১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আরোহনের পর নানা চড়াই-উৎরাইয়ের প্রতিটি পর্বেই শেখ হাসিনা তার পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের স্বার্থে কখনোই আপস করেননি। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর জন্মভ’মি তথা গোপালগঞ্জের সকলেই কোন না কোনভাবে সুবিধা পেয়েছেন শেখ হাসিনার কাছে। আত্মীয়তার সুবাদে রাজাকাররা যেমন শেখ হাসিনার সরকার কিংবা পার্লামেন্টে অথবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদলাভে সক্ষম হয়েছেন, তেমনি যুবলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বেও অধিষ্ঠিত হয়েছেন তুলনামূলকভাবে কম যোগ্যতাসম্পন্নরাও। ঢাকা সিটির মেয়রসহ রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ আসন থেকে এমপিও হয়েছেন বেশ কয়েকজন। কেবলমাত্র বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ মনির পুত্র বলেই শেখ ফজলে নূর তাপস পরপর দু’দফা এমপি এবং পরবর্তীতে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হতে পেরেছিলেন। অর্থাৎ একান্তই আপনজনের মতো আগলে রেখেছিলেন সারাক্ষণ এবং সর্বশেষ কথিত ছাত্র-জনতার আড়ালে গত বছর জুলাই-আগস্টের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষাকল্পে আরো কতিপয় স্বজনের সাথে ফজলে নূর তাপসকেও ৩ আগস্ট বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুরে পলায়নের সুযোগ করে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের পরীক্ষিত লাখ-কোটি নেতা-কর্মী এবং নিজ হাতে গড়া সর্বশেষ জাতীয় সংসদের দলীয় সদস্যগণের প্রায় সকলকেই কঠিন এক সংকটে ফেলে অতিঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে নিয়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়েছেন। এর আগে লন্ডন থেকে ব্যারিস্টার হওয়া শেখ ফজলে নূর তাপস বাংলাদেশের ক্ষমতার একেবারেই নিকটে ছিলেন। তার চাচা শেখ সেলিমও ছিলেন গণ ভবনের অন্যতম নিয়ন্ত্রক। চাচা-ভাতিজার ইশারায় অনেক কিছু ঘটতেও দেখেছে দেশবাসী। এতদসত্বেও ‘বিচারের বানী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’ বলে ব্যারিস্টার তাপসের ফেসবুক স্ট্যাটাসে অনেকে হতবাক। বিস্ময় প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের সমর্থকরা। এমন মতামত ব্যক্ত করে ব্যারিস্টার তাপস কী আওয়ামী লীগকে এই চরম দু:সময়ে আরেক দফা বিপদের মুখে ঠেলে দিলেন-এ ধরনের গুঞ্জনও রয়েছে। এমন আশংকাও ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র যে, বিতর্কিত আরো কয়েকজনের মত ব্যারিস্টার তাপসও মাঠে নেমেছেন জামাত-শিবিরের পরিকল্পনা অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে বিভক্ত করার মিশনে। ফুপু শেখ হাসিনাকে নির্বাসনে রেখে নয়া আওয়ামী লীগ গঠনের ষড়যন্ত্রে ব্যারিস্টার তাপসও রয়েছেন-এমন প্রশ্নও উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী পরিবারে। আর সেজন্যেই কী ‘বিচারের বানী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’ শিরোনামে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। ১৫ আগস্ট এই স্ট্যাটাস দেখে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী সাধারণ প্রবাসীরাও হতভম্ব। তারাও বলাবলি করছেন যে, শেখ হাসিনা যাদের জন্যে সবসময় ব্যস্ত ছিলেন তারাও এখোন তাকে দোষারোপ করছেন। শেখ হাসিনার আমলে আইনের শাসন ছিল না-এমন অভিমতও পোষণ করেছেন ব্যারিস্টার তাপস। উল্লেখ্য, শেখ তাপস বর্তমানে লন্ডনে বাস করছেন। মাঝেমধ্যে সিঙ্গাপুরেও যাতায়াত করেন। এখানে তার বক্তব্যটি হুবহু (কিছু ইংরেজী অংশকে বাংলায় লিখে) উপস্থাপন করা হলো :
১৪ অগাস্ট ১৯৭৫। রাতের বেলা মা আমাকে ও পরশ-কে গান গেয়ে ঘুম পাড়াচ্ছিলেন।
গানটি ছিল-“ও তোতা পাখিরে/শিকল খুলে উড়িয়ে দিব/আমার মা-কে যদি এনে দাও…”
পরের দিন ভোর বেলায় গুলির আওয়াজে ঘুম ভাঙল। সাড়ে তিন বছরের অবুঝ শিশু ভয়ের চিৎকার করে মা-বাবাকে খুঁজতে গিয়ে দেখে বাবা-মা সিঁডির উপর রক্তাক্ত মেঝেতে পড়ে আছে। শুধু রক্ত আর রক্ত। ডুকরে ডুকরে ‘শিশুটি’ কাঁদে আর বলে – মা ওঠো, বাবা ওঠো। কিন্তু, বাবা-মা আর ওঠেনি, আর কখনোই ফিরেনি। গত পঞ্চাশ বছর মায়ের সেই গানের সুরই আমার স্মৃতি হয়ে রইল-“ঘুমিয়ে ছিলাম মায়ের কোলে/কখন যে মা গেলো চলে…”
বুঝ আসার পর থেকেই মনের ভিতর একটি তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও বাসনা জন্মেছিল যে, এক দিন এই দেশে আইনের শাসন এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে। যার ফলশ্রুতিতে আমিও আমার পিতা-মাতার হত্যার বিচার পাবো। একজন সন্তান এবং দেশের নাগরিক হিসেবে শুধু এটুকুই ছিল আমার চাওয়া।
১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল- দীর্ঘ ২১ বছর আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে। সময় সময় স্থগিত ও কাঁটা-ছেঁড়া করা হয়েছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন-সংবিধান। ইমডেমনিটি অর্ডিন্যান্স প্রণয়ন করে রুদ্ধ করা হয়েছে হত্যাকান্ডের বিচারের পথ। কেড়ে নেওয়া হয়েছে নাগরিকের বিচার পাওযার মৌলিক অধিকার। অপরাধ এবং অপরাধীকে দেওয়া হয়েছে আইনি সুরক্ষা। তারপর এসেছিল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করল। আশায় বুক বাঁধলাম। মনে হলো, এবার বুঝি স্বপ্ন পূরণের পালা!ইতোমধ্যে, আমি আইনশাস্ত্রে পড়াশোনা শেষ করলাম। ইমডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিল করে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে সংগঠিত নারকীয় হত্যাকান্ডের বিচার শুরু করা হলো। তরুণ আইনজীবী হিসেবে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচারের জন্য রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সিরাজুল হক এর চেম্বারে যোগদান করলাম। আমার লক্ষ্য ছিল, আমি যেন উক্ত বিচার প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকতে আরি। আমি সম্পৃক্ত হলাম। নিম্ন আদালতের বিচারকার্য,পরবর্তীতে হাই কোর্ট ডিভিশন এবং তৎপরবর্তী আপিলেট ডিভিশনে বিচারকার্য সম্পন্ন হতে পেরিয়ে গেলো তেরোটি বছর। ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর আমার জীবনের এক ঐতিহাসিক স্মরণীয় মুহুর্ত ও আনন্দের দিন হয়ে ধরা দিলো। সেই দিন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিলেট ডিভিশন (Appellate Division of the Supreme Court of Bangladesh) কর্তৃক বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় প্রদান করা হলো। কাকতালীয়ভাবে সেই দিনটি ছিল আমার জন্মদিন। আমি আমার জন্মদিনের অন্যতম উপহারটি পেলাম। এই দীর্ঘ আইনী সংগ্রামের প্রতিটি মুহূর্তে মনে হয়েছে, বঙ্গবন্ধ হত্যা মামলা পরিসমাপ্তির মাধ্যমে দেশে বিচারহীনতার অবসান হবে। সূচনা হবে আইনের শাসন ও ন্যায় বিচারের পথপরিক্রমা। শুরু করা যাবে বাবা (শেখ ফজলুল হক মণি) ও মা (শামছুন্নেছা আরজু) হত্যাকান্ডের বিচার। কিন্তু,”“সত্যিই সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ!”
যদিও ১৯৯৬ সালেই আমাদের বাসায় সংঘটিত আমার বাবা-মায়ের হত্যাকান্ডের এজাহার রুজু করা হয়েছিল। কিন্তু, আজ অবধি সেই মামলার তদন্ত সম্পন্ন হয়নি এবং অভিযোগপত্রও দাখিল করা হয়নি। শুরু করা হয়নি মামলার বিচারকার্য। ২০১০ সাল থেকে ১৫ অগাস্ট আসলেই সরকারের পক্ষ হতে আশ্বস্ত করা হতো যে, বিচার শুরু করা হবে, গঠন করা হবে কমিশন। দেয়া হতো আরো কত কি সান্ত¦না ও মিথ্যা আশ্বাস! ঘটা করে মাসব্যাপী শোক পালনের আনুষ্ঠানিকতার নিচে চাপা পড়ে গেলো পিতা-মাতা হারা সন্তানের ক্রন্দন। অধরা রয়ে গেলো নাগরিকের বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার। আদর্শ ও নীতি বিবর্জিত সংকীর্ণ রাজনৈতিক কূটকৌশলের কাছে পরাজিত হলো আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার।
একজন বিজ্ঞ জুরিস্ট (Jurist) লিখেছেন, জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড (ÒJustice delayed is justice denied)। তাই প্রশ্ন জাগে, আর কি কখনো হবে শেখ ফজলুল হক মণি ও শামছুন্নেছা আরজু হত্যাকান্ডের বিচার? আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও তার পরিবার কি কখনো পাবে হত্যাকান্ডের বিচার? ঘয়েছে কি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শাহাদাতবরণকারী ৩০ লক্ষ শহীদের হত্যার বিচার? ঘয়েছে কি নূর হোসেন, ডাক্তার মিলন, মঞ্জুরুল ইমাম কিংবা শাহ এম এস কিবরিয়া হত্যার বিচার? বিগত ৫৪ বছরে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে সংগঠিত সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সংগ্রাম ও গণঅভ্যুত্থানে আত্মহুতি দেওয়া শহীদদের হত্যার বিচার আদৌ কি কোনো দিন সম্পন্ন হবে? অভাগা আমি, অভাগা এই দেশ ও জাতি! কবি গুরু হয়তো সেজন্যই লিখে গিয়েছেন “বিচারের বানী নীরবে নিভৃতে কাঁদে”। শেখ তাপস/৩১ শ্রাবণ ১৪৩২/১৫ অগাস্ট ২০২৫।