প্রদীপ মালাকার
প্রিন্ট
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট : ১:৪২ অপরাহ্ণ
![]()
প্রদীপ মালাকার
আজ দেবী দুর্গার বিসর্জন। কয়েক দিনের উৎসব, আনন্দ, প্রার্থনা ও মিলনমেলার পর আবারও বিদায়ের সুর। মণ্ডপে মণ্ডপে বাজছে বিষাদের ঘণ্টা, ভক্তদের চোখে অশ্রু, মনে একরাশ আবেগ। ঢাকের বাদ্য, ধূপের গন্ধ, শঙ্খধ্বনি আর আরতির আলোয় যে উৎসবমুখর দিনগুলো কেটেছে, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটছে। দেবী দুর্গা ফিরে যাচ্ছেন কৈলাসে, রেখে যাচ্ছেন অগণিত ভক্তের হৃদয়ে ভালোবাসা, আশীর্বাদ ও নতুন দিনের প্রত্যাশা। কিন্তু মায়ের এই বিদায় কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের সমাপ্তি নয়; এটি আমাদের সামনে নতুন করে একটি প্রশ্নও তুলে ধরে– বাংলাদেশে সব ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের বন্ধন কতটা অটুট রাখতে পেরেছি আমরা?
দুর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দেবী দুর্গা শক্তি, সাহস, কল্যাণ ও অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক। পুরাণের কাহিনিতে মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবীর বিজয় অন্যায়, অন্ধকার ও অশুভ শক্তির পরাজয়ের বার্তা বহন করে। এই প্রতীকী তাৎপর্য কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর মধ্যে রয়েছে সর্বজনীন মানবিক আবেদন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, দুর্বলের পাশে থাকা, অশুভকে পরাজিত করা এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার শিক্ষা সব মানুষের জন্যই প্রাসঙ্গিক।
সেই অর্থে দুর্গোৎসবের আনন্দ ও তাৎপর্যকে আমরা বৃহত্তর মানবিক মূল্যবোধের আলোকে দেখতে পারি। একটি সমাজ তখনই সুন্দর হয়ে ওঠে, যখন সেখানে মানুষে মানুষে বিভেদ নয়, ভালোবাসা জয়ী হয়; প্রতিহিংসা নয়, সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠিত হয়; ভয় নয়, নিরাপত্তা মানুষের জীবনকে পরিচালিত করে।
বাংলাদেশ এমন একটি ভূখণ্ড, যার জন্মের ইতিহাসে বহুত্ববাদ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামের গভীর তাৎপর্য রয়েছে। এ দেশের নদী, মাটি, প্রকৃতি, লোকসংস্কৃতি, গান, কবিতা ও উৎসবের মধ্যে মিশে আছে নানা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের অবদান। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ দীর্ঘকাল ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন। সুখে–দুঃখে, বিপদে–আপদে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের নানা পর্বে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর অসংখ্য দৃষ্টান্ত আমাদের সমাজে রয়েছে।
একজন প্রতিবেশীর উৎসবে অন্য প্রতিবেশীর অংশগ্রহণ, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়, বিপদের দিনে ভিন্ন ধর্মের মানুষের পাশে দাঁড়ানো– এসব সাধারণ দৃশ্যই বাংলাদেশের সামাজিক সম্প্রীতির প্রকৃত শক্তি। এই শক্তি কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সম্পর্ক ও মানবিক আচরণের মধ্যেই বেঁচে থাকে।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়, সেখানে কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই আনন্দ ভাগ করে নেন না; বিভিন্ন ধর্মের মানুষও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, মণ্ডপ পরিদর্শন করেন এবং উৎসবের আনন্দে শামিল হন। শহর থেকে গ্রাম– বহু জায়গায় এই পারস্পরিক অংশগ্রহণ বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজের সৌন্দর্যকে তুলে ধরে। উৎসব তখন আর একটি সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে আটকে থাকে না; তা হয়ে ওঠে মানুষের মিলন, সংস্কৃতির বিনিময় এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের উপলক্ষ।
যদিও সম্প্রীতির এই চিত্রকে অক্ষুণ্ন রাখা সহজ কাজ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে উসকানি, রাজনৈতিক স্বার্থে বিভাজন সৃষ্টি এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ– এসব বিষয় আমাদের সতর্ক করে দেয়। কোনো একটি সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর হামলা, উপাসনালয়ে আক্রমণ, প্রতিমা ভাঙচুর কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে ভয়ভীতির মধ্যে রাখা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ক্ষতিগ্রস্ত করে না; তা পুরো সমাজের মানবিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও আইনের দৃষ্টিতে সমতার নীতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই মূল্যবোধের বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হলে রাষ্ট্র, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ নাগরিক– সবারই দায়িত্ব রয়েছে। যে কোন পূজামণ্ডপ ও উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাই না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রচার করা থেকে বিরত থাকার নাগরিক দায়িত্বও আমাদের পালন করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, সম্প্রীতির স্থায়ী ভিত্তি কেবল নিরাপত্তাব্যবস্থা দিয়ে নির্মিত হয় না; তা গড়ে ওঠে পারস্পরিক আস্থা, শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও ন্যায়বোধের ওপর। আমাদের সন্তানদের শেখাতে হবে– ধর্মীয় পরিচয় মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের অংশ, কিন্তু মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন সবার নৈতিক দায়িত্ব। অন্যের ধর্মকে অবজ্ঞা করে নিজের ধর্মের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বরং কিভাবে নিজের বিশ্বাসে অবিচল থেকেও অন্যের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা যায়– সেখানেই উদারতা ও মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
দেবী বিসর্জন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর সবকিছুই পরিবর্তনশীল। উৎসব আসে, আনন্দের দিন ফুরিয়ে যায়, প্রতিমা বিসর্জিত হয়; কিন্তু উৎসবের শিক্ষা ও অনুভূতি থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে। তাই আজকের বিদায়বেলায় আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত– উৎসবের আনন্দ যেন বিসর্জনের সঙ্গে হারিয়ে না যায়। মণ্ডপের আলো নিভে গেলেও মানুষের প্রতি মানুষের মমতার আলো যেন জ্বলে থাকে। ঢাকের শব্দ থেমে গেলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সুর যেন আমাদের সমাজে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
এ দেশের মুসলমানের ঈদ, হিন্দুর দুর্গাপূজা, বৌদ্ধের প্রবারণা পূর্ণিমা কিংবা খ্রিষ্টানের বড়দিন– প্রতিটি ধর্মীয় উৎসবই মানুষের আনন্দ, বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এক সম্প্রদায়ের উৎসব অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ নয়; বরং তা পারস্পরিক পরিচিতি, সৌহার্দ্য ও মানবিক সম্পর্ক গভীর করার সুযোগ। এই সহজ সত্যটি আমাদের জাতীয় জীবনে যত বেশি প্রতিষ্ঠিত হবে, বাংলাদেশ তত বেশি শান্তিপূর্ণ, সহনশীল ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যাবে।
একজন মানুষের ধর্মীয় পরিচয় কখনোই তার নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা কিংবা মর্যাদা পাওয়ার পথে বাধা হতে পারে না। সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু– পরিচয় যা–ই হোক, রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। তাই প্রতিটি মানুষ যেন নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারেন, প্রত্যেক নাগরিক যেন নিজের পরিচয় নিয়ে নিরাপদে বাঁচতে পারেন, কোনো পরিবার যেন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আতঙ্কে দিন কাটাতে বাধ্য না হয়– এটাই হোক আমাদের সকলের প্রত্যাশা।
মা দুর্গার কাছে ভক্তদের প্রার্থনা অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভশক্তির প্রতিষ্ঠা। সেই প্রার্থনার মানবিক তাৎপর্যকে ধারণ করে আমরাও চাই– বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিক সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, হিংসা, অন্যায় ও মানুষের প্রতি মানুষের অবজ্ঞা। প্রতিষ্ঠিত হোক এমন এক সমাজ, যেখানে ভিন্ন ধর্মের মানুষও একে অপরের আনন্দে আনন্দিত হন, দুঃখে পাশে দাঁড়ান এবং সম্মানের সঙ্গে একসঙ্গে বাঁচার অধিকার ভোগ করেন।
মা, তোমার বিদায়বেলায় আমাদের প্রার্থনা– বাংলাদেশের সকল ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষের সম্প্রীতির বন্ধন যেন অটুট থাকে। আগামী শরতে তুমি আবার ফিরে এসো শান্তি, নিরাপত্তা, মানবতা ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে। আবার তোমার আগমনে প্রতিটি পূজামণ্ডপ ভরে উঠুক আনন্দে, প্রতিটি মানুষের হৃদয় ভরে উঠুক আশায়, আর বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে বিরাজ করুক শান্তি ও নিরাপত্তা। আগামীবার মা আসুক– অশুভের বিনাশ, শুভবোধের জাগরণ এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের অটুট বন্ধনের প্রত্যাশা নিয়ে।
(লখক : আমেরিকা প্রবাসী শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট)
Posted ১:৪২ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
nyvoice24 | New York Voice 24