এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম
প্রিন্ট
রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৬ অপরাহ্ণ
সেমিনারের অতিথি-বক্তাগণের সাথে অয়োজকরা। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।
এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম
আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ গুরুতর সাংবিধানিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে বলেছেন, দেশের ভবিষ্যৎ জনগণের অবাধ ও সচেতন মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত। আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়কে কখনোই সম্মিলিত অপরাধের দায় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। কারও বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
আটক ও বিচারব্যবস্থা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের হাজারো নেতা-কর্মী ও সমর্থককে আটক, বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে অথবা আত্মগোপনে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। যেসব পরিস্থিতিতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, সমান আচরণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চাপে রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন, সেসব ক্ষেত্রে ফৌজদারি ও সন্ত্রাস বিরোধী আইন ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
২ অক্টোবর বিকেলে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে প্রধান বক্তা হিসেবে ভার্চুয়ালে যোগ দিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। “বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট: শিক্ষার অধিকার, নির্বিচারে আটক ও বানোয়াট ট্রাইব্যুনালের রায়” শীর্ষক এই সেমিনারটি যৌথভাবে আয়োজন করে গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নমেন্টস ও তুমুকু ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কালচারাল ইউনিয়ন। খবর জেনেভা থেকে বার্তা সংস্থা এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।
সেমিনারে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার সাবেক রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, গবেষক ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। অন্য বক্তাদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবে মিল্লাত, পাওলো কাসাকা, ড. সিগফ্রিড ও. উলফ, শিনিচি ফুজিকি, কার্ল গুস্তাভ বিআর্তনেস, অধ্যাপক আলফ্রেড ডি জায়াস, ড. চনসি আয়াচ জোসেফ এবং সুইডিশ আইনজীবী মোনা হাগো স্ট্রিন্ডবার্গ।
শেখ হাসিনা বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের ঘটনাগুলো বাংলাদেশে শান্তি বা সমৃদ্ধি বয়ে আনেনি। তিনি বর্তমান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নির্বিচারে আটক, রাজনৈতিক প্রভাবিত আইনি কার্যক্রম এবং এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগ করেন, যার কারণে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের শিক্ষাজীবন ও পেশাগত ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ।
শেখ হাসিনা বলেন, সংবিধান শুধু একটি আইনি দলিল নয়; এটি নাগরিকদের নির্বিচার ক্ষমতা থেকে সুরক্ষা দেওয়া, আইনের চোখে সমতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে ভয় দেখানো, কারাবন্দী করা বা প্রতিশোধের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমাধানের অঙ্গীকার। তিনি বলেন, বর্তমানে এসব নীতি মারাত্মক চাপের মুখে রয়েছে।
তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা, হত্যাকান্ড, গ্রেপ্তার ও নিরাপত্তাহীনতার একাধিক ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, অনেক ঘটনাই সংবাদমাধ্যমে আসে না। তাঁর মতে পরিস্থিতিকে শুধু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা হিসেবে দেখলে হবে না; এটি আইন, জননিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সংকট।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে বহু শিক্ষার্থী তাঁদের মর্যাদা বা সনদ হারিয়েছেন এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে তরুণ পেশাজীবীদেরকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত হতে হয়েছে।
আওয়ামী লীগকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে বিচারিক ও ট্রাইব্যুনাল-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া ব্যবহারের যে চেষ্টা হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন, তারও সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা, বিচারিক প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের জন্য ব্যবহার করা হলে বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মৃত্যুদণ্ডের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে রাষ্ট্রের কোনো ব্যক্তির জীবন কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা প্রয়োগ করা উচিত নয়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি ও তার সমর্থকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে বাদ দেওয়া হলে কোনো নির্বাচনই প্রকৃত অর্থে প্রতিনিধিত্বশীল হতে পারে না।
শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জনগণকেই নির্ধারণ করতে হবে।” তাঁর মতে, ভয়, বল প্রয়োগ বা প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে নয়, জনগণের অবাধ ও সচেতন সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই তা হতে হবে।
শেখ হাসিনা জাতিসংঘ, গণতান্ত্রিক সরকার, মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী সমাজ এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের দেশের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানান। তিনি নির্বিচারে আটক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিপীড়ন বন্ধ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া পুনঃপ্রতিষ্ঠা, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের সুরক্ষা, রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা এবং মতপ্রকাশ, সংগঠন ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
১৯৭৫ সালে তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে যে প্রতিশোধের ওপর কোনো জাতি তার ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে না। তিনি এমন বাংলাদেশের কথা বলেন, যেখানে মানুষ মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করবে, আইন দুর্বল ও শক্তিশালী—উভয়কেই সুরক্ষা দেবে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের।
শেখ হাসিনা বলেন, তিনি এমন বাংলাদেশ দেখতে চান যেখানে নাগরিকেরা ভয় ছাড়াই আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন, দুর্বল ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে বিপর্যয় ঘটার আগেই সুরক্ষা দেওয়া হয়, অপরাধীরা জবাবদিহির আওতায় আসে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয় না, কারাবন্দীরা যথাযথ চিকিৎসা পান এবং প্রত্যেক নাগরিক আইনের সমান সুরক্ষা পাওয়ার ওপর নির্ভর করতে পারেন।
গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নমেন্টসের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবে মিল্লাত বলেন, বাংলাদেশ আইনের শাসন, বিচারিক সুরক্ষা, গণতান্ত্রিক অধিকার ও নাগরিক নিরাপত্তার অবক্ষয়—এমন একটি বিস্তৃত সংকটের মুখোমুখি।
উদ্বোধনী বক্তব্যে মিল্লাত বলেন, এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মানবাধিকার কর্মীদের একত্র করা হয়েছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের মতামত শোনার পাশাপাশি দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণের জন্য। তিনি দাবি করেন, লাখো মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে ২ লাখের বেশি শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে রয়েছে।
সেমিনারে সুধীজনের একাংশ। ছবি-এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম।
সাবেক ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য পাওলো কাসাকা বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু সাংবিধানিক বিরোধ বা সাধারণ রাজনৈতিক সংকট হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁর মতে, এর সঙ্গে গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগসহ একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক সংকট জড়িত।
কাসাকা বলেন, রাজনৈতিক বিরোধীদের বাদ দেওয়া, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ, সাংবাদিকদের ওপর চাপ এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের কারাগারে পাঠানোর অভিযোগগুলো কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রবণতার কথা মনে করিয়ে দেয়। শিক্ষাক্ষেত্রের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক ও আদর্শিক চাপ একাডেমিক বহুত্ববাদ ও স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
জার্মানির সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের গবেষণা পরিচালক ড. সিগফ্রিড ও. উলফ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ সংকুচিত হয়ে আসছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
জাপানি মানবাধিকারকর্মী শিনিচি ফুজিকি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মৌলিক অধিকারগুলো গুরুতর চাপের মধ্যে রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক গ্রেপ্তার ও আইনি কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সিডস-আফ্রিকার সভাপতি কার্ল গুস্তাভ বিআর্তনেস বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নকে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত নয়। সাধারণ নাগরিক নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায্য আচরণ, শিক্ষা এবং সম্মানজনক জীবিকার সুযোগ পাচ্ছেন কি না, তার ভিত্তিতেও উন্নয়ন পরিমাপ করা উচিত।
জেনেভা স্কুল অব ডিপ্লোম্যাসির অধ্যাপক, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা উন্নয়নে জাতিসংঘের সাবেক স্বাধীন বিশেষজ্ঞ এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অধ্যাপক আলফ্রেড ডি জায়াস বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
ক্যামেরুনের সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস অ্যাডভোকেসির সভাপতি ও প্রধান নির্বাহী ড. চনসি আয়াচ জোসেফ বলেন, আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়লে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়। তাই বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে যেকোনো আলোচনার কেন্দ্রে আইনের শাসন থাকা উচিত।
সুইডিশ আইনজীবী মোনা হাগো স্ট্রিন্ডবার্গ বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা বৈধ ও প্রয়োজনীয়। তবে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাকে কখনোই রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
সেমিনারে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার অংশগ্রহণকারীরা যুক্ত ছিলেন এবং তারা বাংলাদেশের সাংবিধানিক শাসন, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, শিক্ষা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আটক, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মানবাধিকার কর্মী ও জেনেভা প্রেস ক্লাবের সদস্য রহমান মামুন।
Posted ১২:২৬ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর