নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট
রবিবার, ২২ জুন ২০২৫ সর্বশেষ আপডেট : ৯:৫৪ পূর্বাহ্ণ
ফাইল ছবি
ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে ইরানে সামরিক হামলার কঠোর নিন্দা-প্রতিবাদ এবং অমার্জনীয় অপরাধ করা হলো বলে মন্তব্য করেছেন ডেমক্র্যাটিক পাটির কংগ্রেসম্যানরা। তবে ইউএস সিনেটে ডেমক্র্যাট নেতা সিনেটর চাক শ্যুমার কোন মন্তব্য করেননি ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের ব্যাপারে। ২১ জুন এই হামলার পর ওয়াশিংটন ডিসি, নিউইয়র্ক-সহ গুরুত্বপূর্ণ সকল স্থানের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সতর্ক রাখা হয়েছে প্রশাসনকে।
ইরানে চলমান ইসরায়েলি সামরিক হামলার পর এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে উত্তেজনার মধ্যে এই হামলায় যোগ দিল যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে যুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই সংঘাতে জড়াল। ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করা এক বার্তায় ট্রাম্প ‘অসাধারণ মার্কিন যোদ্ধাদের’ অভিনন্দন জানিয়েছেন। লিখেছেন, “সব বিমান নিরাপদে ঘাঁটিতে ফিরে যাচ্ছে।” একইদিন অর্থাৎ শনিবার রাত ১০টায় হোয়াইট হাউজ থেকে জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত এক ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ইরানের নাতাঞ্জ ও ইস্পাহান ও ফোরদো-এই তিনটি মূল পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। ফোরদোর ওপর ছয়টি ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা ফেলা হয়েছে। এছাড়া অন্য দুটি স্থাপনায় ৩০টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে, এরপরও যদি ইরান পারমানবিক শক্তির সক্ষমতা থেকে বিরত না হয় তাহলে আরো কঠিন পরিস্থিতির শিকার হতে হবে।
কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এই সামরিক অভিযান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অভিশংসনের সম্মুখীন করলো বলে মন্তব্য করেছেন নিউইয়র্ক থেকে নির্বাচিত কংগ্রেসওম্যান আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিয়ো-করটেজ। একইভাষায় আরো ক’জন কংগ্রেসম্যান অভিযোগ করেছেন যে, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যেকার যুদ্ধে সরাসরি ইসরায়েলের পক্ষাবলম্বন করে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য এলাকাতেও দীর্ঘ মেয়াদি যুদ্ধে উস্কানী দিলো ট্রাম্প প্রশাসন-যা কারোর জন্যেই মঙ্গলকর হবে না। ইরানের পারমানবিক সক্ষমতা (যদিও ইরান তা সবসময় অস্বীকার করছে এবং বলে আসছে যে, তারা তা করছেন সম্পূর্ণ শান্তির জন্যে) ধ্বংসের জন্যে ইসরায়েলের লাগাতার হামলায় ৪ শতাধিক ইরানি নিহত এবং বেশ কয়েক হাজার আহত হয়েছে। তেহরানের অনেক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। ওকাসিয়ো-করটেজ এক্স-এ প্রদত্ত প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখ করেছেন, কংগ্রেসের অনুমোদন না নিয়ে প্রেসিডেন্টের এই সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান চরমভাবে লংঘন করা হয়েছে। এমন একটি যুদ্ধে তিনি জড়ালেন যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এহেন আচরণ অবশ্যই এবং সুস্পষ্টভাবে প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের ক্ষেত্র তৈরী করেছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমক্র্যাট-কংগ্রেসম্যান রো খান্না নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্তকালে ‘এক্স’-এ উল্লেখ করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘ মেয়াদি যুদ্ধে লিপ্ত করার সামিল এই প্রক্রিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে আনার অভিপ্রায়ে অবিলম্বে আমাদেরকে ওয়াশিংটন ডিসিতে ফিরতে হবে এবং যুদ্ধ থেকে বিরত হবার রেজ্যুলেশন পাশ করতে হবে।
পেনসিলভেনিয়ার ডেমক্র্যাট কংগ্রেসম্যান জন ফিটারম্যান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে লিখেছেন, ইরান হচ্ছে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের হুতা এবং ইরানের পারমানবিক সক্ষমতা থাকা উচিত নয়-তা আমি বরাবরই বলে এসেছি। ইরানে এই সাফল্যজনক অভিযানের জন্যে আমি বিশ্বের সবচেয়ে চৌকষ সামরিক বাহিনীকে অভিবাদন জানাচ্ছি।
মিশিগানের কংগ্রেসওম্যান রাশিদা তাইয়্যেব অবশ্য ক্ষুব্ধচিত্তে বলেছেন যে, এই সামরিক অভিযানের মধ্যদিয়ে প্রেসিডেন্ট সংবিধান পরিপন্থি আচরণ করলেন। ‘এক্স’-এ প্রদত্ত পোস্টে তিনি উল্লেখ করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে মার্কিন বন্ধুদের ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে অনৈক্য জোরদারের পথে হাঁটলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ডেমক্র্যাট নেতা নিউইয়র্কের কংগ্রেসম্যান হেকিম জেফরীজ এক বিবৃতিতে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়ায় যথাযথ পদক্ষেপ ব্যর্থতার পর বিদ্যমান যুদ্ধকে আরো বিস্তৃত করার ঝুঁকি নিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। হেকিম জেফরীজ যুদ্ধে লিপ্ত মার্কিন সৈনিকদের নিরাপত্তার জন্যে পরম করুণাময়ের প্রতি প্রার্থনা জানিয়ে উল্লেখ করেছেন, আমরা তাদেরকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছি। প্রতিনিধি পরিষদে বিরোধী দলীয় এই নেতা আরো বলেছেন, এই যুদ্ধে যে কোন পরিণতির দায় বহন করতে হবে ট্রাম্পকে।
তবে সিনেটে বিরোধী দলীয় নেতা তাৎক্ষণিক কোন মন্তব্য করেননি ট্রাম্পের এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে।
মুসলিম আমেরিকানদের স্বার্থ-অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে কর্মরত ‘কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশন্স’ তথা কেয়ারের পক্ষ থেকে তাক্ষণিক বিবৃতিতে ট্রাম্পের এই সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে।
এদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের প্রধান তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বড় ধরনের আঘাত হানার পর যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ শহর নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটন ডিসির কর্তৃপক্ষ উচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। শনিবার রাতে মার্কিন বাহিনী ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা, ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইস্পাহানে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। ইরানে এ হামলায় অংশ নেয় যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান। ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনায় পাঁচ থেকে ছয়টি বাঙ্কার ব্লাস্টার বোমা আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। আর নাতাঞ্জ ও ইস্পাহান পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে মার্কিন ডুবোজাহাজগুলো থেকে ৩০টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
হামলার পর হোয়াইট হাউজ থেকে জাতির উদ্দেশে দেওয়া সংক্ষিপ্ত ভাষণে ট্রাম্প বলেছেন, মার্কিন বাহিনীর হামলায় ইরানের পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধ করার স্থাপনাগুলো ‘পুরোপুরি বিলুপ্ত’ হয়ে গেছে। এরপর সামাজিক মাধ্যম এক্স এ এক পোস্টে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ (এনওয়াইপিডি) বলে, “ইরানের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। ব্যাপক সতর্কতার অংশ হিসেবে আমরা নিউইয়র্ক শহরজুড়ে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোতে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করছি আর আমাদের ফেডারেল অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করছি। নিউইয়র্ক শহরে যে কোনো সম্ভাব্য প্রভাব-পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখবো আমরা।” এর কিছুক্ষণ পর ওয়াশিংটন ডিসির মেট্রোপলিটন পুলিশ বিভাগ (এমপিডি) সামাজিক মাধ্যমে একই ধরনের একটি বিবৃতিতে বলেছে, “মেট্রোপলিটন পুলিশ বিভাগ ইরানের ঘটনাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। শহরের বাসিন্দাদের, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ায় আসা দর্শনার্থীদের সুরক্ষায় সাহায্য করার জন্য তথ্য ভাগাভাগি করতে ও গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণে আমরা আমাদের স্থানীয়, অঙ্গরাজ্যের ও ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী অংশীদারদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সমন্বয় করছি।”
এমপিডি জানিয়েছে, ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ার প্রতি জানা কোনো হুমকি নেই, তারপরও তারা শহরজুড়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের উপস্থিতি বাড়াবে।
নিউইয়র্কের যেসব এলাকার সঙ্গে ইসরায়েলি সংযোগ আছে সেখানে টহল গাড়ি দিয়ে বিশেষ নজরদারি জোরদার করেছে এনওয়াইপিডি। এর পাশাপাশি শহরে বেশ কয়েকটি শিয়া মসজিদ আছে, আর ইরান শিয়া প্রধান দেশ হওয়ায় যে কোনো সময় যে কোনো কিছু ঘটতে পারে। তাই এসব এলাকার ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে ও টহল জোরদার করা হচ্ছে। তারা অনলাইন চ্যাটগুলোর ওপরও নজর রাখছেন বলে জানিয়েছে এওয়াইপিডি।
Posted ৯:২১ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ২২ জুন ২০২৫
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর