নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট
মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৭ অপরাহ্ণ
জেএফকে এয়ারপোর্টে ড. মুহম্মদ ইউনূস। ছবি-সংগ্রহ।
জাতিসংঘের চলতি ৮০তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে নিউইয়র্কে জেএফকে এয়ারপোর্টে অবতরণের পর ড. মুহম্মদ ইউনূস বিশেষ নিরাপত্তায় গোপন একটি গেইট দিয়ে বেড়িয়ে গেলেও তার সফরসঙ্গি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য-সচিব আখতার হোসেন ও যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাসনিম জারা সাধারণ যাত্রীদের সাথে বের হবার সময় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীগণের তুমুল বিক্ষোভে নিপতিত হন।
জেএফকে এয়ারপোর্টে বিব্রতকর অবস্থায় বিএনপি মহাসচিবসহ সফরসঙ্গিরা। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।
এ সময় বিব্রতকর ড. ইউনূসকে খুনী এবং জামাত-শিবিরের নেতা হিসেবে অভিহিত করে নানা স্লোগানে প্রকম্পিত করা হয় এয়ারপোর্টের ৪ নম্বর টার্মিনাল। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনার আকস্মিকতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেও কারো বিরুদ্ধে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং হুমায়ূন কবির পাশাপাশি অবস্থানে হেঁটে পার্কিং স্পটের দিকে যাবার সময় তাদেরকে বাংলাদেশের দুশমন, গত ১২ মাসে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হত্যা, বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ কিংবা বুলডুজার দিয়ে গুড়িয়ে দেয়ার আগে সহায়-সম্পদ লুটতরাজের জন্যে দায়ী করে স্লোগান দেয়া হয়। এ দু’জনকে অনুসরণ করছিলেন এনসিপির আখতার হোসেন ও ডা. তাসনিম জারা।
জেএফকে এয়ারপোর্টে ডিম হামলার শিকার এনসিপি নেতা আখতার হোসেন। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।
এরা উভয়ে ভীতিকর অবস্থায় নিজেদেরকে গুটিয়ে হাঁটছিলেন। কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে থামিয়ে দেয়া হয় অকথ্য গালিগালাজের মধ্যে পরপর কয়েকটি ডিম ছুড়ে মারার মাধ্যমে। আখতার হোসেনের পীঠে সবকটি ডিম আঘাত করেছে। এ সময় তাদেরকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী এবং একাত্তরের রাজাকারের পোষ্য পুত্র হিসেবে অভিহিত করে নানা বাক্য নিক্ষেপ করা হয়। কোন উচ্চবাচ্য না করেই তারা এগুচ্ছিলেন গাড়ির দিকে।
ডিম হামলায় জড়িত সন্দেহে যুবলীগ নেতা মিজানুর রহমানকে গ্রেফতার করে নিউইয়র্কের পুলিশ। ছবি-
এমনি একটি পরিস্থিতির মধ্যে বিএনপি ও এনসিপির নেতৃবৃন্দ একেবারেই ঘাবড়ে গেলেও তাদের কয়েক ফুট পিছণে ছিলেন জামায়াত নেতা মুহাম্মদ তাহের। ৩০/৩৫ জন প্রবাসী মুহাম্মদ তাহেরকে স্বাগত জানিয়ে উচ্চস্বরে স্লোগান দিয়ে গাড়ির দিকে যান। এদের কেউই সম্মুখে বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার মির্জা ফখরুল কিংবা আখতার হোসেনের পাশে দাঁড়াননি কিংবা আওয়ামী লীগের ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীদেরকে নিবৃত্ত করার ন্যূনতম চেষ্টা করতেও দেখা যায়নি বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। একেবারেই শেষ লগ্নে অর্থাৎ মির্জা ফখরুল ও আখতার হোসেন গাড়িতে উঠার প্রাক্কালে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সদস্য গিয়াস আহমেদ অকুস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চালান। তবুও পচা ডিমের পাশাপাশি গাড়িতে সকলে থুথু দিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি ধিক্কার প্রকাশ করেন।
জেএফকে এয়ারপোর্টে বিএনপির স্বাগত সমাবেশ। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।
এখানেই শেষ নয়, আওয়ামী লীগ নেতা তানভির কায়সার এবং যুক্তরাষ্ট্র ছাত্রলীগের নেতা হৃদয় মিয়া গাড়ির সামনে শুয়ে পড়লে ড্রাইভার কৌশলে সম্মুখের পরিবর্তে গাড়ি পেছনে নিয়ে পুলিশের সহায়তায় এয়ারপোর্ট ত্যাগ করতে সক্ষম হয়। এর আগে ১৫ বছরই জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগদানের জন্যে আসা শেখ হাসিনাকেও বিক্ষোভ দেখিয়েছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। শতশত প্রবাসীর বিক্ষোভ কখনো শালিনতা ছাড়ায়নি কিংবা প্রতিনিধি দলের সদস্যগণকে নিরাপত্তা রক্ষি ছাড়া টার্মিনাল পেরিয়ে গাড়িতে উঠতে হয়নি। বিএনপি মহাসচিব ও এনসিপির চার নেতা আক্রান্ত হলেও পেছনে থাকা জামায়াতে ইসলামির সমর্থকরা নির্বিকার থাকার সংবাদে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতৃবৃন্দ জামাতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পাচ্ছেন। উল্লেখ্য, মুহম্মদ ইউনূসের আগমনের প্রতিবাদে আগেই আওয়ামী লীগ ‘যেখানে ইউনূস-সেখানেই প্রতিরোধ’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। সে অনুযায়ী এয়ারপোর্ট পুলিশের প্রহরায় বেলা একটা পর্যন্ত এই এয়ারপোর্টের ৮ নম্বর টার্মিণালের নিকটে একটি নির্দিষ্টস্থানে আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়। এরপর তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে দিয়ে মির্জা ফখরুলসহ প্রতিনিধি দলের সকলকে স্বাগত জানাতে এয়ারপোর্টে আসা বিএনপির নেতা-কর্মীগণকে ঐস্থানেই অবস্থান করে ‘স্বাগত সমাবেশ’ করার সুযোগ দেয়া হয়। এমনি অবস্থায় প্রধান উপদেষ্টা ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইট বিকেল ৩টায় জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দওে অবতরণ করে। সেটি হচ্ছে ৪ নম্বর টার্মিনাল। আর বিএনপির নেতা-কর্মীরা স্বাগত-সমাবেশ করছিলেন ৮ নম্বর টার্মিনালে। অপরদিকে, বিক্ষোভ-সমাবেশ শেষ করে আওয়ামী লীগের অনেকেই হেঁটে ৪ নম্বর টার্মিনালে এসে মুহম্মদ ইউনূস ও তার সফরসঙ্গিদেরকে নাজেহাল করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
জেএফকে এয়ারপোর্টে আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ-সমাবেশ। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।
এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান এ সংবাদদাতাকে বলেন, জঙ্গি আর সন্ত্রাসীদের গুরু মুহম্মদ ইউনূসের দু:শাসনে বাংলাদেশ আজ ডুবতে বসেছে। মানবাধিকার বলতে কিছু নেই। গণমাধ্যমের মুখ বন্ধ করা হয়েছে হুমকি আর হত্যা মামলায় আসামী করার দাপটে। প্রতিদিনই হত্যা ও নৃশংসতার শিকার হচ্ছেন ভিন্নমত পোষণকারিরা। তাই তার মত ঘাতকের জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার কোন অধিকার নেই বলে আমরা সর্বত্র প্রতিররোধের কর্মসূচি নিয়েছি। তারই অংশ হিসেবে জেএফকে এয়ারপোর্টে অবরোধ করে ঘন্টাখানেকের অধিক সময় সবকিছু থামিয়ে দিয়েছিলাম। তবে ইউনূসকে সামনে পাইনি। চোরাই পথে গাড়িতে উঠে হোটেলে চলে গেছেন। জাতিসংঘে অবস্থানকালিন প্রতিদিনই আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ-সমাবেশ চলবে বলেও ড. সিদ্দিকুর রহমান জানান।
জেএফকে এয়ারপোর্টে বিএনপির স্বাগত সমাবেশ। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।
এদিকে ২২ সেপ্টেম্বর সোমবার সন্ধ্যায় নবান্ন পার্টি হলের সামনে থেকে মিজানুর রহমান নামক যুবলীগের এক কর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। গভীর রাতে তাকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে এনসিপি নেতা আখতার হোসেনের প্রতি পচা ডিম নিক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে বলে ১১০ নম্বর প্রেসিঙ্কট সূত্রে জানা গেছে।
জেএফকে এয়ারপোর্টে আওয়ামী লীগের দুই কর্মী মির্জা ফখরুলসহ প্রতিনিধি দলের গাড়ির সামনে শুয়ে পড়েছিলেন। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।??
এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে যোগ দিতে সোমবার নিউইয়র্কে পৌঁছে জাতিসংঘ সদর দফতর সংলগ্ন গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে উঠেছেন। সফরসঙ্গিরাও উঠেছেন একই হোটেলে। এছাড়া জামায়াত নেতা নকিবুর রহমান তারেক যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিনিধি দলে যুক্ত হন।
জেএফকে এয়ারপোর্টে বিএনপির স্বাগত সমাবেশ। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।
জেএফকে এয়ারপোর্টে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যখোন আওয়ামী লীগের কর্মীদ্বারা নাজেহাল হচ্ছিলেন সে সময় লন্ডন থেকে আসা বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকন ইউনূসসহ প্রতিনিধি দলকে স্বাগত জানিয়ে স্লোগান দিচ্ছিলেন এবং সোস্যাল মিডিয়ায় সরাসরি তা সম্প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন। এ সমাবেশে নেতৃবৃন্দের মধ্যে আরো ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য আব্দুল লতিফ সম্রাট, গিয়াস আহমেদ, জিল্লুর রহমান জিল্লু এবং চেয়ারপার্সনের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির সদস্য গোলাম ফারুক শাহীন, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক কোষাধ্যক্ষ জসীম ভ’ইয়া, নিউইয়র্ক ষ্টেট বিএনপির সভাপতি অলিউল্লাহ আতিকুর রহমান, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জসিমউদ্দিন, সেক্রেটারি সাইদুর রহমান সাঈদ, সিটি বিএনপির (দক্ষিণ) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সোরহাব হোসেন, সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম, উত্তরের সভাপতি আহব্বাব চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক ফয়েস চৌধুরী, বাফেলো বি এন পির সভাপতি সিরাজ উল্লাহ বাবুল, সহ-সভাপতি সোহেল মতিন, যুক্তরাষ্ট্র যুবদলের সাবেক সভাপতি জাকির এইচ চৌধুরী এবং সেক্রেটারি আবু সাঈদ আহমেদ, নিউইয়র্ক ষ্টেট বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আনিসুর রহমান প্রমুখ।
জেএফকে এয়ারপোর্টে মির্জা ফখরুলসহ প্রতিনিধিদলের গাড়ি ঘেরাও করে আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ । ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।
অপরদিকে আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ সমাবেশে নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন ড. সিদ্দিকুর রহমান, ড. প্রদীপ কর, ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, মহিউদ্দিন দেওয়ান, আবুল হাসিব মামুন, আব্দুল কাদের মিয়া, ইমদাদ চৌধুরী, মমতাজ শাহনাজ, জন শিকদার, সাখাওয়াত বিশ্বাস, দরুদ মিয়া রনেল, জালালউদ্দিন জলিল, জাহাঙ্গির এইচ মিয়া, শফিকুল ইসলাম সেবুল মিয়া প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের দক্ষিণাঞ্চলীয় কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এম ফজলুর রহমানও এসেছেন ফ্লোরিডা থেকে। জেএফকে এয়ারপোর্টের পর বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তারা মুহম্মদ ইউনূসের হোটেলের সামনেও বিক্ষোভ করেছেন অবিলম্বে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবিতে। এ কর্মসূচি চলবে ইউনূস নিউইয়র্ক ত্যাগ না করা পর্যন্ত।
Posted ৯:৫৫ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর