নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট
শুক্রবার, ০৮ আগস্ট ২০২৫ সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫২ অপরাহ্ণ
বিবিসি বাংলা প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে একটি পর্যালোচনা-মূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনে বিভিন্ন ক্ষেত্রের বর্তমান অবস্থার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অভিমত নিয়ে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা মূলত ব্যর্থতারই খতিয়ান।
সরকারের এক বছরের এই মূল্যায়নে অর্থনীতি, বিচার সংস্কার, দলীয়করণ, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা—এসব ইস্যু প্রাধান্য পেয়েছে। অর্থনীতির মতো কিছু ক্ষেত্রে সরকার কিছুটা কৃতিত্ব পেলেও, অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের ভূমিকা সমালোচিত হয়েছে।
অর্থনীতি: মিশ্র পরিস্থিতি ও কর্মসংস্থানের সংকট
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বিবিসিকে বলেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থনীতির মূল্যায়ন করা কঠিন, কারণ কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ছিল না। তিনি বলেন, “আগের সাথে পরের তুলনা করে আমরা দেখি যে একটা মিশ্র পরিস্থিতি এখানে আছে।”
সরকার অনেক সংস্কারের কথা বললেও, কোনো মধ্যমেয়াদী নীতিকাঠামো দেয়নি। কর আহরণ, সরকারি বিনিয়োগ বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ চালু করতে না পারা। এর ফলে, ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের মূল কারণগুলোর মধ্যে একটি, অর্থাৎ কর্মসংস্থানের আকাঙ্ক্ষা, অপূর্ণ রয়ে গেছে।
বিচার প্রক্রিয়া: প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা ও মামলা বাণিজ্য
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল ‘জুলাই হত্যা’র বিচার এবং বিচার ব্যবস্থার সংস্কার। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ বলেছেন। তিনি ঢালাও মামলার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “এটাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিকারের উপায় তো সরকারকেই বের করতে হবে। সেদিকে আমরা তেমন কিছু দেখি না।”
ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন তুলেছেন, “কতটুকু বিচার, কতটুকু প্রতিশোধ এই প্রশ্নটা ওঠা খুবই যৌক্তিক।” এছাড়াও তিনি মামলা, গ্রেফতার এবং জামিন বাণিজ্যের মতো অনিয়মগুলো “এক ধরনের স্বাভাবিকতায় রূপান্তর” হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।
দলীয়করণ ও সংস্কারের ব্যর্থতা
অভিযোগ উঠেছে যে গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত এই সরকারেও নতুন করে দলীয়করণ চলছে, যা সুশাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরি করেছে। টিআইবি’র ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এক দলের জায়গায় অন্য দল এসে বসেছে।” এই দলীয়করণ সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত হয়েছে, যার ফলে একটি জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ার সম্ভাবনা অর্জন করা যায়নি।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সংস্কার কমিশন থেকে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো সরকার উপেক্ষা করছে। “কমিশনের শতাধিক সুপারিশের মধ্যে থেকে দেড় ডজনের মতো সুপারিশ পিক করা হয়েছে” যার মধ্যে “টয়লেট পরিষ্কার রাখতে হবে”র মতো সুপারিশও ছিল। অথচ মৌলিক সংস্কারের জায়গাগুলো উপেক্ষিত হয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা: ‘মব ভায়োলেন্স’ এবং ভয়ের সংস্কৃতি
গত এক বছরে সারাদেশে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা গণপিটুনি নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন বিবিসিকে বলেন, সরকার ‘মব ভায়োলেন্স’ সহ্য করবে না বললেও বাস্তবে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং, “সরকার বিভিন্ন সময় একে বৈধতা দিয়েছে বলে মনে হয়েছে।” তিনি ‘অপারেশন ডেভিল’ এবং ‘তৌহিদি জনতা’র মতো বিষয়গুলো উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এর মাধ্যমে ‘মব’ বৈধতা পেয়েছে।
টিআইবি-এর প্রতিবেদনেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথা বলা হয়েছে। খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, এবং গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, “মানুষের ভয়ের যে সংস্কৃতি সেটা থেকে মানুষকে বের করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা।”
মুক্তিযুদ্ধ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: আঘাতের শিকার
এই সরকার মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন জোবাইদা নাসরীন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধ, সেটাকে এ সরকারের বিভিন্ন ফোরাম থেকে আঘাত করা হচ্ছে।” মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ছোট করা বা অসম্মান করার একটি মানসিকতা তৈরি হচ্ছে, যা “ঐতিহাসিকভাবে একটা হুমকির জায়গা।”
গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও বড় ধরনের অস্বস্তির মধ্যে পড়েছে। গত এক বছরে দুই শতাধিক গণমাধ্যমকর্মীকে ঢালাওভাবে মামলায় জড়ানো, চাকরিচ্যুত করা, এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান দখলের মতো অভিযোগ উঠেছে। টিআইবি-এর ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল থেকে শুরু করে অনেককে চাকরিচ্যুত করা”র মতো কাজগুলো “সরকারের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ অংশগ্রহণে হয়েছে।”
বিবিসি-র এই প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের এক বছরের শাসনামলে কিছু সফলতা দেখালেও, মৌলিক সংস্কার, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তারা ব্যাপক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। জনগণ যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল, তার অনেক কিছুই এখনো অধরা রয়ে গেছে।
Posted ১২:৫২ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ০৮ আগস্ট ২০২৫
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর