বিশেষ সংবাদদাতা
প্রিন্ট
বুধবার, ১১ জুন ২০২৫ সর্বশেষ আপডেট : ১:১৪ অপরাহ্ণ
আইসের গ্রেফতার-অভিযানের প্রতিবাদে সহকর্মীগণকে পাশে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে কংগ্রেসওম্যান গ্রেস মেং। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।
৫ বছর আগে অর্থাৎ ২০২০ সালে মিনেসোটায় জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকান্ডের প্রতিক্রিয়ায় গড়ে উঠা ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের ন্যায় লসএঞ্জেলেসের হোম ডিপোটে আইসের (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) অভিবাসন-গ্রেফতার অভিযানের বিরুদ্ধে লসএঞ্জেলেসে চলমান আন্দোলনের ঢেউ ক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে অভিবাসন-অধ্যুষিত অন্য শহরগুলোতেও। লসএঞ্জেলেস সিটির ডাউন টাউন হিসেবে পরিচিত চায়না টাউন, সিটি হল, পুলিশ সদর দফতর, ফেডারেল ভবন তথা ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টার রয়েছে এমন এলাকায় বুধবার সন্ধ্যা ৮টা থেকে বুধবার ভোর ৬টা পর্যন্ত কার্ফ্যু জারি করা হয়। ৪০০ ন্যাশনাল গার্ড এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর ৭০০ সশস্ত্র সদস্যকে মোতায়েনের পর বিক্ষোভকারিরা মারমুখো হয়ে সোমবার ও মঙ্গলবার বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর এবং লুটতরাজের ঘটনা ঘটেছে। এহেন অরাজক পরিস্থিতি থামিয়ে দিতে লসএঞ্জেলেন সিটি সেয়র ক্যারণ ব্যাস কাফ্যু জারি করেন। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত কার্ফ্যু অব্যাহত থাকবে বলেও সিটি মেয়রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। কাফর্’্যু ভঙ্গ করার জন্যে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ৪৫ জনসহ শনিবার শুরু হওয়া লাগাতার বিক্ষোভ-সমাবেশ থেকে চারশত জনের মত গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে লসএঞ্জেলেস সিটি থেকে।
আইসের গ্রেফতার-অভিযানে সহায়তা দিচ্ছে ন্যাশনাল গার্ড। ছবি-সংগ্রহ।
উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাচনী অঙ্গিকার অনুযায়ী অবৈধভাবে বসবাসরত গুরুতর অপরাধীদের গ্রেফতার ও বহিষ্কারের কথা। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে ভিন্ন ঘটনা। যারা অভিবাসনের আইন লংঘন ব্যতিত আর কোন ধরনের অপরাধেই জড়িত নন-তারাও গ্রেফতার হয়েছেন। এমনকি গ্রীণকার্ডধারীরাও গ্রেফতারের শিকার হয়েছেন। পূর্ব নির্দ্ধারিত তারিখে ইমিগ্রেশন কোর্টে কিংবা ফেডারেল ভবনে হাজিরা দিতে গিয়েও গ্রেফতারের শিকার হয়েছেন অনেকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রেস্টুরেন্টেও হানা দেয়া হচ্ছে। এরফলে সারা আমেরিকায় ফুসে থাকা ক্ষোভের প্রকাশ ঘটতে শুরু করেছে অন্য এলাকাতেও। অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের চলমান অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্যান ফ্রান্সিসকো, শিকাগো, নিউইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া, ডালাস, অস্টিন ও আটলান্টা, ওমাহা, ওয়াশিংটন ডিসি-সহ আরো কয়েকটি শহরে ছড়িয়েছে। সটেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট তার অঙ্গরাজ্যের শহরগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের অবৈধ অভিবাসী দমন অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ায় ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেছেন। উল্লেখ্য, ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমক্র্যাট গভর্ণরের সাথে আলোচনা ছাড়াই ট্রাম্প সেখানকার বিক্ষোভ দমনে দু’দফায় চার হাজার ন্যাশনাল গার্ড নামানোর পর মঙ্গলবার আরো ৭০০ জন মেরিনা-সেনা নামিয়েছেন। আর এখোন পর্যন্ত টেক্সাস হচ্ছে প্রথম স্টেট যেখানকার রিপাবলিকান গভর্ণর বিক্ষোভ দমাতে ন্যাশনাল গার্ড নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। আরো উল্লেখ্য, ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমক্র্যাট গভর্নর গ্যাভিন নিউজম ট্রাম্পের এসব পদক্ষেপে আপত্তি জানিয়ে সেনা মোতায়েনকে অপ্রয়োজনীয়, অবৈধ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্ত ব্য করেছেন। মঙ্গলবার এক ভাষণে তিনি আমেরিকানদের ‘ট্রাম্পের মুখোমুখি দাঁড়ানোর’ আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “এই মুহূর্তে, এই মুহূর্তে, আমাদের সকলকে উঠে দাঁড়াতে হবে এবং সর্বস্তরের ক্ষমতার অপব্যবহারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।” স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৬৫ সালের পর এই প্রথম স্টেট গভর্ণরের অনুরোধ ছাড়াই প্রেসিডেন্ট কর্তৃক ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের নির্দেশ জারি হয়েছে। এভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং নিজেকে কর্তৃত্ববাদি প্রশাসকে পরিণত করেছেন বলে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্ণর ক্ষোভ জানিয়েছেন।
ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের প্রতিবাদে লসএঞ্জেলেসে বিক্ষোভ। ছবি-সংগ্রহ।
এদিকে, ঢালাওভাবে অবৈধ অভিবাসন গ্রেফতারের দৈনিক টার্গেট বাড়িয়ে ৩ হাজার করা হয়েছে বলে শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে সংবাদ আসার পর সর্বত্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এভাবে ট্রাম্প প্রশাসন শান্তিপ্রিয় কম্যুনিটিতে ক্ষোভের আগুণ উষ্কে দিচ্ছেন বলে ডেমক্র্যাটরা অভিযোগ করেছেন। মঙ্গলবার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে কংগ্রেসনাল এশিয়ান প্যাসিফিক আমেরিকান ককাসের (সিএপিএসি) চেয়ার কংগ্রেসওম্যান গ্রেস মেং, কংগ্রেসনাল ব্ল্যাক ককাসের চেয়ার কংগ্রেসওসম্যান ইয়েভেটি ক্লার্ক এবং কংগ্রেসনাল হিসপ্যানিক ককাকের চেয়ার কংগ্রেসম্যান আদ্রিয়ানা ইসপেইলেট এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প প্রশাসনের গৃহিত পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেন।
ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের প্রতিবাদে লসএঞ্জেলেসে বিক্ষোভ। ছবি-সংগ্রহ।
নিউইয়র্ক থেকে নির্বাচিত কংগ্রেসওম্যান গ্রেস মেং বলেছেন, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অভিযানে সারা আমেরিকায় যে ক্ষোভের সঞ্চার ঘটেছে সে ব্যাপারে আমিও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আইসের সশস্ত্র সদস্যরা স্কুলে, কর্মস্থলে এবং বাসা-বাড়িতে হানা দিচ্ছে। কম্যুনিটিতে সন্ত্রস্ত করেছে। পরিবারে ভাঙন ধরাচ্ছে। মা-বাবার কোল থেকে শিশু সন্তানকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এভাবে জননিরাপত্তা সুসংহত করা যায় না। বরঞ্চ অভিবাসী সমাজে ভীতির সঞ্চার ঘটানো হয়েছে। আমরা এমন আচরণকে মেনে নিতে পারি না যা আমেরিকার সামাজিক-পারিবারিক মূল্যবোধের পরিপন্থি। গ্রেস মেং ক্ষুব্ধচিত্তে উল্লেখ করেন, আমেরিকা গড়ে উঠার মূল্যবোধের পরিপন্থি যে কোন পদক্ষেপ রুখে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর। কংগ্রেসওম্যান ইয়েভেটি ক্লার্ক বলেন, লসএঞ্জেলেস সিটিতে বিক্ষোভ দমাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেছেন। এরফলে শান্তি-শৃঙ্খলা পুনরায় প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে আন্দোলন আরো বেগবান হয়েছে। অর্থাৎ চলমান আন্দোলনকে ভয়ংকর রূপদেয়ার পথ সুগম করা হয়েছে।
আইস বিলুপ্তির দাবিতে নিউইয়র্কে মিছিল। ছবি-সংগ্রহ।
কংগ্রেসওম্যান ক্লার্ক উল্লেখ করেছেন, ট্রাম্পের এহেন আচরণ গণতন্ত্রের পরিপন্থি। স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্টের নামান্তর। কংগ্রেসম্যান আদ্রিয়ানো ইসপেইলেট বলেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী হাজিরা দিতে গিয়ে আইস কর্তৃক অভিবাসীরা গ্রেফতার হচ্ছেন আদালত প্রাঙ্গন থেকে। এমন অবস্থাকে মেনে নেয়া যায় না। এভাবে আইনের প্রতি বিতশ্রদ্ধ করা হচ্ছে সহজ-সরল অভিবাসীগণকে। আর এসব কারণেই মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। আইন মানতে চাচ্ছেন না। দেয়ালে পীঠ ঠেকে গেলে যা হবার তাই হচ্ছে লসএঞ্জেলেসে।
লসএঞ্জেলেসে বিক্ষোভ। ছবি-সংগ্রহ।
এদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মঙ্গলবারও বলেছেন যে, জননিরাপত্তার স্বার্থে যেভানে প্রয়োজন সেখানেই ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের নির্দেশ দেয়া হবে। ক্রিমিনালদের কবল থেকে কম্যুনিটিকে সুরক্ষা দেয়াই তার প্রশাসনের মূল লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। অপরদিকে, ট্রাম্পের ন্যাশনাল গার্ড, ইউএস মেরিন মোতায়েনের নির্দেশকে অসাংবিধানিক ঘোষণার দাবিতে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট গভর্ণর গ্যাভিন নিউজম দায়েরকৃত মামলার শুনানী হবার কথা বৃহস্পৃতিবার সানফ্রান্সিসকোর একটি আদালতে।
Posted ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১১ জুন ২০২৫
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর