নিউইয়র্কে ঐক্য পরিষদের সেমিনার

সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অশনি সংকেত

দীপক কুমার আচার্য /অজিৎ ভৌমিক   প্রিন্ট
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬   সর্বশেষ আপডেট : ৭:১৫ অপরাহ্ণ

সেমিনারে ঐক্য পরিষদের শীর্ষ নেতারা। ছবি-বাংলা গেজেট।

দীপক কুমার আচার্য /অজিৎ ভৌমিক

বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, আমেরিকার উদ্যোগে নিউইয়র্কে ১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় `নিপীড়নের কোন জয় নেই : বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনে প্রকারান্তরে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং জাতির ক্ষতি করছে’ (  “Persecution Has No Winners: How Minority Oppression in Bangladesh Harms the Majority and the Nation” )শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।  সেমিনারে বক্তারা বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চলা দীর্ঘমেয়াদী নিপীড়ন, নির্যাতন এবং এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সেমিনারের প্যানেলিস্টরা বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলি তুলে ধরে বলেন যে, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সমস্যা নয়, বরংএটি সমগ্র জাতির নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এক মারাত্মক অশনি সংকেত।

প্রিয়াঙ্কা পাল এবং স্বপন কে দাসের যৌথ সঞ্চালনায় এ সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মাইনরিটি গবেষক মৃন্ময় সমদ্দার এবং ঐক্য পরিষদের বোর্ড অব গভর্নর্স এর চেয়ারপারসন অ্যাটর্নি অশোক কর্মকার। যৌথভাবে প্রস্তুতকৃত মূল প্রবন্ধে বলা হয় যে, বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের—বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের—ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা নিপীড়নকে কেবল একটি সাম্প্রদায়িক সমস্যা হিসেবে দেখলে এর গুরুতর জাতীয় প্রভাব থেকে যায়। সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা অস্বীকার করা, ঘটনাগুলোকে খাটো করে দেখা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে ব্যর্থতা রাষ্ট্রের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক নাগরিকত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তাকে দুর্বল করে তোলে।

তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের ৫৫ বছরের গতি-প্রকৃতি নিয়ে গবেষণালব্ধ প্রবন্ধটিতে ১৯৭২ সালের সাংবিধানিক অঙ্গীকার থেকে শুরু করে শত্রু ও অর্পিত সম্পত্তি ব্যবস্থা, পঞ্চম ও অষ্টম সংশোধনী, বাবরি মসজিদ ধ্বংস-পরবর্তী হামলা, ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, ২০১৩ সালের নির্যাতন, ২০১৬ সালের নাসির নগর হামলা, ২০২১ সালের কুমিল্লা কেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক রূপান্তর-পরবর্তী ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী ঘটনাগুলোকে একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখানো হয়েছে যে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি সহিংসতাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারযোগ্য এবং আইনগত ভাবে সহনীয় করে তোলে। এই সামাজিক অবক্ষয় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি এক সময় হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী, আহমদিয়া, সুফি, বাউল ও ফকীর সম্প্রদায়ের গণ্ডি পেরিয়ে নারী, সাংবাদিক, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী, রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী এবং সাধারণ নাগরিকদেরও আক্রান্ত করতে পারে, যার স্পষ্ট নমুনা ইতোমধ্যে দেশবাসী দেখেছে। এই পুরো বিষয়টি আন্তর্জাতিক স্তরেও ব্যাপকভাবে প্রকাশিত ও আলোচিত হয়েছে। সে কারণে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল মানবাধিকার রক্ষার একটি খণ্ডিত বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার একটি অত্যন্ত মৌলিক পূর্বশর্ত।

সেমিনারের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক স্বপন কান্তি দাস। তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন যে, বর্তমান বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর অব্যাহতভাবে নির্যাতন চলছে এবং প্রশাসন বা সরকার তাদের সুরক্ষায় কোনো কার্যকর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

সেমিনারে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি অর্ঘ সরকার এবং উর্বশী সান্যাল। ছবি-বাংলা গেজেট।

সেমিনারের বিষয়বস্তু আলোকে বক্তব্য রাখেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন, অধ্যাপক রাজেশ সম্পাত, মানবিধার আইনজীবি এডভোকেট মনজিল মোরশেদ, এর্টনী অশোক কুমার কর্মকার প্রমুখ ।

সেমিনারের বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে অন্যতম ভিকটিম হিসেবে দেশান্তরি হওয়া লেখক তসলিমা নাসরিন বলেন, বাংলাদেশি হিন্দুরা আজ চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন এবং ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিস্টদের ক্রমাগত হামলা ও নিপীড়নের মুখে তারা তাদের প্রাচীন ভিটেমাটি এবং জন্মভূমি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। তারা আজ বিভিন্ন দেশে শরণার্থী বা পরবাসীর জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।

আলোচনায় অংশগ্রহণকারিরা আরও উল্লেখ করেন যে, দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং এর ফলে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ দিনদিন বেড়েই চলেছে। কিছুক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যেমন বিবিসি বা আলজাজিরার সংবাদ প্রচারের ধরন নিয়েও সেমিনারে আলোচনা করা হয়। এছাড়া উর্বশী সান্যাল সংখ্যালঘুদের ওপর জাতিগত নিধন ও সহিংসতার বিভিন্ন দিক অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরেন।

সেমিনারে উপস্থাপিত বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত এবং পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে গত কয়েক দশক ধরে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর হার ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, বিভিন্ন ঐতিহাসিক জনমিতির পরিসংখ্যান তুলে ধরে দেখানো হয় যে, বিগত দশকগুলোতে দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনুপাত উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে, যা দেশত্যাগের প্রবণতাকেই স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদ, আমেরিকার দুই সভাপতি নয়ন বড়ুয়া ও গিতা চক্রবর্তী।

সভাপতির বক্তব্যে তারা বলেন যে, দেশের এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও নির্যাতন বন্ধ করতে হবে এবং রাষ্ট্রকে সব নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

সেমিনারের শেষ পর্যায়ে উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে অংশ গ্রহণকারীরা দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং অবিলম্বে একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোরালো ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

ঐক্য পরিষদের এ সেমিনারে নতুন প্রজন্মের পক্ষে বাংলাদেশে বিরাজমান বর্বরতা আলোকপাত করেন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার উর্বশী সান্যাল, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অধ্যয়নরত অর্ঘ সরকার এবং দশম গ্রেডের ছাত্র নিরত্যিয়া ময়ুখ। প্রবাস প্রজন্মের কন্ঠে গভীর উদ্বেগ প্রকাশিত হয়-যা উপস্থিত সকলকে বিচলিত করেছে। আয়োজক সংগঠনের বোর্ড অব গভর্ণরস’র চেয়ারপারসন অশোক কে কর্মকার এ প্রসঙ্গে এ সংবাদদাতার কাছে অভিব্যক্তি প্রকাশকালে বলেন, তিন দশকের অধিক সময় যাবত ঐক্য পরিষদের সাথে রয়েছি। আগে কখনোই নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার ঘাটতি আজ পূরণ হলো এবং এরমধ্যদিয়েই বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চলমান বর্বরতা-হিংস্রতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খুব সহজে উপনীত হবে।

সেমিনারের প্রয়োজনীয়তা আলোকে আরো বক্তব্য দেন ঐক্য পরিষদের বোর্ড অব গভর্ণর্স এর সদস্য পলাশ বড়ুয়া, ট্রেজারার বরুন পাল এবং অর্থনীতিবিদ চন্দন সরকার।

Facebook Comments Box

Posted ৭:১৫ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

nyvoice24 |

Address
New York
Phone: 929-799-2884
Email: nyvoice24@gmail.com
Follow Us