সিপিজের উদ্বেগ

সংস্কারের অঙ্গীকারের এক বছর পরেও কারাগারে সাংবাদিকেরা

নিজস্ব প্রতিবেদক   প্রিন্ট
রবিবার, ০৩ আগস্ট ২০২৫   সর্বশেষ আপডেট : ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ

সংস্কারের অঙ্গীকারের এক বছর পরেও কারাগারে সাংবাদিকেরা

হ্যান্ডকাফ পরিয়ে মায়ের জানাযায় নেয়া হচ্ছে ফারজানা রুপাকে গত ১১জুন।

বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ (সিপিজে) ১ আগস্ট তার ওয়েবসাইটে ‘বাংলাদেশের নতুন নেতার সংস্কারের অঙ্গিকারের এক বছর পরও সাংবাদিরো কারাগারে’ (A year after new Bangladesh leader vows reform, journalists still behind bars ) শীর্ষক এক নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহকালে সারা বাংলাদেশেই সাংবাদিকেরা সহিংসতা এবং হয়রানির ভিকটিম হয়েছেন। এ ধরনের অন্তত: ১০টি ঘটনা সিপিজে জেনেছে। এসব হামলা, হয়রানির অধিকাংশই সংঘটিত হয় বিএনপির নেতা-কর্মী অথবা ছাত্রদলের নেতা-কর্মী-সমর্থক দ্বারা। কয়েকটি ঘটনায় সাংবাদিকেরা গুরুতরভাবে আহত অথবা ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে ফুটেজ মুছে ফেলার পর সংবাদ প্রকাশ/প্রচারে প্রবিন্ধকতা তৈরী করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতির কিার সাংবাদিকের অন্যতম হচ্ছেন বাহার রায়হান, আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ এবং রকি হোসেন।

এই নিবন্ধে বলা হয়েছে : সাংবাদিক ফারজানা রুপা চলতি বছরের ৫ মার্চ ঢাকার একটি জনাকীর্ণ আদালতে আইনজীবী ছাড়াই দাঁড়িয়েছিলেন। বিচারক তাঁর বিরুদ্ধে আরেকটি হত্যা মামলা নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করছিলেন। ইতিমধ্যে অন্য মামলায় কারাগারে থাকা এই সাংবাদিক শান্তভাবে জামিনের আবেদন জানান। ফারজানা বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমার বিরুদ্ধে এক ডজন মামলা দেওয়া হয়েছে। আমি একজন সাংবাদিক। আমাকে ফাঁসানোর জন্য একটি মামলাই যথেষ্ট।’

এতে বলা হয়, বেসরকারি একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপার বিরুদ্ধে ৯টি হত্যা মামলা রয়েছে। আর তাঁর স্বামী চ্যানেলটির সাবেক বার্তাপ্রধান শাকিল আহমেদের নামে রয়েছে আটটি হত্যা মামলা। এক বছর আগে ছাত্রদের নেতৃত্বে কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভের পর পদত্যাগ করে দেশ থেকে পালিয়ে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই বিক্ষোভ চলাকালে দুজন সাংবাদিক নিহত হন। শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশ ছাড়ার পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
অধ্যাপক ইউনূস গণমাধ্যম সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা সরকারের অধীন সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করতে ব্যবহৃত সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের নভেম্বরে ডেইলি স্টার পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ইউনূস বলেছিলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তাড়াহুড়ো করে হত্যার অভিযোগ আনা হচ্ছে। তিনি আরও বলেছিলেন, সরকার তখন থেকে এ ধরনের পদক্ষেপ বন্ধ করে দিয়েছে। মামলাগুলো পর্যালোচনা করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রায় এক বছর পর এখনো সাংবাদিক ফারজানা রুপা, শাকিল আহমেদ, শ্যামল দত্ত ও মোজাম্মেল হক বাবু কারাগারে আছেন। হত্যায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে পৃথক মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিগত সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগের বারবার ব্যবহারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সেন্সরশিপ বলেই মনে হচ্ছে।

এ ধরনের আইনি অভিযোগ ছাড়াও সিপিজে সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক হামলা, রাজনৈতিক কর্মীদের কাছ থেকে হুমকি এবং নির্বাসনের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কমপক্ষে ২৫ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে তদন্ত করছে। এই অভিযোগ সাবেক শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে ঐ নিবন্ধে।

সিপিজের আঞ্চলিক পরিচালক বেহ লিহ ই বলেন, ‘চারজন সাংবাদিককে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই এক বছর ধরে কারাগারে আটকে রাখা অন্তর্বর্তী সরকারের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার ঘোষিত প্রতিশ্রুতিকে দুর্বল করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রকৃত সংস্কার মানে অতীত থেকে বেরিয়ে আসা, এর অপব্যবহারের পুনরাবৃত্তি নয়। যেহেতু আগামী মাসগুলোতে দেশে নির্বাচন হতে চলেছে, তাই সব রাজনৈতিক দলকে সাংবাদিকদের খবর প্রকাশের অধিকারকে অবশ্যই সম্মান জানাতে হবে।’

আইনি নথি ও প্রতিবেদন নিয়ে সিপিজের এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এফআইআর নথিভুক্ত হওয়ার অনেক পর সাংবাদিকদের নাম প্রায়ই এতে যুক্ত করা হয়। মে মাসে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, গত বছরের বিক্ষোভের পর ১৪০ জনের বেশি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

শ্যামল দত্তের মেয়ে শশী সিপিজেকে বলেন, তাঁর বাবার বিরুদ্ধে এখন কতগুলো মামলা চলছে, পরিবার তার হিসাব রাখতে পারেনি। তাঁরা অন্তত ছয়টি হত্যা মামলার কথা জানেন, যেখানে শ্যামল দত্তের নাম আছে। মোজাম্মেল বাবুর পরিবার ১০টি মামলার কথা জানে। ফারজানা রুপা ও শাকিল আহমেদের পরিবার সিপিজেকে জানিয়েছে, তারা পাঁচটি মামলার এফআইআর পাননি, যেখানে একজন বা অন্য সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর মানে হলো তাঁদের কেউই জামিনের আবেদন করতে পারছেন না।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম ও পুলিশের মুখপাত্র এনামুল হক সাগরকে ই-মেইল করে সিপিজে। তবে তাঁরা সাড়া দেননি বলে সিপিজের নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

সহিংসতা এবং হুমকি সম্পর্কিত পরিস্থিতি উপস্থাপনকালে সিপিজে বলেছে যে, বিএনপি এবং ছাত্রদলের পাশাপাশি জামাতে ইসলামের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরও পেশাগত দায়িত্ব পালনে সাংবাদিকদের বাধা দিচ্ছে অথবা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদি আলম এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে সিপিজে-কে বলেছেন যে কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্ন কিছু দুর্ব্যবহারের কথা শোনা গেলেও এহেন অপকর্মকে বিএনপি কখনোই প্রশ্রয় দেয় না। জামাত-ই ইসলামির মুখপাত্র আব্দুস সাত্তার সুমনের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও পায়নি সিপিজে।

Facebook Comments Box

Posted ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ০৩ আগস্ট ২০২৫

nyvoice24 |

Address
New York
Phone: 929-799-2884
Email: nyvoice24@gmail.com
Follow Us