট থেকেই বহিষ্কার করা হয়েছে। সে সময় জিজ্ঞাসাবাদকালে ঐ ভিসাধারী বাংলাদেশী ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস কর্মকর্তাকে জানিয়েছিলেন যে তিনি তিন সপ্তাহের জন্যে এসেছেন। অথচ তার ফোন পরীক্ষাকালে দেখা যায় যে, তিনি হোটেল বুকিং দিয়েছেন মাত্র দুদিনের। এমন ঘটনা ঘটছে হরদম এয়ারপোর্টে এবং কোন কোন সিটিতেও।

এটর্নী বাশার বলেন, ডনাল্ড ট্রাম্পের টার্গেট হচ্ছে ক্রিমিনাল অবৈধ অভিবাসীরা। এছাড়া, যাদের রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনার আবেদন নাকচ হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও বহিষ্কারের আদেশ জারি হয়। তেমন লোকজনকে খুঁজে পেলেই গ্রেফতার করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের জন্যে। এক্ষেত্রে যদি কারো বাসায় আইস (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) এর এজেন্ট আসে এবং দরজা নক করেন, তাহলে কখনোই দরজা খোলা উচিত হবে না। আইসের এজেন্ট যদি বহিষ্কারাদেশের নথিও দেখায়, তবুও দরকা খুলবেন না। তবে তারা যদি আদালতের গ্রেফতারী পরোয়ানা দেখায় তাহলে ভিন্ন কথা। গ্রেফতারী পরোয়ানা ব্যতিত কোন বাসায় জোরপূর্বক প্রবেশের অধিকার কোন সংস্থারই নেই। এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেই নিজের আইনজীবীকে ফোন করতে হবে। এছাড়া, আইসের এজেন্টের কোন কথারই জবাবদান থেকে বিরত থাকা উচিত। বলতে হবে আইনজীবী ছাড়া আমি কথা বলবো না।
এটর্নী বাশার বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, অনেক আগে যাদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন নাকচ হয়েছে এবং বহিস্কারের আদেশ জারি হয়েছে, তারা এখোন ঐ আবেদন পুনরুজ্জীবিত করতে পারবেন। কারণ, বাংলাদেশের পরিস্থিতি পাল্টেছে। দেশে ফিরলেই প্রাণনাশের মারাত্মকম হুমকি অথবা গ্রেফতার-নির্যাতনের প্রবল আশংকা তৈরী হয়েছে-এমন যুক্তির অবতারণা করে। মামলাটি যদি পুনরুজ্জীবিত হয় তাহলে ট্রাম্পের এই অভিযান থেকে নিজেকে রক্ষার একটি সুযোগ তৈরী হবে।

এটর্নী বাশার আরো উল্লেখ করেন, যারা ওয়ার্ক পারমিট পেয়েছেন তারা সবসময় তা সাথে রাখবেন। আরা যারা রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন কিন্তু ওয়ার্ক পারমিট পাননি তারা আবেদনের রশিদটি সাথে রাখবেন-সেটিও আইসের অভিযান থেকে আপনাকে রক্ষা করতে সহায়ক হবে।

বর্তমানের ভীতিকর পরিস্থিতির কারণে সপ্তাহে একদিন তিনি ফ্রি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্যে নিজের অফিস খোলা রাখেন বলে জানালেন এটর্নী খায়রোল বাশার। এক্ষেত্রে তিনি সংশ্লিষ্টদেরকে বাংলাদেশ সোসাইটির মাধ্যমে তার কাছে যাবার পরামর্শও দিয়েছেন। কম্যুনিটির অনেকে আইনজীবী সেজে কাগজপত্রহীনদের সাথে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছেন। এমন গুরুতর অপকর্মে লিপ্ত দুষ্টলোকদের প্রতি ইঙ্গিত করে এটর্নী বাশার বলেন, সবসময় নিজের এটর্নীর সাথে যোগাযোগ রাখবেন, এবং অভিজ্ঞ এটর্নীর পরামর্শ অনুযায়ী পথ চললে ভীতি মুক্ত থাকা সম্ভব হবে।

অভিবাসীদের গ্রেফতার অভিযানে সন্ত্রস্ত্র কম্যুনিটির জন্যে ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সোসাইটির পরামর্শ সমাবেশের নেতৃবৃন্দ। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪।

এই পরামর্শ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন হোস্ট সংগঠন ‘বাংলাদেশ সোসাইটি’র সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম। সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলীর সঞ্চালনায় উদ্ভ’ত পরিস্থিতির আলোকে আরো বক্তব্য দেন নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কন্সাল জেনারেল মো. নাজমুল হুদা, এটর্নী স্ট্যানলি এম ওয়াইন, এটর্নী সুজান স্কোইয়্যার, কম্যুনিটি বোর্ড মেম্বার শাহনেয়াজ প্রমুখ। সভা পরিচালনায় বিশেষভাবে সহযোগিতায় ছিলেন বাংলাদেশ সোসাইটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মহিউদ্দিন দেওয়ান, ভাইস প্রেসিডেন্ট কামরুজ্জামান কামরুল, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অনিক রাজ, প্রচার সম্পাদক রিজু মোহাম্মদ, স্কুল ও শিক্ষা সম্পাদক হাসান জিলানী, নির্বাহী সদস্য জাহাঙ্গির সোহরাওয়ার্দি প্রমুখ। সোসাইটির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুর রহিম হাওলাদার, সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন সিদ্দিকী, জ্যাকসন হাইটস এলাকা থেকে সিটি কাউন্সিলম্যান প্রার্থী শাহ শহিদুল হক সাঈদ, কম্যুনিটি বোর্ড মেম্বার ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার, জ্যাকব মিল্টন, নীরা রাব্বানী প্রমুখ ছিলেন এ সভায়।

উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ এই কর্মসূচিতে এ যাবত ১০ হাজারের অধিক অবৈধ অভিবাসীকে গ্রেফতারের সংবাদ পাওয়া গেছে। এই অভিযানকে আরো বেগবান করতে ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিস তথা আইআরএসকেও সহযোগিতার অনুরোধ জানানো হয়েছে হোয়াইট হাউজ থেকে। এর আগে নিউইয়র্ক, শিকাগো, লসএঞ্জেলেস, ফিলাডেলফিয়া, বস্টনের মত বড় সিটির মেয়রকে আহবান জানানো হয়েছে গ্রেফতার অভিযানে সর্বাত্মক সহায়তা করার জন্যে। এ আহবানে সাড়া না দিয়ে এসব সিটির ফেডারেল বরাদ্দ বন্ধের হুমকিও রয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচনী অঙ্গিকার অনুযায়ী ১৫ লাখের অধিক অবৈধ অভিবাসী (যাদের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে বহিষ্কারের আদেশ জারি হয়েছে) কে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিস্কারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

Facebook Comments Box

Posted ৬:৫১ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

nyvoice24 |

Address
New York
Phone: 929-799-2884
Email: nyvoice24@gmail.com
Follow Us