নিউইয়র্কে ঐক্য পরিষদের সেমিনার ‘ইয়াহিয়া থেকে ইউনূস’

বাংলাদেশের ভয়ংকর পরিস্থিতির অবসানে আন্তর্জাতিক দেন-দরবারের গুরুত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক   প্রিন্ট
মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই ২০২৫   সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের ভয়ংকর পরিস্থিতির অবসানে আন্তর্জাতিক দেন-দরবারের গুরুত্ব

‘ইয়াহিয়া থেকে ইউনূস’ শীর্ষক সেমিনারে কথা বলছেন তসলিমা নাসরিন। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।

যুক্তরাষ্ট্রস্থ ‘হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন’র সহযোগিতায় বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’র উদ্যোগে ২৬ জুলাই সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে ‘ইয়াহিয়া টু ইউনূস-অ্যা সোকল্ড জুলাই এন্টি-ডিসক্রিমিনেশন মুভমেন্ট অ্যান্ড দ্য রিয়েলিটি’ শীর্ষক সেমিনারে লেখক-কলামিস্ট তসলিমা নাসরিন বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধন জাগ্রত রাখা প্রতিটি সমাজের জন্যেই খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের অসাম্প্রদায়িক চেতনার পক্ষে আওয়াজ উঠাতে দেখছি না। রহস্যজনক নিরবতায় নিপতিত। তারা (ভারতীয়রা মনে করছেন যে, সেক্যুলারিজমের অর্থ হচ্ছে ইসলামের পক্ষে থাকা। তারা (ভারতীয়রা) ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে, জিহাদি সহিংসতার সমালোচনাতেও কথা বলতে নারাজ। মুসলমান নারীদের অবদমিত করার যে আইন রয়েছে তার সমালোচনাতেও আগ্রহী নন। এমনকি, সকলের জন্যে সমঅধিকার সমুন্নত রাখবে-এমন একটি আদালতের পক্ষে থাকতেও অনীহা প্রকাশ করছেন। তাই, বাংলাদেশে যখোন হিন্দুরা নির্যাতিত-নিগৃহিত হয় তখনো তারা কিছুই বলেন না। হিন্দু জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসীগণের এহেন নিরবতা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতনে আস্কারা দিচ্ছে।

তসলিমা উল্লেখ করেন, একইধরনের ধর্মীয় বিদ্বেষের বর্বরতা গাজায় ঘটছে এবং সকলেই সোচ্চার হলেও প্রতিবেশী হিন্দুরা যখোন (বাংলাদেশে) অকর্থ বর্বরতার ভিকটিম হচ্ছে তখোন কেউই কথা বলছেন না। এ ধরনের হিপক্র্যাসি আমাকে নিদারুনভাবে হতাশ করছে। তসলিমা বলেন, বাংলাদেশে এবং বাইরে আমরা যারা সেক্যুলার ফ্রি-থিঙ্কার আছি, আমাদের সোচ্চার হওয়া উচিত, আরো জোরালোভাবে আমরা দাবি জানাতে পারি রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করার জন্যে। আমরা জানাতে পারি একটি পূর্ণাঙ্গ সিভিল কোর্ট প্রতিষ্ঠার জন্যে যেখানে ধর্ম ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলের অধিকার নিশ্চিত হবে।

তসলিমা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, আমি একটি স্বপ্ন দেখি এমন বাংলাদেশের যেখানে হিন্দু, অমুসলিম, মুক্তচিন্তার মানুষেরা এবং ধর্মে বিশ্বাসী নন এমন সকলের নিরাপদ নিশ্চিত হয়। ভয়হীন চিত্তে বসবাসের পরিবেশ বিরাজ করে। যখোন গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়ে, যখোন সিক্যুলারিজম, মানবাধিকার এবং মুক্তচিন্তা অর্থহীন হয়ে পড়ে-এটাই বাস্তবতা। আমি স্বপ্ন দেখি দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া প্রতিটি হিন্দু স্বাচ্ছন্দে নিজ মাতৃভ’মি বাংলাদেশে ফিরুক, কিন্তু সে ধরনের কোন আইনের অস্তিত্ব দেখছি না। আমি আরো স্বপ্ন দেখি মুক্তচিন্তার মানুষেরা নির্ভয়ে তার জন্মভ’মিতে ফিরছে, আমি নিজেও নিজ বাসভ’মিতে ফিরতে পারবো। হয়তো তেমন দিন আসবে, তবে এখনো তার কোন আলামত দেখছি না, যদিও আমার স্বপ্নকে আমি লালন করেই যাবো।

হোস্ট সংগঠনের জেনারেল সেক্রেটারি স্বপন দাস বলেছেন যে, একাত্তরে ইয়াহিয়া খান থেকে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বাধীন সরকার, পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল এইচ এম এরশাদ, বেগম খালেদা জিয়ান এবং সর্বশেষ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন কোন সরকারই ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোন বিচার হয়নি। বর্তমানে ইউনূসের আমলে বৈষম্য মুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গিকার করা হলেও বাস্তবে হিন্দুসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের মাত্রা চরমে উঠেছে।

স্বপন দাসের সমন্বয়ে ড. প্রিয়াঙ্কা পালের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্যে সেমিনারের প্রেক্ষাপট উপস্থাপনকালে ঐক্য পরিষদ যুক্তরাষ্ট্র শাখার চেয়ারম্যান এটর্নী অশোক কর্মকার বলেন, গত বছর ৫ অগাস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর শান্তিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত মুহম্মদ ইউনূস কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পর আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম যে, বাংলাদেশ সঠিক ট্র্যাকে ফিরবে। ক্রিয়াশীল গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত হবে। কিন্তু আমাদের সে প্রত্যাশা তছনছ হয়ে গেছে। এবং সবকিছু দু:স্বপ্নে নিপতিত হয়েছে। এমনকি কথিত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রত্যাশাও হতাশায় নিপতিত হয়েছে। বৈষম্য কয়েকগুণ বেড়েছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে। এটর্নী অশোক বলেন, মানবাধিকার কর্মী, সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কর্মরত সংগঠক, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা নিগৃহিত হচ্ছেন কথিত মবজাস্টিসের আড়ালে। এটা হচ্ছে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশে লিগ্যাল সিস্টেমে হরিবল অবস্থার নামান্তর। ‘স্বৈরাচারের দোসর’ ট্যাগ লাগিয়ে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা অথবা গুরুতরভাবে জখম করার পর পুলিশে সোপর্দ করা হচ্ছে। অথচ যারা এহেন অপকর্মের জন্যে দায়ী তাদেরকে ধরা দূরের কথা, সতর্ক করাও হচ্ছে না। উল্টো ভিকটিমকে জেলে নেয়া হচ্ছে।

ইউনূসের ১১ মাসে বাংলাদেশে মানবাধিকার ভুলুন্ঠিত, ধর্মীয় অধিকার হরনসহ হত্যা-নির্যাতনের তথ্য উল্লেখ করে এটর্নী অশোক আরো বলেন, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট রানা দাসগুপ্ত, ঐক্য পরিষদের প্রেসিডিয়াম মেম্বার কাজল দেবনাথ, লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, শ্যামল দত্তের মত প্রথিতযশা সাংবাদিক-সহ অসংখ্য মানবাধিকার সংগঠকের বিরুদ্ধে মিথ্যা হত্যা মামলা দায়েরের পর গ্রেফতার-নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। তারা আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যূনতম সুযোগ পাচ্ছেন না। বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে গ্রেফতার করা হয়েছে মিথ্যা মামলায়। যারাই ইউনূসের অপশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলছেন বা এহেন কর্মকান্ডের সাথে ভিন্নমত পোষণ করছেন তারাই মামলা-হামলার শিকার হচ্ছেন অথবা প্রকাশ্যে হত্যা করা হচ্ছে। গুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এটর্নী কর্মকার অভিযোগ করেন, আইনী ব্যবস্থাকে গুড়িয়ে ফেলেছে ইউনূসের সরকার। তিনি বলেন, একাত্তরে পাক হায়েনাদের মতই বর্বরতা চালানো হচ্ছে কথিত ইন্টারিম সরকারের ছত্রছায়ায়। পাকিস্তানী জান্তা ইয়াহিয়া খানের সাথে ইউনূসের আচরণে কোনই ভিন্নতা নেই। একইঅবস্থায় বাংলাদেশকে নিপতিত করা হয়েছে। তাই এখোন সময় এসেছে প্রতিটি দেশপ্রেমিক প্রবাসীকে সোচ্চার হবার। আন্তর্জাতিক মিত্রদের সামগ্রিক পরিস্থিতি অবহিত করার।

সেমিনারের বিষয়ের আলোকে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়-যা উপস্থিত সকলকে বাংলাদেশের ভয়ংকর পরিস্থিতি অবহিত করতে সক্ষম হয়েছে।

‘ইয়াহিয়া থেকে ইউনূস’ শীর্ষক সেমিনারে কথা বলছেন এটর্নী অশোক কর্মকার। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।

সেমিনারের মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন বস্টনে কর্মরত সোস্যাল সায়েন্স অ্যান্ড পাবলিক হেল্্থ সম্পর্কিত গবেষক মৃন্ময় সমাদ্দার। প্যানেলিস্ট ছিলেন সাবেক মিশিগান স্টেট রিপ্রেজেনটেটিভ এবং হিন্দু আমেরিকা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী সদস্য পদ্মা কুপা, অসাম এবং মেঘালয় রাজ্যের সাবেক গভর্ণর ও লেখক তথাগত রয়, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর হয়ে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শনকারি ব্রিগেডিয়ার অমরনাথ চকের কন্যা বন্দনা চাক, মানবাধিকার কর্মী রিচা গৌতম। ভিকটিম হিসেবে বাংলাদেশে বিরাজিত ভয়ংকর পরিস্থিতি উপস্থাপন করেন নরওয়ে থেকে ভিকারুন্নেসানুন স্কুল এবং কলেজের শিক্ষক অধ্যাপক রুমা রয়, টিএন্ডটি মহিলা কলেজের শিক্ষক কার্তিক চন্দ্র, বাংলাদেশ আইন ও শালিসকেন্দ্রের কর্মকর্তা ও ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি গীতা চক্রবর্তী প্রমুখ। উপস্থিত সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন ঐক্য পরিষদের সভাপতি নয়ন বড়ুয়া।

সময়ের প্রয়োজনে এবং বাস্তবতার আলোকে অনুসন্ধানী-গবেষণামূলক তথ্য-চিত্রটির তৈরী হয়েছে এটর্নী অশোক কর্মকারের নির্দেশনায়-যা সকলের প্রশংসা পেয়েছে এবং সারা আমেরিকা, কানাডা, বৃটেনসহ সর্বত্র এটি প্রদর্শনের আকুতি পরিলক্ষিত হয়। এই সেমিনারের অধিকাংশ বক্তাই মার্কিন প্রশাসনের সাথে বাংলাদেশের অপশাসন অবসানে জোরালো দেন-দরবারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। মানবাধিকার নিয়ে কর্মরত সকল আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথেও বৈঠকের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়।

Facebook Comments Box

Posted ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই ২০২৫

nyvoice24 |

Address
New York
Phone: 929-799-2884
Email: nyvoice24@gmail.com
Follow Us