ট্রাম্পের অভিবাসন-বিরোধী পদক্ষেপে, গ্রীণকার্ডধারীরাও স্বস্তিতে নেই

১৪ জুন সারা আমেরিকায় বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক   প্রিন্ট
শুক্রবার, ০২ মে ২০২৫   সর্বশেষ আপডেট : ৯:৪৩ পূর্বাহ্ণ

১৪ জুন সারা আমেরিকায় বিক্ষোভ

এবার গ্রীণকার্ডধারীদের জন্যেও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকে হুমকির মুখে ঠেলে দিলো ট্রাম্প প্রশাসন। চলতি সপ্তাহে ফেডারেল প্রশাসনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত এক পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে হুমকি অথবা আমেরিকানদের জীবন-যাপনের সাথে সাংঘর্ষিক কিংবা আমেরিকার স্বার্থের পরিপন্থি কর্মকান্ডে লিপ্ত বলে মনে হলেই সংশ্লিষ্ট গ্রীণকার্ডধারীকেও বহিষ্কার করা হবে এবং এ নিয়ে ইউএসসিআইএস তার অবস্থান থেকে নড়চড় করবে না। ইউএসসিআইএস (ইউনাইটেড স্টেটস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিস) উল্লেখ করেছে, যদি তোমরা আমাদের দেশে অতিথি হিসেবে অবস্থান করতে চাও, বা করছো-সকলেরই সজাগ থাকা উচিত। আমাদের চৌকষ সোস্যাল মিডিয়া প্রোগ্রাম সবসময়ই জাতীয় নিরাপত্তা এবং নাগরিকগনের নিাপত্তার সাথে আপস করবে না। ইউএসসিআইএস সর্বক্ষণই অনলাইনে মনিটরিং করছে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য করা হুমকিস্বরুপ এবং কারা নাগরিকদের জন্যে নিরাপদ নয়। উল্লেখ্য, এর আগে মার্চে ইউএসসিআইএস অপর ঘোষণায় উল্লেখ করেছিল যে, ভিসার জন্যে আবেদনকারি এবং গ্রীণকার্ডের আবেদনকারিগণের সোস্যাল মিডিয়া পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে তা মঞ্জুর করা হবে। এবং এটি হবে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে।

অবৈধভাবে বসবাসরত অভিবাসীদের মধ্যে যারা অপরাধে লিপ্ত অথবা গুরুতর অপরাধে দন্ডিত হয়েছে-কেবলমাত্র তাদেরকেই গ্রেফতারের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে বষ্কিারের কথা বলেছিলো ট্রাম্প প্রশাসন। সে লক্ষ্যে গত ২০ জানুয়ারি থেকে সংশ্লিষ্টরা মাঠে নেমেছে। ইতিমধ্যেই দেড় লক্ষাধিক অবৈধ অভিবাসীর সাথে কয়েকশত গ্রীণকার্ডধারী এবং সিটিজেনকেও বহিষ্কারের ঘটনা ঘটেছে।তা নিয়ে আইনী লড়াই চলছে ফেডারেল আদালতে। এমনি একটি হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতিতে অভিবাসন-সমাজে সন্ত্রস্ত অবস্থা তৈরীর মধ্যেই বিদ্যমান আইন পাত্তা না দিয়ে গ্রীণকার্ডধারীদের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ গ্রহণ করার সতর্কতা জারি করা হলো।

এ ব্যাপারে খ্যাতনামা ইমগ্রেশন এটর্নী এবং ডেমক্র্যাটিক পার্টির ডিস্ট্রিক্ট লিডার এটর্নী মইন চৌধুরী বৃহস্প্রতিবার এ সংবাদদাতাকে বলেন, গ্রীণকার্ডধারীরা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যেতে চাইলে ‘রি-এন্ট্রি পারমিট’ (re-entry permit) সংগ্রহ করতে পারেন। তাহলে ঝামেলা পোহাতে হবে না। এছাড়া, যারা নিজ দেশে ফিরলে দমন-পীড়ন নির্যাতনের আশংকার কথা বলে গ্রীণকার্ড পেয়েছেন-তারাও সিটিজেনশিপ না নেয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ‘রি-এন্ট্রি’র অনুমতি ব্যতিত না যাওয়াই উত্তম। কারণ, ইতিমধ্যেই অনেকে বাংলাদেশ থেকে ফেরার সময় প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়েছেন। আর কখনোই বছরের অধিক সময় কিংবা ঘনঘন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যাবেন না বলে মুচলেকা নেয়া হয়েছে। এটর্নী মঈন উল্লেখ করেছেন, ভিসার আবেদনকারিগণের সোস্যাল মিডিয়াও তল্লাশী করা হচ্ছে। এছাড়া, গতিসীমা লঘন কিংবা রেড লাইটে টিকিটের বিষয়ও সামনে আসছে। এমনকি ৮/১০ বছর আগের মামুলি অভিযোগে গেফতারের পর আদালত থেকে খালাস পাওয়া ব্যক্তিগণের গ্রীণকার্ড কেড়ে নেয়ার মত ঘটনা ঘটছে। তাই কেউ যদি বিশে প্রয়োজনে নিজ দশ ভ্রমণ করতে চান-তাহলে অনুমতি নেয়া জরুরী। অন্যথায় গ্রীণকার্ড কেড়ে নিলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না। নিউইয়র্কের অপর এটনী জান্নাতুল রুমা বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন জাতীয় নিরাপত্তাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে অভিবাসন-বিরোধী প্রক্রিয়ায়। তাই গ্রীণকার্ডধারীদের বিদেশ ভ্রমণে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী। ঘনঘন বিদেশ ভ্রমণকারিরা ফেরার সময় সীমান্ত/এয়ারপোর্টে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হচ্ছেন। এটা আগে খুব কমই ঘটেছে।

রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনার সময় যারা নিজ দেশে ফিরলেই প্রতিপক্ষের আক্রমণের শিকার হবেন কিংবা জেল-জুলুম সইতে হতে পারে বলে উল্লেখ করেছিলেন, তারা গ্রীণকার্ড পেলেও নিজ দেশ ভ্রমণে বিরত থাকা উচিত অন্তত: সিটিজেন না হওয়া পর্যন্ত। ইমিগ্রেশন এটর্নীরা মনে করছেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি পাল্টেছে। তাই যারা বিএনপি, এলডিপি, জাতীয় পার্টি, জাসদের কর্মী হিসেবে এসাইলাম লাভ করেছেন, তারা যেন এ সময়ে গ্রীণকার্ড পেলেও বাংলাদেশে না যান। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টেছে, এখোন সরকারে নেই আওয়ামী লীগ। তাই এখোন তো তাদের জীবন বিপন্ন হবার মত কোন পরিস্থিতি বিরাজ করছে না।

প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য, ইউএসসিআইএস’র সর্বশেষ এই সতর্কতায় হতাশ হয়েছে এক কোটি ২৮ লক্ষাধিক গ্রীণকার্ডধারী। এরমধ্যে সিটিজেন হবার যোগ্য ৮৬ লাখ। বার্ষিক গড় হিসাব অনুযায়ী ২৫ লাখের অধিক গ্রীণকার্ডধারী নানা কারণে বিদেশে/নিজ দেশে যাতায়াত করেন। অর্থাৎ সকলকেই যদি ‘পুনরায় প্রবেশ করা’র অনুমতি সংগ্রহ করতে হয় তাহলে বার্ষিক ২ লাখ ৮৬ হাজার ঘন্টা ব্যয় করতে হবে ইউএসসিআইএসকে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক কর্মচারি ছাটাইয়ের বলি সকল দপ্তরের মত ইউএসসিআইএস-কেও হতে হয়েছে। ফলে পারিবারিক কোটায় আবেদনের প্রসেসংয়ে ধিরগতির ন্যায় গ্রীণকার্ডধারীগণের ‘পুনরায় প্রবেশ করার অনুমতি’ সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় বিলম্বিত হবে-আশংকা সংশ্লিষ্টদের। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, গ্রীণকার্ড হাতে পাবার ৫ বছর পর সিটিজেনশিপের দরখাস্ত করতে হয়। এই ৫ বছরের মধ্যে অন্তত: ৯১৩ দিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলেই সিটিজেনশিপে আবেদন করা যায়। তবে সিটিজেনের সাথে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ গ্রীণকার্ডধারীর জন্যে এ সময় সীমা হচ্ছে তিন বছর।

গাজায় ইসরায়েলি বর্বরতার নিন্দা ও প্রতিবাদকারিদের চিহ্নত করার পরিক্রমায় ট্রাম্প প্রশাসনের খড়গহস্ত নেমে এসেছে ভিসাধারী থেকে গ্রীণকার্ডধারী অতিক্রম করে ন্যাচারালাইজড সিটিজেনদের বিরুদ্ধেও। এরফলে প্রায়দিনই নিত্য নতুন ‘নির্বাহী আদেশ’ জারির ঘটনাও ঘটছে। ‘ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট’ ভিসাধারীর মধ্যে ১২ শতাধিকের ভিসা বাতিলের পর আইনী লড়াই শুরু হলে চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্প প্রশাসন ঐ পদক্ষেপ থেকে সরে এসেছে। তবে গ্রীণকার্ডধারীরা বিদেশ ভ্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার সময় সীমান্ত/এয়ারপোর্টে প্রশ্নবানে জর্জরিত হচ্ছেন। বেশ কিছু গ্রীণকার্ডধারীর কাছে লিখিত অঙ্গিকার নেয়া হচ্ছে যে, ভবিষ্যতে বিনা প্রয়োজনে বিদেশ যাবেন না। আবার কারো কারো কাছে ‘গ্রীণকার্ড দরকার নেই’-এমন কাগজেও স্বাক্ষর নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে নিজ দেশে ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটছে।

এদিকে, মে দিবস উপলক্ষে সারা আমেরিকায় অভিবাসী সমাজের সদস্যরাও ট্রাম্প-বিরোধী বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নেন। ‘একইদিন ৫০ স্টেটে ৫০ প্রতিবাদ’ কর্মসূচিতে ১ মে লাখ লাখ আমেরিকান বিক্ষোভ করেছেন ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের ১০০ দিন পূর্তি উপলক্ষে। এই ১০০ দিনকে ‘অপশাসন’, ‘দু’শাসন’র নামান্তর হিসেবে অভিহিত করা হয়। হোয়াইট হাউজের সামনে বড় ধরনের একটি বিক্ষোভ থেকে ট্রাম্পকে গণ-বিরোধী তৎপরতা থেকে সরে দাঁড়ানোর আহবান জানানো হয়। অভিবাসন-বিরোধী পদক্ষেপ ছাড়াও বন্ধু রাষ্ট্রসমূহের সাথে বাণিজ্যিক যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া, কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১ তম রাষ্ট্রে পরিণত করার মত আগ্রাসী কথাবার্তার কঠোর সমালোচনা করা হয়। অভিবাসীদের শ্রম আর ঘামে গড়ে উঠা আমেরিকায় ট্রাম্পের অভিবাসন-বিরোধী কর্মকান্ড সহ্য না করার ঘোষণাও দেয়া হয় বিক্ষোভ থেকে। এছাড়া, অর্থ সাশ্রয়ের নামে ফেডারেল দপ্তরে নির্বিচার ছাটাই-বরখাস্তের ঘটনাবলিকে সংবিধান পরিপন্থি হিসেবেও অভিহিত করা হয়। ট্রাম্পের এসব কর্মকান্ড রুখে দেয়ার অভিপ্রায়ে ১৪ জুন আবারো দেশব্যাপী তুমুল বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

Facebook Comments Box

Posted ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ০২ মে ২০২৫

nyvoice24 |

Address
New York
Phone: 929-799-2884
Email: nyvoice24@gmail.com
Follow Us