তোমরা আমাকে একজন শেখ হাসিনা দাও, আমি তোমাদেরকে উন্নত-সমৃদ্ধ রাষ্ট্র দেবো

মো: দেলোয়ার হোসেন শাহজাদা   প্রিন্ট
রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬   সর্বশেষ আপডেট : ৭:২২ অপরাহ্ণ

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল ইট-পাথরের অবকাঠামো নির্মাণের নাম নয়। উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন, অর্থনীতির সক্ষমতা বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন, প্রযুক্তির বিস্তার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি করা। আর এসব পরিবর্তনের পেছনে প্রয়োজন হয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ধারাবাহিকতা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সক্ষমতা।

এই জায়গাতেই উচ্চারিত হতে পারে একটি নাম শেখ হাসিনা, তাই বলতে পারি, “তোমরা আমাকে একজন শেখ হাসিনা দাও, আমি তোমাদেরকে উন্নত-সমৃদ্ধ রাষ্ট্র দেবো।”

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের দায়িত্বও নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নেমে আসে এক গভীর অস্থিরতা। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে সময় দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।

দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন। সেই প্রত্যাবর্তন শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীর দেশে ফিরে আসা ছিল না; বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ নেতৃত্বের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনাও ছিল।

এরপরের চার দশকেরও বেশি সময় বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের ইতিহাসের সঙ্গে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পথচলা গভীরভাবে যুক্ত।

নেতৃত্ব যখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রূপ নেয়:
একটি দেশের উন্নয়ন রাতারাতি হয় না। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক পরিকল্পনা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিকল্পনা এসবকে একই বৃহত্তর উন্নয়ন কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা যায়।

শেখ হাসিনার নেওয়া “বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০” তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। শেখ হাসিনা সরকার ২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুমোদন করে। এর লক্ষ্য হচ্ছে পানি, ভূমি, পরিবেশ ও জলবায়ু-ঝুঁকি মোকাবিলার সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে সমন্বিত করা।

অর্থাৎ উন্নয়নের চিন্তা শুধু আজকের রাস্তা বা সেতু নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; একবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলাদেশ কেমন থাকবে, সেই প্রশ্নও পরিকল্পনার মধ্যে এসেছে। এতে শেখ হাসিনার রাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা-শক্তি ও দূরদর্শিতার প্রমাণ পাওয়া যায়।

অর্থনীতির আকারে বড় পরিবর্তন:
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের একটি চিত্র পাওয়া যায় বিশ্বব্যাংকের তথ্যেও। ২০০০ সালে বাংলাদেশের মোট জিডিপি ছিল প্রায় ৫৩.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; ২০২১ প্রায় ৪১৬.৩ বিলিয়ন ডলার; আর তা ২০২৪ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৪৫০.১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শিল্পের অংশও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এই পরিবর্তনের পেছনে তৈরি পোশাকশিল্প, রপ্তানি, প্রবাসী আয়, অবকাঠামো বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের সম্প্রসারণসহ বহু কারণ কাজ করেছে। বিশ্বব্যাংকও গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেছে।

দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে বড় পরিবর্তন হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা ৩ ডলার ২০২১ PPP অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার ছিল ৫.৯ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের (World Bank) আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য পরিমাপের মানদণ্ড অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সরকারের শেষ সময়কাল অর্থাৎ ২০২৪ সাল পর্যন্ত ২০২১ সালের ৩ ডলার (PPP) আন্তর্জাতিক চরম দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্যের হার ছিল আনুমানিক ২.৫% থেকে ৩.২% এর মধ্যে।

সুতরাং উন্নয়নের গল্পের পাশাপাশি উন্নয়নের পরবর্তী চ্যালেঞ্জগুলোও স্বীকার করা জরুরি। কারণ একটি উন্নত রাষ্ট্রের লক্ষ্য শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জন নয়, সেই প্রবৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই করাও।

পদ্মা সেতু: সক্ষমতার প্রতীক
বাংলাদেশের উন্নয়ন-আলোচনায় পদ্মা সেতু একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ২০১১ সালে অর্থায়নের অনুমোদন দিয়েছিল। পরবর্তীতে দুর্নীতির অভিযোগসংক্রান্ত তদন্ত ও শর্ত পূরণ না হওয়ার বিষয় উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংক ২০১২ সালের ২৯ জুন অর্থায়ন চুক্তি বাতিল করে। পরে শেখ হাসিনা সরকার বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের অনুরোধ প্রত্যাহার করে।

এরপর শেখ হাসিনার সুদৃঢ় সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় এবং শেষ পর্যন্ত সেতুটি বাস্তবে রূপ নেয়।

পদ্মা সেতুর তাৎপর্য তাই শুধু একটি সেতু নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে এবং দেশের অবকাঠামোগত সক্ষমতার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হয়ে উঠেছ। পদ্মা সেতু দেশের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সংযোগ বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে।

উন্নয়ন যখন মানুষের চোখের সামনে:
একসময় বাংলাদেশের উন্নয়ন বলতে অনেকের কাছে বোঝাত কেবল গ্রাম-শহরের রাস্তা, বিদ্যুৎ বা সেতু নির্মাণ। এখন উন্নয়নের দৃশ্যপট অনেক বিস্তৃত।

ঢাকার মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, নতুন মহাসড়ক, সেতু, রেল যোগাযোগ, সমুদ্রবন্দর, ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন (India-Bangladesh Friendship Pipeline- IBFPL) বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অবকাঠামোর চেহারায় বড় পরিবর্তন এসেছে।

এগুলোর প্রতিটি প্রকল্পের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন আলাদা। কোনো প্রকল্পের সুফল দ্রুত পাওয়া যায়, কোনো প্রকল্পের সুফল পেতে সময় লাগে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবকাঠামো হচ্ছে সেই ভিত্তি, যার ওপর শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ:
একবিংশ শতাব্দীতে রাষ্ট্রের উন্নয়ন আর শুধু রাস্তাঘাট দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, অনলাইন যোগাযোগ, মোবাইল আর্থিক সেবা এবং সরকারি সেবার ডিজিটাল রূপান্তরও রাষ্ট্রের সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর সেই জায়গায় একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত প্রযুক্তির ব্যবহার বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলে নাগরিক সেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেনের ধরন বদলেছে।

এই পরিবর্তনের পরবর্তী প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কীভাবে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে আরও উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, তরুণদের দক্ষ করে তুলবে এবং উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতা বাড়াবে।

মানবিক উন্নয়নও রাষ্ট্রের উন্নয়ন:
উন্নত রাষ্ট্র মানে শুধু বড় জিডিপি নয়। উন্নত রাষ্ট্র মানে এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয় এবং দুর্বল জনগোষ্ঠী সামাজিক সুরক্ষা পায়।

বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিস্তার, গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের জন্য আবাসন, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী সহায়তা এবং বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এই বৃহত্তর মানবিক উন্নয়নের অংশ।

রোহিঙ্গা সংকটও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষা ছিল। বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করেছে, একই সঙ্গে মানবিক দায়িত্ব পালনের প্রশ্নও সামনে এনেছে।

সংকটের মধ্যেও রাষ্ট্র পরিচালনা:
একজন রাষ্ট্রনায়কের মূল্যায়ন শুধু স্বাভাবিক সময় দিয়ে হয় না; সংকটের সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে হয়েছে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, করোনা মহামারি, জ্বালানি ও খাদ্যবাজারের চাপ এবং ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের মতো একাধিক সংকট।

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশ কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার করেছিল। একই সঙ্গে সংস্থাটি জানিয়েছে, পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক লেনদেনের চাপ, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা হচ্ছে, সাফল্য যেমন থাকে, তেমনি নতুন সমস্যা মোকাবিলার দায়িত্বও থাকে। আর সব সমস্যা দূরীকরণে ও দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রণয়নে শেখ হাসিনা ছিলেন অদ্বিতীয়া। সংকটে তিনি কখনও ভেঙে পড়েননি এমনকি দিশাহারা মানুষকে জুগিয়েছেন সাহস। এই কারণে তাকে ক্রাইসিস ম্যানেজারও বলা হয়।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার:
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো দীর্ঘ সময় ধরে একই রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়া এবং দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় উন্নয়নকে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা।

১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন এবং পরবর্তী সময়ে একাধিক মেয়াদে সরকার পরিচালনা, সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক মুক্তির স্বপ্নের ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনা অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়েছেন।

অন্যদিকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বাস্তবতায় সরকারের উন্নয়নমূলক অর্জনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, জবাবদিহি, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তখনই স্থায়ী হয়, যখন অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক অধিকারও সমানভাবে বিকশিত হয়।

“একজন শেখ হাসিনার” নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা:
“তোমরা আমাকে একজন শেখ হাসিনা দাও, আমি তোমাদেরকে উন্নত-সমৃদ্ধ রাষ্ট্র দেবো” এই বক্তব্যকে শুধু ব্যক্তিপূজার স্লোগান হিসেবে দেখলে এর গভীর রাজনৈতিক অর্থটি ধরা পড়ে না।

এর অন্তর্নিহিত বক্তব্য হলো নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা। একজন নেতৃত্ব যদি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করেন, সেই লক্ষ্যকে জাতীয় পরিকল্পনায় রূপ দেন, বড় অবকাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেন, প্রযুক্তিকে রাষ্ট্রীয় সেবার অংশ করেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন তাহলে সেই নেতৃত্ব রাষ্ট্রের গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে।

বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর মতো পরিকল্পনা সেই দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার একটি উদাহরণ। এর লক্ষ্য শুধু বর্তমানের সমস্যা সমাধান নয়; পানি, পরিবেশ, জলবায়ু, খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে শতাব্দীব্যাপী একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।

উন্নত-সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের পরবর্তী অধ্যায়:
শেখ হাসিনার দূরদর্শি নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে এটি যেমন সত্য, তেমনি আরও অনেক পথ বাকি আছে এটিও সত্য।

এখন প্রয়োজন উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান, দক্ষ মানবসম্পদ, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, আর্থিক খাতের সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নগর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা।

বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বাণিজ্য প্রতিযোগিতা, আর্থিক খাত ও নগরায়ণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।

তাই উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লড়াই কোনো একটি প্রকল্প দিয়ে শেষ হবে না। পদ্মা সেতু একটি মাইলফলক হতে পারে, মেট্রোরেল একটি পরিবর্তনের প্রতীক হতে পারে, ডিজিটাল সেবা একটি নতুন দরজা খুলতে পারে কিন্তু উন্নত রাষ্ট্র তৈরি হয় এসব পরিবর্তনের সমন্বিত ধারাবাহিকতায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র দিয়ে গেছেন। সেই রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী, প্রযুক্তিনির্ভর, আধুনিক ও আত্মনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করার স্বপ্ন বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চারিত হয়েছে।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সময় বাংলাদেশে যে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেছে, তার অনেকগুলোই পরিসংখ্যান ও দৃশ্যমান প্রকল্পের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায়। বিশ্বব্যাংকের তথ্যেও গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস ও জীবনমানের উন্নতির উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু ইতিহাসের বিচার শুধু অতীতের সাফল্য দিয়ে শেষ হয় না। ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে আরও সমৃদ্ধ করতে হলে সেই উন্নয়নের ধারাকে কর্মসংস্থান, সুশাসন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, মানবসম্পদ ও টেকসই অর্থনীতির দিকে আরও এগিয়ে নিতে হবে।

কিন্ত ২০২৪ সালের জঙ্গি আক্রমণের পর থেকে আমরা কি দেখলাম? শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের উন্নয়নমূলক অবকাঠামোগুলো ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হলো, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ঘটিয়ে ভাংচুর ও লুটপাট করা হলো, দেশের সকল থানায় আক্রমণ করে সরকারি টাকায় কেনা শত শত পুলিশের গাড়ী পুড়িয়ে দেওয়া হলো, শত শত পুলিশকে হত্যা করা হলো। হত্যা করা হলো হাজার হাজার আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের। চারিদিকে অগ্নিসংযোগ, লুট-পাট, ডাকাতি আর দখলদারিত্ব। ফ্যাসিস্ট ইউনুস প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে লক্ষ লক্ষ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিনা অপরাধে গ্রেফতার করে কারাগারে নিয়েছে। অনেক নেতা-কর্মীকে পরিকল্পিতভাবে কারাগারে হত্যা করা হয়েছে।

শেখ হাসিনার দীর্ঘসময় শাসনের ফলে দেশে ব্যাপকভাবে ছোট-বড়, মাঝারি মানের শিল্প-কল-কারখানা গড়ে ওঠেছিল। বিএনপি-জামাত আর জঙ্গিরা মিলে হাজার হাজার শিল্প-কারখানা ধ্বংস করেছে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে, ভাংচুর ও লুটপাট করেছে। যা একটি সভ্য রাষ্ট্রের জন্য লজ্জার। বিবিএসের তথ্য মতে, বর্তমানে শিক্ষিত বেকার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ লাখ ১৭ হাজার, প্রায় ৮ লাখ শ্রমিক (নারী ও পুরুষ) কাজ হারিয়েছে বা চাকরিচ্যুৎ হয়েছে। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে নৈরাজ্য বিরাজ করছে। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ফ্যাসিস্ট ও গণশত্রু ইউনুস গংদের ন্যায় তারেক গংরাও একই পথে হাঁটছে। সারাদেশে তারা লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। তাদের সার্টিফিকেট আটকিয়ে দিয়েছে। দেশের মধ্যে কোন শৃঙ্খলা নেই। যেন মাৎস্যন্যায় শাসন চলছে। সমাজে যে যেমন পারছে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে, কোন বিচার ব্যবস্থা নেই। নারী ও শিশুরা আজ অনিরাপদ। নারী ধর্ষণ ও শিশু বলাৎকারের মত ঘটনা অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে কয়েকশগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মব-সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিএনপি-জামাতের সন্ত্রাসীরা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করছে। ধ্বসে পড়েছে রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা। দেশ যেন পরিণত হয়েছে মগের মুল্লুকে।

দেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে পূর্বের সকল ইতিহাস ভেঙে দিয়েছে। একদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি অন্য দিকে জ্বালানী তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। এমন টালমাটাল পরিস্থিতিতে তারেকের মত অর্বাচিন, ভোটারবিহীন এবং বিদেশী প্রভুদের পুতুল সরকারের পক্ষে দেশ চালানো সহজ হবে না। এই কার্ড বাবা যতদিন থাকবে দেশের পরিস্থিতি খারাপ থেকে আরও খারাপ হবে, দেশে অরাজকতা, খুন-ধর্ষণ, লুটপাট আরও বৃদ্ধি পাবে। দুর্নীতি পাহাড় টপকিয়ে আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।

আর সেখানেই একটি নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা, স্বপ্ন দেখানো, পরিকল্পনা করা এবং সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবতায় রূপ দেওয়া। এমন পরিস্থিতিতে শক্ত হাতে দেশের হাল ধরা শেখ হাসিনার পক্ষেই সম্ভব। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার কোন বিকল্প নেই।

ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট সমাজে শিক্ষার ভিত্তি মজবুত ও সুদূরপ্রসারী করতে এই উক্তিটি করেছিলেন, “তোমরা আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দেব।” তিনি বিশ্বাস করতেন, শিশুর প্রথম পাঠশালা হলো মায়ের কোল এবং মা-ই সন্তানের নৈতিক চরিত্র ও প্রাথমিক শিক্ষার প্রধান উৎস। তাই একটি শক্তিশালী, উন্নত ও শিক্ষিত জাতি গঠনে নারীশিক্ষা ও জননীকে শিক্ষিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে তিনি এই মন্তব্য করেন।

আর সেই রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকেই উচ্চারিত হতে পারে,
“তোমরা আমাকে একজন শেখ হাসিনা দাও, আমি তোমাদেরকে উন্নত-সমৃদ্ধ রাষ্ট্র দেবো।”

এটি কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ধারণা, একটি নেতৃত্ব, একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন-দর্শন এবং একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি।

(লেখক: মো: দেলোয়ার হোসেন শাহজাদা, উপ-দপ্তর সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ।)

Facebook Comments Box

Posted ৭:২২ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬

nyvoice24 |

Address
New York
Phone: 347-623-7137
Email: nyvoice24@gmail.com
Follow Us