জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে ২১ সেপ্টেম্বর সোমবার অপরাহ্নে নিউইয়র্কে আসছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের পর ২৫ সেপ্টেম্বর রাতের ফ্লাইটে তারেক রহমানের দেশের উদ্দেশ্যে নিউইয়র্ক ত্যাগের কথা। জেএফকে এয়ারপোর্টে অবতরণের সময় ব্যাপক অভ্যর্ত্থনা প্রদান এবং ২৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য উপস্থাপনের সময় বাইরে ‘শান্তি ও স্বাগত সমাবেশ’কে সাফল্যমন্ডিত করতে দেশপ্রেমিক সকল প্রবাসীর অকুন্ঠ সমর্থন কামনা করে ১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে বিএনপির সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন ও উদ্ভ’ত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আব্দুল লতিফ সম্রাট, জিল্লুর রহমান জিল্ল, গিয়াস আহমেদ, মিজানুর রহমান ভুঁইয়া মিল্টন, গোলাম ফারুক শাহীন, যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদ আহমেদ।
এ সময় জানানো হয় যে, ২৪ সেপ্টেম্বর তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। বলা হয়, এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কয়েকটি দিক থেকে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রথমত, বর্তমান সরকারের জন্য জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে এটিই প্রথম অংশগ্রহণ। এর মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। আবার, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একই অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। তাই, এটি বাংলাদেশীদের জন্য একদিকে যেমন বিরল ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত, অন্যদিকে তেমনি বিশেষ মর্যাদা ও গৌরবের বিষয়। সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসীদের উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি আরও বলেছে, বিদেশে অবস্থান করলেও তারা যেন দেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অপপ্রচার বা বিভ্রান্তিকর প্রচারে বিভ্রান্ত না হন। দলটি প্রবাসীদের দেশের পুনর্গঠন কার্যক্রমে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের উন্নয়নের অংশীদার এবং তাদের বিনিয়োগ ও দক্ষতাকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন বিএনপি নেতা শরাফত হোসেন বাবু, কামাল পাশা বাবুল, আনোয়ার হোসেন, নিয়াজ আহমেদ জুয়েল, আনোয়ারুল ইসলাম, আক্তার হোসেন বাদল, কাজী আজম, ফিরোজ আলম, সবুর খান, মোশারফ হোসেন সবুজ, গিয়াস উদ্দিন, শাহ আলম, সাইদুল হক, জহিরুল ইসলাম মোল্লা, জসিম ভুইয়া, সৈয়দা মাহমুদা শিরিন, আলহাজ্ব বাবরউদ্দিন, শফিকুর রহমান দুলাল, সৈয়দ এ আর ফারুক, বাসেত রহমান, ডা. আব্দুস সবুর, শাহজাহান শেখ, নুর মোহাম্মদ, রফিকুল ইসলাম, ফারুক হোসেন মজুমদার, রফিকুল ইসলাম ডালিম, সৈয়দ মোরশেদুল হাসান রেজা, মো. মহসিন, মাজহারুল ইসলাম জনি, গোলাম হায়দার মুকুট, মো. মাসুদ রানা, জাকির হাওলাদার, মাকসুদ চৌধুরী, সাহেল খান। স্টেট বিএনপির নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন অলি উল্লাহ আতিকুর রহমান, জসিম উদ্দিন ভিপি, সাঈদুর রহমান সাঈদ, সিনিয়র সহ-সম্পাদক আরিফুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক রউসউদ্দিন, সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ন কবীর, সাংবাদিক আনিসুর রহমান, এ আর মাহবুবুল হক, আমিন উদ্দিন চৌধুরী, বদরুল হক আযাদ, আশরাফ আলী, জিয়াউর রহমান মিলন, দেওয়ান কাউসার প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ৪০ বছর পর আবারও একজন বাংলাদেশি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন। এর আগে ১৯৮৬-৮৭ মেয়াদে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ছিলেন। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফরকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরার একটি সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে, তারেক রহমানের আগমণের সময় থেকে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত সকল কর্মসূচি প্রতিরোধের ডাক দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ, নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ। সেদিকে ইঙ্গিত করে বিএনপি নেতৃবৃন্দ দলীয় নেতা-কর্মী ও দেশপ্রেমিক প্রবাসীদেরকে চোখ-কান খোলা রেখে শান্তিপূর্ণভাবে তারেক রহমানের কার্যক্রমকে সম্পন্নের জন্যে সহযোগিতার আহবান জানিয়েছেন। যে কোন ধরনের উস্কানীমূলক কর্মকান্ডে বিএনপির নেতা-কর্মীরা যেন মাথা ঠান্ডা রেখে পদক্ষেপ নেন-সে কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিভিন্ন স্টেট থেকে বিপুলসংখ্যক কর্মী জড়ো হচ্ছেন নিউইয়র্কে তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা তারেক রহমানের সফরকে সাফল্যমন্ডিত করতে।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের পর নিউইয়র্কে কন্সাল জেনারেলের আয়োজনে তারেক রহমানকে নাগরিক সম্বর্ধনা প্রদানের যে প্রস্তুতি চলছিল, তা বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীগণের সাথেও জাতিসংঘ সফরের আলোকে কোন সংবাদ সম্মেলনে মিলিত হবেন না। এর আগে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলন করেছেন প্রতিবারই জাতিসংঘ সফরের আলোকে।
এদিকে বাংলাদেশের ক’টনীতিকরা দাবি করেছেন, এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কয়েকটি দিক থেকে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রথমত, বর্তমান সরকারের জন্য জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে এটিই প্রথম অংশগ্রহণ। এর মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। ক’টনীতিকরা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। আবার, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একই অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। তাই, এটি বাংলাদেশীদের জন্য একদিকে যেমন বিরল ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত, অন্যদিকে তেমনি বিশেষ মর্যাদা ও গৌরবের বিষয়।
মিশনের কর্মকর্তারা জানান, অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হবেন। এসব বৈঠক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা জোরদারের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশ মিশন সূত্র জানায়, নিউইয়র্কে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী ২২ সেপ্টেম্বর থেকে তাঁর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু করবেন। সকালে তিনি রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের জন্যে জাতিসংঘ মহাসচিবের আয়োজনে স্বাগত প্রাতঃরাশে যোগ দেবেন। এরপর তিনি এবারের অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশ্বনেতার সঙ্গে অংশগ্রহণ করবেন। সন্ধ্যায় তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট আয়োজিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাঁদের সহধর্মিণীদের সম্মানে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।
প্রধানমন্ত্রী ২৩ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধির সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠকে মতবিনিময় করবেন। এরপর তিনি ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে এবং স্পেন কর্তৃক আয়োজিত বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলা বিষয়ক একটি সভায় বক্তব্য রাখবেন। বিকেলে তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ের সভায় যোগ দেবেন।
তিনি ২৪ সেপ্টেম্বর এবারের অধিবেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলা বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন। এ সভায় তিনি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, লস অ্যান্ড ড্যামেজ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের পক্ষে বাংলাদেশের জোরালো অবস্থান তুলে ধরবেন।
এছাড়া, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের আয়োজনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাইড ইভেন্টে অংশ নেবেন। তিনি ২৩ সেপ্টেম্বরে রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ক সাইড ইভেন্টে রোহিঙ্গাদের দ্রুততম সময়ে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চাইবেন।
তিনি ২৪ সেপ্টেম্বরে মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি বিষয়ক আরেকটি সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন। এসময় তিনি মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নতুন সরকারের উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরবেন এবং স্বাস্থ্যসেবায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ধাত্রীসেবার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করবেন।
সম্মেলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক। এসব বৈঠকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা ও রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার এবং ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে । এছাড়া, অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে তিনি ওয়াল স্ট্রিট ও মেটাসহ আরো কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ, উৎপাদন, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা, দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং তরুণদের জন্য মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।