নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট
মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫ সর্বশেষ আপডেট : ৯:১৩ পূর্বাহ্ণ
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি অধ্যাপক ড. এ কে আব্দুল মোমেন ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদন্ডের যে রায় প্রদান করেছে তার নিন্দা জানিয়েছেন। বলেছেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচারটি ন্যায়সঙ্গত, নিরপেক্ষ বা বিশ্বস্ত ছিল না। বিচার প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই এটি গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। শুধু দ্রæততা ও গোপনীয়তার কারণে নয়, আরও বড় কারণ হলো এই বিচার প্রক্রিয়ার প্রসিকিউটর, বিচারক এবং প্রধান সাক্ষীর সবাই রাজনৈতিকভাবে শেখ হাসিনার বিরোধী পক্ষের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং ক্ষমতা পরিবর্তনের পর এ বিচার থেকে সরাসরি উপকৃত হয়েছেন। যে বিচার ব্যবস্থায় তদন্তকারী, অভিযোজক, বিচারক ও সাক্ষীরা নিজেরাই রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট, সেখানে কোনোভাবেই ন্যায়বিচারের আশা করা যায় না। এই পুরো কাঠামোই আন্তর্জাতিক মানদন্ডে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও অবৈধ।
ড. মোমেন বলেছেন, যে ট্রাইব্যুনালে এই বিচার হয়েছে, সেই আদালত নিয়ে বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন যেমন এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কারণ আদালতের স্বাধীনতার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাবাধীন রায়, আন্তর্জাতিক মানদন্ড না মানার ইতিহাস।
বিচারক ও প্রসিকিউশন টিম যখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তখন সেই বিচার প্রক্রিয়া শুরু থেকেই পক্ষপাতদুষ্ট ও অবিশ্বস্ত হয়ে পড়ে।
শেখ হাসিনাকে সম্পূর্ণরুপে অনুপস্থিত অবস্থায়, অস্বাভাবিক দ্রæততার সাথে বিচার করা হয়েছে। এই বিচার প্রক্রিয়ায় তিনি কোনোভাবেই পারেননি তাঁর নিজের আইনজীবীর মাধ্যমে বক্তব্য উপস্থাপন করতে, সাক্ষীদের জেরা করতে, মিথ্যা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য চ্যালেঞ্জ করতে, কিংবা স্বাভাবিক আইনি অধিকারগুলো প্রয়োগ করতে। ইন অ্যাবসেন্টিয়া বিচার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদন্ডেই অত্যন্ত সমস্যাজনক। কিন্তু এখানে বিচারক, প্রসিকিউটর ও সাক্ষীরা যখন সবাই রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষ দলভুক্ত তখন এটি পরিণত হয় আইনি বিচারের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিশোধ।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাস্তবায়নে বিচার ব্যবস্থার ব্যবহার : বিচারের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকেই সক্রিয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর সরাসরি উপকারভোগী, এবং জুলাই ২০২৪-এর অস্থিরতার অন্যতম পরিকল্পনাকারী বা সমর্থক। এটি স্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত (পড়হভষরপঃ ড়ভ রহঃবৎবংঃ)। যাদের রাজনৈতিক লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের হাতে বিচার তুলে দিলে তা ন্যায়বিচার নয়, রাজনৈতিক নাটক।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদন্ডের চরম লঙ্ঘন : জাতিসংঘ ইতোমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিচার প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা নিয়ে, ইন অ্যাবসেন্টিয়া বিচার নিয়ে, অস্বাভাবিক দ্রæততা নিয়ে, এবং মৃত্যুদন্ডের রায় নিয়ে।
জাতিসংঘ পরিষ্কারভাবে বলে এসেছে: মৃত্যুদন্ড কোনো পরিস্থিতিতেই গ্রহণযোগ্য নয়, বিশেষ করে যখন বিচার প্রক্রিয়াই অন্যায্য। ভুক্তভোগীদের প্রকৃত ন্যায়বিচার দরকার, রাজনৈতিক প্রদর্শনী নয়। জুলাই ২০২৪-এর ভুক্তভোগীদের প্রকৃত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে বিচার হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী, এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। বর্তমান প্রক্রিয়া এই চারটির কোনোটিই পূরণ করেনি। বরং এটি বিভাজন বাড়িয়েছে, আইনের শাসনকে দুর্বল করেছে এবং বিচার ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক অস্ত্রে রূপান্তরিত করেছে।
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন : বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে হলে প্রয়োজন স্বাধীন ও আন্তর্জাতিকভাবে পর্যবেক্ষিত বিচার প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা বন্ধ করা, এবং সবার জন্য সমান আইনি অধিকার নিশ্চিত করা।
১৫ বছরেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালন করা একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা ন্যায়সংগত, নিরপেক্ষ এবং পূর্ণাঙ্গ বিচার পাওয়ার অধিকার রাখেন, একতরফা, তাড়াহুড়া করে সাজানো রাজনৈতিক বিচারে নয়। বাংলাদেশের অগ্রগতি ও স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে আইনের শাসন পুনরুদ্ধার, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসানের ওপর।
Posted ৯:১৩ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর