ঢাকা প্রতিনিধি
প্রিন্ট
সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ সর্বশেষ আপডেট : ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ
কথিত হামলা-ভাঙচুরের নতুন মামলার আসামী (বাম থেকে) নূর মোহাম্মদ এমপি, শাহিনা বেগম, জহুরা বেগম, সাইফুল ইসলাম, জাহিদুল ইসলাম ও নজরুল ইসলাম সাত্তার। ছবি: সংগৃহীত।
কথিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ১৬ মাস পর ছাত্র-জনতার মিছিলে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে আওয়ামী লীগের ৩৫৯ জনের বিরুদ্ধে জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ থানায় মামলা করেছে গণঅধিকার পরিষদের স্থানীয় এক নেতা। মামলায় জামালপুর-১ (দেওয়ানগঞ্জ-বকশীগঞ্জ) আসনের এমপি নূর মোহাম্মদ, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম সাত্তার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহিনা বেগম, সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বিজয়, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জহুরা বেগম, সহ-সভাপতি ও জেলা পরিষদ সদস্য জয়নাল আবেদীনসহ আওয়ামী লীগের ৩৫৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে আরও ২০০-৩০০ জনকে। গত ২০ নভেম্বর বকশীগঞ্জ থানায় মামলাটি করা হয়। অর্থাৎ কথিত ও ভাঙচুর আর অগ্নিসংযোগের ১৬ মাস পর। এর আগে একই ঘটনার উল্লেখ করে আরেকটি মামলা হয় ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর। বাদি সাইফুল ইসলাম সেই মামলায় অভিযোগ করেন যে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট (অর্থাৎ শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাবার আগের দিন) তার মালিকানাধীন ভবনে থাকা আওয়ামী লীগ অফিস, মা বই বিতান, ও বিসামিল্লাহ রেস্টুরেন্টে একদল লোক হামলা চালিয়ে ভাঙচুরের পর অগ্নিসংযোগ করে। সেই মামলায় ১৩৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয় আসামী হিসেবে এবং যার বেশীর ভাগই সাধারণ মানুষ। আর ১৬ মাস পর দায়েরকৃত মামলায় ৩৫৯ আসামীর মধ্যে স্থানীয় এমপিসহ আওয়ামী লীগের উপজেলা পর্যায়ের নেতাদেরকে। এই মামলার বাদী বকশীগঞ্জ উপজেলা গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক শাহরিয়ার আহমেদ সুমন। বকশীগঞ্জ থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ গণমাধ্যমে দ্বিতীয় মামলা দায়ের করার কথা স্বীকার করেছেন। একইস্থানে কথিত হামলা, ভাংচুর ও অগ্নি সংযোগ করার ঘটনায় ১৬ মাসের ব্যবধানে দুটি মামলা খন্দকার শাকের আহমেদ কেন নিলেন সে প্রশ্নের জবাব খুঁজতে কয়েক দফা ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ উঠেছে যে, মামলার বাদি শাহরিয়ার আহমেদ সুমনের মাধ্যমে ওসি আসামীগণের কাছে থেকে চাঁদাবাজি করছেন। চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যেই হাস্যকর মামলার উদ্ভব ঘটিয়েছেন। মামলার আসামিদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী ছাড়াও বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষক রয়েছেন। আসামিদের অনেকেই জুলাই আন্দোলনের একাধিক মামলায় জেলে। কেউ কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। নতুন মামলার বিষয়ে তাদের কারো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
১৬ মাস পর দায়েরকৃত মামলায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই বিকেলে মামলার বাদী শাহরিয়ার আহমেদ সুমনের নেতৃত্বে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলে আসামিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালান এবং বিসমিল্লাহ হোটেলে আগুন দেন। এতে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। ১৮ জুলাই পুনরায় মিছিল বের করলে আসামিরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মিছিলকারীদের ওপর হামলা চালান। এতে অনেকেই আহত হন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মামলার বাদী শাহরিয়ার আহমেদ সুমন গণমাধ্যমে জানান, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে তিনি উপজেলার প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সরকার পতনের পর দীর্ঘ ১৬ মাস আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছি। মামলা করার কোনো ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু সারাদেশে ১৬’শ এর অধিক মানুষকে হত্যার পরেও এদের কোনো অনুশোচনা নেই। উল্টো তারা অগ্নিসংযোগসহ নাশকতা করেই যাচ্ছে। তাই মামলা করেছি।’ দ্রুত সব আসামিকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান তিনি।
জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জামালপুর জেলা শাখার যুগ্ম সদস্য-সচিব তৌহিদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই, সমৃদ্ধির বাংলাদেশ গড়তে চাই। অহেতুক কোনো মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন সেই কারণে এনসিপি কারো বিরুদ্ধে মামলা করেনি। আমাদের প্রত্যাশা, নিরপরাধ কোনো মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন।’
বকশীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম প্রিন্স বলেন, ঢালাওভাবে সবাইকে অপরাধী বলা যাবে না। তার ভাষ্য, নতুন মামলায় অসুস্থ মানুষ যারা চলতে-ফিরতে পারেন না তাদেরও আসামি করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, তারা প্রতিহিংসার রাজনীতি বিশ্বাসী নন, তারা সাম্যের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তাদের নেতা জামালপুর-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে- অকারণে কোনো মানুষকে হয়রানি না করার। তাই তারা মামলা দিয়ে মানুষকে হয়রানির পক্ষে নন।
বকশীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ জানান, ভিডিও, ছবিসহ যথেষ্ট প্রমাণাদি থাকার পরেই মামলা হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হবে।
অপরদিকে, স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের দাবি, ১৭ জুলাই বকশীগঞ্জে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় বিক্ষুব্ধ জনতা আওয়ামী লীগ অফিসে আগুন দিলে সেটি পাশের বিসমিল্লাহ হোটেলে ছড়িয়ে পড়ে এবং হোটেলটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। অভিযোগ করা হচ্ছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ১৬ মাস পর আকস্মিকভাবে দায়ের করা এই মামলা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, পূর্বপরিকল্পিত এবং একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিকে টার্গেট করে চাঁদাবাজি করাই মূল উদ্দেশ্য ,এ কারণেই মামলাটি করা হয়েছে।। তারা দাবি করেছেন, শাহরিয়ার সুমন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের নামে উত্তেজনা সৃষ্টি করে আসছেন এবং এবার মামলা ব্যবহার করে চাঁদা আদায়ের নতুন কৌশল নিয়েছেন। মেরুরচর ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সুজন নূর বলেন, গণঅধিকার পরিষদের নেতা শাহরিয়ার সুমনের এ ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকান্ডে আমরা গভীরভাবে ক্ষুব্ধ ও বিব্রত। আমরা জোর দাবি জানাই, প্রশাসন যেন অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই মামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য উদঘাটন করে। আমরা ভিত্তিহীন অভিযোগের নামে কাউকে হয়রানি করার পক্ষে না ।
স্থানীয় বাটা শো-রুমের মালিক ফজলুল হক ওয়ালেজ বলেন, আমি ১৯৯০ সাল থেকে বকশীগঞ্জ বাজারে ব্যবসা করে আসছি। বলতে গেলে,আমার কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই, কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত বিবাদও নেই। দীর্ঘদিন ধরে সুমন নানা অজুহাতে আমার কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিল। আমি চাঁদা না দেওয়ায় প্রতিহিংসাবশত আমার নামে মিথ্যা মামলা দিয়েছে। সে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাকে এই মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গণঅধিকার পরিষদের নেতা সুমনের পারিবারিক অবস্থা আগে বেশ সাধারণ ছিল। তাঁর পিতা শহিদুল হক (সোনা মিয়া) একজন দরিদ্র কৃষক; গৃহপালিত গরুর দুধ বিক্রির আয়ে সংসার চলত। সুমনও একসময় এসিআই কোম্পানিতে স্বল্প বেতনের চাকরি করতেন। তবে গত বছরের ৫ আগস্টের পর সুমনের জীবনযাত্রায় হঠাৎ ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যায়। গত বছরের ৫ আগস্টের পর তিনি উপজেলা বিভিন্ন দপ্তরে ঘনঘন যাতায়াত শুরু করেন এবং স্থানীয় কিছু ব্যক্তিকে মামলা করার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেন। স্থানীয়দের একটি অংশ দাবি করছে যে, নিরীহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরও তিনি মামলা-সংক্রান্ত ভয়ভীতি প্রদর্শন করে চাঁদা দাবি করে যাচ্ছে । শাহরিয়ার সুমন বর্তমানে বকশীগঞ্জ বাজার এলাকায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন এবং নতুন একটি গাড়িও ক্রয় করেছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয়রা আরও জানান, কিছুদিন আগে একটি বিয়ে বাড়িতে চাঁদা দাবি করতে গিয়ে সুমন জনরোষের মুখে পড়েন। এর পরবর্তী সময়ে তিনি বেশ কিছুদিন বকশীগঞ্জ থানায় প্রবেশ করতে পারেননি বলে জানা যায়।
বকশীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ মামলার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, তদন্তসাপেক্ষে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হবে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই মামলা গ্রহণ, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক ভুক্তভোগীকে অযথাই বারবার আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়।
Posted ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর