এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম
প্রিন্ট
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট : ৫:২০ অপরাহ্ণ
![]()
এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন চেয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওয়াশিংটন প্রেস ক্লাবে ১৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে অনলাইনে যুক্ত হয়ে দেওয়া বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো পক্ষ নেওয়ার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত গণতান্ত্রিক নীতি, অবাধ নির্বাচন, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা ও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন জানানো।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো পক্ষ বেছে নিতে বলছি না, আমি যুক্তরাষ্ট্রকে গণতন্ত্রকে বেছে নিতে বলছি। আমি হস্তক্ষেপ চাইছি না, বরং নীতির প্রতি সমর্থন চাইছি।’
সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার পাশাপাশি বক্তব্য দেন তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস, যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ও মূলধারার রাজনীতিক ড. নুরুন নবী ও কম্যুনিটি এ্যাক্টভিস্ট রানা হাসান মাহমুদ।
নিজের বক্তব্যে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অবস্থা, অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন।
রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা উচিত নয়
শেখ হাসিনা বলেন, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতবিরোধ স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। সরকারকে জবাবদিহির আওতায় থাকতে হবে। তবে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের অজুহাতে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা কিংবা লাখ লাখ নাগরিককে রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
শেখ হাসিনা বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের তাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে মুছে ফেলা যায় না। একই সঙ্গে তাঁর সরকারের বিরোধিতা করা ব্যক্তিদের রাজনৈতিক অধিকারকেও সম্মান জানাতে হবে।
শেখ হাসিনার ভাষায়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিহিংসার ভিত্তিতে নয়, বরং সমঝোতা ও রাজনৈতিক সম্প্রীতির ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে।
ন্যায়বিচার ছাড়া স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়
বাংলাদেশে সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে বেআইনিভাবে আটক ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে।
শেখ হাসিনা বলেন, ন্যায়বিচার ছাড়া স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আর যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায় না।
শেখ হাসিনা এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশের কথা বলেন, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপের মাধ্যমে মতপার্থক্য দূর করবেন, নির্বাচন নির্ধারিত হবে ভোটারদের মতামতে এবং সাংবাদিকেরা নির্ভয়ে সংবাদ পরিবেশন করতে পারবেন।
তরুণদের স্বাধীনভাবে সমালোচনা করার সুযোগ এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে যোগ্যতা ও সামর্থ্যের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
গণতন্ত্র ও উন্নয়ন—দুটিই প্রয়োজন
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও উন্নয়ন—দুটিই প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও পুনর্মিলন এবং শক্তিশালী ব্যক্তির পরিবর্তে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি।
তাঁর মতে, উন্নয়নকে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। দেশের প্রতিটি নাগরিক যেন রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্ম, লিঙ্গ, সামাজিক অবস্থান কিংবা অঞ্চল নির্বিশেষে শান্তিপূর্ণভাবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গঠনে অংশ নিতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা যুক্তরাষ্ট্রেরও স্বার্থ
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে শেখ হাসিনা বলেন, দুই দেশের অংশীদারত্বের ভিত্তি হলো গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সন্ত্রাসবাদ দমন, জলবায়ু এবং মানবকল্যাণের মতো অভিন্ন স্বার্থ।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি উভয় দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলকে কেন্দ্র করে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা উচিত।
এ লক্ষ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, মার্কিন বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্কের আহ্বান
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশকে এমন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যেতে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনসহ সব অংশীদারের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখবে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশকে কে শাসন করবে, তা নির্ধারণ করা যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়। বরং দেশটিতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সাংবিধানিক শৃঙ্খলা, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং মানবাধিকারের প্রতি সমর্থন জানানোই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হওয়া উচিত।
বাংলাদেশি–আমেরিকানদের কথা
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি-আমেরিকানদের অবদানের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, উদ্যোক্তা, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ, শ্রমিক ও কমিউনিটি নেতা হিসেবে বাংলাদেশিরা যুক্তরাষ্ট্রের সমাজকে সমৃদ্ধ করেছেন।
তাঁর মতে, বাংলাদেশি-আমেরিকান সম্প্রদায় দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। এই সম্পর্ক কোনো সরকার, রাজনৈতিক দল কিংবা রাজনৈতিক মতবিরোধের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত এবং ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
অবাধ নির্বাচন ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান
বক্তব্যের শেষাংশে শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাঁর আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ যেন অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের সরকার নির্ধারণ করতে পারেন, সে পরিবেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন থাকা উচিত।
তিনি অবাধ নির্বাচন, স্বাধীন আদালত, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সংগঠন করার অধিকার, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রতি সমর্থনের আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনার বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে জনগণের অধিকার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসনকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাঁর আহ্বান, বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক পক্ষ নয়, বরং গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি সমর্থন জানানো।
Posted ৫:২০ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
nyvoice24 | New York Voice 24