ইচ্ছে পূরণে ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় জুয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক   প্রিন্ট
বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫   সর্বশেষ আপডেট : ৬:৪২ পূর্বাহ্ণ

ইচ্ছে পূরণে ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় জুয়া

প্রশ্ন উঠেছে, এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প কি ইতিহাসের পাতায় সুখ্যাতি অর্জন করতে পারবেন, না কুখ্যাতি?

জনপরিসরে ডনাল্ড ট্রাম্পের রাজনীতির ধরন গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলেছে। তবে ১৯৮০ এর দশক থেকে তিনি একটি বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে আসছেন। তার বিশ্বাস, মার্কিন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার একটি কার্যকর হাতিয়ার হল শুল্ক। সেই বিশ্বাসকে সত্যি প্রমাণ করতে তিনি এখন নিজের প্রেসিডেন্সিকে বাজি রেখেছেন।

বুধবার অপরাহ্নে হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলন করে বিশ্বের শতাধিক দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ওই তালিকায় মিত্র দেশ যেমন রয়েছে, তেমনই প্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রতিপক্ষ দেশকেও রাখা হয়েছে।

হোয়াইট হাউজের রোজ গার্ডেনে বন্ধু, কনজারভেটিভ রাজনীতিক ও মন্ত্রীদের পরিবেষ্টিত অনুষ্ঠানে ট্রাম্প এ দিনকে বর্ণনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এই দিনের জন্য অপেক্ষা করছে দীর্ঘদিন ধরে। অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের দেওয়া বক্তৃতার অর্ধেক ছিল উদযাপন, বাকি অর্ধেক ছিল আত্মপ্রশংসা। নিয়মিত বিরতিতে চলছিল হাততালি।

ট্রাম্প তার বক্তৃতায় শুল্ক নিয়ে নিজের দীর্ঘদিনের বিশ্বাসের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি নাফটার মত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা নিয়ে নিজের শুরুর দিকের সমালোচনার কথা স্মরণ করেন।

প্রেসিডেন্ট মানছেন, নতুন শুল্ক ঘোষণার কারণে আগামী দিনে তাকে ‘বিশ্ববাদী’ আর ‘বিশেষ স্বার্থবাদীদের’ চাপের মুখে পড়তে হবে। তবে তিনি নিজের বিশ্বাসের ওপর আমেরিকানদের ভরসা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তার কথায়, “ভুলে গেলে চলবে না, গত ৩০ বছর ধরে বাণিজ্য নিয়ে আমাদের বিরোধীরা যেসব ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, তার প্রত্যেকটিই সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে।”

দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পকে যেমন সমমনা উপদেষ্টারা ঘিরে রেখেছেন, তেমনি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণও রয়েছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির হাতে। এ অবস্থায় বাণিজ্য নীতির মাধ্যমে নতুন আমেরিকা গড়ার দীর্ঘদিনের দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবে পরিণত করার সুযোগ ট্রাম্পের সামনে এসেছে।

তার ভাষ্য, এসব নীতিই যুক্তরাষ্ট্রকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে একটি সম্পদশালী দেশে পরিণত করেছিল এবং আবারও করবে।

ট্রাম্প বলেন, “কঠোর পরিশ্রমী মার্কিনিরা বছরের পর বছর ধরে দর্শকসারিতে বসে থাকতে বাধ্য হয়েছে; কারণ অন্যান্য দেশ ধনী ও শক্তিশালী হয়েছে, যার বেশিরভাগ খরচ গুনতে হয়েছে আমাদের। “আজকের পদক্ষেপের মাধ্যমে অবশেষে আমরা আমেরিকাকে আবার মহান করে তুলতে চলেছি; অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে মহান।”

যদিও প্রেসিডেন্টের জন্য এখনো বড় ধরনের ঝুঁকি অপেক্ষা করছে। সব দেশের অর্থনীতিবিদরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, চীনের ওপর ৫৩ শতাংশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর ২০ শতাংশ এবং সব দেশের ওপর অন্তত ১০ শতাংশের যে শুল্ক ঘোষণা করা হয়েছে, তা আখেরে আমেরিকান ভোক্তাদেরই ভোগাবে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে, সেই সঙ্গে বৈশ্বিক মন্দারও ঝুঁকি তৈরি করবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কেন রগফ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, নতুন শুল্ক ঘোষণার পর বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মন্দায় পড়ার আশঙ্কা ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে।

“তিনি (ট্রাম্প) বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় একটি পারমাণবিক বোমা ছুড়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে আমদানির ওপর এই স্তরের কর আরোপের সিদ্ধান্ত হবে বিস্ময়কর।”
ট্রাম্পের পদক্ষেপে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ বৃদ্ধির যেমন আশঙ্কা রয়েছে, তেমনই যেসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টায় রয়েছে আমেরিকা-এমন মিত্রদেরও হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।

যেমন চীনের সম্প্রসারণবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে রক্ষাকবচ হিসেবে দেখে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সম্প্রতি ওই তিন দেশ ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির জবাব দিতে তারা একসঙ্গে কাজ করবে।

ট্রাম্প যদি সফল হন, তবে তিনি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলবেন, যা গড়ে তুলতে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর থেকে আমেরিকার ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি।

তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, নতুন নীতি আমেরিকান উৎপাদন ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করবে, রাজস্বের নতুন উৎস তৈরি করবে এবং আমেরিকাকে আরও স্বাবলম্বী করবে। কোভিড মহামারীতে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে যে ধরনের সংকটে পড়তে হয়েছে, তেমন পরিস্থিতি থেকেও রক্ষা করবে। ট্রাম্পের দীর্ঘ পরিকল্পনা অনেকের কাছে ‘অত্যন্ত অবাস্তব’ ঠেকতে পারে। কিন্তু যুদ্ধের অবসান, ভৌগলিক অবস্থানের নতুন নামকরণ, নতুন অঞ্চল অধিগ্রহণ বা কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প বিলোপ ও জনবল কমানোর মাধ্যমে যে প্রেসিডেন্ট তার উত্তরাধিকারকে শক্তিশালী করতে চান, তার জন্য এটাই হতে পারে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে ফলপ্রসূ পুরস্কার।

নিজের ভঙ্গিতেই তিনি বলেছেন, এটা হবে আমেরিকার ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিবস’। আর এই ঘোষণার মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ট্রাম্প যদি নতুন নীতি অনুসরণ করেন, তাহলে ঐতিহাসিক পরিবর্তন প্রায় অবশ্যম্ভাবী।

এখন যে প্রশ্নটি সামনে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হল- এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প কি ইতিহাসের পাতায় সুখ্যাতি অর্জন করতে পারবেন, না কুখ্যাতি?
ট্রাম্পের ভাষণ ছিল বিজয়োল্লাসে পূর্ণ। তার এ পদক্ষেপের ফলে আমেরিকান অর্থনীতি এবং রাজনৈতিকভাবে তাকে যে চড়া মূল্য দিতে হতে পারে, সেই আশংকার কথা ভাষণে ছিল অনুপস্থিত।

অবশ্য তিনি বলেছেন, যা তিনি করতে চান, সেজন্য এটুকু ঝুঁকি নেওয়াই যায়। আর তাতেই বক্তব্যের একেবারে শেষে, প্রেসিডেন্টের সাহসী চেহারার মাঝে ছোট্ট একটি সন্দেহের ছায়া যেন উঁকি দিচ্ছিল।

ট্রাম্প বলেন, “এটা হতে চলেছে এমন এক দিন, যে দিনের কথা আপনারা ভবিষ্যতে স্মরণ করবেন। তখন আপনারা বলবেন, ‘তিনি ঠিকই করেছিলেন’।”

Facebook Comments Box

Posted ৬:৪২ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫

nyvoice24 |

Address
New York
Phone: 929-799-2884
Email: nyvoice24@gmail.com
Follow Us