ড. পল্টু দত্ত
প্রিন্ট
শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট : ১:১০ অপরাহ্ণ
![]()
ড. পল্টু দত্ত, লন্ডন থেকে
গান, কবিতা, নৃত্য, আলোচনা ও কবিতা-থিয়েটার ব্র্যাডি আর্টস সেন্টারের মঞ্চে ফিরে দেখা হলো সুকান্তকে। বাংলা পেরিয়ে তাঁর কবিতা উচ্চারিত হলো ইংরেজি, লাতভীয় ও ইতালীয় ভাষায়ও।
সন্ধ্যা ৬টা। লন্ডনের ব্র্যাডি আর্টস সেন্টারেরকানায় কানায় পূর্ণ মিলনায়তনে ধীরে ধীরে নিভে এল আলো, জ্বলে উঠল মঞ্চ। আর সেই আলোর সঙ্গে যেন ফিরে এলেন একশ বছর আগে জন্ম নেওয়া, মাত্রকুড়ি বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া এক কবি, সুকান্ত ভট্টাচার্য। ফিরলেন কখনও গানে, কখনও আবৃত্তিতে, কখনও নৃত্যের শরীরী ভাষায়, কখনওকবিতা-থিয়েটারে। বাংলা ভাষার সীমানাও পেরোল তাঁর কবিতা। উচ্চারিত হলো ইংরেজি, লাতভীয় ও ইতালীয় ভাষায়। কিন্তু সন্ধ্যাটি যত এগিয়েছে, ততই একটি প্রশ্ন বড় হয়ে উঠেছে, একশ বছর পরেও সুকান্ত এত সমকালীন কেন?
“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়/পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।“
১৯৪৪ সালে, বাংলার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ক্ষত যখনও দগদগে, তখন মাত্র সতেরো বছরের এক কিশোর কবি লিখেছিলেন এই পঙক্তি। কিন্তু ২০২৬-এর লন্ডনে বসে কথাগুলো শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, এ কি শুধুই ইতিহাস? নাকি ক্ষুধা, যুদ্ধ, বৈষম্য, উদ্বাস্তু মানুষের দীর্ঘ মিছিল আর মর্যাদার জন্য লড়াইয়ে বিপর্যস্ত আজকেরপৃথিবীরও প্রতিচ্ছবি? ব্র্যাডি আর্টস সেন্টারের পুরো সন্ধ্যাটি যেন এই একটিপ্রশ্নেরই নানা শিল্প
ভষায় উত্তর খুঁজেছে।
এই ফিরে আসার স্থানটিও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস।ব্রিটেনে বাঙালির অভিবাসন, সংগ্রাম, আত্মপ্রতিষ্ঠা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ইতিহসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক জনপদ। আর সেই সাংস্কৃতিক ভূগোলের পরিচিত কেন্দ্র হোয়াইট চ্যাপেলের ব্র্যাডি আর্টস সেন্টার। বছরের পরবছর ধরে এখানে বাঙালির গান, কবিতা, নাটক ও নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন প্রাণ পেয়েছে। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে। কিন্তু নিজের ভাষা, সাহিত্য ওশিল্পকে সঙ্গে নিয়ে লন্ডনে বাঙালির সাংস্কৃতিক অভিযাত্রা থামেনি। ২৭সেপ্টেম্বরের সন্ধ্যা ছিল সেই দীর্ঘ যাত্রারই আরেকটি উজ্জ্বল অধ্যায়। এইআয়োজনের নেপথ্যে ছিল যুক্তরাজ্যের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন যাত্রা শুরু করা‘সৃজন’। সংগঠনটির সভাপতি শাহাব আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক লেনিন হক উদ্বোধনী বক্তব্যে জানান, বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, শিল্প ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মেরসংযোগ গড়ে তোলাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য। প্রথম আয়োজনের বিষয় হিসেবেসুকান্তের জন্ম শতবর্ষকে বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়েই যেন সেই যাত্রার অভিমুখটিওস্পষ্ট হয়ে উঠল।
সুকান্তকে সেদিন শতবর্ষ আগের কোনো কবির প্রতিকৃতিতে বন্দী করে রাখা হয়নি। একের পর এক পরিবেশনায় তাঁকে এনে দাঁড় করানো হয়েছে ২০২৬ সালেরপৃথিবীর মুখোমুখি। যে পৃথিবীতে এখনও ক্ষুধা আছে, যুদ্ধ আছে, উদ্বাস্তু
মানুষের দীর্ঘ মিছিল আছে, বৈষম্য ও বঞ্চনা আছে।আবার প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং নতুন পৃথিবী নির্মাণের স্বপ্নও আছে। ফলে মঞ্চে উচ্চারিত সুকান্তের কবিতা বারবার অতীতের সীমানা পেরিয়ে বর্তমানকে স্পর্শ করেছে। মনে হয়েছে, কবি যেন তাঁর সময়কে নয়, প্রশ্ন করছেন আমাদের সময়কেই। পৃথিবী কি সত্যিই এতটা বদলেছে? সেই প্রশ্নের প্রথম উত্তর যেন এল ‘রানার’-এ। সমাজকে সচল রাখা অথচ নিজেই বঞ্চিত এক শ্রমজীবী মানুষের প্রতীক হয়ে রাতের অন্ধকার ভেদ করে ছুটে চলল সুকান্তের রানার। লন্ডনের প্রতিথযশা তিন শিল্পী, সঞ্জয় দে, গৌরী চৌধুরী ও লাবনী বড়ুয়ার সুললিত কণ্ঠের সুর ঝংকারে প্রাণ পেল গানটির কোরাস। তাঁদের কণ্ঠের আবেশকে আরও বর্ণিল করে তুলল মনিরুল ইসলাম মুকুল ও নীহারিকা ভৌমিকের প্রাণবন্ত নৃত্যভঙ্গি।
সুর, ছন্দ ও নৃত্যের মেলবন্ধনে মঞ্চ জুড়ে তৈরি হলো এক মোহনীয় দৃশ্যকাব্য। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের ভেতরেও থেকে গেল রানারের ক্লান্ত পদধ্বনি, অন্ধকার যত দীর্ঘই হোক, তাকে ছুটতে হবে ভোরের দিকে। পুরো সন্ধ্যার সংগীত-আবহনির্মাণে কিবোর্ডে অমিত দে তবলায় পিয়াস বড়ুয়া ও চেলোতে হার্ভে গিবন্সের সঙ্গত, আর আলো ও শব্দ পরিকল্পনায় সুনা মিয়া ও সামসুল জাকি স্বপনের
নেপথ্য ভূমিকা পরিবেশনাগুলোকে দিয়েছিল বাড়তি মাত্রা।
গান, কবিতা ও নৃত্যের এই প্রবাহের মাঝেই সন্ধ্যাটি থামল কিছুক্ষণ, সুকান্তকে নিয়ে ভাবার জন্য। আলোচনায় ড. পল্টু দত্ত প্রশ্ন তুললেন, ঔপনিবেশিক শাসন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য ও তীব্র সামাজিক বৈষম্যের যে বাংলায় সুকান্ত বেড়ে উঠেছিলেন, সেই অস্থির সময় কীভাবে নির্মাণ করেছিল তাঁর কবি সত্তা? কবি ও কথা সাহিত্যিক টি এম আহমেদ কায়সারের উত্তরে উঠে এল সেই সময়, সমাজ ও এক বিদ্রোহী তরুণ কবি কণ্ঠের নির্মাণের প্রেক্ষাপট। এরপর তরুণ সঞ্চালক অর্পিতার প্রশ্ন আলোচনাকে অতীত থেকে টেনে আনল বর্তমানে। সুকান্তের ‘ক্ষুধা’কি কেবল ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ, নাকি আজকের পৃথিবীতে তার নাম বৈষম্য, সুযোগের অভাব, মর্যাদাহীনতা ও সামাজিক বঞ্চনাও? দুই প্রজন্ম ও দুই সময়ের এই কথোপকথন শেষ পর্যন্ত দর্শকের দিকেই ফিরিয়ে দিল প্রশ্নটি। আমরা কি একশ বছর পরে সুকান্তকে পড়ছি, নাকি সুকান্তের কবিতাই আজও আমাদের সময়কে পড়ে চলেছে? আলোচনার সেই প্রশ্নের রেশ মিলিয়ে যেতে না যেতেই মঞ্চে এল নতুন প্রজন্ম। দুই কিশোরী শিল্পী ক্লিওপেট্রা পাল ও রাহা দেওয়ান-সৈয়দের কণ্ঠে সুকান্তের ‘প্রার্থনা’ পেল এক আশ্চর্য কোমলতা। শীতার্ত ও বঞ্চিত মানুষের জন্য সূর্যের কাছে একটু উষ্ণতা, একটু আলো, একটু আশার যে আকুতি কবি রেখে গেছেন, দুই কিশোরীর কণ্ঠে তা যেন হয়ে উঠল আজকের শিশুদেরও প্রার্থনা। আগামী পৃথিবীটি যেন তাদের জন্য হয় আরও উষ্ণ, মানবিক ও নিরাপদ। মনে হলো, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে নীরবে তুলে দেওয়া হচ্ছে মানবিকতার দায়। আজ আমরা উষ্ণতার প্রত্যাশী; একদিন আমাদেরই হয়ে উঠতে হবে অন্য কারও উষ্ণতার উৎস।
সন্ধ্যার আরেকটি ব্যতিক্রমী দিক ছিল সুকান্তকে বাংলা ভাষার সীমানা পেরিয়ে বৃহত্তর বিশ্বের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস। ড. বন্যা চক্রবর্তীর দৃঢ়, ভরাট কণ্ঠে বাংলায় ‘দেশলাই কাঠি’র শব্দগুলো যেন স্ফুলিঙ্গ হয়ে ছড়িয়ে পড়ল মিলনায়তনে। এরপর একই কবিতার লাতভীয় অনুবাদ পাঠ করেন কবি ও ভিজ্যুয়াল শিল্পী আগনেস গ্রাউদিনা। আর সুকান্তের ‘আগ্নেয়গিরি’ ইতালীয় ভাষায় তুলে ধরেন লেখক ও কবি জিউসেপ্পে মাস্ত্রোইয়ান্নি। সুকান্তের কবিতা যখন লাতভীয় ও ইতালীয় উচ্চারণে নতুন জীবন পেল, তখন তা শুধু অনুবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল না।
মনে হলো, তাঁর ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ভাষার সীমানা পেরিয়ে প্রবেশ করছে এক বৃহত্তর মানবিক কথোপকথনে। তারপর ফিরে এল ক্ষুধা। সুকান্তের কবিতার সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতাগুলোর একটি। লাবনী বড়ুয়ার কণ্ঠে ‘হে মহাজীবন’-এর সংগীত রূপে পূর্ণিমার চাঁদ আর নিছক সৌন্দর্যেরপ্রতীক থাকল না। ক্ষুধার্ত মানুষের চোখে তা হয়ে উঠল ‘ঝলসানো রুটি’। টি এমআহমেদ কায়সারের সুরে কবিতাটি যেন নতুন করে প্রশ্ন তুলল, মানুষ যখনক্ষুধার্ত, তখন সৌন্দর্যের অর্থ কি? জীবন যখন প্রতিদিন বেঁচে থাকার সংগ্রাম, কবিতা কি তখন শুধু অলংকার হয়ে থাকতে পারে? সেই প্রশ্নেরই যেন আরও তীব্রপ্রতিধ্বনি শোনা গেল গৌরী চৌধুরীর কণ্ঠে ‘অবাক পৃথিবী’-তে। ক্ষুধা, নিপীড়ন, রক্তপাত ও মৃত্যুর পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে সুকান্তের বিস্ময় সেখানে ক্রমে ক্ষোভেপরিণত হয়। শতবর্ষ পরে লন্ডনের মঞ্চে গানটি শুনতে শুনতে তাই প্রশ্ন জাগে।পৃথিবীকে দেখে কবির সেই বিস্ময় কি সত্যিই আজ শেষ হয়ে গেছে?
কবিতার ভাষা এরপর আরও বদলেছে। রাহাদ আবিরের অনুবাদের ভিত্তিতে লন্ডনের পারফরম্যান্স কবি ড. ডেভিড লি মরগানের ইংরেজি পরিবেশনায় ‘দুর্মর’তুলে ধরল যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও মৃত্যুর ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও মাথা না-নোয়ানো মানুষের অদম্য প্রাণশক্তি। অন্যদিকে সঞ্জয় দে নিজের সুরে ‘দুরাশার মৃত্যু’ পরিবেশন করে বিপদ, হতাশা, নিভে আসা আশা এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামকে দিলেন এক গভীর সংগীতময় মাত্রা। এত ক্ষুধা, যুদ্ধ ও সংগ্রামের পর একটি জায়গায় এসে সন্ধ্যাটি হঠাৎ খুব ব্যক্তিগত হয়ে গেল। উর্মী মাজহারের কণ্ঠে ‘প্রিয়তমাসু’-র সৈনিকটি যুদ্ধশেষে ফিরতে চায় নিজের দেশে। হাতে এখনও রাইফেল, গায়ে যুদ্ধের পোশাক; অথচ তার সমস্ত আকাঙ্ক্ষা এখন ঘর, প্রিয়জন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরেযাওয়া। মুহূর্তটিতে সুকান্তের যুদ্ধবিরোধী মানবিক উচ্চারণ যেন খুব সহজ একটি সত্য মনে করিয়ে দিল শেষ পর্যন্ত মানুষ যুদ্ধ চায় না, মানুষ ঘরে ফিরতে চায়। একক কণ্ঠ থেকে এরপর মঞ্চ ভরে উঠল সম্মিলিত উচ্চারণে। বাংলাদেশের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত আবৃত্তি শিল্পী ও ছান্দসিকের প্রতিষ্ঠাতা মুনিরা পারভীনের রচনা ও নেতৃত্বে বিশেষ দলীয় আবৃত্তিতে তাঁর সঙ্গে ছিলেন শতরূপা চৌধুরী, ড. বন্যা চক্রবর্তী, ধনঞ্জয় পাল, শাহ শরিফ উদ্দিন ও নজরুল ইসলাম আঁকিব। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও গভীর বৈষম্যের যে পৃথিবী সুকান্তের কবিতাকে নির্মাণ করেছিল, সেই অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে মিলিয়ে পরিবেশনাটি যেন মনে করিয়ে দিল—সুকান্তকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তাঁর শব্দ উচ্চারণ করা নয়, অন্যায় ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে সেই শব্দের দায়টুকুও বহন করা।
সুকান্তকে স্মরণ করা মানে শুধু তাঁর কবিতা আবৃত্তি করা নয়। তাঁর স্বপ্ন, তাঁর ক্ষোভ, তাঁর মানবিক আর্তি এবং অনাগত পৃথিবীর প্রতি তাঁর গভীর বিশ্বাসকে নতুন করে অনুভব করা। সেই অনুভবই যেন মর্মস্পর্শী রূপ পেল সুকান্তের ‘ছাড়পত্র’ অবলম্বনে নির্মিত কবিতা-থিয়েটার, ‘A New World’s Passport’-এ। টি এম আহমেদ কায়সারের নির্দেশনায় সারওয়ার ই আলম, তনুশ্রী গুহ, নাজিয়া আমিন ও অস্মিতা কীরের পরিবেশনা, হার্ভে গিবন্সের চেলোর হৃদয় ছোঁয়া সুর এবং আবেগময় দৃশ্য ভাষা মিলেমিশে সৃষ্টি করেছিল এক গভীর বেদনাঘন আবহ। এতক্ষণ যে মঞ্চে ক্ষুধা ছিল, যুদ্ধ ছিল, মৃত্যু ছিল, বঞ্চনা ছিল, প্রতিবাদের আগুন ছিল। শেষ মুহূর্তে সেই মঞ্চই এসে থামল এক নবজাতকের সামনে। চারপাশেরসমস্ত বেদনা ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তার আগমন যেন অন্ধকারে হঠাৎ জ্বলে ওঠা এক আশার আলো। হৃদয়বিদারক সংগীতের আবহে তার প্রথম কান্না তখন আর কেবল একটি শিশুর কান্না বলে মনে হচ্ছিল না। যেন অন্ধকার পৃথিবীর বুক চিরে ভবিষ্যৎ নিজেই তার অধিকার দাবি করছে—বেঁচে থাকার অধিকার, একটি মানবিক পৃথিবীতে বড় হয়ে ওঠার অধিকার। কারণ সুকান্তের কাছে শিশুর জন্ম শুধু আরেকটি জীবনের জন্ম নয়। সে ভবিষ্যতের দূত, নতুন পৃথিবীর প্রতিশ্রুতি। আর ঠিক সেই মুহূর্তে কবির প্রশ্নটি যেন মঞ্চের সীমানা পেরিয়ে নিঃশব্দে এসে দাঁড়ায় আমাদের প্রত্যেকের সামনে। এই নবজাতকের হাতে আমরা কেমন পৃথিবী তুলে দিয়ে যাব?
শতবর্ষ পেরিয়েও সুকান্ত যেন সেই কুড়ি বছরের তরুণই রয়ে গেলেন। ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট জন্ম নেওয়া যে কবি মাত্র কুড়ি বছর বয়সেই পৃথিবী ছেড়ে গিয়েছিলেন, তাঁর কবিতার ক্ষুধা, যুদ্ধ, অন্যায়, বৈষম্য, প্রতিবাদ আর নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন একশ বছর পরেও বিস্ময়করভাবে আমাদের সময়ের সঙ্গে কথা বলে। সম্ভবত ব্র্যাডির সেই সন্ধ্যার সবচেয়ে বড় সার্থকতাও ছিল এখানেই—সুকান্তকে কাচের বাক্সে বন্দী শতবর্ষী কোনো ‘মহান কবি’ হিসেবে নয়, ফিরিয়ে আনা হয়েছিল এক তরুণ প্রশ্নকারী, প্রতিবাদী ও স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে। অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তে শিল্পী, স্বেচ্ছাসেবক ও কারিগরি দলের সদস্যরা একে একে মঞ্চে উঠে এলেন। ‘সৃজন’-এর পক্ষ থেকে রম্য রহিম চৌধুরী শিল্পী, স্পন্সর, স্বেচ্ছাসেবক, সাউন্ড ও লাইটিং টিম এবং ব্র্যাডিআর্টস সেন্টারের সহযোগীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন। একসময় মঞ্চের আলো নিভে গেল। দর্শকেরাও ধীরে ধীরে ব্র্যাডি ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু সুকান্ত যেন সেখানেই শেষ হয়ে গেলেন না। মনে হলো, এখনও কোথাও এক ‘রানার’ রাতের অন্ধকার চিরে ছুটে চলেছে; কোথাও একটি ছোট্ট ‘দেশলাই কাঠি’ বুকের ভেতর আগুন লুকিয়ে জ্বলে ওঠার অপেক্ষায় আছে; আর কোথাও এক সদ্যোজাত শিশু মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। তার দাবি খুব বেশি নয়—একটি যুদ্ধহীন, ক্ষুধাহীন, বৈষম্যহীন, মানুষের বাসযোগ্য পৃথিবী। সেই পৃথিবীর ‘ছাড়পত্র’ লিখে দেওয়ার দায় সুকান্ত হয়তো একশ বছর পরেও আমাদের হাতেই রেখে গেছেন।
Posted ১:০৮ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর