অনলাইন ডেস্ক
প্রিন্ট
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট : ২:০২ অপরাহ্ণ
![]()
নজরুল মিন্টু
(এনওয়াইভয়েস২৪ ডটকম)
কানাডায় অভিবাসনের দরজা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। পড়াশোনা কিংবা চাকরির উদ্দেশ্যে দেশটিতে যেতে ইচ্ছুক বিদেশিদের জন্য একের পর এক কঠোর শর্ত আরোপ করা হচ্ছে। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে কানাডায় নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও বিদেশি কর্মীদের আগমন কমেছে ৬৩ শতাংশ। সংখ্যার হিসাবে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯০০ জন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আগমন কমেছে ৭১ শতাংশ এবং বিদেশি কর্মীদের আগমন কমেছে ৫৭ শতাংশ। কানাডার অভিবাসন, শরণার্থী ও নাগরিকত্ববিষয়ক বিভাগ আইআরসিসির (IRCC) গত ২০ অক্টোবর প্রকাশিত পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে এই চিত্র। তথ্যগুলো ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ের, যার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে ২০২৪ সালের একই সময়ের। এই পরিসংখ্যান কানাডায় যেতে আগ্রহী লাখ লাখ মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে দেশটিতে ইতিমধ্যে অবস্থানরত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
কানাডা একসময় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও বিদেশি কর্মীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় গন্তব্য ছিল। পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ, তারপর স্থায়ী বসবাসের অনুমতি এবং একসময় নাগরিকত্ব অর্জনের সম্ভাবনা অনেককেই দেশটিতে যেতে উৎসাহিত করত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। আবাসন সংকট, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সরকারি পরিষেবার ওপর চাপের কথা উল্লেখ করে অভিবাসীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে একের পর এক পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকারও এই নীতি অনুসরণ করছে। সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, এসব সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে নতুন অভিবাসীদের আগমনে।
আইআরসিসির হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে কানাডায় নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এসেছেন মাত্র ৬৫ হাজার ২৪০ জন। একই সময়ে নতুন বিদেশি কর্মী এসেছেন ১ লাখ ৩০ হাজার ৯৫ জন। দুই শ্রেণি মিলিয়ে মোট ১ লাখ ৯৫ হাজার ৩৩৫ জন। অথচ ২০২৪ সালের একই আট মাসে এই সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখের বেশি। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে নতুন শিক্ষার্থী ও কর্মীদের আগমন প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমে গেছে।
সবচেয়ে বেশি কমেছে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আগমন। ২০২৪ সালের আগস্টে কানাডায় এসেছিলেন ৭৯ হাজার ৬৬০ জন নতুন শিক্ষার্থী। পরের বছর একই মাসে সংখ্যাটি নেমে আসে ৪৪ হাজার ৮৬৫ জনে। আর চলতি বছরের আগস্টে এসেছেন মাত্র ৩৭ হাজার ৯০ জন। সাধারণত সেপ্টেম্বরে শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে আগস্টে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আগমন বেড়ে যায়। কিন্তু এবার সেই সময়েও শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগের দুই বছরের তুলনায় অনেক কম।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমাতে সরকার প্রথমে স্টাডি পারমিটের বার্ষিক সীমা নির্ধারণ করে। এরপর ধাপে ধাপে সেই সীমা আরও কমানো হয়। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তি অনুমতিপত্র যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের আর্থিক সামর্থ্যের শর্ত কঠোর করা হয়েছে। ফলে বিদেশি কোনো শিক্ষার্থী কানাডার কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও তাঁর স্টাডি পারমিট পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে যাঁরা পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করে নিজের খরচ চালানোর পরিকল্পনা করেন, তাঁদের জন্য পরিস্থিতি আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে।
পড়াশোনা শেষে কাজের অনুমতি পাওয়ার নিয়মও কঠোর করা হয়েছে। আগে কানাডায় পড়াশোনা শেষ করে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ওয়ার্ক পারমিট বা পিজিডব্লিউপি (PGWP) পাওয়ার সুযোগ অনেক বিদেশি শিক্ষার্থীর কাছে বড় আকর্ষণ ছিল। কিন্তু এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোর্সের ধরন ও অন্যান্য যোগ্যতার ওপর নির্ভর করছে এই অনুমতি পাওয়া যাবে কি না। কিছু শিক্ষার্থীকে ভাষাগত দক্ষতা এবং নির্দিষ্ট শিক্ষাক্ষেত্রের শর্তও পূরণ করতে হচ্ছে। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয় করে কানাডায় পড়াশোনা শেষ করার পরও কেউ জানতে পারেন, তাঁর কোর্সটি পিজিডব্লিউপির জন্য যোগ্য নয়।
শিক্ষার্থীদের ওপর এই কড়াকড়ির প্রভাব কতটা পড়েছে, তা বোঝা যায় কানাডায় অবস্থানরত স্টাডি পারমিটধারীদের সংখ্যাতেও। ২০২৪ সালের জুনে দেশটিতে স্টাডি পারমিটধারী ছিলেন ১০ লাখ ৩২ হাজার ৯৫০ জন। চলতি বছরের আগস্টে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৬ লাখ ২ হাজার ১১৫ জনে। অর্থাৎ দুই বছরের কিছু বেশি সময়ে সংখ্যা কমেছে চার লাখেরও বেশি। বিদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভরশীল কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যও এটি উদ্বেগের বিষয়। শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের আয় ও কোর্স পরিচালনায় চাপ তৈরি হতে পারে।
বিদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে কানাডায় নতুন বিদেশি কর্মী এসেছেন ১ লাখ ৩০ হাজার ৯৫ জন। ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় যা ১ লাখ ৭০ হাজার ৪৫৫ জন কম। সরকার বিদেশি কর্মী নিয়োগের নিয়ম পরিবর্তন করেছে। বিশেষ করে কম বেতনের কাজে বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাদের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া যেসব বড় শহরাঞ্চলে বেকারত্বের হার ৬ শতাংশ বা তার বেশি, সেখানে কম বেতনের বিদেশি কর্মী নিয়োগের আবেদন প্রক্রিয়াকরণ বন্ধ রাখার নিয়ম রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কম বেতনের বিদেশি কর্মী নিয়োগের সর্বোচ্চ অনুপাতও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে কানাডার কোনো প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে কর্মী নিতে চাইলেও সব ক্ষেত্রে তা সহজে সম্ভব হচ্ছে না। নিয়োগকর্তাকে সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির শর্ত পূরণ করতে হচ্ছে। আবার কানাডায় অবস্থানরত বিদেশি কর্মীদের স্বামী বা স্ত্রীর জন্য ওপেন ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার নিয়মও কঠোর করা হয়েছে। ফলে পরিবারের একজন সদস্য চাকরি পেলেই অন্য সদস্য সহজে কাজের অনুমতি পাবেন, এমন সুযোগ এখন সীমিত। যেসব পরিবার দুজনের আয়ের ওপর নির্ভর করে কানাডায় বসবাসের পরিকল্পনা করেছিল, তাদের জন্য এই পরিবর্তন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
স্থায়ী বসবাসের অনুমতির ক্ষেত্রেও সরকার এখন বিশেষ দক্ষতা, কানাডীয় কাজের অভিজ্ঞতা এবং শ্রমবাজারের প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর মধ্যেই গত ১৬ অক্টোবর এক্সপ্রেস এন্ট্রির নিয়মে নতুন পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বর থেকে নির্দিষ্ট উচ্চ বেতনের পেশায় কানাডীয় কাজের অভিজ্ঞতার জন্য অতিরিক্ত ২০, ৪০ কিংবা ৭০ পয়েন্ট পাওয়া যাবে। একই ধরনের পেশায় যোগ্য চাকরির প্রস্তাব থাকলে ৫০, ৭০ কিংবা ১০০ পয়েন্ট দেওয়ার ব্যবস্থা থাকছে। তবে চাকরির প্রস্তাবের জন্য আগের মতো এলএমআইএ (LMIA) বাধ্যতামূলক থাকবে না।
নতুন নিয়মে নির্ধারিত পেশার বাইরের কর্মীরা এই অতিরিক্ত পয়েন্ট পাবেন না। ফলে দীর্ঘদিন কানাডায় কাজ করলেও সবার জন্য স্থায়ী বসবাসের সুযোগ সমান থাকছে না। এক্সপ্রেস এন্ট্রির পুলে থাকা আবেদনকারীদের পয়েন্ট নতুন নিয়মে পুনর্গণনা করা হবে। যোগ্য চাকরির প্রস্তাব রয়েছে এমন আবেদনকারীদের ৩ নভেম্বরের আগে নিজেদের প্রোফাইলের তথ্য হালনাগাদ করতে বলেছে আইআরসিসি।
কানাডা সরকার বলছে, অভিবাসনব্যবস্থাকে দেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতেই এসব পরিবর্তন আনা হচ্ছে। কিন্তু যাঁরা পড়াশোনা বা চাকরির উদ্দেশ্যে কানাডায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের কাছে এর বাস্তব অর্থ ভিন্ন। নতুন নিয়মে একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। একজন কর্মী চাকরির প্রস্তাব পেয়েও প্রয়োজনীয় অনুমতি নাও পেতে পারেন। আবার কানাডায় কয়েক বছর থাকার পরও স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা অর্জন করতে না পারার আশঙ্কা রয়েছে।
তথ্যসূত্র: Immigration, Refugees and Citizenship Canada (IRCC)
Posted ২:০২ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
nyvoice24 | New York Voice 24