নিউইয়র্ক সিটির কুইন্সের জ্যামাইকায় বিডি ফ্রেশ সুপার মার্কেটের মালিক আবু চৌধুরী (৩৫)এবং তার স্ত্রী ইফফাত লুবনা (২৪)’র বিরুদ্ধে আরেক প্রবাসীকে মুক্তিপণের জন্যে অপহরণ এবং লাগাতারভাবে অকথ্য নির্যাতনের মামলা হয়েছে। এফবিআই তদন্ত শেষে এই দম্পতিকে গ্রেফতারের পর ১৮ ডিসেম্বর ব্রুকলীন ফেডারেল কোর্টে সুপর্দ করেছিল। মামলার উদ্ধৃতি দিয়ে নিউইয়র্কের ডেইলি নিউজ পত্রিকায় ২৯ ডিসেম্বর ‘কুইন্স বেঙ্গলি কিডন্যাপার্স থ্রিটেন্ড টু পোওর চিলি পাওডার ইন ভিকটিমস ওউন্ড: ফেডস’(Queens Bengali kidnappers threatened to pour chili powder in victim’s wounds: feds ) শিরোনামে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। নিরাপদ আশ্রয়ে সুন্দর ভবিষ্যত গড়ার স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পরই বাংলাদেশের একটি কলেজের পূর্ব পরিচিত সুন্দরী ইফফাত লুবনার সহায়তা চাইতে গিয়ে উল্টো অপহৃত এবং প্রাণনাশের হুমকির শিকার এই ২৩ বছর বয়েসী যুবকের নাম নিরাপত্তার কারণে প্রকাশ করা হয়নি। উল্লেখ্য, বিডি ফ্রেশ সুপার মার্কেটের অন্যতম এই মালিক দম্পতির সাথে আরো কয়েকজনকে এর আগে আরো দুই প্রবাসীকে অপহরণের মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছিল। সে সব মামলায় জামিনে থাকাবস্থায়ই তৃতীয় এই প্রবাসীকে ফাঁদে ফেলে অপহরণ ও মুক্তিপণের জন্যে নির্দয় নির্যাতন চালানোর ঘটনা ঘটলো।
ব্রুকলীন ফেডারেল কোর্টের কৌশলীরা আরো জানান, আবু চৌধুরীর গাড়িতে হাত-পা বেধে বেশ কদিন আটকের সময় ঐ প্রবাসীকে বেধড়ক মারপিট করা হয়। বাংলাদেশে তার বাবাকে ফোন করানো হয় অবিলম্বে মুক্তিপণের অর্থ প্রদান এবং পুত্রের জন্যে বিমানের টিকিট পাঠানোর দাবিতে। উল্লেখ্য, যুবকটি ২০২৩ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রে এসে জ্যামাইকার লুবনার সহায়তা চেয়েছিলেন। লুবনা নিজ এপার্টমেন্টে তাকে থাকার ব্যবস্থা করেন। একটি চাকরি সংগ্রহ করে দেয়ার অঙ্গিকার করেছিলেন। এ সময় যুবকটির পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ সকল কাগজপত্র নিজের কব্জায় নিয়ে নেন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি, বাংলাদেশ থেকে যত ডলার এনেছিলেন সেগুলোও লুবনা নিজের কাছে রাখার জন্যে নিয়ে নেন। এসাইলামের আবেদনের সব ব্যবস্থা করার কথাও বলেছিলেন লুবনা। উল্লেখ্য, লুবনার এপার্টমেন্টে বসবাস শুরুর পরের মাসেই লুবনা তার বয়ফ্রেন্ড (তখোনও আবুর সাথে বিয়ে হয়নি লুবনার) আবু সহ তার চক্রের ৫/৬ জনকে নিয়ে নবাগত এই যুবককে নিজ গাড়িতে আটক রাখেন। যুবকটিকে হত্যার হুমকি দিয়ে বাংলাদেশে তার বাবার কাছে ফোন করানো হয় টাকার জন্যে। এমনি অবস্থায় আরেকটি আবু চৌধুরী তার গাড়িতে যুবকটিকে মারধোরের পর হাতের তালুকে ছিদ্র করা হয়। এক পর্যায়ে শাহ শহিদুল চৌধুরী নামক আরেক অপহরণকারিকে ফোন করে একটি ধারালো স্ক্রু ড্রাইভারসহ মরিচের গুড়া আনতে বলা হয়। ওদের কথা অনুযায়ী টাকা না পাওয়া পর্যন্ত কাটা তালুতে মরিচের গুড়া দিয়ে আরো বেশী কষ্ট দেয়ার হুমকি দেয় আবু ও লুবনা। যথারীতি শাহ চৌধুরী অকুস্থলে চলে আসে। সে সময় ধারালো ছুরি দিয়ে যুবকটিকে কেটে টুকরো টুকরো করার হুমকি-ধামকিও দেন লুবনা। তাকে অসহনীয় যন্ত্রণার মাধ্যমে হত্যা না করা পর্যন্ত লুবনা স্বস্তি পাচ্ছেন না বলেও উল্লেখ করেন সে সময়। স্ক্রু ড্রাইভার চোখ ও কানে ঢুকিয়ে রক্তাক্ত করার পর সেখানেও লবন ও মরিচের গুড়া ছিটিয়ে দেয়ার হুমকি দেন আবু ও লুবনা। যুবকটির আর্তচিৎকারের সময় লুবনা আরো উল্লেখ করেন যে, তার মতো মানুষের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার কোন অধিকার নেই। সুতরাং তাকে মরতেই হবে। সেই শাহ-কেও এফবিআই গ্রেফতার করেছিল। মামলার বিবরণে আরো প্রকাশ, যুবকটিকে অকথ্য নির্যাতনের চিত্র আবু চৌধরী নিজের মোবাইলে ধারণ করেছেন। এর আগেও অপহৃত দু’জনকে নগ্ন করে নির্যাতনের ভিডিও ধারণের অভিযোগ রয়েছে দায়েরকৃত মামলায়।
এফবিআই এই চক্রের নাম দিয়েছে ‘বাঙালি ছিনতাই চক্র’। ২০২৩ সালের ১৩ মে পর্যন্ত বন্দি ছিলেন যুবকটি। মুক্তি দেয়া হলেও তার পাাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ সকল কাগজপত্র আটক রাখা হয়। হুমকি দেয়া হয়, এই ঘটনা যদি সে কাউকে বলে তাহলে নিশ্চিত খুন হবে সে। আদালতে তথ্য অনুযায়ী, ১৩ মে এই যুবককে নানা শর্তে ছেড়ে দেয়ার পর একইবছরের জুলাই মাসে আরেক বাঙালি যুবক এবং এ বছরের জানুয়ারিতে মুক্তিপণ দাবিতে আরেক বাঙালিকে অপহরণ করেছিল এই চক্র। সে সব মামলাও বিচারাধীন রয়েছে। সর্বশেষ মামলায় আবু চৌধুরী আড়াই লাখ ডলার এবং লুবনা জামিন লাভ করেছেন লাখ ডলার বন্ডে। অপরদিকে, শাহ শহিদুল চৌধুরী গত বুধবার দেড় লাখ ডলার বন্ডে জামিন লাভ করেছেন বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে। এই চক্রের অপর সদস্যরাও জামিনে আছে এবং তারা হচ্ছে সৈয়দ রুবেল আহমেদ (৪৩), শাহেদ আলম (২৯), আঞ্জু খান (২৮)এবং সুলতানা রাজিয়া (৩৮)। সকলের বাড়ি সিলেট ও বৃহত্তর ঢাকায় বলে জানা গেছে।
নিউইয়র্ক সিটির কুইন্সে এই দুর্বৃত্তচক্র ছাড়াও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সাথে সম্পর্কের সুবাদে আরেকটি চক্র বহু প্রবাসীকে বাড়ি ক্রয়ের টোপ দিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। সে সব নিয়েও কুইন্স ক্রিমিনাল কোর্টে মামলা চলছে। এই চক্রের সদস্যদের মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মঞ্চেও দেখা যায় অতিথি হিসেবে। এমনকি, তাদেরকে ‘কম্যুনিটি লিডার’ হিসেবেও পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে। এভাবেই চক্রটি সহজ-সরল প্রবাসীদের সর্বশান্ত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্বব্যাপী বিমান দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে চলায় ২০২৪ সালটি বিমান পরিবহন খাতের জন্য একটি অশনি সংকেত বহন করে এসেছে। বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, বিভিন্ন দেশে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে, যাতে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। সালটি বিমান চলাচলের ইতিহাসে একাধিক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনাগুলো যাত্রী সুরক্ষা এবং বিমান চলাচল ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলো…
জানুয়ারি: জাপানের টোকিও বিমানবন্দরে সংঘর্ষ বছরের শুরুতেই, ২ জানুয়ারি, জাপানের টোকিও বিমানবন্দরে জাপান এয়ারলাইন্সের একটি এয়ারবাস এ৩৫০-৯০০ অবতরণের সময় কোস্টগার্ডের একটি বিমানের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এই ঘটনায় কোস্টগার্ডের ৫ জন কর্মী নিহত হন, তবে যাত্রীদের সবাই প্রাণে বেঁচে যান। তদন্তে অবতরণ প্রক্রিয়ায় ভুল বোঝাবুঝি এবং যোগাযোগে ত্রুটির কথা উঠে আসে।
আগস্ট: ব্রাজিলে বিমান বিধ্বস্ত ৯ আগস্ট ব্রাজিলের ভিনহেডো শহরে ভিওপাস এয়ারলাইন্সের একটি এটিআর ৭২-৫০০ বিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আবাসিক এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। বিমানে থাকা ৬২ জন আরোহীর সবাই প্রাণ হারান। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, পূর্বে সনাক্ত হওয়া কারিগরি ত্রুটি যথাযথভাবে সমাধান না করায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
ডিসেম্বর: একের পর এক দুর্ঘটনা ডিসেম্বর মাসে বিমান চলাচল আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে ৮টি বিমান দুর্ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে ২৯ ডিসেম্বর ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ।
দক্ষিণ কোরিয়া: মুয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জেজু এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ অবতরণের সময় দুর্ঘটনায় পড়ে। বিমানে থাকা ১৮১ জনের মধ্যে ১৭৯ জন নিহত হন। পাখির আঘাত এবং খারাপ আবহাওয়াকে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে।
কানাডা: দেশটির হ্যালিফ্যাক্স বিমানবন্দরে ঘটল বিমান দুর্ঘটনা। অবতরণের সময় বিমানের একটি অংশে আগুন লেগে যায় বলে খবর। হতাহতের খবর না মিললেও আতঙ্কে রয়েছেন ক্রু সদস্য-সহ যাত্রীরা। দক্ষিণ কোরিয়ান মুয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান দুর্ঘটনার মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে ঘটে এই ঘটনা।
আজারবাইজান: ২৫ ডিসেম্বর আজারবাইজান এয়ারলাইন্সের একটি এমব্রেয়ার ইআরজে-১৯০এআর বিমান কাজাখস্তানের আকতাউ বিমানবন্দরের কাছে অবতরণের আগে বিধ্বস্ত হয়, যাতে ৩৮ জন নিহত হন।
ডিসেম্বর মাসে এই ছয়টি দুর্ঘটনায় মোট ২৩৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যা বছরের শেষ মাসটিকে বিমান চলাচলের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তুলেছে।
২০২৪ সালে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনাগুলো বিমান চলাচল নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেছে।
এই দুর্ঘটনাগুলোর প্রভাব বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মানবিক ক্ষতির পাশাপাশি বিমান পরিবহন খাতেও গভীর প্রভাব পড়েছে। অসংখ্য মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি বিমান সংস্থাগুলোকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, এই দুর্ঘটনাগুলোর ফলে মানুষের মধ্যে বিমান যাত্রার প্রতি আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বিমান পরিবহন খাতে মন্দা সৃষ্টি করতে পারে।
ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে বিশেষজ্ঞরা বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছেন। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিমান দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন তারা। পাশাপাশি পাইলটদের আরও ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং আবহাওয়া সম্পর্কিত তথ্য আরও সঠিকভাবে সংগ্রহ করে পাইলটদের সতর্ক করার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিমান দুর্ঘটনা একটি জটিল সমস্যা এবং এর সমাধানের জন্য সবার যৌথ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। প্রযুক্তিগত ত্রুটি, মানবিক ভুল এবং প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা মোকাবেলায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়।
১ জানুয়ারি (বুধবার) শুরু হচ্ছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা (ডিআইটিএফ)-২০২৫। পূর্বাচলের বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে (বিসিএফসি) এই মেলার উদ্বোধন করবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) জানিয়েছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইপিবির যৌথ উদ্যোগে আগামী ১ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ১০ টায় পূর্বাচল নতুন শহরের বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে ২৯তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার উদ্বোধন করবেন প্রধান উপদেষ্টা। মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, হাতুড়ি-পেরেকের ঠক ঠক শব্দ, কেউ ছুটছে কাঠ আর বোর্ড নিয়ে, কেউবা দিচ্ছেন রং তুলির আঁচড়, শেষ মুহূর্তের ঝালাই; সব মিলে পূর্বাচলে বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে চলছে শেষ মুহূর্তের কর্মযজ্ঞ। গত বছর নির্বাচনের কারণে ২০ দিন পিছয়ে শুরু হওয়ায়, প্রস্তুতি কিংবা ব্যবসায় যে ভাটা পড়েছিলো, এ বছর তা কাটাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে মেলায় অংশ নিতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখন শেষ সময়ের প্রস্তুতি চলছে। ভেতরের কাজ শেষে প্যাভিলিয়ন বা স্টল সাজানো হচ্ছে।ৎ
দেশি-বিদেশি মিলে এবার স্টল ও প্যাভিলিয়নের সংখ্যা থাকছে ৩২৭টি। বাংলাদেশ বাদে সাতটি ভিন্ন দেশের মোট ১১টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেবে এবারের আসরে। ২০২৫ সালের বাণিজ্য মেলায় যুক্ত হচ্ছে বেশকিছু নতুনত্ব। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের সম্মানার্থে তৈরি করা হচ্ছে শহীদ মুগ্ধ ও আবু সাঈদ কর্নার এবং তারুণ্যের প্যাভিলিয়ন।
তবে অপরিবর্তিত থাকছে প্যাভিলিয়ন, স্টল বা রেস্টুরেন্টের স্পেসের ফ্লোর মূল্য বা ভাড়া। টিকেটের জন্য প্রাপ্ত বয়স্কদের গুণতে হবে ৫০ টাকা। ১২ বছরের নিচে হলে টিকেট মূল্য অর্ধেক। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক মাহমুদুল হাসান বলেন, এ বছর পুরো বরাদ্দ প্রক্রিয়া হয়েছে অনলাইনে। তবে গত বছরের মতো একই ফ্লোর মূল্য বা ভাড়া রাখা হয়েছে এবারও।
মেলার আয়োজক রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর প্রত্যাশা নতুনত্বের ছোঁয়ায় এ বছর আরও আকর্ষণীয় হবে বাণিজ্য মেলা। মাহমুদুল হাসান আরও বলেন, জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণভাবে মেলার সার্বিক কার্যক্রম সাজানো হয়েছে। প্রথমবারের মতো এবার বাণিজ্যমেলায় প্রবেশের জন্য থাকছে অনলাইনে টিকেট কাটার ব্যবস্থা। শিশুদের জন্য হচ্ছে প্রযুক্তি ভিত্তিক শিশু পার্ক।
উল্লেখ্য, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইপিবির যৌথ উদ্যোগে ১৯৯৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশীয় পণ্যের প্রচার, প্রসার, বিপণন, উৎপাদনে সহায়তার লক্ষ্যে বাণিজ্য মেলা রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে আয়োজন করা হতো। করোনা মহামারির কারণে ২০২১ সালে মেলা আয়োজন করা হয়নি। আর মহামারির বিধিনিষেধের মধ্যে ২০২২ সালে প্রথমবার মেলা পূর্বাচলে বিবিসিএফইসিতে আয়োজন করা হয়।
বিজয় দিবস উপলক্ষে ২৮ ডিসেম্বর রাতে নিউইয়র্ক সিটির ব্রুকলীনে নবগঠিত ‘আমরা মুজিব’ নামক সংগঠনের ব্যানারে অনুষ্ঠিত আলোচনা সমাবেশে টেলিফোনে প্রদত্ত বক্তব্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও আন্দোলনের মুখে পালিয়ে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জঙ্গিবাদের রাহুমুক্ত হয়, অত্যাচার নির্যাতনের হাত থেকে যেন বাংলাদেশ মুক্তি পায়, মানুষের জীবনে আবার শান্তি ফিরে আসে, তারজন্যে সকলকে একযোগে কাজের আহবান জানাচ্ছি। সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করেন। দেশের ভেতরে যারা নির্যাতিত, তাদের পাশে দাঁড়ান। সহযোগিতা করেন। কারণ সমস্ত বাংলাদেশটাই একটা কারাগারে পরিণত হয়েছে। কোন মানুষের কোন অধিকার নেই। এহেন অবস্থা থেকে মানুষকে মুক্ত করতে হবে। আর বাংলাদেশের যে কোন প্রয়োজনে সবসময় প্রবাসীরা বিশেষ অবদান রেখে যায়, আপনারাও রেখেছিলেন। কাজেই আপনারা এখনও ঐক্যবদ্ধ থাকবেন-এ অনুরোধ সবার প্রতি।
এই বক্তব্যের আগেই মিশিগানে আওয়ামী লীগের এক সমাবেশে শেখ হাসিনা বক্তব্য দিয়েছেন। সেটি উল্লেখ করেন এবং তা শোনার আহবান জানান। একথা বলেই জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেন শেখ হাসিনা। এ সময় সমাবেশস্থল গর্জে উঠে ‘শেখ হাসিনা ভয় নাই-রাজপথ ছাড়ি নাই’ স্লোগানে। টেলিফোনে এ বক্তব্যের সমন্বয় করেন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান এবং নুরল আমিন বাবু। এ সময় পাশে ছিলেন ‘আমরা মুজিব’র নেতা আবু তাহের, আবুল হাসান মহিউদ্দিন, আব্দুল হামিদ প্রমুখ। এর আগে জাতীয় সঙ্গীতের পর মুক্তিযুদ্ধে সকল শহীদ, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের সকল শহীদ, জাতীয় চার নেতার আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সকলে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করেন।
বিজয় দিবস উপলক্ষে ‘আমরা মুজিব’র আলোচনা সভায় সুধীর একাংশ। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪।
বিজয় দিবসের প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশে ধর্মীয় জঙ্গিবাদের উত্থান ইত্যাদি প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় অংশ নেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান, সহ-সভাপতি শামসুদ্দিন আজাদ এবং জয়নাল আবেদীন, বাংলাদেশ মুসলিম সেন্টারের সভাপতি আলহাজ্ব আবুল হাসেম, বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতা রেফায়েত চৌধুরী, সন্দ্বীপ এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি নূরল আমিন এবং সাবেক সেক্রেটারি আনোয়ার হোসেন সেলিম প্রমুখ। সমাবেশে হাজির হয়ে নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম ও প্রথম বাংলাদেশী আমেরিকান কাউন্সিলওম্যান শাহানা হানিফ সকলকে বিজয় দিবস উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানান এবং নিজেদের অধিকার ও মর্যাদা আদায়ে মার্কিন রাজনীতি ও নির্বাচনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ার উদাত্ত আহবান জানান।
বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীর এ সমাবেশে বিশিষ্টজনদের মধ্যে আরো ছিলেন বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের যুক্তরাষ্ট্র শাখার সভাপতি আব্দুল কাদের মিয়া, চট্টগ্রাম সমিতির বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হানিফ, বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সেক্রেটারি নজরুল ইসলাম, নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ চৌধুরী, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাসুদুল হাসান প্রমুখ। সমাবেশের আগে ব্রুকলীনের ম্যাকডোনাল্ড এভিনিউর ওপর একটি ভবনে ‘আমরা মুজিব’র স্থায়ী অফিসের উদ্বোধন করা হয়।
ক্রস ফায়ারের নামে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডে লিপ্ত বহুল বিতর্কিত র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান ১২ ডিসেম্বর সংস্থাটির বর্বরতার জন্যে দুঃখপ্রকাশ এবং প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করলেও যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট তা গ্রাহ্য করেনি।
২৭ ডিসেম্বর (শুক্রবার) ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট তথা মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল’ তথা ওএফএসি কর্তৃক ঘোষিত স্যাঙ্কশন তথা অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার তালিকায় র্যাবের শীর্ষস্থানীয় ৬ কর্মকর্তা রয়েছেন। এছাড়াও বাংলাদেশভিত্তিক সন্ত্রাসী সংস্থা ‘আইসিস’, জামাতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশ, ইসলামিক স্টেট ইন বাংলাদেশ, জেএমবি, ক্যালিফ্যাট ইন বাংলাদেশ ছাড়াও আল হারমাইনের বাংলাদেশ শাখা ও আল ক্বায়েদার অর্থে পরিচালিত ‘আরআইএইচএস’র নামও রয়েছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে সরব ‘আল ক্বায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্ট’ও রয়েছে সর্বশেষ এই নিষিদ্ধের তালিকায়। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংস্থা ও ব্যক্তিগণের জন্ম তারিখসহ ঠিকানাও রয়েছে। উল্লেখ্য, মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারি দেশ, ব্যক্তি, সংস্থা, সংগঠনকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা হয়। এসব ব্যক্তি, সংস্থা অথবা সংগঠনের কোন তহবিল যুক্তরাষ্ট্রে থাকলে সেগুলোও বাজেয়াপ্ত করা হয়। তারা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রাপ্তি থেকেও বঞ্চিত থাকেন। স্যাঙ্কশন প্রাপ্ত র্যাবের কর্মকর্তারা হলেন : বেনজির আহমেদ, মো. আনোয়ার লতিফ খান, খান মোহাম্মদ আজাদ, চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, মোহাম্মদ জাহাঙ্গির আলম এবং মোস্তফা সরোয়ার তোফায়েল।
আইএসআইএস বাংলাদেশ, জামাতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশ, ইসলামিক স্টেট ইন বাংলাদেশ তথা জেএমবি কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আরোপের সর্বশেষ তালিকাটি ২৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়েছে। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪।
ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যাবার পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছে। এরপরই র্যাবের মহাপরিচালক প্রকাশ্যে বিবৃতির মাধ্যমে অতীতের সকল কর্মকান্ডের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকের ধারণা ছিল যে, নিষিদ্ধ তালিকা থেকে হয়তো র্যাবকে অব্যাহতি প্রদান করা হবে। সেটি তো ঘটলোই না অধিকন্তু বেশ কটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংস্থার নামও উদঘাটিত হলো-যারা বাংলাদেশ এবং পাক-ভারত উপমহাদেশে কর্মকান্ড পরিচালনা করছে।
প্রথমেই ইসকন নিয়ে কিছুকটা আলোচনা করা যাক । এই মুহূর্তে দেশে এবং দেশের বাহিরে ইস কন ও বাংলাদেশ শাখার প্রধান গ্রেপ্তারকৃত চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে নিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় চর্চা হচ্ছে । ইস্কন একটি ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন । ৫০ পূর্বে ১৯৬৬ সালে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে ইসকনের প্রতিষ্ঠা । সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ । ইস্কন মুলত বৈষ্ণব ধর্মের একটি অংশ ও ভগবান কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে তাদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় । ভক্তিযোগ বা কৃষ্ণভাবনামৃত সংস্কৃতি হাজার বছর ধরে শুধুমাত্র ভারতবর্ষের মধ্যেই সিমা্বব্ধ ছিল । তবে সময়ের ব্যবধানে বিশ্বের বহু দেশে সম্প্রসারণ ঘটেছে ইসকনের।
ইসকনের প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে মন্দির নির্মাণ ,শ্রীমদ্ভগবদগীতার শ্রীকৃষ্ণের বাণী প্রচার, ধর্মীয় উপদেশ দেওয়া ,ভক্তি কার্যক্রম এবং দাতব্য সংস্থা পরিচালনা । মন্দির রক্ষণাবেক্ষণ ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনও করে থাকে ইস্কন । সংস্কৃতি চর্চার অংশ হিসেবে যোগব্যায়াম ও জীবনযাত্রার উপর শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম করে থাকে সংগঠনটি । তাহাছারা দরিদ্রদের জন্য বিনামূল্যে নিরামিষ খাবারও বিতরণ করে থাকে ইস্কন । পশ্চিমা দেশসহ বিশ্বের নানাদেশে ইস্কনের লাখো ভক্ত ছড়িয়ে আছে । এদের মুল নাম ছাড়াও ইস্কনের ভক্ত হিসেবে পৃথক একটি নাম দেওয়া হয়ে থাকে । ইসকনের বিরুব্ধে বাংলাদেশের মৌলবাদীরা যে জঙ্গিবাদের অভিযোগ তুলেছেন তা তারা নিজেদের দিকটা ডাকা দেওয়ার জন্যই বলে থাকেন ,এমনটাই দাবী করে থাকেন অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ । তাদের মতে, আমেরিকা ও ইউরোপ যেখানে ধর্মীয় জঙ্গিবাদের বিরুব্ধে নয়-এগারর পর থেকে লড়ে যাচ্ছেন ,সেই সকল দেশে ইসকনের কর্মকাণ্ড নিসিব্ধ বা উপড়ে ফেলা হতো । বরং এ সকল পশ্চিমা বিশ্বে দিনে দিনে ইসকনের জনপ্রিয়তা ও প্রসারণ ঘটেছে । শুধু তাই নয়, ইস্কনের বিখ্যাত ভক্তদের মধ্যে অনেকেই বিলাসবহুল জীবন ত্যাগ করে ব্রহ্মচারীর জীবন বেচে নিয়েছেন ।ইস্কনের বিখ্যাত ও কোটিপতি সদস্যদের মধ্যে আছেন ফোরড মোটরসের মালিক হেনরি ফোরডের প্রপৌত্র অ্যালফ্রেড ফোরড ,দ্য বিটলসের অন্যতম মুখ জর্জ হ্যারিসন ,কবি অ্যালেন গিনসবারগ এবং অ্যাপেলের প্রাক্তন সিইও স্টীভ জবস এবং বর্তমান ট্রাম প্রশাসনের গোয়েন্দা প্রধানের দায়িত্বে আছেন আমেরিকান হিন্দু তুলসী গ্যাবাড। তিনিও একজন ইসকনের ভক্ত ও সদস্য । বিখ্যাত মানুষদের সমাবেশ যেমন হয়েছে ইসকনে ,তেমনই নানা সময়ে বিতর্কেও জড়িয়েছে ইস্কন । যেমন সংঘ-প্রতিষ্ঠার গোঁড়ার দিকে সিঙ্গাপুরে ইসকন নিসিব্ধ থেকেছে দীর্ঘকাল ।সংঘটির রেজিস্ট্রেশন আটকিয়ে রাখা হয়েছিল । তবে অন্য নাম নিয়ে সেদেশে শুরু হয় ইসকনে্র কর্মকাণ্ড । সেখানে একটি মন্দির আছে । ইস্কন ভক্তরা সেখানে খোলাখুলিভাবে কাজ করেন । সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট চীনে দীর্ঘদিন ইসলামসহ সকল ধর্মীয় কর্মকাণ্ড নিসিব্ধ ছিল । সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গার পর সেই সকল দেশে ইসকন সহ সকল ধর্মের কর্মকাণ্ড নূতনভাবে শুরু হয় । এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে এখনও ইস্কন তার কর্মকাণ্ড চালাতে পারেনি ঐ সকল দেশের বিধিনিষেধর কারণে । তবে পাকিস্তানে ইস্কনের অন্তত ১২ টি মন্দির রয়েছে বলে সংঘটি দাবি করে ।
বাংলাদেশে ইসকনের কারযকলাপ নিয়ে বলা হচ্ছে যে তারা উগ্র এবং জঙ্গি ধর্মীয় সংগঠন । এটা বলা একেবারেই উচিত নয় ।তারা হয়তো ধর্মীয় রক্ষণশীল সংগঠন কিন্তু রক্ষণশীলতার প্রচার বিভিন্ন ধর্মের অনেক সংগঠনই করে থাকে । বাংলাদেশে ইসকনের বিরুব্ধে যে মুল অভিযোগটা নানা সময়ে ওঠে , তা হলো ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাদের ব্যাপক ভক্ত সংখ্যা থাকায় তারা সেটাকে কাজে লাগিয়ে নানা সময়ে বাংলাদেশের নানা ইস্যুকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে ।ভারতের হস্তক্ষেপ চেয়েছে । সম্প্রতি বাংলাদেশ ইস্কনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু সন্ন্যাসীর মুখে ভারতে মুলত বিজেপি নেতা কর্মী সমর্থকদের মধ্যে প্রচারিত জয় শ্রী রাম শ্লোগান শুনতে পাওয়া এই ভারত যোগের অভিযোগ দৃঢ় হয় । এখানে ইসকনের সাথে ভারতের সম্পর্কের ব্যাপারটিই মুখ্য হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক বাংলাদেশ রাজনীতির ভারত-বিরুধি প্রবণতার প্রভাবে ,এমনটাই অনেকে মনে করেন ।
এবার মৌলবাদীদের জঙ্গিপনা বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক । গত ৫ই আগস্টের পর স্বভাবতই আর্মি ব্যাকড ডঃ ইউনিসের পোস্টার সরকারের মুল চালিকাশক্তি জামায়াত ইসলামী । এই জামায়াত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি যাদুঘর সহ আওয়ামী তথা ৭১ এর মুক্তিযুব্ধের চেতনার পক্ষের অসংখ্য স্থাপনা ধ্বংস করেছে । খুন করেছে আওয়ামীলিগাদের । খুন করেছে পুলিশকে , আনসারকে । আর বাই ডিফল্ট আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক মনে করা হিন্দুদেরকে গণহারে আগুন-হত্যা- ধর্ষণ সব ধরনের অত্যাচারই করেছে, তা এখনও চলমান । কিন্তু তাদের ধ্বংসাত্মাক কর্মকাণ্ড এই ধারায়ই সীমাব্বধ নেই । আওয়ামী বিরোধী রাজনীতি করা লোকজনও তাদের হাতে আক্রান্ত হচ্ছে । পাহাড়ের সমীকরণ বাদই দিলাম, বাম সমীকরণও বাদ দিলাম । কিন্তু পীরদের দরগাহও আগুন , ভাংচুরের শিকার হচ্ছে । তারাও তো আওয়ামী বিরোধী । তাদেরকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছ ।
একদিকে জামায়াত-শিবির যেমন মুক্তিযুব্ধের পক্ষের মানুষদের আক্রমণ ও মুক্তিযুব্ধের চেতনা ধ্বংসের মাধ্যমে ৭১ এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিচ্ছে । পাশাপাশি তারা অন্যান্য ইসলামিক দলগুলিকে নিয়ে ভবিষৎ ক্ষমতায় যাওয়া ও ইসলামি খেলাফত কায়েমের স্বপ্ন দেখছে । জামায়াত-শিবির ইউনুস সরকারকে সামনে রেখে এবং এই সরকারের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে একদিকে যেমন বিএনপি র নেতাকর্মীরা পরিবহন সেক্টর থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের ইজারা ঘাট পর্যন্ত দখল বানিজ্যে ব্যাস্ত , তখন অন্যদিকে জামায়াত-শিবির ,ছাত্র জনতার অন্তরালে সমন্বয়কের ভূমিকায় থেকে প্রশাসনে নিজেদের লোক বসিয়ে প্রশাসনকে সাজাচ্ছে । এই কাজে তারা সফলও হয় । উপমহাদেশের বাংলাদেশ অংশের আল-কায়েদা জঙ্গিনেতা যার বিরুব্ধে অসংখ্য খুনের মামলা আছে , সেই জসিমুদ্দিন রাহমনি সহ অসংখ্য আনসারুল্লাহ বাংলা টিম , হিযবুত তাহরির , জে এম বি ( জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ ) এর ভয়ঙ্কর জঙ্গি নেতা কর্মীদের জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় । পুলিশের হিসাব মতে, নরসিংদী জেল সহ দেশের বিভিন্ন জেল থেকে তিন হাজারের অধিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে জঙ্গিরা পালিয়ে যায় । পুলিশ এ পর্যন্ত এগারশ আগ্নেয়স্ত্র উব্ধার করতে সমর্থ হয় । বাকিগুলি এখনো উব্ধার করা সনভব হয়নি ।
পাঠক, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে সেই বাংলা ভাই এর কথা মনে আছে( আসল নাম সিদ্দিকুর রহমান ) ? সেই বাংলা ভাই ও শাখায়ক আব্দুর রহমান দুই জঙ্গি নেতা উত্তর বঙের রাজশাহীর বিস্তৃন অঞ্চল জুড়ে নিয়মতান্ত্রিক সরকারের পাশাপাশি প্যারালাল জঙ্গি তালেবানি শাসন কায়েম করে অসংখ্য বাম , মুক্তিযুব্ধা ও প্রগতিশীল নেতা কর্মীদের হত্যা করে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল । তারাও এক সময় শিবিরের ক্যাডার ছিলেন । বিগত আওয়ামী সরকারের পনর বৎসরের শাসনামলে বিভিন্ন সময়ে জেএমবি বা আনসারউল্লা বাংলা টিমের যে সকল জঙ্গি ধরা পরেছে বা পুলিশের গুলিতে মারা গেছে ,পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসে এক সময় তাদের অনেকে জামায়াত-শিবিরের সাথে সম্প্রীত ছিল । ২০০৪ সালে জামায়াত-শিবিরের একযুগে একই সময়ে সারাদেশের ৬৩ টি জেলায় বোমা হামলা চালিয়ে শক্তি প্রদর্শনের কথা দেশের মানুষ কি ভুলে গেছে ? মানুষ ভুলেগেছে কি শিবিরের রগ কাটার রাজনীতি কথা?
ইস কনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চ ও বাংলাদেশ সম্মিলিত সংখ্যালঘু জোট নামে দ্যুটি সংগঠন বর্তমানে সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের ব্যানারে সংখ্যালঘুদের ৮ দফা দাবি নিয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করছে দীর্ঘ দিন ধরে । সেই জোটের মুখপাত্র করা হয়েছে চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুকে ।গত ২৫ ষে অক্টোবর চত্রগ্রামে ৮ দফা দাবিতে মহা সমাবেশ করেছিল বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চ । সেই সমাবেশে ভাষণ দিয়েছিলেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভু । সেই সমাবেশে দুই লক্ষাধিক মানুষের সমাগমে ৭১এর পরাজিত শক্তির দোসরা গাবরে যায় । তারপর ৩১ অক্টোবরে চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভু সহ ১৯ জনের বিরুব্ধে সেই সমাবেশে জাতীয় পতাকার অবমাননার দায়ে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করেন বিএনপির স্থানীয় নেতা ফিরোজ খান । পরবর্তীতে সরকার উদ্দশ্যপ্রনিতভাবে সেই মামলায় চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুকে গ্রেপ্তার করেন । সেই সাথে সনাতনীরা প্রশ্ন রাখেন, দ্বিতীয় স্বাধীনতার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে কিংবা পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়েদা আজমের ছবির নীচে পাকিস্তানের পতাকা ও বাংলাদেশের পতাকা টাঙ্গিয়ে তাদের দিবস পালন করা হয়, তখনকি আমাদের জাতীয় পতাকার অবমাননা হয়নি ?
বিভিন্ন সময়ে জঙ্গিরা পতাকা বিছিয়ে নামাজ পড়তে দেখা গেছে বা ৫ই আগস্টের পর বিভিন্ন সময়ে আগস্ট বিল্পবের সমর্থকেরা পতাকা ,জাতীয় সংগীত ,বদলের দাবি তুলেছেন , তখন কি জাতীয় পতাকা বা সঙ্গীতের অবমাননা হয়নি ? কিংবা মৌলবাদী জামায়াত-শিবিরের মিছিল থেকে যখন শ্লোগান দেওয়া হয় একটা করে ইসকন ধর ,একটা করে জবাই কর / একটা করে হিন্দু ধর , একটা করে জবাই কর । কই এই সাম্প্রদায়িক উসকানর জন্য কারো বিরুব্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হয়েছে বলে জানা নেই । অথবা বিজয় দিবসে জয় বাংলা শ্লোগান দেওয়ার অপরাধে দুই যুবকে পিটিয়ে হত্যা করে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী গং দের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তা জানা নেই । কাজেই ইসকন নয় ,জামায়াত-শিবির মৌলবাদী সংগঠনগুলিকে নিসিব্ধ করতে হবে ইহা সময়ের দাবী ।
নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিল ডিসট্রিক্ট-২৫ এর কাউন্সিলম্যান প্রার্থী শাহ্ শহীদুল হকের তহবিল সংগ্রহের ডিনার ৬ জানুয়ারি সোমবার সন্ধ্যা ৬ টায় সানাই রেস্টুরেন্ট এন্ড পার্টি হলে (৩৭-৪৩ ৭৪স্ট্রিট, জ্যাকসন হাইটস, নিউইয়র্ক ১১৩৭২) অনুষ্ঠিত হবে।
জ্যাকসন হাইটস, উডসাইড এবং ইস্ট এলমহার্স্টকে প্রতিনিধিত্বকারী ডিসট্রিক্ট ২৫ থেকে বাংলাদেশী প্রার্থী হিসেবে শাহ শহীদুলের এ আয়োজনে সকলকে সাদর আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য, ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট, ইউএসএর সভাপতি শাহ্ শহীদুল হক গত ৩০ বৎসর যাবৎ আর্ত-মানবতার সেবায় নিয়োজিত থেকে মানব সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। তিনি ২০২১ সালের সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে ডিসট্রিক্ট ২৫ থেকে উল্লেখযোগ্য সমর্থন অর্জন করেছিলেন।
আসছে ২৪ জুন সিটি কাউন্সিলের প্রার্থী বাছাইয়ের এ নির্বাচনে শাহ্ শহীদুল হকের এ প্রচারণায় সমর্থন জানাতে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, শিল্পী, লেখক, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ রাজনীতিবিদরা একত্রিত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেছেন, ‘রাজনৈতিকভাবে প্ররোচিত সরকার শেখ হাসিনাকে ফাঁসি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই তার ওপর অত্যাচারের খড়গ নেমে আসে।’ শুক্রবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে অজ্ঞাত স্থান থেকে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় এসব কথা বলেন তিনি।
আত্মগোপনে থাকা এ আওয়ামী লীগ নেতা বক্তব্যের শুরুতে বলেন, ‘আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে এসেছি। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি আমাদের সকলকে ব্যথিত করে তুলেছে। শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে দেশের জনগণ হাসফাস করছে। আজ জনগণের সামনে একটি প্রশ্ন- বাংলাদেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? কোনদিকে যাচ্ছে?’
তিনি বলেন, ‘দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শেখ হাসিনা পরিচালিত সরকারকে হটিয়ে বাংলাদেশ তার গতিমুখ হারিয়েছে। আর্থ সামাজিক, অর্থনীতিক অগ্রগতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বারবার প্রশংসিত বাংলাদেশ আজ অস্থিতিশীলতার চোরবালিতে ডুবে গেছে। আজকের বাংলাদেশে সবকিছুর চেয়ে বোধহয় মানুষের জীবনের দামটাই কম।’
নানক বলেন, ‘একটি গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। তাদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাট চালাচ্ছে। তাদের হত্যা করছে। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল মানুষদের ওপর অবর্ণনীয় দমন-নিপীড়ন চালানো হচ্ছে।’
আওয়ামী লীগের এ নেতা বলেন, ‘শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ কেন্দ্রীয় ১৪ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানীমূলক হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। সেই সব মৃতদের অনেকেই জীবিত আছে। টাকার প্রলোভন দেখিয়ে মামলার বাদি বানানোর পরিকল্পিত কৌশলের গোমড়ও ফাঁস হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সরকার রাজনৈতিকভাবে প্ররোচিত হয়ে শেখ হাসিনাকে যে ফাঁসি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাও ইতিমধ্যে প্রমাণিত। বাধ-বিচারহীনভাবে চলছে গণগ্রেপ্তার। এই সরকারের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই তার ওপর অত্যাচারের খড়গ নেমে আসে।’
তিনি বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সমাজকে গভীর সংকটে ফেলে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার গতিমুখ বদল করে একত্বাবাদিতা কায়েম করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস মুছে ফেলার পায়তারা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রাচার থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলো বাদ দিয়েছে। জয় বাংলা জাতীয় দিবসের রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে।’ আজ বাংলাদেশ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘একদিকে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নেই, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি। এরফলে দুর্বিসহ হয়ে ওঠেছে মানুষের জীবন।’
সচিবালয়ে অগ্নিকান্ড প্রসঙ্গে নানক বলেন, ‘আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল তারই অংশ হিসেবে সচিবালয়ে অগ্নিকান্ড সংগঠিত করা হয়েছে। লাগামহীন দুর্নীতির প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করতে এমন নীল নকশা কিনা আমরা জাতির কাছে সেই প্রশ্ন রাখছি। মূলত এর মধ্যে সরকারের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আবিষ্কারের চেষ্টা চলছে। সব জায়গায় আওয়ামী লীগের ভূত দেখার মতো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরকারের কেউ কেউ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর দোষ চাপানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। আমরা সচিবালয়ের ভিডিও ফুটেজ জাতির সামনে প্রকাশ করার দাবি জানাচ্ছি। নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে অগ্নিকান্ডে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনারও দাবি জানাচ্ছি।’
এদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেউ মুছে ফেলতে পারবে না উল্লেখ করে নানক বলেন, ‘বৃথা চেষ্টা না করে জনদুর্ভোগ কমান। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। সব হত্যাকান্ডের নিরপেক্ষ বিচার করুন।’ তিনি বলেন, ‘যেখানে সেখানে মবের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের হত্যা করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। ছাত্রলীগের অসংখ্য নেতাকর্মীর শিক্ষা জীবন আজ বিপন্ন। ছাত্রলীগ করার কারণে তাদের পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না। এটা মানবাধিকার লঙ্ঘন। বিনা কারণে যাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে তাদের স্বপদে বহাল করতে হবে। ইজতেমা ময়দানের হত্যাকান্ডের ঘটনা জাতি জানতে চায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষকে আবার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ওরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে দিতে চায়। আমাদের আর বসে থাকার সুযোগ নেই। আসুন প্রতিবাদ করি, প্রতিরোধ করি। ওরা দেশ প্রেমিক নয়, ওরা জাতির পিতা মানে না।’
‘আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য এখানেই শেষ করছি। জয় বাংলা।’
বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং ইসলামিক চরমপন্থিদের নির্মূলে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ কামনায় ২৭ ডিসেম্বর শুক্রবার অপরাহ্নে ফ্লোরিডাস্থ মার-এ লাগো’তে ট্রাম্পের বাসভবনের সামনে এক বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়েছে। নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, মিশিগান, পেনসিলভেনিয়া, ক্যালিফোর্নিয়া, জর্জিয়া, ম্যারিল্যান্ড, ভার্জিনিয়াসহ বিভিন্ন স্টেট থেকে ব্যানার-ফেস্টুনসহ বাংলাদেশী আমেরিকানরা এই কর্মসূচিতে অংশ নেন। এ সময় ডনাল্ড ট্রাম্প সমীপে একটি স্মারকলিপি হস্তান্তর করা হয় ‘ইউনিটি কাউন্সিল-ইউএসএ’র পক্ষ থেকে। এতে স্বাক্ষর করেছেন ইউনিটি কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ড. দ্বীজেন ভট্টাচার্য, সাধারণ সম্পাদক বিষ্ণুগোপ এবং উপদেষ্টা ড’ দীলিপ নাথ।
‘সাম্প্রদায়িক হামলা-রুখে দাঁও বাংলাদেশ’, ‘জাস্টিস ফর বাংলাদেশী হিন্দুজ’ ইত্যাদি লেখা প্লেকার্ড হাতে নারী-পুরুষেরা সমস্বরে স্লোগান ধরেন বাংলাদেশে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানসহ জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর নির্বিচার বর্বরতা বন্ধের দাবিতে।
এ সময় প্রদত্ত বক্তব্যে ডেমক্র্যাটিক পার্টির ডিস্ট্রিক্ট লিডার ও ইউনিটি কাউন্সিলের উপদেষ্টা ড. দীলিপ নাথ ডনাল্ড ট্রাম্পকে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ভরসার স্থল হিসেবে অভিহিত করে বলেন, কথিত এক আন্দোলনের মধ্যদিয়ে গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ইসলামিক জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে। এই জঙ্গিদের অবিসম্বাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূস। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিন্টনের বন্ধু হওয়ায় ড. ইউনূস জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক কোন আইনেরই পরোয়া করছেন না। এরফলে নির্বাচিত সরকার হটিয়ে ক্ষমতা দখলকারি ইউনূসের অনুসারিরা বাংলাদেশের হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের ওপর হামলা শুরু করেছে। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় ব্যবসা ও বাড়ি-ঘরে আগুন দিচ্ছে। মন্দিরে হামলা এবং মূর্তি ভাঙচুর করছে। তরুনী এবং নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। লুটতরাজের মহোৎসব চলছে গোটা বাংলাদেশে। ড. দীলিপ নাথ উল্লেখ করেন, ৫ আগস্টের থেকে এ যাবত কমপক্ষে ২ হাজারের অধিক হামলা ও আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। ইউনূসের পক্ষ থেকে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি চরমপন্থিদের বিরুদ্ধে। ড. দীলিপ নাথ উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে উৎখাতের পর প্রগতিশীল চিন্তা- চেতনার লেখক-সাংবাদিক-সাংস্কৃতিক কর্মী-অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং রাজনৈতিক কর্মীরাও অত্যাচার-নির্যাতনে অতীষ্ঠ। ৫০ লাখের অধিক মানুষের বিরুদ্ধে হত্যার মামলা দায়ের এবং ৫০ হাজারের অধিক বাংলাদেশীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যারাই ইউনূস বাহিনীর অবিচারের প্রতিবাদ করছে তাদেরকেই মিথ্যা মামলায় হয়রানি করা হচ্ছে। এভাবে গোটা বাংলাদেশকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে।
ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের বাসার সামনে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের র্যালি। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪।
ড’ দীলিপ নাথ উল্লেখ করেন, এহেন অন্যায়-অবিচার বন্ধ এবং দায়ীদের বিচার দাবিতে গত কয়েক মাসে আমরা হোয়াইট হাউজ, স্টেট ডিপার্টমেন্ট, জাতিসংঘ-সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের অফিসের সামনে বিক্ষোভ-সমাবেশ করেছি। স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে বিস্তারিত উল্লেখ করে। কেউই আমাদের আবেদনে সাড়া দেয়নি বলেই আজ নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাসার সামনে জড়ো হয়েছি। আশা করছি মানবতার প্রশ্নে আমরা ট্রাম্পের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হবো না।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এই সমাবেশ চলাকালে ভেতরে ট্রাম্পের সাথে নীতি-নির্দ্ধারকদের বৈঠক চলছিল বলে জানা গেছে। সেই বৈঠকের লোকজন বাইরে এসে সামগ্রিক পরিস্থিতি অবলোকন করেছেন এবং আশ্বাস দিয়েছেন ২০ জানুয়ারির মধ্যে চলমান সহিংসতা বন্ধ না হলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প যথাযথ পদক্ষেপ নিতে কালক্ষেপণ করবেন না। উল্লেখ্য, ৫ নভেম্বরের কদিন আগে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশের হিন্দুদের পরিস্থিতির ওপর একটি মতামত দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন এহেন বর্বরতার পরিপ্রেক্ষিতে।
হিন্দু বাঙালি সোসাইটি অফ ফ্লোরিডা আয়োজিত এবং বাংলাদেশী হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউনাইটেড হিন্দুস অফ ইউএসএ সহ বেশ কয়েকটি বাংলাদেশী-আমেরিকান ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সংগঠনের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত দুই ঘন্টাস্থায়ী এই সমাবেশে শতাধিক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে এসেছিলেন।
হিন্দু বাঙালি সোসাইটি অফ ফ্লোরিডার সভাপতি সঞ্জয় সাহার সভাপতিত্বে এবং সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক লিটন মজুমদারের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তাদের মধ্যে ছিলেন জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শ্যামল চক্রবর্তী, হিন্দু বেঙ্গলি সোসাইটি অফ ফ্লোরিডা, ইউ.এস.এ-এর সভাপতি সঞ্জয় কুমার সাহা ও সাধারণ সম্পাদক লিটন মজুমদার, ইউনাইটেড হিন্দুস অফ ইউএসএ-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ভবতোষ মিত্র, হিন্দু অ্যাকশন নেটওয়ার্কের পরিচালক শিবু চৌধুরী, ফ্লোরিডা হিন্দু বাঙালি সোসাইটির প্রাক্তন সভাপতি সাধন সরকার ও সদস্য রতন মজুমদার, ইউনাইটেড হিন্দু কাউন্সিল অফ ইউ. এস. এ’র পরিচালক পীযূষ বর্ধন এবং আটলান্টার হিন্দু অ্যাকশন নেটওয়ার্কের পরিচালক শিবু চৌধুরী, ভূপাল ধর প্রমুখ।
বক্তারা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচার দাবিতে চট্টগ্রামে সর্বকালের বৃহত্তম সমাবেশ করার পরই ইসকনের নেতা চিন্ময় কৃষ্ণদাসকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে সাজানো একটি মামলায়। এরপর আদালতে তার জামিনের আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু আইনজীবীরা তার পক্ষে কথা বলতে পারেননি সরকারের লেলিয়ে দেয়া জঙ্গিদের হামলার আতংকে। এভাবেই সারাদেশের বিচারালয় আজ চরমপন্থিদের হুমকি-ধামকির মুখে থমকে দাঁড়িয়েছে। বক্তারা উল্লেখ করেন, সুপরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের উচ্ছেদের নিরব একটি পরিকল্পনা সুপরিকল্পিতভাবে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। এটি বন্ধ করা সম্ভব না হলে অচিরেই বাংলাদেশও আফগানিস্তানের মতো জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত হতে বাধ্য। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতি বিপন্ন হয়ে পড়ার আশংকা বিরাজ করছে।
Memorendum to President-elect Donald Trumpবক্তারা অভিযোগ করেন যে, ইসলামী জাতীয়তাবাদী, মৌলবাদী, আইএসআই, ও আল-কায়েদার মত আন্তর্জাতিক ইসলামী জঙ্গী গোষ্ঠী সমর্থিত বাংলাদেশী ধর্মীয় চরমপন্থীদের সক্রিয় সহযোগিতায় সংঘটিত ৫ আগস্ট’র গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় এসেই সকল জঙ্গী সন্ত্রাসীকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে সরাসরি অভিযুক্ত করে, বাংলাদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর নৃশংসতা অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য বক্তারা উভয়ের প্রতি আহবান জানান। তাঁরা সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে শূন্য-সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করা এবং প্রতিটি সংখ্যালঘু নির্যাতনকারীকে অবিল¤ে ^বিচারের আওতায় এনে তাদেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বিধানের আহ্বান জানান। বক্তারা তাঁদেও মনে করিয়ে দেন যে, তাঁরা ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে হিন্দুদের উপর দুই হাজরেরও বেশি নৃশংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে অগ্নিসংযোগ, নির্যাতন, ধর্ষণ এবং নয়টি হত্যা অন্তর্ভুক্ত ছিল, এবং তা এখনও অব্যাহত রয়েছে। বক্তারা বলেন, যার প্রমান পার্বত্য চট্টগ্রামের খ্রিস্টানদের উপর বড় দিনে সন্ত্রাসী হামলায় সতেরটি খ্রিস্টান বাড়ি পুড়ে ধ্বংস হওয়া। বক্তারা প্রশ্ন তোলেন, বাংলাদেশি সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর কর্মকর্তারা যদি তাঁদের নিজস্ব দেশের বিপন্ন সংখ্যালঘু নাগরিকদের মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে এবং সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হন, তা’হলে তাঁরা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর অধীনে বিদেশে শান্তি রক্ষার কাজ করতে পারে কীভাবে। কোন কোন বক্তা এই বিষয়টার প্রতি অবিলম্বে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করার কথা বলেন। বিচারকার্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেনা বলে ড. ইউনূস এবং তার উপদেষ্টাবৃন্দ যে ঘোষণা দিয়েছেন সে বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বক্তারা প্রশ্ন তোলেন দেশকে ইসলাম পন্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য তাঁদের এত আগ্রহ কেন। ড. ইউনূসকে এই সত্যটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাঁরা বলেন যে, যদিও ঠিক আওয়ামী লীগের মতই বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী খুন, লুট তরাজ ও ম্যাসাকারের অপরাধে অপরাধী ছিল, তবুও ড. ফখরুদ্দিন এবং জেনারেল মঈনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাদের ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি দিয়েছিল। তাঁরা উল্লেখ করেন লোগাঙে ছয় থেকে নয়শ অদিবাসীকে বি. ডি. আর পঠিয়ে হত্যা করার অপরাধে বেগম জিয়ার আজও বিচার হয়নি, তাঁর দলকে তো নির্বাচন করতে বাধা দেওয়া হয়নি।
বিশ্ব শান্তিতে নোবেল বিজয়ী একজন মানুষ মানবতা বিরোধী অপরাধকে প্রশ্রয় দেবে এটা বিশ্ববাসী প্রত্যাশা করেনা বলে উল্ল্রখ করে সমাবেশের পক্ষ থেকে ড. ইউনূস ও জেনারেল ওয়াকার সাহেবের প্রতি ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু নির্মূল অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করার জন্য অবিলম্বে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। এরমধ্যে ছিল (১) অবিল¤ে ^হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে মুক্তি দেওয়া; (২) সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ার নামে ‘ধর্মনিরপেক্ষ-গণতন্ত্র’ এবং বাঙালির ‘ভাষা-ভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী“ পরিচয় অক্ষুন্ন রাখা; (৩) ২০১১ সালে সরকারের কাছে হস্তান্তরিত জজ্ সাহাবুদ্দিন কমিশনের প্রতিবেদন যাতে কয়েক হাজার সংখ্যালঘু নিপীড়কের তালিকাভুক্ত রয়েছে (যার মধ্যে ২,৬০০ জন সরাসরি বিচারযোগ্য) , সেটার ভিত্তিতে সংখ্যালঘুনির্যাতকদের বিচার ও শাস্তির প্রক্রিয়া শুরু করা, (৪)দেশের প্রগতিশীল মুসলমান এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বকারী সমস্ত প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলিকে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
এছাড়া, সংখ্যালঘু নির্যাতন সমস্যার দীর্ঘ মেয়াদী টেকসই সমাধান অর্থাৎ সংখ্যালঘু সুরক্ষায় স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে একটি বিশদ সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা যাতে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে ১. হিন্দু, বৌদ্ধ,এবং খ্রিস্টানদের “সংখ্যালঘু” মর্যাদা এবং আদিবাসীদের “আদিবাসী” মর্যাদা প্রদান করা, ২.যেহেতু কোনও সরকার ধর্মীয় ও জাতিগত নির্মূল অভিযান বন্ধ করতে ইচ্ছুক নয়, তাই কয়েকটি সংখ্যালঘু এনক্লেইভ তথা ছিটমহল প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে বেসামরিক প্রশাসন এবং নিরাপত্তা সংখ্যালঘু প্রশাসক/কর্মকর্তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। ছিটমহলগুলিতে জমিক্রয় এবং ব্যবসাস্থাপনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠীর জন্য নিষিদ্ধ থাকবে। প্রতিটি প্রশাসনিক-জেলায় এবং প্রতিটি শহরে বা যেখানেই সংখ্যালঘুরা ঘনীভূত রয়েছে সেখানে এই ধরনের ছিটমহল স্থাপন করতে হবে। সংখ্যালঘুদের জন্য পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা বা সেপারেট ইলেক্টরেট প্রতিষ্ঠা করা, যেমন ব্রিটিশ-ভারতের মুসলমানদের ১৯০৯ সালে দেওয়া হয়েছিল এবং যা ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের জন্য কার্যকর ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদলে একটি ঘৃণাত্মক-অপরাধ ও বক্তব্য নিষিদ্ধকরণ আইন প্রতিষ্ঠা করা, যা কোন ব্যক্তিকে শারীরিক বা মৌখিকভাবে আক্রমণ করা, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করার হুমকি দেওয়া, যেমন, “ইসলাম ধর্মান্তরিত হও অথবা এই দেশ ছেড়ে চলে যাও”, বা তাঁদের উপাসনালয় অক্রমণের যে ধুম পড়েছে সেটা বন্ধ করবে। এই আইনের ফলে সংখ্যালঘু নাগরিকদের সম্পত্তি দখল, উপাসনালয়,সংস্কৃতি ধ্বংস করা, তাঁদের “মালাউন,”, ”ডেঁডাইয়া,” “কাফের” প্রভৃতি ঘৃণাত্মক, অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করে সম্বোধন করা,পাঠ্য পুস্তকে এবং ওয়াজে অমুসলমানদেও “পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট ” বলা কিংবা “অমুসলিমদের সম্পত্তি বা নারী সম্ভোগে পাপ হয়না বলে বক্তৃতা করাও বন্ধ হবে। এই আইন যথার্থ অর্থে কার্যকর করা বিচার বিভাগের অধীনে হাইকোর্টে — একটি ঘৃণাত্মক অপরাধ ও বক্তব্য বিষয়ক বিভাগ খুলে, সরকার বাদী হয়ে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন অফ পুলিশ (র্যাব) কর্তৃক দ্রুত প্রতিটি হেইট ক্রাইম ও স্পীচ অপরাধের তদন্ত এবং দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষমতা সম্পন্ন আদালতে বিচার প্রক্রিয়া, তত্বাবধান, সাক্ষী সুরক্ষা ব্যবস্থা, ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিধান রাখতে হবে। এজন্য দেশের প্রতিটি জেলাসদরে একটি করে ফাস্টট্র্যাক কোর্ট প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে শুধু হাজার হাজার সংখ্যালঘু নির্যাতনকারীদের বিচার হবে। একটি ধর্মীয় ঐতিহ্য ও দেবোত্তর সম্পত্তি সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে-যার বলে সরকারকে প্রতিটি ধর্মীয় ঐতিহ্য, যেমন মন্দির, আশ্রম, শ্মশান, দেবতা প্রভৃতি লুণ্ঠন, দখল, বিকৃত, ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করা থেকে রক্ষা, পুনরুদ্ধার এবং রক্ষণাবেক্ষণ করতে বাধ্য করবে। এই আইন দেবতা, মন্দির, আশ্রম, আখড়া, শ্মশান এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে দানকৃত সম্পত্তি বা সম্পদ হস্তান্তর ও নিষিদ্ধ করবে। এমন যেসব সম্পত্তি বেদখল হয়েছে সেগুলোও এই আইনের অওতায় পুনরুদ্ধার করে যাদের সেটা মূলত: দান করা হয়েছিল তাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। ধর্মীয়-ঐতিহ্যগত আইনের সুরক্ষা আইন, যার বলে যে কোন ধর্মীয়-ঐতিহ্যগত কোন আইন রদ বা বদল করতে সংশ্লিষ্ট সমপ্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনাক্রমে তাঁদের উত্থাপিত উদ্বেগসমূহের সমাধান করার পর, দেশব্যাপী ধারাবাহিক সংলাপ আয়োজনের মাধ্যমে করা। সুপ্রিমকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত নিরপেক্ষ বিচারপতি, দুইজন বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী, এবং দুজন সংখ্যালঘু-অধিকার কর্মীর সমন্বয়ে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করত: এর মাধ্যমে সকল সংখ্যালঘু নির্যাতককে সনাক্ত করে একটি শ্বেতপত্র তৈরি করা, যেমনটা ২০০১- ২০০৫ এর জন্য জজ্ সাহাবুদ্দীন কমিশনের মাধ্যমে করা হয়েছিল। ধর্ম নিরপেক্ষ-গণতন্ত্র বা রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পূর্ণ পৃথকীকরণে এবং বাঙালিদের ভাষা-ভিত্তিক জাতীয়তাবাদী পরিচয় সুরক্ষার বিধান করা।
এক বছরের ব্যবধানে চলতি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে গৃহহারা মানুষের সংখ্যা ১৮% বেড়েছে। মার্কিন প্রশাসনের গৃহায়ন এবং নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী স্মরণকালের আর কোন বছরেই এমন পরিস্থিতির অবতারণা হয়নি। শুক্রবার প্রকাশিত এই তথ্য অনুযায়ী ৭ লাখ ৭১ হাজার ৪৮০ জন মানুষের স্থায়ী কোন ঠিকানা নেই। তারা রেল স্টেশন, ব্রীজের নীচে, খোলা পার্কে, পরিত্যক্ত ভবনে অথবা জরাজীর্ণ গাড়িতে রাত কাটাচ্ছে। সরকারী তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরসমূহে বাড়ি ভাড়া আকাশচুম্বি হবার পাশাপাশি বাড়ির দামও বেড়েছে অবিশ্বাস্যভাবে। করোনায় ক্ষত-বিক্ষত মানুষেরা ঘুরে দাঁড়ানোর পরিক্রমায় ফেডারেল সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোন সহায়তা পায়নি। অপরদিকে, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বেড়েই চলছে। বাড়ি ভাড়াও বেড়েছে অকল্পনীয় হারে। অথচ বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হয়নি। অধিকন্তু স্বল্প আয়ের মানুষের কর্মঘন্টাও হ্রাসের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এমনি একটি নিদারুণ পরিস্থিতির মধ্যে হাবুডুবু খাওয়া আমেরিকানদের ঘাড়ে নতুন যন্ত্রণা ভর করেছে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আসা অবৈধ অভিবাসীরা-এমন অভিমতও পোষণ করা হচ্ছে ক্ষোদ বাইডেন প্রশাসনের পক্ষ থেকেও। সরকারী তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে গৃহহারা মানুষের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫৯ হাজার জন। এ বছরের জানুয়ারিতে গৃহহারা শিশু-কিশোরের সংখ্যা ছিল দেড় লাখের মত। আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে তা ৩৩% বেশী।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং গাজায় ইসরায়েলি হামলায় লাগাতার অর্থ সহায়তার পরিপ্রেক্ষিতে ট্যাক্স প্রদানকারি আমেরিকানরা নিপতিত হয়েছেন আর্থিক সংকটে-এমন অভিযোগ করেছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। এবং এটাই হচ্ছে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের প্রতি আমেরিকানদের নাখোশের অন্যতম কারণ-যার প্রভাব পড়েছে গত নির্র্বাচনে। সর্বশেষ জরিপে এ আভাস ফুটে উঠেছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে স্বল্প ও মাঝারি আয়ের আমেরিকানদের নাজুক অবস্থা থেকে উদ্ধারকল্পে গত এক বছর যাবত বাইডেন প্রশাসন রহস্যজনক নিরবতা অবলম্বন করেছে বলে অভিযোগের মধ্যেই সারা আমেরিকায় গৃহহারা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করলো ফেডারেল প্রশাসন।
ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রেখে মানবতার কল্যানে আত্মনিয়োগের সংকল্প উচ্চারিত হলো বড়দিন উদযাপনের সমাবেশে। বাংলাদেশী-আমেরিকান খৃষ্টান সম্প্রদায় ২ ডিসেম্বর তাঁদের এই বিশেষ দিনটি পালন উপলক্ষে কুইন্সের উডসাইডস্থ ‘ইউনাইটেড বেংগলী লুথারেন চার্চ অব আমেরিকা’ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। সহযোগিতায় ছিল ‘ওজোনপার্ক ইভ্যাঞ্জেলিক্যাল লুথারেন চার্চ।’ অতিথি ছিলেন নিউইয়র্কস্থ বাংলাদেশের কন্সাল জেনারেল মো. নাজমুল হুদা। মুসলিম কম্যুনিটির পক্ষ থেকে সেখানে আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি ও শুভেচ্ছার বার্তা দিতে যোগদান করেন মোহাম্মদী সেন্টারের ইমাম কাজী কায়্যুম।ৎ
হোস্ট সংগঠনের প্রধান ডা. টমাস দুলু রায়ের সার্বিক সমন্বয়ে উপাসনা পরিচালনায় ছিলেন প্যাস্টও জেমস রয়, প্যাস্টর কমল দেব, অ্যাল্ডার থ্রিয়ডোর এ বারিকদার, ভিকার বেনিকিড বারৈ, অ্যাল্ডার সমির রত্ন, এডোয়ার্ড বিশ্বাস, ড. ডিএইচ ব্যাংকে। যীশুর জন্মের ভবিষ্যৎবাণী ও পূর্ণতা সম্পর্কে আলোকপাত করেন প্যাস্টও কমল দেব। বাইবেল থেকে পাঠ করেন শিখা অধিকারি। সমবেত সকলকে স্বাগত জানিয়ে দিবসের তাৎপর্য নিয়ে কথার বলেন প্যাস্টর কাজল সরকার। প্রার্থনা উৎসবে নেতৃত্ব দেন জেমস রয় এবং জন এস রত্না। তারা ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে নিপতিত মানুষদের পরিত্রাণে যিশু খ্রিস্টের দয়া কামনা করেন। গান, কবিতা আর জয়ধ্বনিতে মুখরিত অবস্থায় সমাবেশে আগতদের মধ্যে বড়দিনের খাবার পরিবেশন করা হয়। সমবেত কন্ঠে গীত হয় ‘পথহারা পথিকেরা আয় ছুটে আয়, পেয়েছি ঐ পথের দিশা নতুন তারায়। লক্ষ কোটি শত তারকার ভীড়ে-আধারের বুকে চলে ধীরে ধীরে। পাপী তাপী ব্যথিতেরে বারে বারে ফিরে পথ সে দেখায়।’
বিশাল এ আয়োজনে শিশুদের মধ্যে বড়দিনের উপহার বিতরণ করা হয়। বড়দিনের ডিনার পরিবেশনায় সহযোগিতা করেন জেমস এন সরকার, সুজিত কীর্তনিয়া, ডা. টমাস দুলু রায়, জন এস বাড়ৈ, সিলভিয়া রয়, ফ্রান্সিস রোজারিয়ো, আলেক্স সাহা, জেমস রয়, মরিয়ম দাস, বাপী অধিকার প্রমুখ।
বিশ্ববাসীর শান্তি কামনায় যীশুর জন্মদিন উপলক্ষে ২৫ ডিসেম্বর বুধবার শ্রীশ্রী ঠাকুরঅনুকুল চন্দ্র সৎসঙ্গঁ ইউ,এস,এ এর (৪২-২২ ৭৯ষ্ট্রীট, এলমর্হাস্ট) ব্যবস্থাপনায় যীশুর জীবন বৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনা, জন্মদিনের কেক কাটা, ভক্তিমূলক গান ছাড়াও ছিল খেলাধুলা। এছাড়া পারিবারিক সুখ, শান্তি, কল্যাণ সমৃদ্ধি ও বিশেষ শান্তির জন্য সৎসঙ্গেঁর বিশেষ এ অধিবেশনের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিলো প্রার্থনা, সদগ্রন্থাদি পাঠ, ধর্মীয় আলাচনা ও সংগীত পরিবেশনা। শ্রী শ্রী ঠাকুরের স্বহস্তে লিখিত সত্যানুসরণ থেকে পাঠ করেন শুভাশীষ দত্ত। শ্রী মদ্ভগবদ থেকে পাঠ করেন সুধন্যসেন, পূন্য পূঁথি থেকে সুভাষ পাল। নারী নীতি থেকে প্রিয়া দেবনাথ এবং প্রভু যীশুর জীবন চরিত মানবজীবন উন্নয়নে ভূমিকা শীর্ষক নাতিদীর্ঘ আলোচনা করেন অজিত ভৌমিক স্বস্তয়নী ব্রতধারী। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দিবাকর রায়। দিনব্যাপি এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সার্বিক সহায়তা করেছেন সংগঠনের সাধারন সম্পাদক সুভাষ তালুকদার, সহ-সভাপতি কল্যাণ ব্রত পান্থ দাস, উপদেষ্টা বিশ^নাথ মিত্র, সাংগঠনিক সম্পাদক সুভাষ দত্ত, কোষাধ্যক্ষ উত্তম চৌধুরী, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অনামিকা মজুমদার, সহ: সাংস্কৃতিক সম্পাদক প্রিমা রায়, মহিলা সম্পাদিকা হাসি রানী চাকী। ধর্মীয় সংগীতে মিঠুয়া রায় স্বস্তয়নী ব্রতধারী ও লিপিকা তালুকদার, জয়শ্রী রায়, টুম্পা দাস গুপ্তা, সীমাবর্দ্ধন ও ইন্দ্রজিত সিংহ রায়।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি ও মুক্তিযোদ্ধাদের হেনস্থা করার জবাবদিহিতা ড. ইউনুসকেই করতে হবে বলে এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু পরিষদ। একইসাথে বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের যুক্তরাষ্ট্র শাখার পক্ষ থেকে কুমিল্লার বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাকে জনসমক্ষে অপদস্ত করার তিব্র নিন্দা এবং এজন্যে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে। শেখ হাসিনা পরিষদও ঐ আচরণের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
বঙ্গবন্ধু পরিষদের প্রেসিডেন্ট ড. নূরুন্নবী এক বিবৃতিতে বলেছেন: বাঙালী জাতির জীবনে সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। বীর মুক্তিযোদ্ধারা জাতির সূর্য সন্তান। তারা তাদের জীবন বাজি রেখে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে আমাদের মুক্ত করেছেন, জন্ম দিয়েছেন লাল সবুজের বাংলাদেশ। কিন্তু গভীর দুঃখের সঙ্গে আমারা লক্ষ্য করছি যে অবৈধ দখলদার ডঃ ইউনুস আর তার স্বাধীনতা বিরোধী জামায়েতি দোসররা অবৈধভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেই দেশের স্বাধীনতার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এবং স্মৃতিচিহ্নগুলোকে মুছে ফেলার মিশন শুরু করেছে। যেন পাকিস্তানের পরাজিত হায়েনার একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে একাত্তরকেই খুবলে খাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের উপর শুরু হয়েছে পরিকল্পিত অপমান আর অসম্মান । সর্বশেষ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই কানুকে গলায় ছুরি ধরে জুতার মালা পড়িয়ে গ্রাম থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে : একাত্তরের গনহত্যাকারী দল জামায়েতকে সাথে নিয়ে ডঃ ইউনুস ক্ষমতা দখল করার শুরু থেকেই বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়ী পোড়ানো থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের সব স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার সে অশুভ প্রয়াস চালাচ্ছে, খেতাবধারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদেও বিভিন্নভাবে হেনস্থা ও অপমান করা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। এই সকল দেশ ও স্বাধীনতা বিরোধী ঘৃণ্য কর্মের জন্য ডঃ ইউনুসকে জাতির কাছে অবশ্যই একদিন জবাবদিহি করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু পরিষদ এবং এর সকল অঙ্গরাজ্য শাখার পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভুলুন্ঠিত করার অপচেষ্টা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের লাঞ্ছিত করার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাচ্ছি। বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট আব্দুল কাদের মিয়া এবং সেক্রেটারি কামাল হুসেন মিঠু, জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদের প্রেসিডেন্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন অপর এক যুক্ত বিবৃতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন : বীর মুক্তিযোদ্ধাগণকে অপমানের অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের অস্তিত্বে আঘাত করা। একাত্তরের রাজাকার ও তাদের দোসরেরা যে কোন উপায়ে বাঙালি জাতির ইতিহাসকে কলংকিত করার অপচেষ্টার অংশ হিসেবেই বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এভাবে একাত্তরের চেতনাকে ধ্বংস করা কখনোই সম্ভব হবে না। বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বাঙালি চেতনায় উজ্জীবিতরা ড. ইউনূস ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের এহেন আচরণকে রুখে দিতে বাংলার আপামর জনতা সংঘবদ্ধ হবে এবং সমুলে উচ্ছেদ করবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
বিডিআর হত্যাকান্ডের সত্যিকারের নেপথ্য কাহিনী আজো কেউ জানতে পারেনি। কীভাবে কার স্বার্থে এবং কার মদদে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানী ঢাকার পিলখানায় তৎকালিন বিডিআর সদর দপ্তরে নির্মম ও নৃশংস হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল তা এতদিন শুধু ক্ষমতাসীনদের মুখে উচ্চারিত হয়েছে। ভিকটিমরাও রহস্যজনক কারণে সরব হননি। ফলে প্রকৃত সত্য জানতে সারা বাংলার মানুষের কৌতুহলের অন্ত নেই। সেই তাগিদে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ঘটনা তদন্তে একটি কমিশন গঠিত হয়েছে। সেই কমিশনের প্রথম বৈঠক শেষে কমিশনের প্রধান এ এল এম ফজলুর রহমান বৃহস্প্রতিবার গণমাধ্যমে বলেছেন যে, হত্যাকান্ডের নেপথ্যে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র যদি থেকে থাকে, তা চিহ্নিত করে জাতির সামনে উপস্থাপনে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করা হবে না। একই মনোভাবের প্রতিধ্বনি ঘটেছে সে সময়ের সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের কন্ঠেও। ২৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় (বাংলাদেশ সময় শুক্রবার সকাল) ফ্লোরিডা থেকে টেলিফোনে নিউইয়র্কে এ সংবাদদাতাকে জেনারেল মইন সন্তোষের সাথে জানান, জাতির প্রত্যাশা পূরণে গঠিত কমিশনের তদন্তে প্রকৃত তথ্য উদঘাটিত হবে বলে আশা করি। কারণ, ঐ হত্যাকান্ডের ভিকটিমরা ছিলেন বাংলাদেশের চৌকষ অফিসারদের অন্যতম। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে ধ্বংসের অভিপ্রায়ে ঐ হত্যাযজ্ঞ চালানো হতে পারে। তাই সঠিক তদন্তের প্রত্যাশা ছিল সর্বমহলে। উল্লেখ্য, বিডিআর হত্যাকান্ড নিয়ে এই সেনা প্রধান ‘পিলখানায় পৈশাচিক হত্যাকান্ড’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন এবং তা শিগগিরই প্রকাশিত হবে। যেখানেও অজানা অনেক তথ্য সন্নিবেশিত আছে বলে উল্লেখ করেন জেনারেল মইন। সাবেক এই জেনারেল তদন্ত কমিশনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল মইন জানান, চিকিৎসার প্রয়োজনে ফ্লোরিডায় বাস করছি। এ নিয়েও নানাজনে নানা কথা রটাচ্ছেন। উদ্ভট কিছু মন্তব্যও পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো আমাকে ব্যথিত করে। জেনারেল মইন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যিনি আগে গঠিত কমিশনের প্রধান ছিলেন তার সাথে আমার ইতিমধ্যেই কথা হয়েছে। এছাড়া আমি বিডিআর হত্যাকান্ডের ব্যাপারে একটি ভিডিও-বক্তব্য ইউটিউবে ৬ সেপ্টেম্বর আপলোড করেছি, সেখানেও অনেক কিছু রয়েছে। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) মইন ইউ আহমেদ বলেছেন, হত্যাকান্ডটি নিয়ে ১৫ বছরে শুধু বিগত সরকারের কথা শুনতে হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা অনেক কিছুই জানা নেই। জনগণও জানতে পারেনি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার থাকাকালে তিনি কথাগুলো বলতে চেয়েও পারেননি। তবে তিনি মনে করেন, তখন সেনাবাহিনী কী ভূমিকা নিয়েছিল এবং ঘটনা কী ছিল, সে সম্পর্কে মানুষের জানা উচিত। বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি এখন ঘটনাগুলো তুলে ধরতে পারছেন। উল্লেখ্য, বিডিআরের কথিত ঐ বিদ্রোহে ওই সময় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়। “বাংলাদেশ আমার’’ শীরোনামে ২৯ মিনিটের ঐ ভিডিও বার্তার শুরুতেই গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে তিনি সেদিনের ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় সেনাবাহিনী ও তৎকালীন সেনাপ্রধানের ভূমিকা অনেকের জানা নেই। অনেকে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করছেন। ভূমিকা কী ছিল, তা তিনি জানাতে চান। ৫ আগস্ট স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর বিডিআর বিদ্রোহের কিছু প্রত্যক্ষদর্শীগণ এবং পরিবারবর্গ তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। আমিও আমার ভূমিকা আপনাদেরকে জানাতে চাই। বিডিআর বিদ্রোহ দমনে সেনাবাহিনী তথা সেনা প্রধানের ভূমিকার কথা অনেকের জানা নেই এবং তারা নেতিবাচক ধারণা পোষণ করছেন। বিডিআর হত্যাকান্ডের ওপর একটি বই আমি লিখেছি যা সহসাই প্রকাশ করা হবে।
সাবেক এই জেনারেল উল্লেখ করেন, বিদ্রোহের ১৫ বছর ধরে আমরা শুধু ক্ষমতাসীন সরকারের কথা শুনেছি এবং প্রকৃত ঘটনার অনেক কিছু আমাদের জানা নেই। সে সময় সরকার একটি তদন্ত আদালত গঠন করে এবং সেনাবাহিনীও একটি তদন্ত আদালত গঠন করে। আমি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আদেশ দিয়েছি তদন্ত আদালত গঠনের। তখোন আমাকে বলা হলো যে, সরকার যখোন তদন্ত আদালত গঠন করছে তখোন সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রয়োজনটা কী। প্রতি উত্তরে আমি বললাম একই ঘটনায় বিভিন্ন স্তরে তদন্ত আদালত হতে পারে। যদি একটি ব্যাটালিয়নে একটি ঘটনা ঘটে তবে ব্যাটেলিয়ন কমান্ডার তদন্ত আদালত করবেন। ব্রিগেড কমান্ডার করবেন, প্রয়োজন হলে ডিপ কমান্ডারও করতে পারেন। তদ্রুপ আমিও আমার ৫৭ জন অফিসার হারিয়েছি, আমি মনে করি আমার দায়িত্ব আমার জানার প্রয়োজন আছে, পুরো সেনাবাহিনীর জানার প্রয়োজন আছে কেন হত্যা করা হলো এবং এই হত্যাকান্ডের কারণ আমাকে বের করতে হবে। এরপর আর কোন উচ্চবাচ্য সরকার থেকে আসেনি। তবে এই তদন্ত আদালত করতে যেসব জিনিষ প্রয়োজন তা সরকার থেকে আমরা পাইনি। তদন্ত আদালতের নেতৃত্ব দিয়েছেন লে. জেনারেল জাহাঙ্গির আলম চৌধুরী এবং তার সাথে অন্যান্য মেম্বাররা ছিলেন। তাকে যে টার্মস অ্যান্ড রেফারেন্স দেয়া হয়েছে তিনি তা সম্পন্ন করতে পারেননি, কারণ হলো যারা এর সাথে জড়িত ছিল তারা মোস্টলি জেলে ছিল, তাদেরকে সম্মুখে আনা সম্ভব হয়নি। তাদেরকে প্রশ্ন করা সম্ভব হয়নি এবং যারা বিভিন্ন আলোচনায় যুক্ত ছিল তাদের বক্তব্যও নেয়া সম্ভব হয়নি। সেনাবাহিনীর তদন্ত চলাকালিন জেনারেল জাহাঙ্গির (বর্তমান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা) বেশ কবার আমার কাছে এসেছেন, এবং ওনার প্রবলেমগুলো তুলে ধরেছেন। এখোন আমি নিশ্চিত যে, এবার উনি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা হয়ে তদন্ত আদালত, প্রয়োজন হলে পুনরায় তদন্ত করে সম্পূর্ণ তথ্য বের করে, কারা জড়িত দেশে এবং বাহিরে তা উদঘাটনে সক্ষম হবেন। আমি জানাতে চাই যে এই নতুন সরকার যখোন গঠিত হয় তখোনই আমি জেনারেল জাহাঙ্গিরকে টেলিফোন করি এবং ওনাকে রিকুয়েস্ট করি যাতে উনি এই তদন্ত আদালতের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেন। জনগণ জানুক কারা এর সাথে জড়িত, এবং কী অপরাধে চৌকষ ৫৭ জন অফিসারকে খুন করা হলো।
মইন ইউ আহমেদ বলেন, কী ঘটেছিল সেদিন পিলখানায়? সেনাবাহিনীর অব্যবহৃত কিছু অস্ত্র (৮১ মিলিমিটার মর্টার, যেগুলো সেনাবাহিনী ব্যবহার করে না) বিডিআরকে দেওয়া নিয়ে বাহিনীটির তৎকালীন মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের (হত্যাকান্ডে নিহত) সঙ্গে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে কথা হয়। তিনি অস্ত্রগুলো নিতে রাজি হন। তখন পর্যন্ত বিদ্রোহ সম্পর্কে তিনি (বিডিআরের ডিজি) কিছুই জানতেন না বলেই সাবেক সেনাপ্রধানের বিশ্বাস। যতি জানতেন তাহলে নিশ্চয়ই তিনি আমাকে তা অবহিত করতেন।
জিএসপিসির একটি বৈঠকে থাকার সময় ওই দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ‘আমার প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি কর্নেল ফিরোজ সভাকক্ষে প্রবেশ করেন এবং আমাকে কানে কানে বলেন, স্যার পিলখানায় গন্ডগোল হচ্ছে। আপনার দিকনির্দেশনা প্রয়োজন।’ মনে মনে ভাবলাম-একটু আগেই তো ডিজি বিডিআরের সাথে কথা হলো। হঠাৎ কী হলো। সে যাই হোক। মইন ইউ আহমেদ বলেন, তখন ওই সভা স্থগিত করে সহকর্মীগণকে সঙ্গে নিয়ে আমার অফিসে এলাম। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিডিআরের ডিজির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। এডিসি ক্যাপ্টেন জুনায়েদকে নির্দেশ দেই টেলিফোনে যুক্ত করার জন্য। তাঁদের ফোন ধারাবাহিকভাবে ব্যস্ত ছিল। তাৎক্ষণিক সংযোগ পাওয়া সম্ভব হয়নি। সামরিক গোয়েন্দারা তখন পরিস্থিতি সম্পর্কে জানান। কী ঘটছে পিলখানায় তা জানানো হলো।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে সময় বাঁচাতে কারও নির্দেশ ছাড়াই সেনাবাহিনীর ৪৬ ইন্ডপিন্ডেন্ট পদাতিক ব্রিগেডকে অপারেশনের জন্য প্রস্তুত হতে নির্দেশ দেই। তারা তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধপ্রস্তুতি শুরু করে, যার নামকরণ করা হয় ‘অপারেশন রিস্টোর অর্ডার’। গৃহিত পদক্ষেপ সম্পর্কে পিএসও এফডি জেনারেল মবিনকে অবহিত করি।
সকাল ৯টা ৪৭ মিনিটে বিডিআরের ডিজিকে ফোনে পাওয়া গেল। আমি ওনাকে বল্লাম কী হয়েছে। তিনি এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেন। তিনি (মহাপরিচালক) বলেন, দরবার চলাকালীন দুজন সশস্ত্র সৈনিক দরবার হলে প্রবেশ করে। একজন আমার (ডিজির) পেছনে এসে দাঁড়ায় এবং অজ্ঞান হয়ে যায়। অপরজন দরবার হল ক্রস করে বাইরে চলে যায়। তার পরপরই বাইরে থেকে গুলির শব্দ আসে। গুলির শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে দরবার হলে উপস্থিত সৈনিকবৃন্দ গন্ডগোল শুরু করে দেয়। এবং তারা দাঁড়িয়ে যায়। দরবার হল থেকে বের হয়ে যায়।
মইন ইউ আহমেদ বলেন, ‘মনে হলো সব পরিকল্পনার অংশ। পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হচ্ছে। ডিজি আরো বলেন, আমি সেক্টর কমান্ডার এবং ব্যাটেলিয়ন কমান্ডারকে পাঠিয়েছি তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য, যাতে করে পুনরায় দরবার শুরু করা যায়। তিনি আশা করেন যে সহসাই দরবার শুরু করতে পারবেন। আমি তাকে জানাই যে, পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য ৪৬ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনফ্র্যান্ড ব্রিগেডকে প্রস্তুত হওয়ার জন্য আদেশ দিয়েছি। এবং সহসাই তারা পিলখানার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন।
মইন ইউ আহমেদ উল্লেখ করেন যে, ‘অনেকে মনে করেন, ডিজি বিডিআর সাহায্যের জন্য আমাকে কল করেছিলেন। এটা সত্য নয়। আমি বিডিআর ডিজিকে ফোন করি এবং আমরা কী ব্যবস্থা নিচ্ছি, তা ওনাকে জানিয়ে দিই। ওনি আমাকে ফোন করেননি।’
ওই দিন সকাল ৯টা ৫৪ মিনিটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মুঠোফোনে পেলাম। ‘এর মধ্যেই তিনি (শেখ হাসিনা) বিডিআর বিদ্রোহ সম্পর্কে অনেক তথ্য পেয়ে গিয়েছিলেন। এ সময় আমি তাঁকে অপারেশনের কথা জানালে তিনি জানতে চান, কতক্ষণ সময় লাগবে ব্রিগেডকে তৈরি করতে? আমি বললাম, সাধারণত ছয় ঘণ্টা লাগে। তবে তাড়াতাড়ি করে দুই ঘণ্টার মধ্যে তৈরি করা যায়।’
৪৬ ব্রিগেডকে পিলখানায় যাওয়ার অনুমতি শেখ হাসিনা দিয়েছিলেন বলে জানান মইন ইউ আহমেদ। ব্রিগেডটি এক ঘণ্টার মধ্যে যাত্রা শুরু করে উল্লেখ করে জেনারেল মইন বলেন, ৪৬ ব্রিগেডের তৎকালীন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাকিমের নেতৃত্বে ১০ জন কর্মকর্তা ও ৬৫৫ জন সৈনিক পিলখানার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। সকাল সাড়ে ১০টায় ব্রিগেডের অগ্রবর্তী দল জাহাঙ্গীর গেট অতিক্রম করে। এত কমসময়ের মধ্যে প্রস্তুত হয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল এটা বিরল কৃতিত্বের উদাহরণ।
ওদিকে বিদ্রোহীরা বিডিআর গেটগুলোর সামনে আক্রমণ প্রতিহত করতে বিভিন্ন ভারী অস্ত্র মোতায়েন করে বলে উল্লেখ করেন মইন ইউ আহমেদ। তিনি বলেন, বেলা ১১টায় ৪৬ ব্রিগেডের প্রথম গাড়িটি পিলখানার মেইন গেটের কাছাকাছি পৌঁছালে বিদ্রোহীরা একটি পিকআপ লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালায়। এতে চালক ঘটনাস্থলেই মারা যান। চালকের পাশে বসা একজন গুরুতর আহত হন।
সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, আমার নির্দেশ অনুযায়ী ১০টা ৩৫ মিনিটের দিকে আমার অফিস থেকে বিডিআরের মহাপরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। তবে তা সম্ভব হয়নি। হয়তো এর আগেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামসের বরাত দিয়ে বলেন, শামসের ধারণা অনুযায়ী, সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যেই বেশীরভাগ অফিসারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেনাবাহিনীর ব্রিগেড পৌঁছায় ১১টার পরে। তার মানে আমরা পৌঁছানোর আগেই বেশীর ভাগ হত্যাকান্ড ওরা করে ফেলেছে।
বিডিআর হত্যাকান্ড নিয়ে লেখা বইয়ের প্রচ্ছদ-যা শীঘ্রই প্রকাশিত হবে।
মইন ইউ আহমেদ বলেন, ক্যাপ্টেন শফিকের নেতৃত্বে ৩৫৫ জন র্যাব সদস্য পিলখানায় পৌঁছান ১০টার আগেই। এ সময় তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে পিলখানায় প্রবেশের অনুমতি চাইলেও তা পাননি। তাকে যদি অনুমতি দেয়া হতো, (বিদ্রোহীরা তখোনও পুরোপুরি সংঘটিত হতে পারেনি, কোন ক্ষয়-ক্ষতিও করতে পারেনি, ) তাহলে তিনি সহজেই ওদেরকে কনটেন্ট করতে পারতেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা বিদ্রোহীদের অতি সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।
সাবেক এই সেনাপ্রধান উল্লেখ করেন, ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে পিএসও এএফডি (প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ) তাঁকে জানান, সরকার রাজনৈতিকভাবে এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। বিদ্রোহীরা দাবি করেছে যে, কোনো আলোচনার আগে সেনাবাহিনীকে এই এলাকা থেকে চলে যেতে হবে। তাই সরকার আদেশ করেছিল, সেনাবাহিনীর সদস্যদের দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতে হবে। অন্তত দুই কিলোমিটার উত্তরে চলে যাওয়ার জন্য বলা হয়। সমঝোতা না হলে তখন সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হবে।
আনুমানিক বেলা ১২টায় পিএসও ফোন করে জরুরি ভিত্তিতে আমাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যমুনায় যেতে বলেন। তিনি কেনইবা আমাকে যমুনায় যেতে বললেন। কারণ ঐ সময় প্রতিটা ক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যা হোক আমি যমুনায় রওয়ানা হলাম। মইন ইউ আহমেদ বলেন, বেলা একটার দিকে সাদা পতাকা নিয়ে প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও হুইপ মির্জা আজম আলোচনার জন্য পিলখানায় যান। এরই মধ্যে সরকার থেকে বলা হলো, সেনাবাহিনী পিলখানার প্রধান ফটক এলাকায় থাকবে। র্যাব ও পুলিশ আরও দুটি এলাকায়। ডেইরি ফার্ম থাকা এলাকাটি অরক্ষিত ছিল।
মইন ইউ আহমেদ বলেন, যমুনায় গিয়ে অনেক লোককে দেখি, লোকে লোকারন্য, হাঁটার জায়গা নেই। যাঁদের কোনো কাজ ছিল না। কৌতূহলবশত এসেছিলেন। মন্ত্রিসভা বৈঠক করছিল। কোনো সিদ্ধান্ত আসছিল না। আমি ভেবেছিলাম, সেখানে পৌঁছার সংবাদ জেনে তিনি আমাকে ভেতরে ডেকে নেবেন। কিন্তু তা করা হলো না। বেলা ২টার পর খবর এলো, পিলখানা থেকে একজন অফিসার পালিয়ে যমুনায় এসেছে। আমি তার কাছে ছুটে গেলাম। জানলাম যে বেশ কিছু অফিসারকে হত্যা করা হয়েছে। তবে ডিজি বিডিআর সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন। সে সময়েই নিশ্চিত হলাম যে বিডিআর বিদ্রোহীরা নিরপরাধ অফিসারদেরকে হত্যা করেছে।
মন্ত্রিসভার পর আরেকটি ছোট বৈঠক করে তিন বাহিনীর প্রধানদের শেখ হাসিনা ডাকেন বলে উল্লেখ করে মইন ইউ আহমেদ বলেন, তিনি যাওয়ার দেড় ঘণ্টা পরে বিমান ও নৌবাহিনীর প্রধান যমুনায় এসেছিলেন। শেখ হাসিনা আমাদেরকে বললেন যে, রাজনৈতিকভাবে সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজম এবং তাপস বিদ্রোহীদের একটি ডেলিগেশন নিয়ে যমুনায় আসছেন এবং তারা (বিদ্রোহীরা) চাচ্ছে সাধারণ ক্ষমা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) বলেন, বিদ্রোহীদের কিছু বলার থাকলে আমরা (তিন বাহিনীর প্রধান) যেন তাদের বলি।
মইন ইউ আহমেদ বলেন, ‘তখন আমি তাঁকে (শেখ হাসিনা) বলি, “অপারেশন রিস্টোর অর্ডার শুরুতেই আমাদের একজন সৈনিককে নিহত হতে হয়েছে এবং একজন গুরুতর আহত হয়েছে। এইমাত্র খবর পেলাম বিদ্রোহীরা অনেক অফিসারকে হত্যা করেছে। আমি আরো বলি, বিদ্রোহীদের কোন শর্ত মানা যাবে না। আপনি তাদেরকে বলবেন, অফিসার হত্যা এই মুহূর্তে বন্ধ করতে হবে। আর একটি প্রাণও যেন না হারায়। দ্বিতীয়ত, আটককৃত সকল অফিসার এবং তাদের পরিবারকে এক্ষুণি মুক্তি দিতে হবে। তৃতীয়ত, অস্ত্র এবং গোলাবারুদসহ সকল বিদ্রোহীকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। চতুর্থত, আমি জোর দিয়ে বলি যে, সাধারণ ক্ষমা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’ আমাদের সাথে কথা বলার পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী চলে গেলেন। আর এরইমধ্যে কিছু সময় আমরা পেলাম বিদ্রেহীদের সাথে আলোচনার আগে।
বিকেল ৩টা ৪৮ মিনিটে ডিএডি তৌহিদের নেতৃত্বে ১৪জন বিদ্রোহী আলোচনার জন্য যমুনায় প্রবেশ করে। তাদেরকে একটি বড়রুমে রাখা হয়। আমি আমার এডিসিকে বললাম, দেখোতো এদের মধ্যে নেতা কে, ডেকে নিয়ে এসো। এডিসি জুনায়েদ তৌহিদকে নিয়ে আসলো এবং আমি তাকে বললাম, আপনি আমাকে চেনেন। তিনি বললেন হ্যাঁ। তাকে কাছে সবিস্তারে জানতে চাইলাম কতজনকে হত্যা করা হয়েছে, এখন কী অবস্থা। তিনি (আমাকে) বললেন যে, সকাল ৯টায় বিদ্রোহীরা তাকে একটি কক্ষে তালা মেরে রেখেছিল। এখোন তালা খুলে আমাকে এখানে এনেছে। আমি কিছুই জানি না। এসময় আমি তাকে বলি যে, আপনার সাথে যারা এসেছেন তাদের কাছে জেনে আমাকে জানান। তিনি ভেতরে চলে গেলেন, আর আসেননি বাইরে। আধা ঘন্টার মত অপেক্ষা করে আবার কাপ্টেন জুনায়েদকে ভেতরে পাঠালাম ডিএডি তৌহিদকে ডেকে নিয়ে আসার জন্যে। সে ডেকে আনলো। তৌহিদকে আমি জিজ্ঞেস করলাম যে, আপনি তো উত্তর দিলেন না। বললেন, সাথে যারা এসেছে তারা সবজানে কিন্তু কেউউ মুখ খুলছে না। তৌহিদ আবার কনফারেন্স রুমে চলে গেল।
শেখ হাসিনা বিদ্রোহীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বলে উল্লেখ করে মইন ইউ আহমেদ বলেন, বৈঠকে শেখ ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজম ছিলেন। প্রথম পর্যায়ে আলোচনা তাঁর (মইন) জানা নেই। পরের পর্যায়ে শুধু আমাকে ভেতরে ডাকা হয়। সেখানে গিয়ে দেখি ঐ ১৪ জনকে। দেখলে মনে হয় যে সকলেই রাস্তার বখাটে ছেলে। তাদের ডিমান্ড কী ছিল তা আমি জানিনি। প্রধানমন্ত্রীকে হয়তো জানিয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বললেন, যেটি আমি শুনেছি যে, তোমরা অস্ত্র-গোলাবরুদ সারেন্ডার করো এবং সবাই ব্যারাকে চলে যাও। পরে উনি (প্রধানমন্ত্রী) সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। আলোচনা শেষে জনাব নানক অপেক্ষমান সাংবাদিকদের জানালো পরিস্থিতির সারাংশ এবং এটাও বললেন যে, প্রধানমন্ত্রী এই বিদ্রোহীদেরকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। এবং তারা বলেছে এখোন আত্মসমর্পণ করবে এবং ব্যারাকে ফিরে যাবে। বিদ্রোহীরা ৬টা ৩৭ মিনিটে যমুনা থেকে পিলখানার উদ্দেশে রওনা দেয়। সেখানে গিয়ে তারা ঘোষণা দেয় যে, যতক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ ক্ষমার প্রজ্ঞাপন তাদের হাতে না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা আত্মসমর্পণ করবে না। তারা পুনরায় গোলাগুলি শুরু করে এবং অফিসারদের খুঁজতে থাকে।
মইন ইউ আহমেদ বলেন, রাত ১২টায় তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, শেখ ফজলে নূর তাপস ও তৎকালীন আইজিপি (পুলিশের মহাপরিদর্শক) পিলখানায় যান আলোচনার জন্য এবং তাদের সাথে বসেন। একপর্যায়ে বিদ্রোহীরা কিছু অস্ত্র সমর্পণ করে এবং আটটি পরিবারকে মুক্তি দেয়। এরমধ্যে শুধু তিনটি পরিবার ছিল সেনা অফিসারদের। ৫টি ছিল ডিএডি ফ্যামিলি। সাহারা খাতুন জানতেন অফিসার এবং পরিবারের সদস্যদেরকে কোয়ার্টার গার্ডে বন্দী করে রাখা হয়েছে। কিন্তু তিনি তাঁদের মুক্তির ব্যাপারে উদ্যোগ নেননি, খোঁজ-খবরও নেননি। ঐ ৮টি পরিবার নিয়ে তিনি পিলখানা থেকে বের হয়ে আসেন।
পরদিন ২৬ ফেব্রুয়ারি আবার গোলাগুলি শুরু করে বিদ্রোহীরা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী সকাল সাড়ে ১০টায় তাঁকে ডেকে নেন জানিয়ে মইন ইউ আহমেদ বলেন, তাঁকে জানানো হয় বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ না করলে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হবে। তিনি সাভার থেকে ট্যাংক আনার অনুমতি চান। সেটা দেওয়া হয়। তিনি ট্যাংক রওনা দেওয়ার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে নির্দেশ দেন। অন্য প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। মইন ইউ আহমেদ বলেন, সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি ও ট্যাংক আসার কথা শুনে বিদ্রোহীরা কোনো শর্ত ছাড়া আত্মসমর্পণে রাজি হয়। শেখ হাসিনা বেলা দুইটায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের সময়সীমা বেঁধে দেন। সেই পরামর্শ তিনি (মইন) দিয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর আক্রমণ প্রস্তুতি দেখে বিদ্রোহীরা আলোচনা ও আত্মসমর্পণের জন্য উদ্গ্রীব হয় এবং সাদা পতাকা টানিয়ে দেয়। রাতে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি দল পিলখানায় প্রবেশ করে এবং বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ করে। এর মাধ্যমে ৩৩ ঘণ্টার বিদ্রোহের অবসান হয়। প্রাণ হারান ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা, যাঁরা সেনাবাহিনীর মেরুদন্ড ছিলেন।
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি ভারতের বিবেচনার ওপর নির্ভর করছে। প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকা সত্ত্বেও নয়াদিল্লি চাইলে ঢাকার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে। চুক্তির মধ্যে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রয়েছে। তাই শেখ হাসিনাকে ঢাকায় ফেরত পাঠানো হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরার গভীর বিশ্লেষণমূলক অনুষ্ঠান ‘ইনসাইড স্টোরি’তে এ বিষয়টি উঠে এসেছে। ‘বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে ভারত কি প্রত্যর্পণ করবে?’ শিরোনামে ওই অনুষ্ঠানের ভিডিও প্রতিবেদন মঙ্গলবার আল–জাজিরার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে গত সোমবার দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কূটনৈতিক পত্র দেওয়া হয়। গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অভিযোগে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত এনে বিচারের মুখোমুখি করতে চায় অন্তর্বর্তী সরকার।
আদ্রিয়ান ফিনিঘানের উপস্থাপনায় ইনসাইড স্টোরিতে কথা বলেন ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত, যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো সোহেলা নাজনীন ও বাংলাদেশের নারী অধিকারবিষয়ক সংগঠন নারীপক্ষের সহপ্রতিষ্ঠাতা শিরীন হক।
শ্রীরাধা দত্তের কাছে আদ্রিয়ান ফিনিঘানের প্রশ্ন ছিল, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের প্রতি যে অনুরোধ জানানো হয়েছে, তা নিয়ে নয়াদিল্লির প্রতিক্রিয়া কেমন হতে হবে? ঢাকার এই অনুরোধ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে বলে মনে হচ্ছে। আপনি কী মনে করেন?
জবাবে শ্রীরাধা বলেন, নিঃসন্দেহে এটি (শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ) একটি বেশ জটিল প্রক্রিয়া। এখানে রাজনৈতিক বিবেচনাসহ আরও কিছু বিষয় আছে। তা ছাড়া বাংলাদেশের বিচার বিভাগ কতটা নিরপেক্ষ, তা-ও ভেবে দেখবে ভারত। পাশাপাশি কিছু টেকনিক্যাল বিষয়ও রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে ভারতের কাছে শুধু কূটনৈতিক পত্র দেওয়া হয়েছে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেওয়া হয়নি। সেটাও বিবেচনায় নেবে ভারত। এ ছাড়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কতটা ন্যায়বিচার পাবেন—এ ধরনের নানা বিষয়ও আছে।
একই প্রশ্নের জবাবে সোহেলা নাজনীন বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালে যে প্রত্যর্পণ চুক্তি হয়েছে, তাতে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রয়েছে। সাধারণত যেকোনো প্রত্যর্পণ চুক্তিতে এ ধরনের কিছু শর্ত থাকে। যেমন কোনো দেশ যদি মনে করে ফেরত পাঠানো ব্যক্তির ক্ষেত্রে সুষ্ঠু বিচারপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে না, সে ক্ষেত্রে চুক্তিবদ্ধ কোনো দেশ প্রত্যর্পণ আহ্বানে সাড়া না–ও দিতে পারে। আর শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে ভারত কী করবে, তা ভারত সরকারই ভালো বলতে পারবে।
এরপর তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে অনেক অভিযোগ রয়েছে। তিনি কি ন্যায়বিচার পাবেন? আপনার কী মনে হয়? জবাবে সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এই রিসার্চ ফেলো বলেন, এটা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কী ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে, সেটার ওপর নির্ভর করছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমি আশা করব, গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে তারা সুষ্ঠু প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে।’
শিরীন হকের কাছে আদ্রিয়ান ফিনিঘানের প্রশ্ন ছিল, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনালকে কতটা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়? এই মধ্যে তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ফেসবুকে অভিযোগ করেছেন, তাঁর মা ও আওয়ামী লীগের নেতারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই তাঁদের বিচারের কথা বলা হচ্ছে।
জবাবে শিরীন হক বলেন, এই ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার আমলেই নানা কারণে বিতর্কিত হয়েছিল। কিন্তু তা দূর করার জন্য তাঁর সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এখন তিনিই (শেখ হাসিনা) এই ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই আশা করব, বিচারে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে, অবাধ ও সুষ্ঠু বিচার হবে।’
তবে সবকিছু অনিশ্চিত—এমন মন্তব্য করে শিরীন হক বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে কথা বলা হচ্ছে, সেটার সঙ্গে তিনি একমত নন। এর একটি কারণ হলো, ২০১৩ সালে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে চাপ তৈরি করতে শাহবাগে (আওয়ামী লীগ) সরকারের পক্ষে গণজাগরণ হয়েছিল, সেখানে ফাঁসি দাবি করা হয়েছিল। এভাবেই ট্রাইব্যুনালটি বিতর্কিত হয়েছিল। এবার সে রকম কিছু হচ্ছে না। তিনি আশা করেন, এবার তেমনটি হবে না, ভিন্ন কিছু হবে।
প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে ভারত অতীতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণ করেছে জানিয়ে শিরীন হক বলেন, শেখ মুজিব হত্যা মামলার আসামি আবদুল মাজেদকে ফেরত পাঠিয়েছিল নয়াদিল্লি। যেহেতু অতীতে অভিযুক্তদের ভারত প্রত্যর্পণ করেছে, তাই দেশটি এবারও ঢাকার প্রত্যর্পণের অনুরোধে সাড়া দেবে।
নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) সম্প্রতি বলেছে, বাংলাদেশ যত দিন মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত করবে না, তত দিন দিল্লিকে শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের আশ্রয় দিতে হবে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এমন মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে শিরীন হক বলেন, তারা বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের বাতিল চেয়েছে। মামলা যেমনই হোক, তিনি নিজেও সব ধরনের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে। তবে তাঁকে (শেখ হাসিনা) বিচারের মুখোমুখি করা উচিত।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ‘দুর্নীতিতে’ জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, এটি ‘একদম ভুয়া’ ও ‘উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা’।
মঙ্গলবার অভিযোগের বিষয়ে সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেন, ”সরকারি কোনো প্রকল্প থেকে আমি কিংবা আমার পরিবার, কেউই কোনো দেশের থেকে অর্থ নেইনি। এ ধরনের কোনো ঘটনার সঙ্গে আমাদের সম্পৃক্ততাও নেই।”
সপ্তাহ খানেক আগে আনুষ্ঠানিকভাবে জয় ও তার মা শেখ হাসিনা, খালা শেখ রেহানা ও খালাত বোন টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পে ৫৯ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়ার তথ্য দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।
সেদিন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের বিশেষ অগ্রাধিকারের আট প্রকল্পে শেখ হাসিনাসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে ওঠা ২১ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করার কথাও বলে দুদক।
গত ১৭ ডিসেম্বর দুদক এ দুই সিদ্ধান্ত জানানোর পরদিন এ নিয়ে অনুসন্ধান চালাতে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে।
এছাড়া শেখ হাসিনা এবং তার ছেলে ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে ৩০ কোটি ডলার পাচারের আরেকটি অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনার পালিয়ে ভারতে যাওয়ার পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার এসব ‘দুর্নীতির’ তদন্তকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখার কথা বলেছে।
এরইমধ্যে এ নিয়ে কাজ শুরুর তথ্য তুলে ধরে মঙ্গলবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “শেখ হাসিনার দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে আমাদের কাজগুলো শুরু হয়েছে। আরও বিস্তারিত কার্যক্রম জানতে পারবেন। এটা আমাদের টপ প্রায়োরিটি।”
এ খবর প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা পর মঙ্গলবার রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পে ওঠা দুর্নীতির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বসবাসরত জয়ের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে রয়টার্স।
জয় দাবি করেন, “এক হাজার কোটি ডলারের কোনো প্রকল্প থেকে কোটি কোটি ডলার আত্মসাৎ করা সম্ভব নয়। আমাদের অফশোর কোনো ব্যাংক হিসাবও নেই।
“আমি ৩০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে থাকি। আমার খালা (শেখ রেহানা) ও খালাতো বোনেরাও প্রায় একই সময় ধরে যুক্তরাজ্যে থাকেন। এসব দেশে আমাদের ব্যাংক হিসাব আছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের কেউই কখনো এত অর্থ দেখিনি।”
দুদকের অভিযোগ, রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের ‘আর্থিক অনিয়ম’ হয়েছে। এ প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তির মাধ্যমে শেখ হাসিনা, তার ছেলে জয় ও ভাগ্নি টিউলিপ সিদ্দিক ওই অর্থ আত্মসাৎ করেছেন, যা ‘পাচার করা হয়েছে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন অফশোর ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে’।
রয়টার্স লিখেছে, বিট্রিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক এবং রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকারী রাশিয়ান কোম্পানি রোসাটমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া মেলেনি।
তবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের একজন মুখপাত্র ‘দুর্নীতিতে’ টিউলিপের যুক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তার (টিউলিপ) প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আস্থা রয়েছে। টিউলিপ তার দায়িত্ব চালিয়ে যাবেন।
শেখ হাসিনার ভাগ্নি টিউলিপ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের নেতৃত্বাধীন সরকারে আর্থিক সেবাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর (সিটি মিনিস্টার) দায়িত্বে আছেন।
এর আগে বাংলাদেশে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার মান্টিটস্কিও রূপপুর প্রকল্পের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের ৫০০ কোটি ডলার ঘুষ দেওয়ার অভিযোগকে ‘গুজব’ ও ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দেন।
বর্তমানে ভারতে থাকা শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কয়েকদিন ধরে সংবাদমাধ্যমে এসব খবর প্রকাশ হলেও সজীব ওয়াজেদ জয় এতদিন কোনো বক্তব্য দেননি; যিনি বিভিন্ন বিষয়ে মাঝেমধ্যেই ফেইসবুকে পোস্ট দেন।
তবে মঙ্গলবার রাতে তিনি দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছেন।
এদিকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত আনতে সম্প্রতি ভারত সরকারকে চিঠি দেওয়ার তথ্য দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
রয়টার্সকে জয় বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে তাদের পরিবার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি এবং নয়া দিল্লিও তাকে অন্য কোথাও আশ্রয় নেওয়ার কথা বলেনি।