যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি
প্রিন্ট
বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ সর্বশেষ আপডেট : ৯:৫৪ পূর্বাহ্ণ
ইউনূসকে পাঠানো চিঠির কপি। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।
প্রধান উপদেষ্টাকে লেখা পাঁচ মার্কিন কংগ্রেসম্যানের চিঠিতে আওয়ামী লীগসহ বেশ কটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ এবং এসব দলকে নির্বাচনের বাইরে রাখার ঘটনাটি কোনভাবেই বহুল প্রত্যাশিত নির্বাচন তথা গণতন্ত্রের জন্যে সহায়ক নয় বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে। ২৩ ডিসেম্বর লেখা এই চিঠিতে বলা হয়, “আমরা আশা করি, আপনার সরকার বা নির্বাচিত পরের সরকার এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে।” সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন করার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে দেয়া চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন উভয় পার্টির (রিপাবলিকান ও ডেমক্র্যাটিক পার্টি) কংগ্রেসম্যান গ্রেগরি ডব্লিউ মিকস, বিল হুইজেঙ্গা ও সিডনি কামলাগার-ডোভ, কংগ্রেসম্যান জুলি জনসন ও টম আর সুওজি। এর মধ্যে গ্রেগরি মিকস হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির সিনিয়র সদস্য এবং হুইজেঙ্গা ও মালাগার- ডোভ যথাক্রমে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান ও সদস্য। ‘হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির’ ওয়েবসাইটেও চিঠিটি প্রকাশ করা হয়েছে।
তারা নির্বাচনের আগে একটি রাজনৈতিক দলকে ‘নিষিদ্ধ’ করায় উদ্বেগ প্রকাশ করে লিখেছেন, একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করলে ভোটারদের একটি বড় অংশ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
চিঠিতে কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের নাম না নিয়ে এসব আইনপ্রণেতা বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় সংকটের সময় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনের ভূমিকার প্রতি তারা সমর্থন জানালেও, একটি বড় রাজনৈতিক দলকে বাদ দেওয়া মৌলিক মানবাধিকার এবং ব্যক্তিগত অপরাধের দায়বদ্ধতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। চিঠিতে বলা হয়, “আমরা আশা করি, আপনার সরকার বা নির্বাচিত পরের সরকার এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে।”
সব দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন আয়োজনে মার্কিন কংগ্রেসম্যানদের এ আহ্বান এমন এক সময়ে করা হয়েছে যখন চব্বিশের অভ্যুত্থান দমাতে গিয়ে হত্যাকান্ডসহ সন্ত্রাসী কাজের অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পরে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধনও স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। এতে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয় দেশের অন্যতম পুরনো দলটির। এটির ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকেও একই অভিযোগে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ছাত্র-জনতার সেই আন্দোলন ঠেকাতে ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে হত্যাকান্ড চালানোর অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাও করা হয়েছে। দলের প্রধান ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কয়েক ডজন হত্যাকান্ডের অভিযোগে মামলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অভিযোগের মামলায় শেখ হাসিনা ও তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে।
ইউনূসকে পাঠানো চিঠির কপি। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।
শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০২৪ সালের জানুয়ারির ভোটে নির্বাচিত দ্বাদশ সংসদ ভেঙ্গে দেওয়া হয়। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। আগের নির্বাচনের দুই বছর পর আগামী
২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টাকে লেখা কংগ্রেসম্যানদের চিঠিতে চব্বিশের আন্দোলন নিয়ে ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ১৪০০ জনকে হত্যার তথ্য তুলে ধরা হয়। সেসব হত্যাকান্ডে প্রকৃত অর্থে কারা জড়িত বা কী ধরনের গুলিতে হতাহতের ঘটনা বেড়েছে তা উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের আহবান জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়, এসব কর্মকান্ডসহ অন্যান্য ঘটনার জন্য প্রকৃত জবাবদিহি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মূল্যবোধের প্রতিফলন হওয়া উচিত; প্রতিশোধের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা নয়।
অন্তর্ভুক্তিমূলক না হওয়ায় বাংলাদেশে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না তুলে ধরে চিঠিতে তারা লেখেন, সংগঠনের স্বাধীনতার পাশাপাশি সম্মিলিত নয় বরং ব্যক্তিগত অপরাধ দায়বদ্ধতার নীতি মৌলিক মানবাধিকার।
“আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধী বা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বদলে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম পুরোপুরি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত এসব নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে আমরা উদ্বিগ্ন।”
চিঠিতে কংগ্রেসম্যানরা বলেন, ব্যালটের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে জনগণের মতামত প্রকাশের সুযোগ দিতে নির্বাচন আয়োজনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি অত্যন্ত জরুরি। একইভাবে সততা, স্বচ্ছতা ও নির্দলীয়ভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনার মাধ্যমে এগুলোর ওপর আস্থা ফেরাতে সংস্কার প্রয়োজন।
তারা সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম স্থগিত করা বা “ত্রুটিপূর্ণ” আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনরায় চালু করা এসব লক্ষ্যকে ক্ষুন্ন করতে পারে।
চিঠিতে কংগ্রেসম্যানরা জোর দিয়ে বলেন, একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে, যেখানে সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করতে পারবে।
প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন সরকারের নির্লিপ্ততায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা, লাশ নিয়ে উল্লাসের মধ্যে গাছে ঝুলিয়ে পুড়ে ফেলা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়ি-ঘর এবং আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটতরাজের পর বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে ফেলা এবং অনেক বাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে গত ১৫ মাস যাবত। ক্ষমতাসীনদের মদদে এহেন বর্বরতা-হিংস্রতা চলছে পুলিশ-প্রশাসনের সামনে। সেনাবাহিনীকেও নিরব থাকতে দেয়া যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ভয়ংকর এসব ঘটনার তথ্য প্রকাশের সাহস কেউই পাচ্ছে না। তবে সোস্যাল মিডিয়ায় তা প্রকাশ পাচ্ছে এবং মার্কিন আইন প্রণেতারাও তা অবাক বিস্ময়ে অবলোকন করছেন। তারই প্রকাশ ঘটলো কংগ্রেসে পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির শীর্ষ কর্মকর্তাগণের চিঠিতে।
Posted ৮:০০ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর