পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন ট্রাজেডি:

রাষ্ট্রীয় দায়, মূল্যবোধের গভীর সংকট ও সরকারের চরম ব্যর্থতা

এমডি এইচ হোসেন   প্রিন্ট
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬   সর্বশেষ আপডেট : ৪:০৬ অপরাহ্ণ

রাষ্ট্রীয় দায়, মূল্যবোধের গভীর সংকট ও সরকারের চরম ব্যর্থতা

এমডি এইচ হোসেন

​একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে জীবন উৎসর্গকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বগুলোর একটি। তবে সম্প্রতি পিরোজপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের তৎকালীন নায়েবে আমির দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার অন্যতম সাক্ষী ও গেজেটেড বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর (৮৭) মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ কেন্দ্র করে যা ঘটে গেল, তা কেবল অনভিপ্রেত নয় ।এ ঘৃণিত ঘটনা বাংলাদেশের সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে।

একজন মৃত ব্যক্তির জানাজা, গার্ড অব অনার এবং দাফনে বাধা প্রদান, কবর ভরাট করে ফেলা এবং গভীর রাতে পুলিশি নিরাপত্তায় স্বজনদের দ্বারা লাশ দাফনের ঘটনা সভ্য সমাজের ন্যূনতম বিবেককেও চরমভাবে ধাক্কা দিয়েছে।

​ঘটনার আদ্যোপান্ত ও পটভূমি :

​২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে পিরোজপুর সদর উপজেলার চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা মানিক পশারী নিজ এলাকায় অবস্থান করতে পারছিলেন না।

স্থানীয় শত্রুতা ও নিরাপত্তার অভাবে তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর মেয়ে জামাতার বাড়িতে আশ্রয় নেন। এরই মধ্যে তাঁর এক মাত্র ছেলে আসাদুল (৩৬) ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সন্তান হারানোর গভীর শোক ও দীর্ঘ অসুস্থতার পর গত ২৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ শনিবার সকাল ১০ টায় টুঙ্গিপাড়ায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মানিক পশারী।

​মরদেহ দাফনের উদ্দেশ্যে ওই দিন দুপুর ১২টার দিকে যখন পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নিয়ে আসা হয়, তখনই শুরু হয় টানটান উত্তেজনা।

পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদীর অনুসৃত দৃষ্টিভঙ্গি এবং পিরোজপুর জেলা জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী ও স্থানীয় কিছু লোকের বাধার মুখে পড়ে মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স।

মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ আখ্যা দিয়ে পিরোজপুরের মাটিতে তাঁর দাফন না করার ঘোষণা দেওয়া হয় এবং রাষ্ট্রীয় সম্মাননা (গার্ড অব অনার) প্রদানে কড়া আপত্তি জানানো হয়।

শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দলটির নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়, যা সাধারণ মানুষের মনে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করে।

​প্রশাসনিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও গোপনে ‘গার্ড অব অনার’
​রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী সরকারিভাবে একজন গেজেটেড অফিসার বীর মুক্তিযোদ্ধাকে উন্মুক্ত স্থানে সুশীল সমাজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্বজনদের উপস্থিতিতে গার্ড অব অনার প্রদান করার কথা। কিন্তু বাধার মুখে উপজেলা পরিষদ চত্বরে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে বরফ বা সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছাড়াই ৫ ঘণ্টা ফেলে রাখা হয় লাশ।

অবশেষে পিরোজপুর জেলা প্রশাসন ও পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকল্প পথ হিসেবে জেলা পুলিশ লাইনসের ভেতরে অত্যন্ত গোপনে মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার প্রদান করে।

​সেই সময় মানিক পশারীর নিকটাত্মীয় বলতে কেবল উপস্থিত ছিলেন তাঁর মেয়ে জামাতা মো. ফারুক। কোনো আত্মীয়স্বজন কিংবা সহযোদ্ধা সেখানে উপস্থিত হতে পারেননি।

রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদানের মতো একটি গৌরবোজ্জ্বল ঘটনাকে গোপন আশ্রয়ে শেষ করতে হওয়া কেবল একজন মুক্তিযোদ্ধার অবমাননা নয়, বরং স্থানীয় প্রশাসনের দুর্বলতা ও সিদ্ধান্তহীনতার চিত্রকেও ফুটিয়ে তোলে।

মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী

​কবর ভরাট, হুমকি ও বোনদের কবর খোঁড়ার হৃদয়বিদারক দৃশ্য :


​পুলিশ লাইনসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে যখন লাশ চিতলিয়া গ্রামে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল, তখন গ্রামে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যানুযায়ী, ছাত্রদল বা জামায়াত-শিবিরের স্থানীয় কিছু কট্টর সমর্থক মোটরসাইকেল নিয়ে গ্রামে ঢুকে দাফনের জন্য খুড়ে রাখা কবরটি মাটি দিয়ে ভরাট করে দেয়। এ সময় ‘মানিক পশারীর দাফন পিরোজপুরের মাটিতে হবে না’ এবং ‘মানিক পশারীর আস্তানা জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও’—এরকম উসকানিমূলক স্লোগান দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।

​পরবর্তীতে নারী ও শিশুদের বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ভয় দেখালে স্বজন ও প্রতিবেশীদের বড় অংশই আতঙ্কে পিছু হটে। এমন এক অমানবিক পরিস্থিতিতে মৃত ভাইয়ের দাফনের জন্য কোনো লোক না পেয়ে মানিক পশারীর ষাটোর্ধ্ব তিন বোন—রিনা, হেনা ও অপর বোন নিজেরা খন্তা-কোদাল হাতে নিয়ে রাতের অন্ধকারে ভাইয়ের কবর খোঁড়ার কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে স্থানীয় এক ব্যক্তি ও গ্রাম পুলিশের সহায়তায় কবর খনন সম্পন্ন হয়।

​অবশেষে শনিবার দিবাগত রাত দেড়টা থেকে দুইটার দিকে পুলিশ বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে পারিবারিক কবরস্থানে মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন হয়। দাফন শেষে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কবরের পাশে পুলিশ মোতায়েন রাখতে হয়েছে-যা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল।

​নীরব ভূমিকা ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন :

​পিরোজপুরের এই ঘটনায় সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের যে ভূমিকা দেখা গেছে, তা নিয়ে দেশজুড়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

​প্রথমত, একজন গেজেটেড বীর মুক্তিযোদ্ধাকে দাফনে বাধা দেওয়ার মতো বেআইনি ও অমানবিক কর্মকাণ্ডের সময় প্রশাসন কেন শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান নিতে পারল না ?

​দ্বিতীয়ত, উপাসনালয় বা দাফন প্রক্রিয়ায় বাধা প্রদান বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে মারাত্মক অপরাধ হলেও ঘটনার পর অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে কেন শিথিলতা প্রদর্শন করা হলো ?

​তৃতীয়ত, সমগ্র দেশজুড়ে যখন এ নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে নিন্দার ঝড় বইছে, তখন সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য বা কঠোর বার্তার অভাব নাগরিক সমাজকে হতাশ করেছে।

​জাতীয় রাজনীতিতে বিরোধ বা বিচার প্রক্রিয়ার সাক্ষী হওয়া কোনো অপরাধ হতে পারে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যকে কেন্দ্র করে একজন মৃত মানুষের লাশ নিয়ে রাজনীতি করা এবং তাঁর পরিবারকে এভাবে সামাজিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করা আইনের শাসনের পরিপন্থী।

​সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা :

আবহমানকাল থেকেই মৃত্যু এবং শেষকৃত্যকে সব ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিরোধের ঊর্ধ্বে রেখে এসেছে। শত্রুভাবাপন্ন কোনো মানুষের মৃত্যু হলেও জানাজা ও দাফনে সহায়তা করা এ দেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ কিন্তু পিরোজপুরের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক বিভাজন ও প্রতিহিংসাপরায়ণতা আজ আমাদের কতটা সহনশীলতাহীন ও নিষ্ঠুর করে তুলেছে।

​একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষের মরদেহের প্রতি এই আচরণ কেবল মানিক পশারীর পরিবারের ওপর নিপীড়ন নয়, এটি পুরো দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের প্রতি এক গভীর অবমাননা।

​উত্তরণের পথ :

​১. অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: মানিক পশারীর দাফনে বাধা প্রদান, লাশ পোড়ানোর হুমকি দেওয়া, কবর ভরাট করা এবং পরিবারকে উচ্ছেদের হুমকিদাতাদের অবিলম্বে সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

২. পরিবারের পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান: বর্তমানে মানিক পশারীর পরিবার যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তা দূর করতে স্থায়ী পুলিশি পাহারা এবং সরকারি সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

৩. বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা আইন জোরদার: বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির হস্তক্ষেপ বরদাশত না করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।

৪. রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীলতা: রাজনৈতিক স্বার্থে মরদেহের অবমাননা কিংবা সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করার অপসংস্কৃতি বন্ধে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্ট ও নীতিগত অবস্থান নিতে হবে।

সরকারের ব্যর্থতা ও জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জা :

​মৃত্যুর পর প্রত্যেক মানুষেরই মর্যাদা পাওয়ার অধিকার রয়েছে এই সার্বজনীন সত্যটি যদি রাষ্ট্র ও সমাজ হারিয়ে ফেলে, তবে আমাদের মানবিক ভিত্তিটাই নড়বড়ে হয়ে যাবে। এ ন্যাক্কারজনক ঘটনায় স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সকলের লজ্জিত হওয়া উচিত। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোন বিবৃতি বা ব্যাখ্যা না দেওয়াও লজ্জাজনক ও রহস্যময় । সরকার কঠোর অবস্থান নিলে স্থানীয় প্রশাসন অবহেলার সুযোগ নিতে পারতো না।

এ ধরনের অনেক ঘটনার ক্ষেত্রে সরকার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থা নিতে চরম ব্যর্থ হচ্ছেন যা মানুষের নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পিরোজপুরের ঘটনার যেন আর কোনো পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তা নিশ্চিত করার দায় এখন রাষ্ট্র ও এর নাগরিকদের।

 

 

 

Facebook Comments Box

Posted ৪:০৬ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

nyvoice24 |

Address
New York
Phone: 347-623-7137
Email: nyvoice24@gmail.com
Follow Us