দ্য ভয়েস নিউজ
প্রিন্ট
বুধবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ
বৃটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক।
যুক্তরাজ্যের সংসদ সদস্য টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে ঘোষিত দুই বছরের কারাদন্ডকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও আইনজীবী মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। আইন ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অভযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তথ্য প্রমাণ ছাড়াই কাল্পনিক অভিযোগে পরিচালিত এ বিচারকে তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে অভিহিত করেছেন। এমনকি বৃটিশ লেবার পার্টির পক্ষ থেকেও বাংলাদেশের কথিত আদালতের রায় সম্পর্কে বিস্ময় প্রকাশ করে বলা হয়েছে, যেখানে অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন সুযোগই দেয়া হয়নি, তেমন রায়কে আমরা মেনে নিতে পারিনা।
ঢাকার একটি আদালত অভিযোগ আনে-টিউলিপ সিদ্দিক নাকি তার প্রভাব ব্যবহার করে নিজের নিকট আত্মীয়দের জন্য সরকারি জমি বরাদ্দ করাতে ভূমিকা রেখেছেন। একই মামলায় তার মা শেখ রেহানা সাত বছর, আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী অর্থাৎ তার খালা শেখ হাসিনাকে পাঁচ বছর কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় তিনজনই দেশে ছিলেন না এবং তাদের আইনজীবীদেরও আদালতে হাজির হতে দেওয়া হয়নি।
রায় ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্যাপক কভারেজ দেয়। বিবিসি, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, এএফপি, ডয়চে ভেলে এবং দ্য গার্ডিয়ানসহ বৈশ্বিক গণমাধ্যমগুলো রায়টির প্রেক্ষাপটকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করে।
বিবিসি জানায়, টিউলিপ অভিযোগগুলো দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন এবং অভিযোগের বিবরণও তাকে জানানো হয়নি।
রয়টার্স লিখেছে, টিউলিপ বিচারকে “ত্রুটিপূর্ণ ও হাস্যকর” বলেছেন। যুক্তরাজ্য-বাংলাদেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায় রায় কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানায়, টিউলিপকে ভুলভাবে ‘বাংলাদেশি নাগরিক’ হিসেবে গণ্য করে বিচার চালানো হয়েছে, যা তিনি সরাসরি অস্বীকার করেন।
দ্য গার্ডিয়ান উল্লেখ করে, প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী কথিত ফোনকল বা বার্তার কোনো প্রমাণ আদালতে হাজির করা হয়নি।
আইনজীবী ও বিশিষ্ট নাগরিকদের উদ্বেগ
আইনজীবী পারভেজ হাশেম দি ভয়েসকে বলেছেন, “এ ধরনের রায় ন্যায়বিচারের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটেন থেকে সুপারিশ করে শেখ রেহানার নামে জমি বরাদ্দ দিতে বাংলাদেশ সরকারকে বাধ্য করেছেন-এরকম গল্প হাস্যকর।”
বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
মামলায় অভিযোগ করা হয়, টিউলিপ নাকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফোন ও বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু ফোনকলের কোনো রেকর্ড,বার্তার কোনো কপি, অন্য কোনো লিখিত বা ডিজিটাল প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। এমনকি: আসামিদের অনুপস্থিতিতে বিচার, আইনজীবীদের আদালতে দাঁড়াতে না দেওয়া, এক আইনজীবীকে গৃহবন্দী করে রাখা-এ ধরনের অভিযোগ বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে আরও সংশয় তৈরি করেছে।
টিউলিপ সিদ্দিকের প্রতিক্রিয়া
লন্ডন থেকে টিউলিপ সিদ্দিক বলেন, “এ বিচার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ। আমাকে কোনো নোটিশ পাঠানো হয়নি, কোনো জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।” তিনি জানান যে, তিনি বহু বছর বাংলাদেশে থাকেন না, তিনি কেবল ব্রিটিশ নাগরিক, বাংলাদেশি পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্র তার নেই। যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টি জানায়, “যে প্রক্রিয়ায় রায় দেওয়া হয়েছে, তা ন্যায়বিচারের সর্বনিম্ন মানও পূরণ করেনি।”
রায়ের পর যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজে প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ বলেছেন, “আমি পুরো ব্যাপারটা নিয়ে হতবাক। দেড় বছর ধরে আমার বিরুদ্ধে যেসব বিদ্বেষমূলক অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আমার সঙ্গে একবারও যোগাযোগ করা হয়নি।“আমি দায়িত্বশীল থাকার চেষ্টা করেছি। যুক্তরাজ্যে আইনজীবী নিয়োগ করেছি, যারা বহুবার বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখেছে, কিন্তু কোনো জবাব পাইনি।”
টিউলিপ বলেন, “এরপর আমি বাংলাদেশেই একজন আইনজীবী নিয়োগের চেষ্টা করি। তিনি আদালতে গিয়ে জানতে চেয়েছিলেন কী হচ্ছে। কিন্তু তাকে ভয় দেখানো হয়, হুমকি দেওয়া হয়, আর তিনি মামলা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।”
ঢাকার চতুর্থ বিশেষ জজ আদালতের বিচারক রবিউল আলম ১ ডিসেম্বর সোমবার টিউলিপকে দোষী সাব্যস্ত করে দুই বছরের কারাদন্ড দেন। মামলার অভিযোগ ছিল, ঢাকা শহরে বাড়ি বা ফ্ল্যাট বা আবাসন সুবিধা থাকার পরেও ‘সেই তথ্য গোপন করে আইন ভেঙে দুর্নীতির মাধ্যমে’ শেখ রেহানা পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ নেন। শেখ হাসিনা ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ করে বোনকে প্লট বরাদ্দে ‘সহায়তা’ করেন। ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক তার মা রেহানাকে প্লট পাইয়ে দিতে খালা শেখ হাসিনাকে ‘প্রভাবিত’ করেন। দুদকের করা এই মামলায় টিউলিপের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির প্রতিক্রিয়ায় গত এপ্রিলে তার আইনজীবী অভিযোগ করেন, দুদক ‘প্রামাণিক নথির ভিত্তিতে’ টিউলিপের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানোর কথা বললেও কোনো প্রামাণিক নথি উপস্থাপন করেনি। সোমবার নিজের দুই বছরের কারাদন্ড হওয়ার রায়কে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ‘প্রতিহিংসা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন টিউলিপ সিদ্দিক। তার ভাষায়, পুরো বিচারপ্রক্রিয়াটি ছিল ‘বিশৃঙ্খল, হাস্যকর ও প্রহসনমূলক’।
মামলার বিষয়ে টিউলিপ বলেন, “অভিযোগে বলা হয়েছে, আমি ব্রিটেনে বিরোধী দলের এমপি থাকাকালে আমার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আমার খালাকে রাজি করিয়েছি, যেন তিনি আমার মাকে কোনো এক জায়গায় জমি কিনতে দেন। “আমার খালার বয়স আমার চেয়ে দুই গুণ। তিনি আমার চেয়ে বহু বেশি ক্ষমতাবান এবং আমার জন্মের আগ থেকেই তিনি রাজনীতি করেন। আমি জানতে চাই, আমি যে তাকে প্রভাবিত করেছি, তার কী প্রমাণ আছে? পুরো বিষয়টাই ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টের’ মতো মনে হয়, যা বিশৃঙ্খল, হাস্যকর ও সম্পূর্ণ প্রহসনমূলক।”
বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সম্পর্কও পরীক্ষার মুখে
লন্ডনের কূটনৈতিক মহল ঘটনাটিকে “অস্বাভাবিক ও সংবেদনশীল” বলে উল্লেখ করেছে।
যুক্তরাজ্যের কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই টিউলিপকে বাংলাদেশে পাঠানোর; কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এ রায় মূলত বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফল, এবং ব্রিটিশ সংসদ সদস্যকে নিয়ে এমন বিতর্ক উভয় দেশের সম্পর্ককে চাপে ফেলতে পারে। শেখ হাসিনা পরিবারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক মামলার অংশ?
বিভিন্ন গণমাধ্যম উল্লেখ করেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক মামলা চলছে। টিউলিপ সিদ্দিকের মামলাকেও অনেক বিশ্লেষক একই ধারার রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তু করার প্রচেষ্টা বলে মনে করছেন।
একদল ব্রিটিশ বিশিষ্ট আইনজীবী লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনে চিঠি দিয়ে বলেছেন, “টিউলিপের বিরুদ্ধে আয়োজিত বিচার কৃত্রিম, একপেশে ও অন্যায্য।”
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, অনুপস্থিতিতে দ্রুত বিচার, প্রমাণ সংগ্রহে ত্রুটি, এবং প্রভাবশালী পরিবারকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে লক্ষ্যবস্তু করার প্রবণতা-সব মিলিয়ে দেশের বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে দেওয়া রায় বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক-সব ক্ষেত্রেই নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
একদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তাপ, অন্যদিকে বিশ্বের গণমাধ্যম ও মানবাধিকার মহলের তীক্ষ্ণ নজর-সব মিলিয়ে এই রায় এখন আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত। বাংলাদেশের আদালত ও সরকার ভবিষ্যতে এই ধরনের মামলাকে কীভাবে মোকাবিলা করে সেদিকেই এখন বিশ্বের দৃষ্টি।
ছবির ক্যাপশন-টিউলিপ সিদ্দিক-১
ছবির ক্যাপশন-টিউলিপ সিদ্দিক-২
Posted ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর