অনলাইন ডেস্ক
প্রিন্ট
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট : ৪:২৩ অপরাহ্ণ
![]()
হেমায়েত হোসেন
জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি যারা, দিনশেষে তারাই আজ সবচেয়ে একা, অরক্ষিত ও বঞ্চনার শিকার।
মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমির বুকে রক্তকে পানি করে দেশে যে রেমিট্যান্সের জোয়ার প্রবাসীরা পাঠাচ্ছেন, তার ওপর ভর করেই টিকে থাকে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাকা। অথচ তাঁদের ঘামে অর্জিত সুবিধার ভাগীদার রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরম প্রয়োজনের দিনে এই প্রবাসীদের ন্যূনতম সুরক্ষাটুকুও দিতে পারছে না। সম্প্রতি সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশি প্রবাসী নজরুল ইসলাম আব্দুল বাসির ও সুইটি আকতারের শিরশ্ছেদের নির্মম ঘটনা এবং তা ঘিরে বাংলাদেশ দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চরম উদাসীনতা প্রবাসীদের প্রতি রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবহেলা ও চরম ব্যর্থতাকে আবারও নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পবিত্র মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কাজের (ব্যভিচার) অভিযোগে ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে এই দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরবর্তীতে সৌদি আদালত তাঁদের বিরুদ্ধে ইসলামি আইনশাস্ত্রের ‘তাজির’ (Ta’zir) বিধানের অধীনে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়—যে বিধানে সুনির্দিষ্ট বিচারিক সীমারেখা না থাকলে বিচারক অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে যেকোনো শাস্তি নির্ধারণ করতে পারেন।
ভিয়েনা কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিককে চরম দণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসকে তা আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করার বাধ্যতামূলক বিধান রয়েছে। কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সাথে গত ১৪ অক্টোবর এই শিরোচ্ছেদ কার্যকর করে। তবে এর চেয়েও বড় সত্য হলো, বাংলাদেশের মিশন এই ১৪ মাস ধরে সেখানে কী ভূমিকা পালন করেছে?
জেদ্দার কারাগারে এই প্রবাসীরা দীর্ঘ ১৪ মাস ধরে বন্দি ছিলেন এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা বন্দীদের তালিকায় স্পষ্টত তাঁদের নাম ছিল। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ দূতাবাস বা লেবার ওয়েলফেয়ার উইং একবারের জন্যও এই মামলার অগ্রগতি যাচাই করা, রায়ের নকল সংগ্রহ করা কিংবা আসামিদের জন্য আইনজীবী বা আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়নি। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার চার দিন পর স্থানীয় সৌদি সংবাদমাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি দেখে কূটনৈতিক কর্মকর্তারা খবর পান! রেমিট্যান্স পাঠানো এই নাগরিকদের চরম সংকটের দিনে তাঁদের পাশে কোনো আইনজীবী কিংবা কনস্যুলার প্রতিনিধি দাঁড়িয়ে তাঁদের জীবন রক্ষার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেনি।
রাজনৈতিক মঞ্চে প্রতিটি সরকারই প্রবাসীদের “সোনার ছেলে”, “জাতীয় বীর” কিংবা “অর্থনীতির মূল স্তম্ভ” বলে ভূয়সী প্রশংসা করে থাকে। প্রবাসী কল্যাণের নামে খোলা হয় নানা দফতর ও তহবিল। কিন্তু বাস্তবতা যে কতটা ভয়াবহ, তা উঠে এসেছে জেদ্দা কনস্যুলেটেরই সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে।
বর্তমানে কেবল পশ্চিম সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারেই ৩০৬ জন বাংলাদেশি প্রবাসী বিভিন্ন অভিযোগে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন, যার মধ্যে ১৪৭ জন দীর্ঘমেয়াদি সাজা ভোগ করছেন। অথচ কনস্যুলেট স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছে যে, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে লিখিত কোনো আবেদন না আসায় তারা কোনো পূর্বপ্রস্তুতিমূলক আইনি পদক্ষেপ নেয়নি। যে প্রবাসীরা নিজ দেশে প্রবাসে যাওয়ার সময় থেকে শুরু করে কর্মস্থলে প্রতি পদক্ষেপে শোষিত হন, বিপদের দিনে রাষ্ট্র কেন নিজে থেকে এগিয়ে এসে তাঁদের বিনামূল্যে আইনি সুবিধা দেবে না? স্বজনরা আবেদন করেনি—এমন আমলাতান্ত্রিক অজুহাত তুলে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া প্রবাসীদের জীবনের সাথে চরম প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।
অন্যান্য দেশের কূটনৈতিক তৎপরতার দিকে তাকালে বোঝা যায়, নিজ নাগরিকদের রক্ষায় রাষ্ট্রের সঠিক ভূমিকা কী হওয়া উচিত। ফিলিপাইন কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো তাদের কোনো নাগরিক সৌদিতে গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হলে বা মৃত্যুদণ্ডের মুখে পড়লে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, রাষ্ট্রপ্রধানের দফতর এবং দূতাবাস যৌথভাবে সর্বোচ্চ আইনি ও কূটনৈতিক লড়াই চালায়। তারা নিজস্ব তহবিল থেকে নামী আইনজীবী নিয়োগ করে এবং প্রয়োজনবোধে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে কোটি কোটি টাকা ‘রক্তপণ’ (Diyyah) জোগাড় করে নাগরিকদের জীবন বাঁচায়। ২০১১ সালে না জানিয়ে রুয়াতি নামের এক ইন্দোনেশীয় গৃহকর্মীর শিরোচ্ছেদের পর জাকার্তা সরকার কঠোর অবস্থান নিয়ে সৌদিতে কর্মী পাঠানো সাময়িক বন্ধ করে দিয়েছিল।
পরবর্তীতে সাতিনাহ নামের আরেক নারীকে বাঁচাতে তাদের সরকার নিজে উদ্যোগী হয়ে প্রায় ১৮-১৯ লাখ ডলার রক্তপণ পরিশোধ করে মৃত্যুদণ্ড ঠেকায়। অথচ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের ভূমিকা কেবল ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর একটি প্রথাগত কূটনৈতিক পত্র পাঠানো কিংবা ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে ডেকে আনুষ্ঠানিক কৈফিয়ত চাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। প্রবাসীদের লাশ হয়ে দেশে ফেরার পর এই লোকদেখানো তৎপরতায় কোনো প্রাণের সুরক্ষাই মেলে না।
প্রবাসীরা কোনো করুণা বা দান চান না; তারা চান তাঁদের ঘামে কেনা রেমিট্যান্সের বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও জীবনের নিরাপত্তা।
বিমানবন্দর থেকে শুরু করে বিদেশে দূতাবাস পর্যন্ত প্রতি পদক্ষেপে হয়রানি বন্ধ করে প্রবাসী সহায়তা সেলগুলোকে সত্যিকার অর্থে কার্যকর করতে হবে। সৌদি আরবসহ বিশ্বের প্রতিটি বাংলাদেশ মিশনে অভিজ্ঞ আইনজীবীসহ স্থায়ী আইনি সহায়তা সেল গঠন, প্রতিটি বিচারাধীন প্রবাসীর খবরাখবর বাধ্যতামূলকভাবে মনিটর করা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিয়ম মেনে চলতে সৌদি সরকারের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি। মুখে প্রবাসীদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি বলে প্রশংসা আর বাস্তবে তাঁদের অবহেলা করে লাশ বানানোর এই দ্বিচারিতা বন্ধ করতে হবে।
রাষ্ট্র যদি প্রবাসীদের বিপদে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই রেমিট্যান্স অর্জনের বড়াই করা বন্ধ হওয়া উচিত।
Posted ৪:২২ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
nyvoice24 | New York Voice 24