মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা

আশরাফুল হক   প্রিন্ট
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬   সর্বশেষ আপডেট : ১:৩১ অপরাহ্ণ

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা

বীর মুক্তিযোদ্ধা আশরাফুল হক।

আশরাফুল হক

মুক্তিযুদ্ধের কথা লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। এই অসাধারণ বিষয়টি কারো কারো জীবনে একবারই এসেছিল তবে আবারও যে কখনো আসবে না বা এই স্পিরিট নিঃশেষ হয়ে গেছে এমনটি বলা যাবে না। মুক্তিযুদ্ধার স্পিরিট মৃত্যু ছাড়া শেষ হওয়ার সুযোগ নাই। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সুযোগ আসাটা অবশ্যই সৌভাগ্যের আর সুযোগ আসার পরও যদি কেউ যোগদান করতে না পারে তাহলে তারা নেহায়েত হতভাগ্য ছাড়া আর কিছু বলার নাই, অবশ্য শারীরিক মানসিক অক্ষম কিংবা মানসিক বিকারগ্রস্ত হলে বলারতো কিছু থাকে না।

শারীরিক অক্ষমতা সত্ত্বেও কেউ কেউ অসাধারণ কিছু সাফল্য দেখিয়েছেন সেটা তাদের মনের জোর এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অসামান্য আগ্রহের কারণেই সম্ভব হয়েছে। আর যাদের জন্মই হয়নি অথবা অপরিপক্ক শিশু ছিল তাদের কথা আলাদা।

মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ জীবনে এটাই প্রথম, হয়তবা এটাই শেষ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অদম্য স্পিরিট মানুষের ভিতর থেকে আসে । এই চেতনা এমনই যে কন কনে শীতের রাতে সারা শরীর নোংরা পানিতে ডুবিয়ে রেখে মাথার উপর কিছু কচুরিপানা রেখে সারারাত শত্রুদের ঘায়েল করার অপেক্ষায় থেকে আবার না খেয়ে থাকা কিছুই অনুভব হয়নি। অবশ্য নিরাপদ কোনো দূরত্বে পৌঁছানোর পর অনুভূতি ঠিকই আসত। কখনো কখনো কিছু কিছু এলাকাবাসী সাহায্য সহানুভূতি এবং সহযোগিতা করেছেন। তা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাদের সমর্থনের প্রকাশ।

যারা শারীরিক মানসিক অর্থ বিত্ত সবদিক থেকেই সচল থাকার পরও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি শুধু তারাই জানেন কেন পারেননি।বিবেক বুদ্ধি তো আল্লাহ একবারেই দিয়ে দিয়েছেন কিন্তু খরচ করলাম কিভাবে তার হিসাব নিজের কাছেও তো কিছু আছে, তা – নয়কি? মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে না পারলে মানুষের হিংস্রতার ভয়াবহতা বুঝতে পারতাম না।

আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে কতটুকু সক্রিয় ছিলাম তা নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করি না কেন উত্তর পেয়ে যাবো, কারো কাছে ‍ব্যাখ্যা চাইতে হবে না। নিজের বিবেক বুদ্ধিই যথেষ্ট। মুক্তিযুদ্ধে নারী পুরুষ যারা যেভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন তা তাদের জীবনের অতি উল্লেখযোগ্য একটি মাইলফলক হিসাবে চিহ্নিত থাকবে। এই মাইলফলক সারা জীবনের জন্য একবারই প্রতিষ্ঠিত। কে কি বলল কি করল না করল তেমন কিছু যায় আসে না।

কোন মানুষের জীবনে তার নিজের সামনেই ঘর বাড়ি অর্থ বিত্ত আপনজন সব কিছু হারিয়ে নিজের ঘর বাড়িটুকু পর্যন্ত দাও দাও করে জ্বলতে দেখেও শুধুমাত্র প্রানভয়ে দূর দূরান্তরে পালিয়ে যাওয়ার প্রানান্ত চেষ্টা তা আজকের দিনে কল্পনা করাটাও কঠিন। হায়রে জীবন! তার পরও সকলে বাঁচতে পারে নাই।

মুক্তিযোদ্ধাদের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলির কথা মুক্তিযোদ্ধা এবং ভূক্তভুগীরা নিজেরাই ভালোভাবে জানেন, অন্যরা কি বললো না বললো তাতে তেমন কিছু আসে যায় না। তবে অকৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশটুকু বুঝা যায়। জীবনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে না পারলে অনেক অনেক কিছু দেখার সুযোগ কোনদিনও হ’ত না। আর মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার কারণে পঙ্গুত্ববরণ (যোদ্ধাহত হিসেবে) করে যারা বেঁচে আছেন, তাদের মনের অবস্থাই বা কি ?

আমি মনে করি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দেখা হ’ল মুক্তিযুদ্ধ এবং শ্রেষ্ঠ পাওয়া হ’ল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ। সবশেষে বলে যেতে চাই – -বংলাদেশ মম চির মনোরম চির মধুর।

 

(লেখক:নিউইয়র্কে বসবাসরত একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা)

Facebook Comments Box

Posted ১:৩১ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

nyvoice24 |

Address
New York
Phone: 347-623-7137
Email: nyvoice24@gmail.com
Follow Us