দীপক কুমার আচার্য
প্রিন্ট
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট : ৬:৫৭ পূর্বাহ্ণ
![]()
দীপক কুমার আচার্য
রংপুরের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন একই পরিবারের চার সদস্য। গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, তাদের কন্যা আগামী চক্রবর্তী এবং পুত্র প্রীতম চক্রবর্তীর এই নির্মম হত্যাকাণ্ড পুরোদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। শুরুতে এই নৃশংসতাকে নিছক ডাকাতি বা সাধারণ শত্রুতা বলে মনে করা হলেও, সম্প্রতি বেরিয়ে এসেছে এক রোমহর্ষক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য।
অভিযোগের তীর খোদ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার দিকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সদ্য পদোন্নতি পাওয়া রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি (পুলিশ কমিশনার) আবদুল মাবুদের লালসা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দেওয়ার মরিয়া চেষ্টাই মূলত এই চার খুনের নেপথ্য কারণ।
পুলিশ হেডকোয়ার্টর সূত্রগুলো বলছে, একটি সাধারণ জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ থেকে কীভাবে একটি পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হলো, আর এর পেছনে রক্ষক কীভাবে ভক্ষকের রূপ নিল—তা নিয়ে দেশজুড়ে এখন তোলপাড় চলছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশে হিন্দু কমিউনিটিতে এখন চাপা আতঙ্ক চলছে এবং সবাই বলাবলি করছে পুলিশ যেখানে সব শ্রেণী মানুষের নিরাপত্তা দেবে সেখানে যদি পুলিশ নিজেই হিন্দু নিধনে অংশ নেয় তাহলে হিন্দুরা যাবে কোথায়?
ঘটনার সূত্রপাত কয়েক মাস আগে। নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবী রংপুরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় বসবাস করেন। এই হিন্দু নারী সম্প্রতি তার একটি জমির দখল নিয়ে তীব্র বিরোধ ও হয়রানির শিকার হচ্ছিলেন। প্রতিপক্ষের প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে তিনি জমির দখল বুঝে পাচ্ছিলেন না। নিরুপায় হয়ে ওই নারী তার বান্ধবী প্রীতিলতা এবং তার স্বামী গণপতি চক্রবর্তীর শরণাপন্ন হন।
গণপতি চক্রবর্তী ওই নারীকে আইনি সহায়তার জন্য স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিলন কুমার চক্রবর্তীর কাছে নিয়ে যান। কিন্তু জমির বিষয়টি অত্যন্ত জটিল হওয়ায় এবং প্রতিপক্ষ প্রভাবশালী হওয়ায় ওসি মিলন কুমার বিষয়টি নিজের হাতে না রেখে রংপুরের তৎকালীন পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদের কাছে হস্তান্তর করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এখান থেকেই ঘটনার মোড় সম্পূর্ণ ভিন্নদিকে ঘুরে যায়।
পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ জমি উদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়ার বদলে ওই অসহায় নারীর সাথে এক ধরনের অনৈতিক রফাদফায় জড়ান। গত তিন মাসের মধ্যে মাবুদ ওই নারীর সাথে জোরপূর্বক সখ্যতা গড়ে তোলেন। জানা যায়, এই সময়ের মধ্যে তিনি অন্তত চারবার ওই নারীর বাড়িতে যাতায়াত করেন।
পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ নেয় আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে। অভিযোগ রয়েছে, এই সময়ে আবদুল মাবুদ ওই নারীকে চরমভাবে হয়রানি করেন। তাকে কুপ্রস্তাব দেওয়া হয় এবং অন্তত দুবার জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন বা ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার এমন বিকৃত ও ভয়ংকর আচরণে ওই নারী মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন।
নিরুপায় ও আতঙ্কিত হয়ে ওই নারী তার ওপর চলা এই ভয়ংকর নিপীড়নের কথা তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী প্রীতিলতা চক্রবর্তীকে জানিয়ে দেন। প্রীতিলতা স্বাভাবিকভাবেই এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন এবং বিষয়টি ওসি মিলন কুমার চক্রবর্তী সহ আরও কয়েকজনের কান পর্যন্ত পৌঁছে দেন।
নিজের এমন জঘন্য কেলেঙ্কারির কথা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন কমিশনার আবদুল মাবুদ। তার মতো একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার সম্মান ও ক্যারিয়ার নষ্ট হওয়ার উপক্রম হওয়ায় তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এই কেলেঙ্কারি নিয়ে আর একটি শব্দও উচ্চারণ করলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।
এর কিছুদিন পরেই ঘটে যায় সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ড। গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা এবং তাদের দুই নিষ্পাপ সন্তানকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয়। এই হত্যার ধরন ও সময়কাল স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে, কমিশনার মাবুদের কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দিতেই পুরো পরিবারটিকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বেঁচে থাকা প্রীতিলতার সেই বান্ধবী ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে বাড়িঘর ছেড়ে রংপুরের অন্য এক অজ্ঞাত স্থানে আত্মগোপনে রয়েছেন।
আবদুল মাবুদের বিরুদ্ধে এমন নৈতিক স্খলন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এটিই প্রথম নয়। তার অতীত ঘাটলে বেরিয়ে আসে আরও চমকপ্রদ তথ্য। ২০১২সালে তিনি যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অ্যাডিশনাল এসপি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তখন এক নারীর সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন।
তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান এবং পরবর্তীতে এসপি মনিরুজ্জামান পিপিএম (বার)-এর সময়ে তিনি দুবার হাতেনাতে ধরা পড়েন। একবার রাতের অন্ধকারে ওই নারীর বাড়িতে এলাকাবাসী তাকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পুলিশের একটি দল গিয়ে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে আনে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর পুলিশ হেডকোয়ার্টারে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে রিপোর্ট করা হয়। তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে হেড কোয়ার্টারে সংযুক্ত করা হয়।
বিগত বছরগুলোতে নিজের অপকর্মের কারণে ক্যারিয়ারে পিছিয়ে পড়া মাবুদ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সম্পূর্ণ নতুন রূপে আবির্ভূত হন। তিনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে সুর মিলিয়ে নিজেকে বিগত সরকারের ‘রাজনৈতিক রোষানলের শিকার’হিসেবে দাবি করতে শুরু করেন।
তিনি প্রচার করেন যে, ২০০১ সালে বিসিএস ২০তম ব্যাচে (বিএনপি-জামায়াত আমলে) চাকরিতে যোগদান করা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলে ছাত্রদলের সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণেই বিগত সরকার তাকে পদোন্নতি বঞ্চিত রেখেছে। ৫ আগস্টের কথিত জুলাই অভ্যুত্থানে তিনি সাধারণ ছাত্র-জনতার পক্ষে কাজ করেছেন বলেও ফেসবুকে নানা স্ট্যাটাস ও ভিডিও আপলোড করে নিজেকে ‘বিপ্লবী’প্রমাণের চেষ্টা করেন।
কিন্তু বিশ্বস্তসূত্র ও পুলিশের অভ্যন্তরীণ নথিপত্র বলছে ভিন্নকথা। মাবুদের পদোন্নতি আটকে থাকার মূল কারণ রাজনীতি ছিল না, বরং ছিল তার নৈতিক স্খলন এবং জেএমবি বা ‘বাংলাভাই’ইস্যুর সাথে তার সন্দেহভাজন সম্পৃক্ততা। নোয়াখালীর সেনবাগের সন্তান মাবুদের বিরুদ্ধে সে সময় জঙ্গিবাদের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকার গুরুতর অভিযোগ ছিল, যা নিয়ে বিভাগীয় তদন্তও হয়েছিল। অথচ, ৫ আগস্টের পর পুরনো সব কলঙ্কিত ফাইল ধামাচাপা দিয়ে তিনি ব্যাপকভাবে লবিং শুরু করেন। পুলিশের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশে তিনি দ্রুত পদোন্নতি আদায় করে নেন। প্রথমে এসপি, তারপর অতিরিক্ত ডিআইজি এবং সর্বশেষ রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে তিনি পদোন্নতি পান।
গত ১২ এপ্রিল আবদুল মাবুদ রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের ঠিক আগে, ১২আগস্ট তাকে ডিআইজি হিসেবে বদলি করা হয়। রহস্যজনক ভাবে, তিনি এই বদলি আদেশ পাওয়ার পরও তার নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে রংপুরে অবস্থান করে তিনি প্রীতিলতার পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং এই হত্যাকাণ্ডের নীল-নকশা বাস্তবায়নে ব্যস্ত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
রংপুরের এই চার খুনের সাথে পুলিশের এমন একজন শীর্ষ কর্মকর্তার নাম জড়িয়ে পড়ায় পুলিশ হেড কোয়ার্টারে এখন রীতিমতো তোলপাড় চলছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হেড কোয়ার্টার আবদুল মাবুদের অতীতের সব ফাইল নতুন করে তলব করেছে। ২০১২ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সেই পরকীয়া ও নৈতিক স্খলনের রিপোর্টগুলো পুনরায় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একইসাথে মাবুদের বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের নতুন নতুন তথ্যও সামনে আসতে শুরু করেছে। এখন সচেতন মহলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—বর্তমান সরকারও কি এমন একজন দাগী, দুর্নীতিবাজ ও খুনের অভিযোগ ওঠা কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে পার পেয়ে যেতে দেবে? নাকি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে রংপুরের এই নিরীহ চক্রবর্তীর পরিবারের হত্যার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করবে?
পুরোদেশ এখন তাকিয়ে আছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। চারখুনের এই নারকীয় ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের সবচেয়ে বড়দাবি। প্রকৃত অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল প্রীতিলতা ও তার পরিবারের আত্মারা শান্তি পাবে। আত্মগোপনে থাকা ওই নারীও হয়তো তখন নির্ভয়ে তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।
(এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম নিউজ সার্ভিস)
Posted ৬:৫৭ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
nyvoice24 | New York Voice 24
এ বিভাগের আরও খবর