ড. আশরাফ আহমেদ
প্রিন্ট
বুধবার, ২৭ আগস্ট ২০২৫ সর্বশেষ আপডেট : ৯:৪৯ পূর্বাহ্ণ
প্রয়াত ওয়াহেদ হোসেনির সাথে বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. সুলতান আহমাদ ও কাফি খান। ছবি-সংগ্রহ।
গতরাতে (২৫ অগাস্ট) হোসেনি ভাই চলে গেলেন। ডিসি এলাকায় মুরুব্বিদের যেন মৃত্যুর মিছিল চলছে। প্রথমে গেলেন ভয়েস অব আমেরিকার অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিক সৈয়দ জিয়াউর রহমান। এরপর একে একে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম দিককার চিত্রনায়ক ও ভয়েস অব আমেরিকার অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিক কাফি খান, লেখক ও বিশ্বব্যাংক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজিজুল জলিল, বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, এবং মাত্র দশদিন আগে মুক্তিযোদ্ধা ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ড. সুলতান আহমাদ। তাঁদের সাথে যোগ হলেন ওয়াহেদ হোসেনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। অনেকের মতো আমি ও আমার স্ত্রী এঁদের সবারই স্নেহাসিক্ত ছিলাম বলে এই মৃত্যুগুলো শেলের মতো হৃদয়ে বাধে।
বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি বাংলা কবিতার মতো করে কোরানের তর্জমা লিখছিলেন যা গত বছর বই হিসাবে প্রকাশও করেছেন। প্রায় দুই দশক থেকে ডিসি এলাকার বাঙালি কারো মৃত্যু হলে মৃতের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি সহ তা হোসেনি ভাইয়ের ই-মেইলেই আমরা জানতে পারতাম। তেমন একটি চিঠির ইউলোজি (ঊটখঙএণ) মুসাবিদা করার সময় ঠাট্টা করে তাঁকে বলেছিলাম, আপনাকে যদি কেউ জিবরাইলের বন্ধু না বলে আজরাইলের বন্ধু বলে সম্বোধন করে তাতে কি আপনি অসন্তুষ্ট হবেন? কারন দুজনই তো আল্লাহর প্রিয় ফেরেশতা? মাথাটি নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেছিলেন, নাহ, এতে অসন্তুষ্ট হওয়ারতো কিছু নেই!
আজ ওয়াশিংটন ডিসি এলাকার বাঙালি সমাজের সবাই তাঁর মৃত্যুতে অসন্তুষ্ট, দুঃখ ভারাক্রান্ত, ও সবাই আজরাইলের বন্ধুর মতো তাঁর মৃত্যু সংবাদ সবাইকে জানাচ্ছেন! আমার বদস্বভাবজাত সেই প্রশ্ন করার সময়ই হোসেনি ভাই জানিয়েছিলেন, নিজের ইউলোজিটিও তিনি নিজেই লিখে রেখেছেন।
কয়েক সপ্তাহ আগে ফোন করে তাঁকে দেখতে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করতে বলেছিলেন, আজ নয় আরেকদিন এসো কারণ এক্ষণে আমি হাসপাতালে আছি। মাত্র দুদিন আগে তাঁকে তাঁর বাসায় দেখতে যাবার সময় ভেবেছিলাম সেই ইউলজিটি তাঁর কাছ থেকে চেয়ে নেবো। কিন্তু সে সুযোগ আর হয়নি। তাঁর বাকরোধ হয়ে গিয়েছিল, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সামনে বসে তাঁর একটি শীর্ণ হাত আমার হাতে নিয়ে বলেছিলাম, হোসেনি ভাই আমি আশরাফ এসেছি আপনাকে দেখতে। পাশে বসা আযরিনা হোসেনি ভাবিও তাঁকে বললেন-শুনছো, আশরাফ এসেছে। একটি গড়গড় আওয়াজ ছাড়া তাঁর গলা থেকে আর কিছু বেরোলো না। গত দুদিন থেকে নবতিপর আবু সোলায়মান ভাই ও তাঁর স্ত্রী, ইকবাল বাহার চৌধুরি ভাই, এবং গতরাত প্রায় সাড়ে দশটায় আমার স্ত্রীর কাছে নিনা ফখরুদ্দিন ভাবির (সাবেক কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড ফখরুদ্দিনের স্ত্রী) ফোনে হোসেনি ভাইয়ের ক্রমশ নিস্তেজ হড়ে পড়ার অনেকটা ধারাবাহিক খবর পাচ্ছিলাম। এর প্রায় এক ঘণ্টা পরই তিনি পরপারে যাত্রা করেন। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন।
কয়েকমাস আগে আচমকাই ধরা পড়া ক্যান্সার শরীরে ছড়িয়ে গেলে তা নিরাময় সম্ভব না বলে তিনি চিকিৎসা নিতে অস্বীকার করেন ও মৃত্যুকে দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করতে প্রস্তুত হন। শুধু তাই নয়, তাঁর মৃত্যুকে যেন অহেতুক প্রলম্বিত করা না হ তেমন নির্দেশনা সহ দৃশ্যমান কওে ( উঘজ – উড় ঘড়ঃ জবংঁংপরধঃব) লেখাটি টাঙিয়ে রেখেছিলেন। প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন ’আশি বছরের এক যুবক’ -দশ বছর আগে নিজ সম্পর্কে তিনি তেমনই লিখেছিলেন। জীবনের শেষ কয়েকটি বছর কানে কিছুটা কম শুনতেন। কিন্তু তখনও কুশল জিজ্ঞেস করলে উৎফুল্ল চেহারায় তাঁর চিরপরিচিত ও প্রত্যপূর্ণ উত্তর ছিল ‘ফার্স্ট ক্লাশ’। বিদ্রোহী কবি নজরুলের মতোই যেন বলছেন আমি ‘ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা’!
লেখকের একটি বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে কথা বলেন ওয়াহেদ হোসেনি। ছবি-সংগ্রহ।
হোসেনি ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয় ১৯৮৫ সালে। তখন থেকেই তিনি স্থানীয় বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব আমেরিকা’র (বর্তমানে বাই নামে পরিচিত) সাথে জড়িত ছিলেন এবং পরবর্তীতে এটির সভাপতিও মনোনীত বা নির্বাচিত হয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় এমএ করলেও যুক্তরাষ্ট্রে তিনি ফ্যানি-মে নামক আধা সরকারি গৃহঋণ সংস্থায় কাজ করতেন। আশি ও নব্বই দশকে তাঁর সম্পাদিত এসোসিয়েশনের নিউজলেটার এই এলাকার বাংলাদেশি সুধীজনের একমাত্র লিখিত সাংস্কৃতিক বাহন ছিল। কয়েক বছর উত্তর আমেরিকাভিত্তিক ফোবানা’র (ঋবফবৎধঃরড়হ ড়ভ ইধহমষধফবংযর অংংড়পরধঃরড়হং রহ ঘড়ৎঃয অসবৎরপধ) নেতৃস্থানীয় ভূমিকাও পালন করেন। অবসরে যাবার পর তিনি আমেরিকার মূলধারার অবসরপ্রাপ্তদের সংগঠন ‘এএআরপি ( অঅজচ – অসবৎরপধহ অংংড়পরধঃরড়হ ড়ভ জবঃরৎবফ চবৎংড়হং)’র সাথে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজে অংশগ্রহণ করতে থাকেন। কোভিডের পর এলাকার জ্যেষ্ঠদের সাপ্তাহিক ‘শনিবারের কফি ক্লাব’ আড্ডাটি ভার্চুয়াল হয়ে গেলে এক সময় তিনি এর পরিচালনার ভার নেন। কখনও কখনও সভ্যদের মাঝে বিতন্ডা ও বিব্রতকর চিঠি চালাচালি শুরু হলে তা সামাল দেয়ার দায়িত্বও তাঁর ঘাড়েই পড়তো।১৫/২০ বছর থেকে তিনি বার্ষিক
‘রামাজান ফুড ড্রাইভ’ নামে একটি জনহিতকর কাজে হাত দেন। কম্যুনিটি থেকে সংগ্রহ করা অপচনশীল খাবার এবং অর্থ স্থানীয় দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে শুধু দিতেন না, দাতাদের কাছে এর পাই পয়সার হিসাবও বুঝিয়ে দিয়েছেন প্রতিবার। ‘বাই’ এর মাধ্যমে এই কাজটি এখনও চালু রয়েছে। নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিকগুলোতে বাংলায় কলাম ও ছোট ছোট প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন।
‘ওয়াশিংটনের জানালা’ নামে তাঁর একটি কলাম আমার ও অনেকের খুব পছন্দের ছিল। বাঙালি কারো গর্ব করার মতো অর্জন হলে প্রথমেই তিনি এগিয়ে আসতেন। আমার প্রথম বই প্রকাশের সংবাদে সাধুবাদ জানানোদের মাঝে তিনিই ছিলেন প্রথম সারিতে। শুধু তাই নয়, দুটি প্রকাশনা উৎসবে অনেকটা সতঃপ্রণোদিত হয়েই তিনি প্রশংসামূলক বক্তব্য রেখেছিলেন। এলাকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন একটি পরিচিত মুখ। ‘বাই’ আয়োজিত এক ঈদ মিলনমেলায় তাঁকে সর্বশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে দেখেছি। তাঁর তিরোধানে ডিসি বাঙালি সমাজ এক পরম সুহৃদকে হারালো। (২৬শে আগস্ট, ২০২৫)।
Posted ৯:৪৯ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ২৭ আগস্ট ২০২৫
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর