বিশেষ সংবাদদাতা
প্রিন্ট
সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সর্বশেষ আপডেট : ৯:৪০ পূর্বাহ্ণ
সাংবাদিকদের সাথে কথা বলছেন মেয়র প্রার্থী এ্যান্ড্রু ক্যুমো। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।
নিউইয়র্ক সিটি মেয়রের আসন্ন নির্বাচনী দৌড় থেকে সরে দাঁড়ালেন বর্তমান মেয়র এরিক এডামস। ২৮ সেপ্টেম্বর রোববার অপরাহ্নে সোস্যাল মিডিয়ায় এক ভিডিও বার্তায় এডামসের এ ঘোষণার পরই নিউইয়র্ক অঞ্চলের বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী (নিউইয়র্ক স্টেটের সাবেক গভর্ণর) এ্যান্ড্রু ক্যুমোকে সমর্থন জ্ঞাপণ করা হয়। নিউইয়র্ক সিটির ফ্লোরাল পার্কে ‘বাংলাদেশ বেদান্ত সোসাইটি’র শারদীয় দুর্গোৎসবে অতিথি হিসেবে যোগদানকালে এ্যান্ড্রু ক্যুমোকে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের দ্ব্যর্থহীন সমর্থন দানের ঘোষণা দেন ডেমক্র্যাটিক পার্টির ডিস্ট্রিক্ট লিডার ড. দীলিপ নাথ। এ সময় প্রবাসী বাংলাদেশীদের নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা শরাফ সরকারসহ অনেকেই মেয়র পদে ক্যুমোকে সমর্থন দান করেন। ড দীলিপ নাথ বলেন, নিউইয়র্ক সিটিকে ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোষ্ঠি নির্বিশেষে সকল মানুষের নির্বিঘ্নে বসবাসের পরিবেশ অটুট রাখার স্বার্থেই ক্যুমোর মতো একজন নেতার প্রয়োজন। বাংলাদেশের হিন্দুরা পুরোপুরি নিরাপদে দুর্গাপূজা উদযাপনে সক্ষম না হলেও এই নিউইয়র্ক সিটির অলি-গলিতে এবার ৩৬টির মত মন্ডপে বিপুল উৎসাহে তা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সবকটি আয়োজনেই সকল ধর্ম আর বর্ণের মানুষেরা আসছেন। উৎসবের আমেজ ভাগাভাগি করছেন। এমন চমৎকার সম্প্রীতির বন্ধন অব্যাহত রাখতে ক্যুমোর মত পরীক্ষিত একজন ব্যক্তির মেয়র পদে নির্বাচিত হওয়া জরুরী। এ সময় উপস্থিত সকলে বিপুল করতালিতে ক্যুমোর বিজয়ে কাধে কাধ মিলিয়ে কাজের অঙ্গিকার করেন। উল্লেখ্য, ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে ডেমক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী হচ্ছেন জোহরান মামদানী। গত জুনে দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচনে মামদানীর কাছে হেরে গিয়ে এ্যান্ড্রু ক্যুমো এবং এরিক এডামস স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। এরইমধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এরিক এডামসকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়েছিলেন। ট্রাম্পের ভাষায় মামদানী হলেন বামপন্থি ডেমক্র্যাট এবং মামদানী মেয়র হিসেবে জয়ী হলে ফেডারেল সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে নিউইয়র্ক সিটি বঞ্চিত হবে। তাই মামদানীর পরাজয় অবশ্যাম্ভী করতে এডামসকে সরে দাড়ানোর পুরস্কার হিসেবে সউদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের টোপও রয়েছে। উল্লেখ্য যে, দুর্নীতিসহ নানাবিধ অনিয়মের মামলা থেকে ইতিমধ্যেই এরিক এডামসকে মুক্তি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আরো কটি মামলা ঝুলছে। সেগুলোতে দোষী সাব্যস্ত হলেও ট্রাম্প তার প্রেসিডেন্সি ক্ষমতায় অব্যাহতি প্রদান করবেন বলে আগাম ইঙ্গিত দিয়েছেন এডামসকে। সবকিছু বিবেচনা করেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন এরিক এডামস। এরফলে বিশ্বের রাজধানী খ্যাত নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থী হিসেবে মামদানীর বিজয়ের পথ কতটা হুমকির মুখে পড়লো তা ব্যালট যুদ্ধের আগে কেউই নিশ্চিত হতে পারছেন না। কারণ, সর্বশেষ জরিপেও ক্যুমোর চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছেন মামদানী।
কম্যুনিটি লিডার ড. দীলিপ নাথ কর্তৃক হিন্দুদের দ্ব্যার্থহীন সমর্থনের ঘোষণা দেয়ার পর সিটি মেয়র প্রার্থী এ্যান্ড্রু ক্যুমো প্রবাসী বাঙালিদের প্রশংসা করেন । এ সময় বেদান্ত সোসাইটির নেতৃবৃন্দ পাশে ছিলেন। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।
দুর্গোৎসবে ভারত ও বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের দ্ব্যর্থহীন সমর্থন লাভের পরই অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ্যান্ড্রু ক্যুমো বলেন, বাংলাদেশীরা নিউইয়র্ক সিটির খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, এবং আমি আশা করছি তারাও আমার টিমে কাজ করবেন। একইসাথে আমি অত্যন্ত সম্মানীতবোধ করছি নির্বাচনে আমাকে ভোট দেয়ার অঙ্গিকার করার জন্যে।
বেদান্ত সোসাইটির দুর্গোৎসবে মেয়র প্রার্থী এ্যান্ড্রু ক্যুমো। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।
ক্যুমো উল্লেখ করেন, আমাদের সারাজীবনের মধ্যে আসন্্ন নির্বাচনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে বিষয়টি অনুধাবনের পরই মেয়র এরিক এডামস নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নিজের স্বার্থে এবং এই সিটির সামগ্রিক কল্যাণের পথ সুগম করতে। কারণ আমরা উগ্রপন্থিদের প্রচন্ড হুমকির মুখে রয়েছি। আমরা যে সিটিকে চিনি এবং হৃদয়ে ধারণ করি সেটির অস্তিত্ব বিলীন করার হুমকি তৈরী হয়েছে। মি. মামদানী (ডেমক্র্যাট মেয়র প্রার্থী) যে নীতি ও আদর্শ লালন করেন তা নিউইয়র্ক সিটির পরিপূরক নয়। আমরা বিশ্বাস করি সুযোগ-সুবিধায়, আমরা বিশ্বাস করি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে, আমরা আইন-শৃঙ্খলায় বিশ্বাস করি, আমরা নাগরিকদের নিরাপত্তায় বিশ্বাস করি, কিন্তু আমরা মনে করতে চাই না যে নিউইয়র্ক পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা দুর্নীতিবাজ এবং দায়িত্ব পালনে খুবই দুর্বল। মামদানীর বক্তব্য অনুযায়ী নিউইয়র্কের পুলিশ বর্ণবিদ্বেষী বলেও আমরা মনে করি না। পুলিশ এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে মামদানীর বক্তব্য-মন্তব্য একেবারেই অপমানজনক। যারা আমাদের সামগ্রিক নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করছে তাদের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধার ভাষা ব্যবহার করেননি মামদানী। আমি মনে করছি মামদানী জয়ী হলে নিউইয়র্কের প্রকৃত চেহারা অটুট থাকবে না। কারণ মামদানী মারদাঙ্গা, ভাংচুরে বিশ্বাসী। আমরা সকল ধর্ম-বর্ণ-ভাষার মানুষের সম্প্রীতির বন্ধনে বিশ্বাসী। কিন্তু মামদানী সেটি চান না। তিনি সম্প্রীতির বন্ধন ভেঙ্গে চুরমার করতে বিশ্বাসী। মামদানীর মধ্যে সহমর্মিতাবোধ একেবারেই নেই। এহেন অবস্থায় এরিক এডামস নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে আমি সাধুবাদ জানাচ্ছি এবং সিটির স্বার্থে তিনি নিজ স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে মহানুভবতার উদাহরণ তৈরী করলেন বলে মনে করছি।
বেদান্ত সোসাইটির দুর্গোৎসবে পূজারিরা। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।
পূজায় সমবেত ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের সাথে দাঁড়িয়ে মন্ডপে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন সাবেক গভর্ণর ও সিটি মেয়র প্রাথী কুমো। এ সময় বেদান্ত সোসাইটির সভাপতি পূর্ণচন্দ্র মুখার্জী এবং সাধারণ সম্পাদক রীনা সাহা-সহ বিশিষ্টজনেরা সেখানে ছিলেন।
এ্যান্ড্রু ক্যুমোকে বেদান্ত সোসাইটির দুর্গোৎসবে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান সেক্রেটারি রীনা সাহা। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।
এরিক এডামস প্রার্থীতা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর এক বিবৃতিতে জোহরান মামদানী বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বিলিয়োনেয়ার ব্যবসায়ীগণের অনুরোধে এরিড এডামস সরে দাঁড়ালেন এবং সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন ক্যুমো। এসবের কোনই প্রভাব পড়বে না ব্যালট যুদ্ধের ফলাফলে। নিউইয়র্কবাসী সবসময়ই দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক এবং দুশ্চরিত্রের নেতৃত্বকে ঘৃণা করেছে, সামনের নির্বাচনেও তার প্রকাশ ঘটাবেন ভোটারেরা। উল্লেখ্য, নিউইয়র্ক সিটির ৩৭২ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম বড় কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে একজন মুসলমান মাঠে নেমেছেন। সে কারণে এই সিটিতে বসবাসরত ২ লাখ মুসলমান ভোটারের প্রায় সকলেই সরব হয়েছেন। প্রথম দক্ষিণ এশিয়ান হিসেবেও মামদানীর পক্ষে মাঠে রয়েছেন বাংলাদেশী, ভারতীয়, পাকিস্তানী, শ্রীলংকান, নেপালি, ইন্দোনেশিয়ানরাও। উগান্ডায় জন্মগ্রহণকারি মামদানী (৩৩)’র মা হলেন ভারতীয় মীরা নায়ার এবং বাবা মাহমুদ মামদানী। ২০২০ সালের নির্বাচনে কুইন্স নিয়ে গঠিত নিউইয়র্ক স্টেট এ্যাসেম্বলী ডিস্ট্রিক্ট-৩৬ থেকে ডেমক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়নে এ্যাসেম্বলীম্যান হয়েছেন। দু’বছর পর ২০২২ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনেও বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় এ্যাসেম্বলীম্যান হয়েছেন। সেই পদে থেকে লড়ছেন মেয়র পদে। নিউইয়র্ক স্টেটের গভর্ণর ক্যাথী হোকুল এবং সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসসহ শিক্ষক-কর্মচারি ফেডারেশন মামদানীকে সাপোর্ট দিয়েছেন। ডেমক্র্যাটিক পার্টির তৃণমূলের অনেকে মাঠে নেমেছেন মামদানীর পক্ষে। তবে পার্টির গুরুত্বপূর্ণ অনেকের প্রকাশ্য সমর্থন এখনো জুটেনি মামদানীর। এমনি অবস্থায় ডেমক্র্যাটিক পার্টির সাবেক স্টেট গভর্ণর ক্যুমোর পক্ষে এরিক এডামসের সরে পড়ার বিষয়টি সিটি মেয়রের নির্বাচনের হিসাব-নিকাশকে গোলকধাধায় নিপতিত করছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন।
Posted ৯:৪০ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর