নিজস্ব প্রতিনিধি
প্রিন্ট
শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট : ৯:২৪ পূর্বাহ্ণ
নিজের লেখা বই তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে দিচ্ছেন সৈয়দ আশরাফ আহমেদ। পাশে ড. মোস্তফা সারোয়ার। ছবি-সংগ্রহ।
নিজস্ব প্রতিনিধি
বাংলাদেশে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় পথিকৃত হিসেবে বিবেচিত তৌফিক ইমরোজ খালিদীর অকাল প্রয়াণে আটলান্টিকের এপাড়েও শোকের ছায়া ফেলেছে। লেখক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী-গবেষক-শিক্ষক-রাজনীতিক ছাড়াও সচেতন প্রবাসীদের অনেকে ফোন করে কিংবা সোস্যাল মিডিয়ায় নিজ নিজ শোক-অনুভ’তি প্রকাশ করেছেন। সকলেই অন-লাইন সাংবাদিকতার বিকাশে খালিদীকে চিরস্মরণীয় করে রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, ‘চাপের কাছে মাথানত না করে সঠিক তথ্য উপস্থাপনে সবসময়ই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম পাঠকের আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এজন্যেই পরবর্তীতে ডিজিটাল মিডিয়ার ছড়াছড়িতেও নিজের ইমেজ অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
খালিদীর মৃত্যুর সংবাদ জানার পর নিউইয়র্কে বসবাসরত জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন, বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নঈম নিজাম, বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে এ মোমেন, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা ইকবাল ইউসুফ, যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি মেডিকেল রিসার্চ ইন্সটিটিউট অব ইনফ্যাকশাস ডিজিজের প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর (গবেষক-বিজ্ঞানী) এবং লেখক সৈয়দ আশরাফ আহমেদ, নিউঅর্লিন্স ইউনিভার্সিটির এমিরিটাস অধ্যাপক ও সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর, মুক্তচিন্তার লেখক মোস্তফা সারোয়ার প্রমুখ এ সংবাদদাতার মাধ্যমে গভীর শোক জ্ঞাপন এবং বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন।
বস্টনে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইএসডিআইয়ের সেমিনারে তৌফিক ইমরোজ খালিদী। পাশে ড. মশিউর রহমান এবং আইএফআইসি গ্রুপের মীরা নারায়নস্বামী। ছবি-সংগ্রহ।
ঢাকাস্থ জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, তৌফিক ইমরোজ খালিদী আপাদমস্তক একজন সাংবাদিক । অনলাইন সাংবাদিকতার বিকাশে তাঁর অনন্য ভূমিকা রয়েছে। বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশে ডিজিটাল সাংবাদিকতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিডি নিউজ পাঠকদের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। তিনি বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে গভীরভাবে ধারণ করতেন। সজ্জন, প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার একজন মানুষ ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে সাংবাদিকতা জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি হল। আমি তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করছি।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাবেক সম্পাদক, কলামিস্ট ও লেখক নঈম নিজাম বলেছেন, তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যু বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় এক গভীর শূন্যতা তৈরি করল। তিনি শুধু একজন পেশাদার সাংবাদিক ও সম্পাদক ছিলেন না, বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে প্রিন্ট ও সম্প্রচারের গন্ডি পেরিয়ে ডিজিটাল যুগে নিয়ে যাওয়ার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন। ২০০৬ সাল থেকে তাঁর নেতৃত্বে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম দেশের অনলাইন সাংবাদিকতায় নতুন একটি ধারা তৈরি করে।
বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নঈম নিজাম বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশের মিডিয়া বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছে। এমন একটি সংকটের মুহূর্তে খালিদীর মত সাহসী সম্পাদকের প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশী। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর মেধা, সাহস, অনুসন্ধিৎসা ও সংবাদবোধকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলায় বক্তব্য দেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। পাশে মেলা কমিটির প্রধান ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ। ছবি-সংগ্রহ।
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি এ কে এ মোমেন বলেন, তৌফিক ইমরোজ খালিদী নিজ প্রতিভাগুণে বিডিনিউজ২৪ ডটকমকে জনপ্রিয় করে তোলেন । অনলাইনে তাৎক্ষণিক সব ধরণের তথ্য নির্ভর সংবাদ পরিবেশনে তার দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা অপরিসীম । তার অকাল মৃত্যুতে জাতি এক উজ্জ্বল সাংবাদিককে হারালো । আমি তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং শোক-সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। মহান আল্লাহ পাক যেন তাকে জান্নাতবাসী করেন, আমিন ।
বস্টনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ‘আইএসডিআই’ (ইন্টারন্যাশনাল সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ইন্সটিটিউট)Õর নির্বাহী পরিচালক ইকবাল ইউসুফ বলেন, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৮ সালে ‘আইএসডিআই’র উদ্যোগে বাংলাদেশের উন্নয়নে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে তৌফিক ইমরোজ খালিদী এসেছিলেন প্যানেলিস্ট হিসেবে। এর আগেও বস্টনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে পেয়েছি নির্মোহভাবে। তার পেশাগত সততা, দায়িত্বে ন্যায়-নিষ্ঠতা সকলকে মুগ্ধ করেছে। প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনায় উজ্জীবিত এবং সাদা মনের মানুষের অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকা মানুষটির হঠাৎ চলে যাবার সংবাদে আমরা সকলেই ব্যথিত। পরম করুণাময়ের কাছে র্প্র্থানা করছি, তাকে যেন বেহেস্ত নসীব করেন।
এবছরের ২২ থেকে ২৫ মে পর্যন্ত ৪দিনব্যাপী নিউইয়র্কে আন্তর্জাতিক বইমেলাতে তৌফিক ইমরোজ খালিদী এসেছিলেন বইয়ের স্টল নিয়ে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরডটকমে প্রকাশিত গবেষণাধর্মী লেখার সমন্বয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থ ছিল সেই স্টলে। বইমেলার একটি সেমিনারেও বক্তব্য দিয়েছেন খালিদী। এর দুÕদশক আগে নিউইয়র্কে ফোবানার বাংলাদেশ সম্মেলনেও এসেছিলেন তিনি। এভাবেই প্রবাসীদের সাথে নিবিড় একটি সম্পর্ক রচিত হয়েছিল। সে সব স্মৃতি রোমন্থনের মধ্যে মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা খালিদীর মৃত্যু সংবাদ জেনে ফেসবুকে লিখেছেন, Ôকোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।Õ
পেন্টাগণে মার্কিন সেনাবাহিনী মেডিকেল রিসার্চ ইন্সটিটিউটের গবেষক-বিজ্ঞানী এবং লেখক সৈয়দ আশরাফ আহমেদ বলেছেন, বিডিনিউজ২৪ ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর অকস্মাৎ মৃত্যু সংবাদে মনটি ভরাক্রান্ত হয়ে গেল। সম্প্রতি নিউইয়র্ক বইমেলায় তার সাথে প্রথম পরিচয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর তিন ভলিউমের অত্যন্ত উন্নতমানের দুর্লভ সচিত্র প্রতিবেদন সহ তিনটি ঢাউস বইয়ের কয়েকটি কপি নিয়ে এসেছিলেন। রাজু আলাউদ্দিন পরিচয় করিয়ে দিলে তাকে একজন বিনয়ী ও নিরহংকারী মনে হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের বইগুলো প্রকাশ করতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছিল বলছিলেন। এগুলোকে কীভাবে বিভিন্ন লাইব্রেরি ও উৎসাহীদের হাতে পৌছানো যায় তার পরামর্শ চাইছিলেন। তার মৃত্যুতে আমরা মুক্তিযুদ্ধের এক পরম সুহৃদকে হারালাম। মৃতের নিকটজন এবং রাজু আলাউদ্দিনকে গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।
নিউঅর্লিন্স ইউনিভার্সিটির সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর, মুক্তচিন্তার লেখক মোস্তফা সারোয়ার গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছেন, আজ (নিউইয়র্ক সময় শুক্রবার বিকেলে) সম্পাদক লাবলু আমাকে ফোন করে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মাত্র ঊনষাট বছর বয়সে অকালপ্রয়াণের হৃদয়বিদারক খবরটি জানান। এই সংবাদে আমি গভীরভাবে শোকাহত ও স্তব্ধ। বিগত বছরগুলোতে তাঁর খ্যাতিমান অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে বেশ কয়েকটি বাংলা ও ইংরেজি কলাম, সাহিত্য সমালোচনা এবং কবিতা প্রকাশের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। ২০২১ সালের শেষের দিকে ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১’ নিয়ে আয়োজিত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের একটি বিশেষ টেলিভিশন আলোচনা সভায় তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও তৌফিক ইমরোজ খালিদীর পাশাপাশি আমি সেই আলোচনায় অংশ নিয়েছিলাম। অনুষ্ঠানে তাঁর আপসহীন ও তীক্ষ্ণ স্বাধীনচেতা মনোভাব আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করে। তিনি ছিলেন একজন দুরন্ত ও নির্ভীক সাংবাদিক ও সম্পাদক, যাঁর ক্ষেত্রে কবি নজরুলের সেই অমর পঙ্ক্তিটি অত্যন্ত যথার্থ:
‘অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস;
উদ্ধত উলঙ্গ দৃষ্টি, বাণী ক্ষুরধার’
পরবর্তীকালে গত মে মাসে তাঁর সাথে আমার সরাসরি দেখা হয়েছিল নিউইয়র্কের বইমেলায়। তিনি অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ মেজাজে আমাকে নিউইয়র্কে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানান এবং আমার প্রিয় সাহিত্য সম্পাদক রাজু আলাউদ্দিনকে নির্দেশ দেন আমি ঢাকায় গেলে যেন একটি সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। কিন্তু আফসোস, সেই আড্ডা আর কখনোই বাস্তবায়িত হবে না। এই মহতী ও অসাধারণ বুদ্ধিজীবী আমাদের এই নশ্বর পৃথিবী ছেদে চিরবিদায় নিলেন।
Posted ৯:১৯ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর