জিয়া হত্যার বিচার কেন চায় না বিএনপি?

অনলাইন ডেস্ক   প্রিন্ট
রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬   সর্বশেষ আপডেট : ১:০০ অপরাহ্ণ

– স্বপ্নীল ফিরোজ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও জটিল অধ্যায়গুলোর একটি হলো ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সংঘটিত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড এবং এর পরবর্তী বিচার প্রক্রিয়া। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া এই দেশটির সেনাবাহিনী ও রাজনীতিতে পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে যে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছিল, জিয়া হত্যাকাণ্ড এবং এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তারই একটি চরম ও নিষ্ঠুর বহিঃপ্রকাশ। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সংঘটিত এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন সামরিক আইন ও কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে যেভাবে তড়িঘড়ি করে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল, তা নিয়ে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তীব্র বিতর্ক, আইনি প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক বাগবিতণ্ডা চলছে।

সমালোচক, ইতিহাসবিদ ও আইনি বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশের মতে, জিয়া হত্যার বিচার করতে গিয়ে গঠিত সামরিক ট্রাইব্যুনালে যেভাবে দ্রুততম সময়ে বিচার শেষ করে বহু খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ সেনা কর্মকর্তাদের ফাঁসি বা ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, তাঁদের অনেকেই ন্যায়বিচার পাননি। এই তড়িঘড়ি বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কেবল যে অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয়েছিল তা-ই নয়, বরং এর নেপথ্যের মূল রাজনৈতিক ও সামরিক কুশীলবদের আড়াল করার একটি পরিকল্পিত চেষ্টাও ছিল। এই বিশাল সংখ্যক অফিসার হত্যার দায় এবং তাঁদের পরিবারের ওপর নেমে আসা অন্যায়ের দায় থেকে তৎকালীন সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব মুক্ত হতে পারে না।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বড় প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কেন দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও জিয়া হত্যার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও প্রচলিত দেওয়ানি বা সাধারণ আদালতে উন্মুক্ত বিচার দাবি বা সম্পন্ন করেনি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাস, ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব এবং আইনি বাস্তবতার এক জটিল সমীকরণ উন্মোচিত হয়।

১৯৮১ সালের মে মাসের শেষের দিকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ মেটাতে এবং স্থানীয় সাংগঠনিক অবস্থা জোরদার করতে চট্টগ্রাম সফরে যান। ৩০ মে গভীর রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল বিক্ষুব্ধ সেনা কর্মকর্তার অতর্কিত হামলায় তিনি নিহত হন।
এই অভ্যুত্থানের মূল নেতৃত্ব ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে চট্টগ্রামের ২৪তম পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুল মঞ্জুরকে অভিযুক্ত করা হয়। জেনারেল মঞ্জুর ছিলেন একজন প্রখ্যাত বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং জিয়াউর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। তবে তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ এবং সরকারের উচ্চমহলের সাথে মঞ্জুরের তীব্র নীতিগত ও ব্যক্তিগত দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। হত্যাকাণ্ড ঘটার ঠিক আগমুহূর্তে জেনারেল মঞ্জুরকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার একটি অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদে (স্টাফ কলেজ) বদলি করা হয়। এই বদলিকে মঞ্জুর তাঁর সামরিক ক্যারিয়ারের অবমাননা হিসেবে দেখেছিলেন এবং ধারণা করা হয়- এই তাৎক্ষণিক ক্ষোভ ও সেনাবাহিনীতে বিরাজমান দীর্ঘদিনের অসন্তোষ থেকেই তিনি অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
অভ্যুত্থানের পর বিদ্রোহীরা রেডিওতে যে বক্তব্য প্রচার করেছিল, তাতে জিয়ার প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে এই বিদ্রোহ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ঢাকার সেনা সদর দপ্তরের কঠোর অবস্থান এবং সাধারণ সৈনিকদের সমর্থন না পাওয়ায় মাত্র দুই দিনের মাথায় বিদ্রোহ ব্যর্থ হয় এবং জেনারেল মঞ্জুরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে অত্যন্ত রহস্যজনক পরিস্থিতিতে জেনারেল মঞ্জুরকে বন্দী অবস্থায় চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ভেতরেই গুলি করে হত্যা করা হয়, যা এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য উন্মোচনের পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়।

জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পরপরই তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার সরকারের অধীনে দেশজুড়ে সামরিক আইন জারি করা হয়। সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ এবং রাষ্ট্রপতি হত্যার অভিযোগে একটি বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনাল (কোর্ট মার্শাল) গঠন করা হয়। এই ট্রাইব্যুনালের প্রধান ছিলেন তৎকালীন মেজর জেনারেল আব্দুর রহমান।তিনি অস্বাভাবিক দ্রুততায় একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হত্যার মতো সুদূরপ্রসারী ও সংবেদনশীল মামলার বিচার সম্পূর্ণ করেন।

বিচারটি যেখানে সাধারণ আদালতে বছরের পর বছর ধরে চলার কথা, তা এই সামরিক আদালতে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ করা হয়েছিল। ১৯৮১ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই রায় কার্যকর করা হয়।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে অত্যন্ত গোপনে এবং কড়া সামরিক পাহাড়ার মধ্যে এই ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সংবাদমাধ্যম বা জনসাধারণের সেখানে প্রবেশের কোনো সুযোগ ছিল না।

অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের পক্ষে কোনো স্বাধীন বা বেসামরিক আইনজীবী নিয়োগের মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। সামরিক বাহিনীর বিধিমালা অনুযায়ী নামমাত্র ডিফেন্স কাউন্সিল গঠন করা হলেও, তারা অভিযুক্তদের পক্ষে যথাযথ তথ্য-প্রমাণ বা যুক্তি উপস্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত সময় বা সুযোগ পাননি। অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, এটি ছিল একটি পূর্ব-নির্ধারিত রায় বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

১৯৮১ সালের এই কোর্ট মার্শালের রায়ে ৩১ জন সেনা কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয় এবং ১৩ জন শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। এই ১৩ জন কর্মকর্তার প্রায় সকলেই ছিলেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখসমরের বীর যোদ্ধা, যাদের অনেকেই বীর বিক্রম, বীর উত্তম বা বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত ছিলেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান কর্মকর্তারা ছিলেন-
১. ব্রিগেডিয়ার মহসীন উদ্দিন আহমেদ, বীর বিক্রম
২. কর্নেল এম এ রশীদ চৌধুরী
৩. কর্নেল শাহ আব্দুল হান্নান
৪. লে. কর্নেল এ টি এম মাহফুজুর রহমান, বীর বিক্রম
৫. লে. কর্নেল এম দেলোয়ার হোসেন
৬. লে. কর্নেল নওয়াজেশ উদ্দিন
৭. মেজর গিয়াস উদ্দিন আহমেদ
৮. মেজর কাজী মোমিনুল ইসলাম
৯. মেজর মোস্তফা আনোয়ার
১০. ক্যাপ্টেন মোমতাজুল ইসলাম
১১. ক্যাপ্টেন জামিল হক
১২. ক্যাপ্টেন হাফিজ উদ্দিন আহমেদ
১৩. লে. রফিক হাসান খান

এই তড়িঘড়ি বিচারের মাধ্যমে মূলত সেনাবাহিনী থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল অফিসারদের একটি বড় অংশকে পরিকল্পিতভাবে নির্মূল বা নিষ্ক্রিয় করা হয়েছিল। কেবল এই ১৩ জনের ফাঁসিই নয়, এই ঘটনার পর প্রায় কয়েক শত অফিসার এবং জেসিও-জোয়ানকে চাকরিচ্যুত করা হয়, অনেকের পেনশন বাতিল করা হয় এবং অনেককে দীর্ঘ মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এই গণ-ফাঁসি এবং তাড়াহুড়ো করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ফলে যে মানবাধিকার ও আইনি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছিল, তার দায় থেকে তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোনোভাবেই মুক্ত হতে পারেন না। ফাঁসি হওয়া কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরা আজও দাবি করে আসছেন যে, তাঁদের স্বজনরা চক্রান্তের শিকার হয়েছিলেন এবং রাষ্ট্রপ্রধান হত্যার মূল পরিকল্পনার সাথে তাদের কোনো সরাসরি যোগসূত্র ছিল না। তারা স্রেফ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ মানতে বাধ্য হয়েছিলেন অথবা ভুল তথ্যের শিকার হয়েছিলেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় রহস্য ও বিতর্কের একটি হলো- বিএনপি যখনই ক্ষমতায় এসেছে (১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬), তারা কেন জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের নতুন কোনো তদন্ত বা সাধারণ দেওয়ানি আদালতে (Civil Court) উন্মুক্ত বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেনি? এই অনীহার পেছনে গভীর রাজনৈতিক ও আইনি কারণ রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

জিয়াউর রহমানের নিজস্ব শাসনামলে (বিশেষ করে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত) সেনাবাহিনীতে অসংখ্য ছোট-বড় অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবরের ব্যর্থ অভ্যুত্থান। সেই সময় সামরিক আদালতের মাধ্যমে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও গোপন বিচারে শত শত বিমানবাহিনী ও সেনাবাহিনীর জোয়ান ও অফিসারকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল বা ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করা হয়েছিল।

যদি ১৯৯১ বা ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে ১৯৮১ সালের সামরিক আদালতের রায়টিকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’, ‘অবৈধ’ বা ‘অসম্পূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে নতুন করে বেসামরিক বিচার শুরু করত, তবে স্বাভাবিকভাবেই একটি আইনি নজির বা ‘Precedent’ তৈরি হতো। এর ফলে জিয়াউর রহমানের নিজস্ব শাসনামলে যে শত শত সামরিক বিচার (কোর্ট মার্শাল) হয়েছিল, সেগুলোর বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠত। নিহত সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারগুলোও তখন জিয়ার সময়কার বিচারগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার আইনি ভিত্তি পেয়ে যেত। সুতরাং, জিয়াউর রহমানের নিজস্ব শাসনামলের সামরিক আইনি কাঠামো এবং তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে ও অক্ষুণ্ণ রাখতে গিয়েই বিএনপি সম্ভবত ১৯৮১ সালের সামরিক আদালতের রায়টিকে চূড়ান্ত হিসেবে মেনে নিয়েছিল এবং সেটিকে নতুন করে স্পর্শ করতে চায়নি।

বিএনপি যে ঠুনকো যুক্তি দাঁড় করিয়ে জিয়াউর রহমানের আই ওয়াশ বিচারের বৈধতা দিয়ে তাকে রক্ষা করতে চায় তা হলো- যেহেতু ১৯৮১ সালে একটি সামরিক আদালতের মাধ্যমে ঘটনার সাথে জড়িতদের বিদ্রোহের অভিযোগে বিচার সম্পন্ন হয়ে গেছে এবং সাজা কার্যকর হয়েছে, তাই একই ঘটনার ওপর ভিত্তি করে পুনরায় সাধারণ আদালতে ফৌজদারি মামলা পরিচালনা করা আইনি জটিলতার সৃষ্টি করবে।

প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে- তৎকালীন কোর্ট মার্শালে কেবল ‘সামরিক বিদ্রোহের  বিচার হয়েছিল, দেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে সপরিবারে বা দলগতভাবে হত্যার যে ফৌজদারি অপরাধ তার বিচার সেখানে করা হয়নি। ফলে সাধারণ আদালতে বিচার করার ক্ষেত্রে কোনো স্থায়ী আইনি বাধা ছিল না, কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ছিল। বিচার করতে গেলে কেঁচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে পরার মতো সামরিক ট্রাইবুনালে জিয়া কীভাবে অতীতে শত শত বীর মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছেন সেই সমস্ত গোপন রহস্য উদঘাটিত হয়ে ফেঁসে যেতেন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বয়ং নিজে।

জিয়া হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক ও সামরিক সুবিধাভোগী কে ছিলেন- তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জিয়ার মৃত্যুর পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার কিছুদিন ক্ষমতায় থাকলেও মূলত ক্ষমতার মূল নিয়ন্ত্রণ চলে যায় তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদের হাতে, যিনি পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পূর্ণ ক্ষমতা দখল করেন।

যদি সাধারণ আদালতে উন্মুক্ত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত হতো, তবে তৎকালীন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এমন অনেক সংবেদনশীল তথ্য বা নথি সামনে চলে আসত, যা তৎকালীন রাষ্ট্রীয় বা সামরিক কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দিতে পারত। এমনকি বিএনপির ভেতরে বা বাইরে থাকা এমন অনেকের নামও হয়তো আলোচনায় আসতে পারত যারা এই হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছিলেন। এই ধরনের অপ্রিয় ও বিপজ্জনক সত্যের মুখোমুখি হওয়ার ভয় থেকেই বিএনপি সাধারণ কোর্টে বিচার করা থেকে বিরত থেকেছে বলে ধারণা করা হয়।

কর্নেল তাহেরের ফাঁসি জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা লিপ্সার এক মর্মান্তিক দলিল। সেনাবাহিনীতে গোপন ট্রাইব্যুনাল এবং দ্রুত ফাঁসি দেওয়ার এই সংস্কৃতির গোড়াপত্তন কিন্তু জিয়াউর রহমানের শাসনামলেই হয়েছিল, যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ কর্নেল আবু তাহেরের (অব.) ফাঁসি। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে বন্দিদশা থেকে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে কর্নেল তাহের প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সমাজতান্ত্রিক ধারার ‘গণবাহিনী’ এবং সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলার অভিযোগ এনে স্বয়ং জিয়ার নিজের জীবন রক্ষাকারী ত্রাণকর্তাকে হত্যা করে তিনি ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন।

১৯৭৬ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে একটি গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে কর্নেল তাহেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই তা কার্যকর করা হয়।

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর, ২০১১ সালে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত (সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ) এক ঐতিহাসিক রায়ে কর্নেল তাহেরের সেই গোপন সামরিক আদালতের বিচারটিকে সম্পূর্ণ “অবৈধ এবং অসাংবিধানিক” বলে ঘোষণা করে। আদালত কর্নেল তাহেরকে “দেশপ্রেমিক শহীদ” হিসেবে উল্লেখ করে এবং তৎকালীন সামরিক ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়াটিকে একটি সাজানো নাটক ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করে।

এই আইনি নজিরটি ১৯৮১ সালের বিচারের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হতে পারে বলে অনেক আইনজীবী মনে করেন। ১৯৮১ সালে যে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের বিচার প্রক্রিয়াও ছিল ঠিক তেমনি গোপন, দ্রুত এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগহীন। ফলে, বিএনপি যদি জিয়া হত্যার সুষ্ঠু বিচার প্রচলিত আদালতে চাইত, তবে স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের নিজেদের নেতার সময়ে হওয়া কর্নেল তাহেরের বিচার বা ১৯৭৭ সালের গণ-ফাঁসিতে ১২ শতাধিক সেনা অফিসার (যাদের বেশিরভাগই ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা )হত্যার দায় মেনে নেওয়ার নৈতিক বাধ্যবাধকতা তৈরি হওয়ার ভয়ে বিএনপি জিয়া হত্যার বিচার চায় না বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন।

বিএনপি জিয়াউর রহমানের রক্তমাখা হাত এবং কলঙ্ক ঢাকতেই জিয়াকে একজন “শহীদ” ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে রাজনৈতিক ও আবেগীয় সুবিধা আদায় করার চেষ্টা করেছে। তারা বিভিন্ন সময়ে এর জন্য আওয়ামী লীগ বা বিদেশি শক্তির দিকে পরোক্ষ ইঙ্গিত করলেও জিয়া হত্যার বিচার করার কোন সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যবস্থা নেয়নি।

কিন্তু দেশের সর্বসাধারণের মনে সবসময় প্রশ্ন জাগে- বিএনপি এত বছর ক্ষমতায় থেকে কেন নিজেদের দলের প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতির হত্যার বিচার করতে পারল না? ১৯৯৩ সালের জুন মাসে পঞ্চম জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মতিয়া চৌধুরী (যিনি তাঁর রাজনৈতিক অগ্নিকণ্ঠী ভাষণের জন্য পরিচিত ছিলেন) সংসদে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উদ্দেশ্যে সরাসরি প্রশ্ন ও অনুরোধ ছুঁড়ে দেন যে- খালেদা জিয়া তাঁর স্বামী (প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান) হত্যার বিচার কেন করছেন না? তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় আসে, তবে তারা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করবে। মতিয়া চৌধুরী খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে আরও বলেন, “আপনি দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও কেন এই হত্যাকাণ্ডের বিচার বা পুনঃতদন্তের উদ্যোগ নিচ্ছেন না?” জবাবে খালেদা জিয়া মতিয়া চৌধুরীকে বলেছিলেন- “আপনার এত দরদ থাকলে আপনি বিচারের উদ্যোগ নেন।” কী হাস্যকর ছিল এ বক্তব্য। জবাবে মতিয়া চৌধুরী শুধু এটুকু বলেছিলেন- “আপনার স্বামী আপনি বিচার চান না, আমার কী দায়!” এখান থেকেও জনগণ বুঝে নিয়েছে- ডালমে কুছ কালা হ্যায়।

পরিশেষে বলা যায়, ১৯৮১ সালের জুনে গঠিত সামরিক ট্রাইব্যুনালে যে তড়িঘড়ি বিচার হয়েছিল, তা কোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা দেশীয় প্রচলিত আইনের পরিমাপকাঠিতেই ‘ন্যায়বিচার’ ছিল না। মাত্র কয়েক দিনের গোপন বিচারে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যেভাবে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর ইতিহাসের একটি বড় ট্র্যাজেডি। শত শত অফিসার ও জোয়ানকে বলির পাঁঠা বানিয়ে মূলত রাষ্ট্রপ্রধান হত্যার মূল নকশাকারদের আড়াল করা হয়েছিল।

এই নির্মম সত্যের কারণেই বিএনপি পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় এসেও জিয়া হত্যার সাধারণ আদালতে উন্মুক্ত বিচার বা নতুন করে তদন্ত করতে সাহস পায়নি। কারণ সাধারণ আদালতে নিরপেক্ষ বিচার শুরু হলে জিয়াউর রহমানের নিজস্ব শাসনামলের সামরিক আদালতগুলোর বৈধতা যেমন প্রশ্নের মুখে পড়ত, তেমনি সেনাবাহিনী ও রাজনীতির ভেতরের অনেক শক্তিশালী ও স্পর্শকাতর মহলের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। ফলে, শত শত সামরিক কর্মকর্তার অন্যায্য হত্যার দায় এবং জিয়া হত্যার অসম্পূর্ণ বিচারের বিতর্কটি বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় এক গভীর ক্ষত ও অনুদঘাটিত রহস্য হিসেবেই থেকে যাবে।

 

(টেক্সাস থেকে )

Facebook Comments Box

Posted ১:০০ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬

nyvoice24 |

Address
New York
Phone: 347-623-7137
Email: nyvoice24@gmail.com
Follow Us