নঈম নিজাম
প্রিন্ট
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট : ৮:০৯ অপরাহ্ণ
![]()
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে আবারও আলোচনা ঢাকায়। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহকে ঘিরে আমাদের ইতিহাস, রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তার বিতর্ক নতুন নয়। তবে জিন্নাহকে বুঝতে হলে শুধু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক ইতিহাস দেখলেই হবে না, দেখতে হবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার এবং ভারত ভাগের পর তাঁর একমাত্র মেয়ে দিনা ওয়াদিয়ার জীবনও।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর একমাত্র মেয়ে দিনা ওয়াদিয়া পাকিস্তান সম্পর্কে বাবার মাজারে গিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বোম্বাই ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যান চিরতরে। মুম্বাইয়ের অভিজাত মালাবার হিল এলাকায় তাঁর বাড়িটি এখনও আছে। জিন্নাহর একমাত্র মেয়ে দিনা ওয়াদিয়া ভারত ভাগের পর বাবার সঙ্গী হননি। তিনি মুম্বাইয়েই থেকে যান। যাননি পাকিস্তানে।
এই একটি তথ্যই জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক জীবনের একটি বড় বৈপরীত্য সামনে আনে। যে মানুষটি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য জীবনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংগ্রাম করেছিলেন, তাঁর নিজের একমাত্র সন্তান সেই নতুন রাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করেননি।
দিনা ওয়াদিয়া ছিলেন জিন্নাহর একমাত্র সন্তান। ১৯১৯ সালে লন্ডনে তাঁর জন্ম। তাঁর মা রতনবাই জিন্নাহ ছিলেন পারসি পরিবারের মেয়ে। দিনার শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় সময় ভারত ও ইংল্যান্ডে কেটেছে। পরবর্তী জীবনে তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত, বিয়ে এবং জীবনযাপন নিয়ে জিন্নাহর সঙ্গে নানা টানাপোড়েন তৈরি হয়।
দিনা পারসি পরিবারের যুবক নেভিল ওয়াদিয়াকে বিয়ে করেন। এই বিয়ে জিন্নাহ সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। বাবা-মেয়ের সম্পর্কেও এর প্রভাব পড়ে। কিন্তু দূরত্ব তৈরি হলেও সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বাবার প্রতি দিনার আবেগ ও ভালোবাসা জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকাশ পেয়েছে।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হলো। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলো। জিন্নাহ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হয়ে নতুন রাষ্ট্রের নেতৃত্ব নিলেন। বোম্বাইয়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্কের অবসান হলো। তিনি চলে গেলেন পাকিস্তানে। কিন্তু দিনা থেকে গেলেন ভারতে। তিনি পাকিস্তানে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেননি।
দিনা জীবনে দুইবার পাকিস্তান সফর করেন। প্রথমবার, তাঁর বাবা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুর পর, ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে। বাবার শেষকৃত্যে অংশ নিতে তিনি পাকিস্তানে যান। সেটিই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম পাকিস্তান সফর।
এরপর দীর্ঘ সময় দিনা ওয়াদিয়া পাকিস্তান যাননি। ভারতে, বিশেষ করে মুম্বাইয়েই তিনি দীর্ঘ সময় বসবাস করেন। জীবনের শেষদিকে তিনি লন্ডন ও নিউইয়র্কেও বাস করেন।
প্রথম সফরের দীর্ঘ ৫৬ বছর পর ২০০৪ সালে দ্বিতীয়বার পাকিস্তান সফরে যান দিনা। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ তাঁকে ভারতীয় ক্রিকেট দলের পাকিস্তান সফরের সময় আমন্ত্রণ জানান। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের একটি বিশেষ সময়ে এই সফর হয়েছিল। ক্রিকেট তখন দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও কাজ করছিল।
২০০৪ সালের সেই সফরে দিনা ওয়াদিয়া তাঁর বাবার মাজারে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। দীর্ঘ ৫৬ বছর পর বাবার সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর আবেগ ছিল স্পষ্ট। ব্যক্তিগত আবেগ ও বাবার প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই তিনি মন্তব্য বইয়ে লিখেছিলেন—
“এটি আমার জন্য একই সঙ্গে অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং বিস্ময়কর এক অভিজ্ঞতা। তাঁর পাকিস্তানের স্বপ্ন যেন সত্যি হয়।”
বাবার মাজারে দাঁড়িয়ে একমাত্র মেয়ে দিনা ওয়াদিয়ার এই মন্তব্যে যেন তাঁর নিজের সংশয় ও বেদনার কথাই উঠে এসেছিল। একজন মেয়ের কাছে এটি ছিল বাবার স্মৃতির সামনে দাঁড়ানোর মুহূর্ত; কিন্তু ইতিহাসের দৃষ্টিতে এটি ছিল আরও বড় একটি প্রতীকী ঘটনা।
কারণ দিনা ছিলেন সেই মানুষের একমাত্র সন্তান, যিনি পাকিস্তানের জন্মের জন্য নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। অথচ সেই রাষ্ট্রে তিনি কখনো স্থায়ীভাবে বসবাস করেননি। ২০০৪ সালে পাকিস্তানে গিয়ে তাঁকে বাবার মাজারে দাঁড়াতে হয়েছিল একজন অতিথি হিসেবে। এই বৈপরীত্য ইতিহাসের একটি গভীর প্রশ্ন সামনে আনে—রাষ্ট্রের রাজনৈতিক জন্ম আর মানুষের ব্যক্তিগত পরিচয় কি সব সময় একই পথে চলে?
ভারত ভাগের ইতিহাস মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ইতিহাস হলেও এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছিল সাধারণ মানুষ। পরিবার ভেঙেছে, মানুষ দেশ বদলেছে, সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ এক ভূখণ্ড থেকে অন্য ভূখণ্ডে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। জিন্নাহর নিজের পরিবারও এই বিভাজনের মানবিক অভিঘাত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল না।
দিনা ওয়াদিয়ার জীবন সেই বিভাজনের একটি ব্যতিক্রমী প্রতিচ্ছবি। তাঁর বাবা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু তাঁর নিজের জীবন ভারতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তিনি পাকিস্তানের রাজনৈতিক জীবনে সক্রিয় হননি, কোনো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নেননি এবং পাকিস্তানে বসবাসও করেননি। তাঁর পরিচয়ের মধ্যে একই সঙ্গে ছিল জিন্নাহর উত্তরাধিকার, ভারতের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং বিভক্ত উপমহাদেশের জটিল ইতিহাস।
এখানেই জিন্নাহকে নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান আলোচনার গুরুত্ব। বাংলাদেশের ইতিহাস পাকিস্তানের ইতিহাস থেকে আলাদা হয়ে জন্ম নিয়েছে। ১৯৪৭-এর পাকিস্তান থেকে ১৯৭১-এর বাংলাদেশ—এই দীর্ঘ পথের মধ্যে বাঙালির রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ভাষার অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন একে একে সামনে এসেছে। তাই বাংলাদেশে জিন্নাহকে নিয়ে আলোচনা কখনোই শুধু একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে নিয়ে আলোচনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাকিস্তানের জন্ম, পূর্ববাংলার অভিজ্ঞতা এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস।
জিন্নাহকে কেউ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দেখেন, কেউ ভারত বিভাজনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে মূল্যায়ন করেন। আবার বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর উত্তরাধিকারকে দেখা হয় ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার অংশ হিসেবে। ফলে জিন্নাহকে নিয়ে আলোচনা করতে হলে আবেগের পাশাপাশি ইতিহাসের ধারাবাহিকতাও মনে রাখতে হবে।
আর দিনা ওয়াদিয়ার জীবন সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দিক সামনে আনে। জিন্নাহ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর একমাত্র মেয়ে সেই পাকিস্তানে বসবাস করেননি। ২০০৪ সালে জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি বাবার মাজারে ফিরে এসে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তাঁর বক্তব্যে ছিল বাবার প্রতি ভালোবাসা, স্মৃতি ও আবেগ; পাশাপাশি ছিল পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের প্রত্যাশা ও সংশয়ের ছাপ।
২০১৭ সালের ২ নভেম্বর, ৯৮ বছর বয়সে নিউইয়র্কে দিনা ওয়াদিয়া মারা যান। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জিন্নাহ পরিবারের একটি দীর্ঘ ব্যক্তিগত অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
কিন্তু ইতিহাসের গল্প শেষ হয় না। জিন্নাহকে নিয়ে ঢাকায় যখন আবার আলোচনা হচ্ছে, তখন তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের পাশাপাশি দিনা ওয়াদিয়ার জীবনও মনে রাখা দরকার। কারণ ইতিহাস শুধু রাষ্ট্রের জন্মের গল্প নয়, ইতিহাস মানুষেরও গল্প। জিন্নাহ একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন; তাঁর একমাত্র মেয়ে সেই রাষ্ট্রে বসবাস করেননি। এই বৈপরীত্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভারত ভাগের ইতিহাসের অনেক না-বলা কথা।
১৯৪৭ সালের বিভাজন শুধু মানচিত্র বদলায়নি মানুষের পরিচয়, পরিবার, সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎও বদলে দিয়েছিল। জিন্নাহর পরিবারও সেই ইতিহাসের বাইরে ছিল না। আর তাই আজ ঢাকায় জিন্নাহকে নিয়ে আলোচনা উঠলে প্রশ্ন শুধু হওয়া উচিত নয় জিন্নাহ কে ছিলেন? প্রশ্ন হওয়া উচিত, তাঁর রাজনৈতিক স্বপ্নের পরিণতি কী হয়েছিল, সেই স্বপ্নের ভেতরে থাকা মানুষগুলো কোথায় দাঁড়িয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত উপমহাদেশের ইতিহাস আমাদের কোথায় নিয়ে গিয়েছিল?
Posted ৮:০৯ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর