পুলিশ অফিসার দিদারকে ‘মরনোত্তর পদোন্নতি’র অনুরোধ

বন্দুক হামলায় নিহত দিদারের জানাযা বৃহস্পতিবার

বিশেষ সংবাদদাতা   প্রিন্ট
বুধবার, ৩০ জুলাই ২০২৫   সর্বশেষ আপডেট : ১:১৩ অপরাহ্ণ

বন্দুক হামলায় নিহত দিদারের জানাযা বৃহস্পতিবার

বন্দুন হামলায় নিহত (উপরে বাম থেকে) পুলিশ অফিসার দিদারুল ইসলাম, এ্যালেন্ড ইতিয়েনা জুলিয়া হাইম্যান এবং ওয়েসলি লাপাটনার। ছবি-এনওয়াইপিডি।

বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টে বাংলাদেশী আমেরিকান পুলিশ অফিসার দিদারুল ইসলাম-সহ চারজনের বিদেহী আত্মার শান্তি ও মাগফেরাত কামনায় ২৯ জুলাই মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্ক সিটির মিডটাউনে ব্রায়ান পার্কে আন্ত:ধর্মীয় প্রার্থনা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। নিউইয়র্ক স্টেটের গভর্ণর ক্যাথি হোকুল এবং সিটি মেয়র এরিক এডামস-সহ বিভিন্ন ধর্মের দেড় শতাধিক আমেরিকান এতে অংশ নেন। উল্লেখ্য, ২৮ জুলাই সোমবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্ক সিটির ম্যানহাটানে পার্ক এভিনিউস্থ (৫১ এবং ৫২ স্ট্রিটের মধ্যে)একটি ভবনে বন্দুক হামলা চালিয়ে হত্যার অপর ভিকটিমরা হলেন আবাসন ও অর্থনীতি নিয়ে বিশ্বব্যাপী কর্মরত ব্ল্যাকস্টোনের নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়েসলি লিপাটনার, ভবনটির সিকিউরিটি অফিসার এলান্ড ইতিয়েনা এবং অর্থ-সম্পদ নিয়ে গবেষণা ও পরামর্শক সংস্থা রুডিন কোম্পানীর অফিসার জুলিয়া হাইম্যান। এই প্রার্থনা সমাবেশে অশ্রুসিক্ত কন্ঠে মেয়র এডামস বলেন, এমন নিষ্ঠুর আচরণ ঠেকাতে আইনের প্রয়োগ ঘটিয়ে যতটা সম্ভব তার চেয়ে অধিক শক্তিশালী হতে পারে সৃষ্টিকর্তার করুণা প্রার্থনার মাধ্যমে। এজন্যেই এখন সময় হচ্ছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করার। শান্তি-সম্প্রীতির সমাজ গঠনের মধ্যদিয়ে হিংসা-বিদ্বেষের পরিসমাপ্তি ঘটানোর পথ সুগম হবে। শোকার্ত মানুষের স্বতস্ফুর্ত এই প্রার্থনা সমাবেশে আনা হয় নিহত চারজনের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের জন্যে ৮টি ফুলের ডালা।

এদিকে, ২৯ জুলাই অপরাহ্নে হাসপাতালের মর্গ থেকে দিদারুল ইসলাম দিদারের মরদেহ ব্রঙ্কসে পার্কচেস্টার মসজিদে আনা হলে শোকার্ত প্রবাসীসহ স্বজনের আহাজারিতে গোটা পরিবেশ ভারি হয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, ব্রঙ্কসেই ক্রয়কৃত একটি বাড়িতে মা-বাবা-স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাস করতেন মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা সদরের সন্তান দিদারুল ইসলাম। কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে গৃহত্যাগের ২৪ ঘন্টা পর স্বজনেরা পেল তার লাশবাহী কফিন। স্থানীয় সময় ৩১ জুলাই বৃহস্প্রতিবার বেলা দেড়টায় ব্রঙ্কসে পার্কচেস্টার জামে মসজিদে দিদারের জানাযা নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। পরিবারের পক্ষে জালালাবাদ এসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা জানাযায় অংশগ্রহণের জন্যে সকলের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। বাংলাদেশী আমেরিকান পুলিশ এসোসিয়েমন-বাপার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, জানাযার পর তার লাশ দাফন করা হবে নিউজার্সির টটোয়া সিটিতে অবস্থিত ‘লোরেল গ্রোভ সিমেটারি’তে । এর আগে শেষবারের মত সকলে তার কফিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের সুযোগ পাবেন জানাযার প্রাক্কালে।

নিউইয়র্ক সিটির ব্রায়ান্ট পার্কে অনুষ্ঠিত প্রার্থনা সমাবেশ। ছবি-সংগ্রহ।

এদিকে, দিদারের পেশার প্রতি নিষ্ঠা, বিরুত্বপূর্ণ ও সাহসি ভ’মিকার জন্যে তার লাশ দাফনের আগেই ডিটেকটিভ হিসেবে পদোন্নতি প্রদানের জন্যে সিটি মেয়র এবং পুলিশ কমিশনারের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন ডেমক্র্যাটিক পার্টির ডিস্টিক্ট লিডার অ্যাট লার্জ এবং ইমিগ্রেশনের খ্যাতনামা আইনজীবী এটর্নী মঈন চৌধুরী। মরনোত্তর পদোন্নতির এমন ঘটনা এর আগে অনেকের ক্ষেত্রেই ঘটেছে।

এদিকে দিদারুল ইসলাম দিদারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ এবং শোক-সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন সিনেটর চাক শ্যুমার। ২৯ জুলাই ইউএস সিনেট ফ্লোরে দাঁড়িয়ে বিরোধী দলীয় নেতা নিউইয়র্কের সিনেটর চাক শ্যুমার( ডেমক্র্যাট) বলেন, ম্যানহাটানে খুবই হৃদয়-বিদারক বন্দুক সহিংসতায় নিহত বাংলাদেশী আমেরিকান পুলিশ অফিসার দিদারুল ইসলামসহ বহুজাতিক দুটি সংস্থার আরো ৩ জনের আত্মার শান্তি কামনা করছি। এহেন কান্ড-জ্ঞানহীন আচরণ বন্ধে আমাদের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। আজ আমি এখানে উপস্থিত হয়েছি ডেমক্র্যাটিক পার্টির নেতা হিসেবে নয়, এমনকি জ্যেষ্ঠতম সিনেটর হিসেবেও নয়, শুধুমাত্র নিউইয়র্কের একজন নাগরিক হিসেবে, ব্রুকলীনে জন্মগ্রহণকারি একজন মানুষ হিসেবে, যিনি অকুস্থল পার্ক এভিনিউ দিয়ে বহুবার পরিভ্রমণ করেছি। প্রবীন এই রাজনীতিক চাক শ্যুমার অশ্রুসিক্তকন্ঠে বলেন, মিডটাউন ম্যানহাটানে আমার অফিস থেকে মাত্র চার ব্লক দূরের ঐ ভবনে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় চারজন নীরিহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়া হয়েছে। ঐ ভবনে কোন এক গ্রীষ্মের ছুটিতে আমি একটি ল’ ফার্মে কিছুদিন কাজও করেছি। চাক শ্যুমার বলেন, ভিকটিমদের একজন হলেন পুলিশ অফিসার দিদারুল ইসলাম। ছিলেন একজন আদর্শ স্বামী, দু’ পুত্র সন্তানের জনক, তৃতীয় সন্তানও ভ’মিষ্ট হবার পথে। নিউইয়র্কের শ্রেষ্ঠতম অধিবাসীগণের একজন ছিলেন দিদার, বাংলাদেশী আমেরিকানদের অহংকারের প্রতিক ছিলেন, ৪৭ পুলিশ স্টেশনের নিষ্ঠাবান অফিসারদের একজন ছিলেন। সামগ্রিক অর্থে নিউইয়র্কের সকল মানুষের নিরাপত্তা প্রদানে অতন্দ্র প্রহরির ন্যায় ছিলেন দিদার। নিজের জীবন বিপন্ন জেনেও দায়িত্বে পিছপা হননি মুহূর্তের জন্যে। আমি তাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।

বিবৃতি দিয়েছেন কংগ্রেসনাল বাংলাদেশ ককাসের অন্যতম সদস্য নিউইয়র্কের কংগ্রেসওম্যান গ্রেস মেং। এহেন নিষ্ঠুর ও নৃশংসতম আচরণ থেকে অসহায় মানুষদের রক্ষায় বন্দুক নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে মেং বলেছেন, একজন বীর মানুষ হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছেন দিদার। তাঁকে কখনো ভুলতে পারবো না। আমি পরমকরুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করছি যেন এই কঠিন শোক সইতে পারেন বাংলাদেশী আমেরিকানরা।

দিদারুল ইসলামের জানাযা সম্পর্কিত প্রচারণা। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।

এদিকে, ঘাতক শেন তামুরা তার এই আত্মঘাতি হামলার ব্যাপারে একটি চিরকুটে লিখেছেন যে, ফুটবল খেলার সময় মাথায় বারবার যে আঘাত লাগে, তার যন্ত্রনা সইতে পারছি না। আমার মাথার মগজসহ পুরো মাথা নিয়ে যেন গবেষণা করা হয় ফুটবল প্লেয়ারদের এমন কষ্ট আর যন্ত্রনার লাঘবে স্থায়ী একটি প্রক্রিয়া অবলম্বনের জন্যে। উল্লেখ্য, হাই স্কুলের ছাত্র হিসেবে তামুরা ফুটবল খেলোয়ার ছিলেন। চাকরিতে প্রবেশের পর মাথার যন্ত্রনা তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। মানসিক স্থিতি পাচ্ছিলেন না। এমনি কষ্ট সইতে না পেরে এর আগে আরো বেশ কয়েকজন ফুটবল খেলোয়ার প্রিয় পরিচিত অথবা সামনে যাকে পেয়েছেন তাকেই গুলি করে হত্যার পর আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। তামুরাও তার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করেননি। বুকে গুলি করেছেন, যাতে তার অক্ষত মাথা নিয়ে স্বাচ্ছন্দে গবেষণা করা যায়। ‘স্টাডি মাই ব্রেন প্লিজ’ লিখেছেন চিরকুটে। ‘সিটিই’ তথা ক্রনিক ট্রমাটিক এন্সফেলোপ্যাথি রোগের বিস্তার ঘটে মাথায় বারবার আঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে। এদিকে, বস্টন ইউনিভার্সিটির সিটিই সেন্টারের পরিচালক ড. অ্যান ম্যাককী তার দীর্ঘ গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, অনেক ফুটবল খেলোয়ার এবং অন্য খেলায় অংশগ্রহণকারিগণের ব্রেন নিয়ে গবেষণায় আমি নিশ্চিত হয়েছি যে এহেন নিষ্ঠুর আচরণের জন্যে সিটিই একমাত্র দায়ী নয়। তবে এজন্যে আরো বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন ড. অ্যান। অপরদিকে, সুধীজনের প্রশ্ন-আড়াই হাজার মাইলের অধিক পথ গাড়ি চালিয়ে লাসভেগাস থেকে নিউইয়র্কে ঐ ভবনের সামনে গাড়ি পার্ক করিয়ে তামুরা সোজা ভবনে ঢুকেছেন এবং নীরিহ মানুষকে হত্যা করেছেন। এক্ষেত্রে কোন বিভ্রান্তি ঘটেনি। তাহলে মানসিক অস্থিরতায় আক্রান্ত হলে পথিমধ্যে অনেক ভুল-ভ্রান্তি হতে পারতো, অন্য কোন স্থানেও বন্দুক হামলা চালানো হতো। সিটিই-কে দায়ী করে পৈশাচিক আচরণকে ধামাচাপা দেয়ার অপচেষ্টা কিনা তা খতিয়ে দেখার অনুরোধও উচ্চারিত হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে।

Facebook Comments Box

Posted ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ৩০ জুলাই ২০২৫

nyvoice24 |

Address
New York
Phone: 929-799-2884
Email: nyvoice24@gmail.com
Follow Us