মরনোত্তর পদোন্নতি এবং বীরোচিত শ্রদ্ধাঞ্জলিতে

চিরবিদায় নিউইয়র্কের বাংলাদেশী পুলিশ অফিসার দিদারের

বিশেষ সংবাদদাতা   প্রিন্ট
শুক্রবার, ০১ আগস্ট ২০২৫   সর্বশেষ আপডেট : ১:১৮ অপরাহ্ণ

চিরবিদায় নিউইয়র্কের বাংলাদেশী পুলিশ অফিসার দিদারের

‘প্রথম গ্রেডের ডিটেকটিভ’ হিসেবে মরনোত্তর পদোন্নতি এবং বীরোচিত ভ’মিকার জন্যে ২০ হাজারের অধিক শোকার্ত মানুষের আহাজারির মধ্যদিয়ে ৩১ জুলাই সম্পন্ন হলো নিউইয়র্ক পুুলিশ ডিপার্টমেন্টের অফিসার দিদারুল ইসলামের জানাযা ও দাফনের প্রক্রিয়া। উল্লেখ্য, মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ার সন্তান দিদারুল ইসলাম (৩৬) কে মরনোত্তর পদোন্নতি প্রদানের এই দাবি সর্বপ্রথম উচ্চারণ করেছিলেন কুইন্স ডেমক্র্যাটিক পার্টির ডিস্ট্রিক্ট লিডার ও ইউএস সুপ্রিম কোর্টের এটর্নী মঈন চৌধুরী। ভরদুপুরে ব্রঙ্কসে পার্কচেস্টার মসজিদে দিদারের জানাযার প্রাক্কালে প্রদত্ত বক্তব্যে নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের কমিশনার জেসিকা টিশ দিদাদের কর্মনিষ্ঠা ও সাহসিকতার প্রশংসা উচ্চারণের পর মরনোত্তর পদোন্নতির ঘোষণা দেন। এজন্যে প্রবাসীদের পক্ষ থেকে সিটি প্রশাসনের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এটর্নী মঈন চৌধুরী বলেন, এরফলে দিদারের পরিবার পেনশন ভাতার পরিমাণ অনেক বেশী পাবেন। সুযোগ-সুবিধাও বাড়বে। শুধু তাই নয়, অন্য অফিসারেরাও আরো সাহসি হবেন নগরবাসীর নিরাপত্তা সুসংহত করতে। উল্লেখ্য, এটর্নী মঈন জানাযায় অংশ গ্রহণের সময় নিরাপত্তা রক্ষীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। বিশেষ করে নিহত দিদাদের সহকর্মীগণের সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। আরো উল্লেখ্য, ২৮ জুলাই সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ম্যানহাটানে একটি ভবনে নিরাপত্তা রক্ষীর দায়িত্ব পালনকালে শ্যান তামুরা নামক এক বন্দুকধারীর গুলিতে দিদারসহ ৪ জন মারা যান। হত্যাকান্ডের পর ভবনটির ৪৩ তলায় উঠে নিজেও ঐ বন্দুকের গুলিতেই আত্মহত্যা করেছেন।

ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলামের জানাযার প্রাক্কালে অসহনীয় সূর্যতাপে অপেক্ষারত মুসল্লীরা। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ডটকম।

জানাযায় শরিক হয়েছিলেন সিটি মেয়র এরিক এডামস, স্টেট গভর্ণর ক্যাথি হোকুল, মেয়র পদে ডেমক্র্যাটিক প্রার্থী জোহরান মামদানি, স্বতন্ত্র প্রার্থী এ্যান্ড্রু ক্যুমো, রিপাবলিকান পার্টির মেয়র প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়া-সহ কম্যুনিটির সর্বস্তরে প্রতিনিধিত্বকারি ব্যক্তিবর্গ। ছিলেন দিদারের বাবা আব্দুর রব, স্ত্রী জামিলা আকতার, দুই শিশু পুত্রসহ আত্মীয়-স্বজনেরা। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র এরিক এডামস জানাযায় অংশগ্রহণ ছাড়াও আগেরদিন দিদাদের ব্রঙ্কসের বাসায় এসে তার বাবা-সহ পরিবারের সদস্যদেরকে শান্তনা দেন।

জানাযা নামাজের প্রাক্কালে ব্রুঙ্কসে মূলধারার রাজনীতির পথিকৃত হাসান আলী নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশকালে বলেন, দিদারের সাহসিকতা, কর্মনিষ্ঠা এবং মানবতার কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার মধ্যদিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশী, মুসলিম কম্যুনিটি এবং নিউইয়র্কবাসীর জন্যে সম্মান বয়ে এনেছেন। তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি যে সম্মান জানানো হচ্ছে তার পথ বেয়ে মহান আল্লাহও তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুক, মরহুমের পরিবারকে সৃষ্টিকর্তা ধৈর্য ধারনের তৌফিক দান করুক-এই কামনা করছি।

ডেমক্র্যাটিক পার্টির লিডার এটর্নী মঈন চৌধুরী বলেন, আমি তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। আজকে স্মরণকালের বৃহৎ একটা পাবলিক গেদারিং হচ্ছে। আমার মনে হয় এতবড় জানাযা কোন বাংলাদেশীর জন্যে এর আগে নিউইয়র্ক অঞ্চলে হয়নি। এখানে ফেডারেল, স্টেট, সিটি প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মকর্তার পাশাপাশি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাও এসেছেন। এটা প্রবাসীদের জন্যে অবশ্যই বিশেষ একটি দিনে পরিণত হবে এবং বহুজাতিক সমাজে বাংলাদেশীদের মান-মর্যাদা আরো বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।

দিদারুল ইসলামের বাসায় সিটি মেয়র এরিক শান্তনা দিচ্ছেন পরিবারের সদস্যদের। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ডটকম।

নিউইয়র্ক সিটির মেয়র প্রার্থী (রিপাবলিকান) কার্টিস স্লিওয়া এ সময় দিদাদের আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, এই সিটি তথা আমেরিকানদের নিরাপত্তায় বাংলাদেশীরা যে ত্যাগ শিকার করলেন, তা উদাহরণ হয়ে থাকবে অনন্তকাল। আর এই পথবেয়েই বহুজাতিক সমাজে উদিয়মান একটি কম্যুনিটি হিসেবে বিশেষ স্থানে অধিষ্ঠিত হলেন বাংলাদেশী আমেরিকানরা। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-জাতি নির্বিশেষে মানুষ এসেছেন জানাযায়। এ এক বিরল দৃশ্য।

দিদাদের স্ত্রীর লিখিত বক্তব্যতেও উচ্চারিত হয়েছে যে, দিদার ছিলেন আমাদের সবকিছু। তাঁর এই মৃত্যু আমাদেরকে একেবারেই মুষড়ে ফেললেও গৌরববোধ করছি যে, তার এই আত্মত্যাগের মধ্যদিয়ে ঐ লবিতে অন্যদের জীবন বেঁচেছে।
নিউইয়র্ক অঞ্চল তথা উত্তর আমেরিকায় সর্ববৃহৎ সামাজিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ সোসাইটি’র প্রেসিডেন্ট আতাউর রহমান সেলিম, সেক্রেটারি মোহাম্মদ আলী, জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সভাপতি বদরুল হক খান এবং সেক্রেটারি রোকন হাকিম, ব্রঙ্কস কম্যুনিটি বোর্ডের লিডার শাহজাহান শেখ এবং আব্দুস শহীদ, স্পোর্টস কাউন্সিলের নেতা মহিউদ্দিন দেওয়ান প্রমুখ অংশগ্রহণকারি বিশিষ্টজনদের মধ্যে ছিলেন।

উল্লেখ্য, একমাত্র পুত্রের মৃত্যুর সংবাদ জানার পরই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন আব্দুর রব। হাসপাতালে চিকিৎসার পরদিন বাসায় ফিরেছেন। তিনিও ছিলেন জানাযায়, তবে কোন কথা বলতে পারেননি।

দিদারের প্রবাস জীবন শুরু হয় নিউইয়র্ক সিটির পাবলিক স্কুলের নিরাপত্তা প্রহরি হিসেবে। সাড়ে তিন বছর আগে পুলিশ ডিপার্টমেন্টে ঢুকেছিলেন। নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ব্রঙ্কসে অবস্থিত ৪৭ নম্বর পুলিশ স্টেশনে কাজ করতেন দিদার। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পুলিশ ডিপাটমেন্টের অনুমতিক্রমে ম্যানহাটানের ইস্ট ৫১ নম্বর ভবনে পুলিশের পোশাক পরেই নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছিলেন। বন্দুকধারী দুর্বৃত্ত শ্যান তামুরার উপর্যূপরি গুলিতে অকুস্থলে প্রাণ হারিয়েছেন দিদার। প্রতিটি বুলেট বিদ্ধ হয় দিদারের বুকে। এসময় ঐ ভবনের নিজস্ব নিরাপত্তা রক্ষী অ্যালেন্ড ইতিয়েন (৪৬), ব্ল্যাকস্টোন কোম্পানীর নির্বাহী অফিসার ওয়েসলি লিপাটনার (৪৩) এবং জুলিয়া হাইম্যান (২৭)কেও গুলি করে হত্যা করা হয়। তামুরার গুলিতে গুরুতর আহত আরেকজন হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন।

দিদারুল ইসলামের শোকার্ত পরিবারের সদস্যবর্গকে শ্রদ্ধার্ঘ-স্যালুট পুলিশ অফিসারদের। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ডটকম।

জানাযায় ইমামতি করেন মৌলানা জাকির আহমেদ। এ সময় তিনি বিশ্বব্যাপী বিরাজিত মুসলমানদের সাথে বিদ্বেষমূলক আচরণের নিন্দা এবং গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের অবসানে সকলকে সোচ্চার থাকার উদাত্ত আহবান জানিয়ে বলেন, দিদাদের মত নিষ্ঠুর পরিস্থিতির ভিকটিম যেন আর কেউ না হই। আমরা সকলে যেন দিদাদের মত মানুষদের অধিকার-মর্যাদার জন্যে নিরন্তরভাবে লড়ে যাই। আমাদেরকে অঙ্গিকারাবদ্ধ হতে হবে দিদারের আত্মত্যাগকে শুধু সম্মান জানাতে নয়, তার এই ত্যাগের বিনিময়ে গোটাবিশ্বকে যাতে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ রাখতে পারি-এমন সংকল্প গ্রহণ করতে হবে। আর যেবিশ্ব সকলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে, গুটিকতক মানুষের নয়।

দিদারুল ইসলামের শেষযাত্রা পার্কচেষ্টার জামে মসজিদ থেকে। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ডটকম।

দিদারের নিকট প্রতিবেশী কলোন গভীর শোক জানিয়ে বলেন, পুলিশ একাডেমি থেকে গ্র্যাজুয়েশনের পরই দিদারের পরিবার সকলকে নিয়ে একটি উৎসব করেছেন। তারা উৎসব করেছেন দুই পুত্র সন্তানের জন্মের পরই। শীঘ্রই আসছে তৃতীয় সন্তান। কিন্তু তার জন্যে কী তেমন উৎসব হবে?

দিদারুল ইসলামের শেষযাত্রায় সহকর্মীগণের মোটর-শোভাযাত্রা। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ডটকম।

জানাযা শেষে মসজিদ থেকে দিদারের নিথর দেহ নিয়ে কফিনটি যখোন দাফনের উদ্দেশ্যে গাড়িতে নেয়া হচ্ছিল, তখোন পুলিশের চারটি হেলিকপ্টার টহল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে দিদারের বিদেহি আত্মার প্রতি।
এরপর কয়েকশত মোটর সাইকেলের শোক-যাত্রার সাথে রওয়ানা দেয় কফিনবাহি পুলিশের গাড়ি ও অফিসারদের বেশ কটি গাড়ি।

Facebook Comments Box

Posted ১:১৮ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ০১ আগস্ট ২০২৫

nyvoice24 |

Address
New York
Phone: 929-799-2884
Email: nyvoice24@gmail.com
Follow Us