নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট
শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সর্বশেষ আপডেট : ৪:২১ পূর্বাহ্ণ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে জোরদারকরণে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ২৯ মিলিয়ন ডলারের মঞ্জুরি গ্রহণকারি সংস্থাটির নাম জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র এ সংবাদদাতাকে ২৬ ফেব্রুয়ারি ই-মেইলে জানান, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বৈদেশিক নীতি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তার অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হবার অভিপ্রায়ে ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১৪১৬৯ নম্বরের নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন। এবং ঐ নির্দেশের পর মঞ্জুরির সমস্ত অর্থ স্থগিত (যদি প্রকল্পগুলো সম্পন্ন না হয়ে থাকে) হয়ে গেছে। এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক যে এনজিও কাজগুলো করছিল সেজন্যে কোন তহবিল নেই।’ সংস্থাটির নামোল্লেখ করা হয়নি এ সংবাদতাতার প্রশ্নের জবাবে।
এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে অন্য একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে যে, মার্কিন তহবিলে বাংলাদেশের রাজনীতিকে শক্তিশালী করার যে প্রকল্প নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বিতর্ক উসকে দিয়েছেন, সেটি বাস্তবায়ন করেছে যুক্তরাষ্ট্রেরই একটি এনজিও- ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল। ‘স্ট্রেংদেনিং পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ ইন বাংলাদেশ’ (এসপিএল) শীর্ষক প্রকল্পটি ২০১৭ সাল থেকে বাস্তবায়ন করেছে মেরিল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি। ২৯ মিলিয়ন (২ কোটি ৯০ লাখ) ডলারের এ প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি ) এসপিএল প্রকল্পের নাম ধরে বলেন, “বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি শক্তিশালী করতে দুই কোটি ৯০ লাখ ডলার দেওয়া হয়। এটা এমন এক প্রতিষ্ঠান পেয়েছে, যার নাম আগে কেউ শোনেনি। কল্পনা করতে পারেন! আপনার ছোট একটি প্রতিষ্ঠান আছে; আপনি এখান থেকে ১০ হাজার ডলার, সেখান থেকে ১০ হাজার ডলার পান। এর মধ্যে আপনি মার্কিন সরকারের কাছ থেকেই পেয়ে গেলেন দুই কোটি ৯০ লাখ ডলার।” এ সময় ট্রাম্প আরো উল্লেখ করেন, “ওই প্রতিষ্ঠানে মাত্র দুজন লোক কাজ করেন, দুজন। আমার মনে হয়, তারা এখন খুবই খুশি; খুবই ধনী। কোনো ব্যবাসায়িক সাময়িকীর প্রচ্ছদে শিগগিরই তাদের ছবি ছাপা হবে প্রতারণায় সেরা হওয়ার জন্য।”
ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের পর বাংলাদেশের কোন প্রতিষ্ঠান ২৯ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ওয়াশিংটনে শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) আরেক অনুষ্ঠানে এসপিএল প্রকল্প নিয়ে আরেকটি বোমা ফাটান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মেরিল্যান্ডের একটি মিলনায়তনে কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল অ্যাকশন কনফারেন্সে (সিপিএসি) ট্রাম্প বলেন, “২৯ মিলিয়ন ডলার গেছে রাজনৈতিক পরিসর শক্তিশালী করার জন্য এবং বাংলাদেশে, যাতে একজন উগ্র বামপন্থি কমিউনিস্টকে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করা যায়।”
প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনের বিগত প্রশাসনকে সমালোচনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় ‘উগ্র বাম কমিউনিস্ট’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন ডনাল্ড ট্রাম্প।
কেউ নাম শোনেনি-এমন এক প্রতিষ্ঠান, যেটা চালায় মাত্র দুজন, সেই প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি শক্তিশালী করার প্রকল্প বাস্তবায়নে ২ কোটি ৯০ লাখ ডলার পেয়ে ‘ধনী বনে গেছে’ বলে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, আর তারপর শোরগোল শুরু হয় বাংলাদেশে। তার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে এ সংবাদদাতা সুনির্দিষ্টভাবে ঐ সংস্থাটির নাম-পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন।
এ নিয়ে নানা আলোচনা, জল্পনা-কল্পনার মধ্যে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আইনুল ইসলামের একটি এনজিওকে জড়িয়েও নানা কথাবার্তা শুরু হয় সোশাল মিডিয়ায়।
বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা খরচের দায়িত্ব আসলে কারা পেয়েছে; ওই প্রকল্পে আসলে কী কাজ হয়েছে, তার ফলাফলই বা কী- সেসব আলোচনাও শুরু হয়।এ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করা হয়েছে কি না, সে প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ। বড় অংকের এ অর্থের আসল সুবিধাভোগী কারা, দেশের গণতন্ত্র বা রাজনীতি সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হয়েছে কি না তাও স্থান পায় আলোচনায়। এসপিএল প্রকল্প নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল। মাত্র ‘দুইজনের’ এনজিওর যে কথা ট্রাম্প গত শুক্রবার তার বক্তব্যে বলেছেন, তার বাস্তবতা পাওয়া যায়নি।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সোমবার এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ওই অনুদানের বিষয়ে আরো তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন তারা। এনজিও ব্যুরোর বরাতে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের এমন অর্থ পাওয়ার ‘এন্ট্রি’ নেই সরকারি সংস্থাটির কাছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন অ্যাসিসট্যান্স ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ইউএসএআইডির অর্থায়নের ২৯ মিলিয়ন ডলারের এসপিএল প্রকল্প ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় ২০১৭ সালের ২ মার্চ; মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর। প্রকল্পের মোট প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৯০ লাখ ৬ হাজার ৮৫৫ ডলার। তার মধ্যে ২ কোটি ৮০ লাখ ১৭ ডলার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ছাড় হয়। আট বছর মেয়াদের এ প্রকল্পে ২০২৪ সালে ছাড়ের পরিমাণ ছিল ৩৬ লাখ ৩৯ হাজার ১২৭ ডলার। এর আগে ২০২৩ সালে ৩৭ লাখ ৪ হাজার ৫৮৬ ডলার; ২০২২ সালে ৩২ লাখ ৩৮ হাজার ২২ ডলার; ২০২১ সালে ২৯ লাখ ৫০ হাজার ৭৮৪ ডলার; ২০২০ সালে ৩৩ লাখ ৭৩ হাজার ৬৮১ ডলার; ২০১৯ সালে ৬৭ লাখ ৩৭ হাজার ৩০ ডলার; ২০১৮ সালে ৩৫ লাখ ৬৩ হাজার ৮৪৭ ডলার এবং ২০১৭ সালে ৭ লাখ ৯২ হাজার ৯৪০ ডলার ছাড় হয়।
ট্রাম্পের বক্তব্য এবং এসপিএল প্রকল্পের কার্যক্রম সম্পর্কে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রকল্পের চিফ অব পার্টি ক্যাথেরিন সেসিল গণমাধ্যমে বলেছেন যে, তার কোনো ‘মন্তব্য নেই’।
প্রকল্পের সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় ফরেন অ্যাসিসট্যান্স ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বিরোধ মেটানো এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে যৌক্তিক সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক কর্মী ও নাগরিকদের দক্ষতা ও শিক্ষা দেওয়া এ কার্যক্রমের উদ্দেশ্য।চার বছর বিরতির পর দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমেই ইউএসএআইডির ওপর খড়্গহস্ত হন ডনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন এই সংস্থা গত শতকের ষাটের দশক থেকে বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক সহযোগিতা কার্যক্রম দেখভাল করে আসছে।
শুরুতেই এক নির্বাহী আদেশে এ সংস্থাসহ বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের উন্নয়ন অর্থায়নে ৯০ দিনের স্থগিতাদেশ দেশ তিনি। ইউএসএআইডির দিকে তোপ দাগার এই সময়ে তিনি সঙ্গী করেছেন ধনকুবের ইলন মাস্ককে; যাকে নতুন গঠিত ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সির (ডিওজিই) প্রধান করেছেন তিনি। ট্রাম্প ও মাস্কের দাবি, সংস্থাটি অহেতুক নানা প্রকল্পে মার্কিন করদাতাদের অর্থ খরচ করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কাজে তো আসেইনি, উল্টো জালিয়াতির মাধ্যমে অনেককে পকেট ভরার সুযোগ করে দিয়েছে। ইউএসএআইডি বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক প্রচার নিয়ন্ত্রণেও অর্থ ব্যয় করেছে বলে অভিযোগ তাদের। এমন প্রচারের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন ট্রাম্প ও মাস্ক। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ২৯ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্পের উদাহরণ টানছেন তারা।
Posted ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর